বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[শিল্প]

[শিল্প]

স্রষ্টা যেখানে সৃষ্টি

কুমার রাণা পুস্তক সমীক্ষা

photo

শ্রমজীবী ভাষা ১ জানুয়ারি, ২০২২— আন্ডার মাই ডার্ক স্কিন ফ্লোজ আ রিভার: ট্রান্সলেসন্স অব দলিত রাইটিংস ফ্রম বেঙ্গল; সম্পাদনা ও অনুবাদ: দেবী চ্যাটার্জি ও শিপ্রা মুখার্জি; সাম্য; টাকা ৭৯৯।
১৯৮০-র দশকে বাংলার জনপরিসরে অনেকেই দলিত শব্দটা প্রথম শুনলেন। কেউ চমকিত হলেন, আবার অনেকে নাক কোঁচকালেন: দলিত, সে আবার কী জিনিস? যদিও ততদিনে মহারষ্ট্রের দলিত সাহিত্য পরিপক্ক হয়ে উঠেছে, এবং মধ্য ও উত্তর ভারতেও তার প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক পরিসরে “দলিত”-এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে অনেক সময় লেগেছে। দলিত তো শব্দমাত্র নয়, জাতিগত পরিচয় নয়, মহারাষ্ট্রের দলিত আন্দোলনের সংগঠক ও বলিষ্ঠ কবি অর্জুন ডাংলের কথায়, “দলিত একটি বোধ, জীবনের অভিজ্ঞতা, আনন্দ, দুঃখ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নির্মিত বোধ।” বাংলার জন্য এটা একটা বিড়ম্বনা যে, দলিত বোধ গড়ে ওঠার সমস্ত উপাদান থাকা সত্ত্বেও এ রাজ্যে ধারণাটির আকার পেতে বহু সময় লেগে গেছে। ডাংলে দলিত বোধকে বলছেন বিদ্রোহী; তার আনুগত্য বিজ্ঞানের প্রতি, এবং শেষ পর্যন্ত তার চরিত্র হয়ে ওঠে বিপ্লবী। সম্ভবত, বিদ্রোহ, বিজ্ঞান, এবং বিপ্লব সম্পর্কিত ধারণাগুলো বাংলার সমাজে এমনভাবে গেড়ে বসেছিল যাতে, এগুলোকে মনে করা হয়েছিল স্বয়ম্ভূ, এদের কোনও সামাজিক উৎস থাকার ব্যাপার নেই। যে জাতিব্যবস্থা মানুষকে ঊনমানব করে তোলে, মানুষে মানুষে বিভেদ ও বিদ্বেষের প্রধানতম একটি উপাদান হিসেবে দেখা দেয়, এবং সমাজের বিরাট অংশের মানুষের শ্রমের ফল লুঠ করার জন্যই তাদের “দলিত” করে রাখে, সেই ব্যবস্থার শিকড় এতটাই গভীরে যে, দলিতদের পক্ষে নিজেদের সংগঠিত করে তোলার পথেও সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং দার্শনিক বাধাও ছিল বিপুল। সে বাধা যে দূর হয়েছে তা বলা যাবে না, কিন্তু গত চার দশক ধরে নানা ধরনের চলাচল আজকের পশ্চিমবাংলায় “দলিত” ধারণাটির বিকাশের পথ খুলে দিয়েছে, যার ফল হিসেবে “বাংলার দলিত সাহিত্য” নামক একটি ধারার নির্মাণ ও বিকাশ ঘটে চলেছে।
এই চলাচলের একটা দিক ছিল, খণ্ডিত আকারে হলেও প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকে চলে আসা দলিত সামাজিক আন্দোলন (হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রজ্ঞায়) ও রাজনৈতিক সমাবেশ (যোগেন মণ্ডলের নেতৃত্বে) থেকে গড়ে ওঠা দলিত চেতনা, যার ভিতর দিয়ে মুদ্রিত দলিত রচনার অংকুরোদ্গম। আর এর অন্য দিকটা ছিল, ক্ষুদ্র হলেও বাংলার বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক ধারার মধ্যে দলিত চেতনার উদ্ভব। এই চেতনা একদিকে দলিতদের স্বার্থে গড়ে ওঠা নানা আকারের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গড়ার উদ্যোগ নেয়। বিদ্যাচর্চার জগতে জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবী চ্যাটার্জি, কমলেশ সেন-দের মতো বিদ্যানুশীলকরা দলিত ধারণাটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন – দলিত বিষয়ক গবেষণা ও সাহিত্যকে এঁরা এমন একটি প্রশস্ত পরিসরে দাঁড় করান, এবং স্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন করেন যে, দলিতের বিকাশ কেবল কোনও গোষ্ঠীগত বিকাশ নয়, এটা আসলে সমগ্র দেশবাসীর বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। উদাহরণ হিসেবে কবি কমলেশ সেন মহারষ্ট্রের দলিত কবিতার বাংলা অনুবাদ সংকলন “সূর্যের উত্তরপুরুষ” বইয়ের ভূমিকায় লিখলেন: তাঁদের [দলিতদের] এই মেধা প্রজ্ঞা এবং শক্তি ছড়িয়ে আছে তাঁদের নিজেদের রচিত সাহিত্যের মধ্যে – এমন নির্মম অভিজ্ঞতার ফসল বোধ হয় এর আগে কোন ভারতীয় সাহিত্যে আসেনি। তাই তাঁরা নিজেরাই একদিকে স্রষ্টা হয়েছেন, আবার অন্যদিকে তাঁরা নিজেরাই স্রষ্টার সৃষ্টি হয়ে উঠেছেন।
স্রষ্টা এবং সৃষ্টির এই আত্মিক সম্পর্ক দলিত সাহিত্য এমন এক ক্রোধ এবং মমতা নিয়ে হাজির হয়েছে, যা তাঁদের সেই বোধ নিয়েই অনুধাবন করতে হবে – বুঝতে হবে।
সৌভাগ্য, বোঝার গুরুত্বটা প্রসারিত হয়েছে। দলিতের নিজস্ব উদ্যোগের সঙ্গে সাধারণ বুদ্ধিচর্চার সংযোগটা একদিকে যেমন এর প্রসারের কারণ, অন্যদিকে তেমনি এটা তার ফল। সেই ফল হিসেবে ১৯৯০ দশকে বাংলায় দলিত সাহিত্যে একটা জোর আসে – গড়ে ওঠে “বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থা”-র মতো সংগঠন, “চতুর্থ দুনিয়া”-র মতো পত্রিকা, এবং এক লেখকদল, যাঁরা দেখিয়ে দিলেন, বাংলার ক্ষমতাবান সমাজ যে মানুষকে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে ক্রমে নিজের অন্তরকে নিঃস্ব করে তুলেছে, যার পরিণতিতে তার সাহিত্যে, তার বুদ্ধিচর্চায় জমে উঠেছে পাঁক – সেই লাঞ্ছিত মানুষ কীভাবে তার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত মূলস্রোত – বাংলার নবজাগরণের মধ্য দিয়ে উঠে আসা উচ্চবর্ণ হিন্দু লেখক লেখিকাদের অধরা কথনের বহু-কেন্দ্রিক বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক উঠে এল দলিত রচয়িতাদের কলমে। তাঁরাই দেখালেন সমাজের পরতগুলো কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই পরতগুলোকে চিনতে হলে তার সঙ্গে যেভাবে পরিচিত হতে হয়, অহর্নিশি আত্মমর্যাদার রক্তপাত, আপন মানুষদের মর্যাদার নিধন দেখতে দেখতে যেভাবে তার বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটে তা অ-দলিতের জীবনে ঘটে না। ঘটার সুযোগ হয় না। ফলে বাংলার যে জীবন তাকে পূর্ণরূপে দেখা ও দেখানোর ক্ষমতা এঁরা অর্জন করতে পারেননি। সেই অভাবটা পূরণ করে চলেছে দলিত সাহিত্য।
সাহিত্য বিচ্ছিন্ন কারো অর্জন নয়, বিচ্ছিন্ন কোনও অর্জন নয়। সাহিত্য সামূহিক। যে কারণে ভাষার ব্যবধান ঘোচাবার এত আয়োজন – তুর্কি সাহিত্য পাঠের জন্য মুখিয়ে থাকে ইংরাজ পাঠক, ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য পড়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে বসে থাকে জার্মান বা ফরাসি রসিক, মারাঠি বা মালয়ালম সাহিত্য পড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে থাকে পিপাসু বাঙালি। অপরকে আপন করে নেওয়ার এই বাসনা থেকেই মানুষ গড়ে তুলেছে তর্জমা নামক সাহিত্যের এক বিশেষ ধারা। অবশ্যই, তর্জমা সাহিত্যেও বাছ-বিচার আছে – গুণ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগ আছে। যারা যতটা ক্ষমতা অর্জন করেছে তারা ততটা এগিয়ে থেকেছে, আবার যারা এগিয়ে থেকেছে তারা ততটাই ক্ষমতা অর্জন করেছে। সে-কারণে মহারাষ্ট্রের দলিত সাহিত্য আজ তর্জমার সুবাদে এত বিস্তৃত – সারা দেশ জুড়েই তার প্রভাব। সে প্রভাব ইতিবাচক। দেশের মানুষ যত বেশি সে সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তত বেশি করে সে মারাঠি দলিতের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও জানবার সুযোগ পাচ্ছে – যতক্ষণ না অপরকে জানছি, ততক্ষণ নিজেকে জানা পুরো হয় না।
বাংলার দলিত সাহিত্য এদিক দিয়ে এখনো খানিকটা পিছিয়ে। তর্জমার পথ বেয়ে সেইসব রচনা ভারতীয় বা অন্যান্য পাঠকের পৌঁছে দেওয়ার কাজটা খুব বেশি এগোয়নি। কিছু কিছু দলিত লেখকের রচনা ইংরাজি ও হিন্দি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ঠিকই। কিন্তু, তা থেকে বাংলার দলিত সাহিত্য কোন পথে চলেছে, কী তার স্বরূপ, বাংলার সমাজের সঙ্গে কী তার সম্পর্ক, কোথায় বৈরিতা, কোথায় আত্মীয়তা, ইত্যাদি বুঝে উঠতে পারার মতো কোনো সংকলন এতদিন ছিল না। অন্তত ইংরাজি ভাষার পাঠকদের জন্য সুখবর, ইংরাজি তর্জমায় বাংলার দলিত লেখকদের একটি নির্বাচিত রচনা সংকলন তৈরি হয়েছে, দেবী চ্যাটার্জি ও শিপ্রা মুখার্জির সম্পাদনায় ও অনুবাদে। “আন্ডার মাই ডার্ক স্কিন ফ্লোজ আ রিভার: ট্রান্সলেসন্স অব দলিত রাইটিংস ফ্রম বেঙ্গল” শিরোনামের প্রায় চারশ’ পৃষ্ঠার এই সংকলন খুবই যত্নের সঙ্গে বাংলা দলিত সাহিত্যের সঙ্গে ইংরাজি ভাষার পাঠকদের পরিচয় ঘটিয়ে দিচ্ছে। পাঁচটি ভাগে ভাগ করা এই সংকলনে প্রথমভাগে আছে বাংলা দলিত সাহিত্য নিয়ে বাংলাভাষায় লেখা দলিত রচয়িতাদের আলোচনার তর্জমা। এই লেখগুলোতে দলিত লেখকরা কীভাবে বাংলা দলিত সাহিত্য আন্দোলনটাকে দেখছেন তার একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। দ্বিতীয় ভাগে আছে, দলিত গল্পকারদের লেখা কিছু কাহিনির তর্জমা। সেই সঙ্গে আছে, তিনটি উপন্যাসের অংশবিশেষের তর্জমা। তৃতীয় ভাগে আছে নির্বাচিত দলিত কবিদের কবিতা, এবং মৌখিক সাহিত্যের প্রকাশ, কিছু গান – দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মৌখিক রামায়ণ গান, এবং বাউল, ফকির ও অন্যান্যদের গান। বিষয়বস্তু শুধু নয়, উপস্থাপনার ধরন, ভাষার ব্যবহার, আবেগ ও বুদ্ধির মিশ্রণের বিশিষ্টতা, ইত্যাদি নানা দিক দিয়ে এই সৃষ্টিগুলি বাস্তবিকই এই রচয়িতাদের “স্রষ্টা” করে তুলেছে, আবার নিজেদেরকে “স্রষ্টার সৃষ্টি” করে তুলেছে। চতুর্থ ভাগে আছে কিছু নির্বাচিত আত্মকথার অংশবিশেষের তর্জমা। দলিত জীবন ও দলিত লেখকের জীবন এই আত্মকথাগুলোতে অবিচ্ছিন্নভাবে মিশে গিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সাহিত্যের অনন্য এক ধারায়। পঞ্চম ভাগে আছে বাংলা দলিত পত্রপত্রিকার একটি সমীক্ষা, যা পাঠকের সামনে এই সাহিত্যধারার সমৃদ্ধিটাকে তুলে ধরে।
এর সঙ্গে একটি বড় প্রাপ্তি দেবী চ্যাটার্জির লেখা একটি ভূমিকা। ভারতীয় সমাজে দলিত-সম্পর্কটার স্বরূপ, তার আঙ্গিক ও গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এই লেখাটি বিদ্যাচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে থাকবে। তর্জমা প্রসঙ্গে শিপ্রা মুখার্জির লেখাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তর্জমার সমস্যাটি কেবল ভাষার ব্যবধান নয়, এটা সামাজিক ব্যবধানেরই প্রতিফলন, এবং তর্জমার সময় এই জিনিসটা স্মরণে না রাখলেই নয় - এই শিক্ষাটি সাধারণ পাঠক থেকে বিদ্যানুশীলক সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অনুবাদকরা কথাটা মনে রেখেছেন, যার প্রতিফলন তর্জমার উৎকর্ষে ধরা পড়ে।
ইংরাজি এই সংকলনটি শুধু ইংরাজি ভাষাভাষীদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাংলার দলিত সাহিত্যিকদের জন্য এবং বাংলা সাহিত্যের জন্য এই সংকলনটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রথমত অ-বাংলাভাষী পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া, সমালোচনা, আলোচনা, ইত্যাদি বাংলার দলিত ও সাধারণ সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে যাঁরা ইংরাজি পড়তে সক্ষম তাঁরাও সংকলনটিতে বাংলার দলিত সাহিত্যের একটি সামগ্রিক ছবি দেখতে পাবেন – সেদিক দিয়ে সংকলনটি বাংলা ভাষাতেও এ-জাতীয় সংগ্রহ না থাকার অভাব কিছুটা পূরণ করবে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.