বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[শিল্প]
শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১— ইতিমধ্যে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মের দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত। আজও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা অন্তহীন। বিশেষ করে সমাজ সংস্কার, বাংলার নবজাগরণে তাঁর ভূমিকা, শিক্ষা ও শিক্ষা সংস্কার, নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ভাষা ইত্যাদিতে নবচেতনার উন্মেষ, সর্বোপরি ধর্মমোহমুক্ত বৈজ্ঞানিক মনন আজও আমাদের উদ্দীপ্ত করে। বিগত দু'শো বছর সময়কালে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে এবং আমরা তাঁর জীবন-কর্ম ও চরিত্র সম্পর্কে মোটামুটি ভাবে অবহিত এবং সমৃদ্ধ হয়েছি। তবে সম্প্রতি একটি বিষয় আমার মনে কিছু কৌতুহল সঞ্চার করেছে। যে বিষয়টি সম্পর্কে গবেষক, আলোচক বা বিশেষজ্ঞগণ প্রায় নীরবই থেকেছেন। বিষয়টি হল তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা বা উপলব্ধি বা কোনও ভূমিকা ছিল কি না? যদি থেকে থাকে তার স্বরূপ কী, আর যদি না থেকে থাকে কেনই বা ছিল না?
দু’ একটি বিচ্ছিন্ন প্রত্যক্ষসূত্র এবং কিছু পরোক্ষ উল্লেখের মধ্যে দিয়ে এটা কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিদ্যাসাগরের একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক অভিমত ছিল, যা তাঁর সারাজীবনের কর্মপ্রচেষ্টা, বৈজ্ঞানিক মনন এবং দেশের বৃহত্তর জীবনসংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত সাধারণ মানুষের অনুভূতির অনুকূল। যদিও তাঁর আচার-আচরণে, কথাবার্তায় বা জীবন-চর্যায় তার কোনও বাহ্যিক প্রকাশ ছিল না। আমার ধারণার সমর্থনে আমি দু-একটি সূত্রের উল্লেখ করতে চাই।
প্রথমত, ১৯৯৩ সালে 'All Bengal Vidyasagar Death Centenary Committee' প্রকাশিত 'The Golden Book of Vidyasagar' -এ 'A Glorious Span' 1820-1891 অধ্যায়ে 'The life : A Chronicles of Seven Decades' -এ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের একটি সালভিত্তিক বিবরণী সংযোজিত হয়েছে। এই বিবরণীতে ১৮৫৮ সালে এসে আমরা দেখতে পাই সেখানে ওই বছরের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য দিকের সঙ্গে এ কথাও উল্লেখিত হয়েছে, "November 15: SOMPRAKAS, a Vernacular weekly, appeared, Vidyasagar was behind the planning of the journal that for the first time in the country dealt with political issues ; the first issue of the journal, it is said, was entirely a specimen of Vidyasagar's versatility; became the secretary of Editorial Committee of TATTWABODHINI, a vernacular theoretical journal founded by Debendranath Thakur, through a different purpose, it became the first vernacular journal for instilling logical bent of mind, the brain behind was of Vidyasagar."
দ্বিতীয়ত, 'সোমপ্রকাশ' সাপ্তাহিকীর সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পর্কে 'সংসদ বাঙ্গালি চরিতাভিধান' বলছে, 'তাঁর জীবনের প্রধান কীর্তি সাপ্তাহিক 'সোমপ্রকাশ' সম্পাদনা। ১৫ নভেম্বর, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পত্রিকাটি কলকাতার চাঁপাতলা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। মার্জিত রুচি, প্রাঞ্জল ভাষা ও নির্ভীক সমালোচনার জন্য পত্রিকাটি বিশুদ্ধ রাজনীতি ও সুস্থ সাহিত্যের প্রচারে দীর্ঘদিন বাংলা সংবাদপত্র জগতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন বড়লাট লর্ড লিটন বঙ্গীয় মুদ্রাযন্ত্র বিষয়ক আইন বিধিবদ্ধ করলে তিনি মুচলেকা দিতে অস্বীকার করে 'সোমপ্রকাশ' প্রচার বন্ধ করে দেন। পরে ওই আইন রদ হলে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয়।'
আমরা যদি বিদ্যাসাগরের সারাজীবনের কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করি তবে অবশ্যম্ভাবীভাবে দেখতে পাব তাঁর এই জীবনব্যাপী কর্মকাণ্ডে একটা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে। সমাজের নিরন্ন-ক্ষুধার্ত-জীবন সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত, অবহেলিত-শোষিত-নিপীড়িত মানুষদের প্রতি সমবেদনা সহানুভূতি ও তাদের জীবনে খানিকটা আশার আলো সঞ্চার, এতেই তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন। বক্তব্যের সমর্থনে অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিন্ত অযথা প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আমি শুধু হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখা 'কর্মটাঁড়ে বিদ্যাসাগর' প্রবন্ধ থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি।
"বাংলায় (অর্থাৎ কর্মটাঁড়ে যে বাড়িতে বিদ্যাসাগর থাকতেন) আসিয়া চাহিয়া দেখি, বাংলোর সম্মুখের উঠান সাঁওতালে ভরিয়া গিয়াছে - পুরুষ মেয়ে ছেলে বুড়ো - সব রকমের সাঁওতালই আছে। তারা দল বাঁধিয়া বসিয়া আছে, কোনও দলে পাঁচজন, কোনও দলে আটজন, কোনও দলে দশজন। প্রত্যেক দলের মাঝখানে কতকগুলো শুকনা পাতা ও কাঠ। বিদ্যাসাগরকে দেখিয়াই তাহারা বলিয়া উঠিল– ও বিদ্যাসাগর, আমাদের খাবার দে। বিদ্যাসাগর ভুট্টা (যে ভুট্টা তিনি আগে থেকেই পয়সা দিয়ে সাঁওতালদের কাছ থেকেই কিনে রেখেছিলেন এবং প্রতিদিনই যেটা করতেন) পরিবেশন করিতে বসিলেন। তাহারা সেই শুকনা কাঠ ও পাতায় আগুন দেয়, তাহাতে ভুট্টা শেঁকে, আর খায় - ভারি ফুর্তি। আবার চাহিয়া লয় - কেহ দুটা, কেহ তিনটা, কেহ চারটা ভুট্টা খাইয়া ফেলিল। তাকের রাশিকৃত ভুট্টা প্রায় ফুরাইয়া আসিল। তাহারা উঠিয়া বসিল– খুব খাইয়েছিস বিদ্যাসাগর। ক্রমে চলিয়া যাইতে লাগিল। বিদ্যাসাগর রকে দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিলেন; আমিও আশ্চর্য হইয়া দেখিতে লাগিলাম; ভাবিলাম এ রকম বোধহয় আর দেখিতে পাইব না।" শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে!
বিদ্যাসাগর — পাশ্চাত্য সাহিত্য দর্শনে যাঁর অগাধ বুৎপত্তি, যিনি শেক্সপিয়ার, মিল, বেন্থাম প্রায় গুলে খেয়েছেন, তিনি কি বিশ্ব রাজনীতি এবং ভারতে তার প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন ছিলেন? যদি তাই হয় তবে এই শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি তিনি পেলেন কোথা থেকে? এই কৌতুহল বা প্রশ্ন থেকেই আমার এ প্রবন্ধের অবতারণা।
'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা ৪৩ বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ৪৩ বছরের মধ্যে আজ পর্যন্ত মাত্র ১২ বছরের প্রকাশিত সংখ্যা গবেষকগণ সংগ্রহ করতে পেরেছেন। গবেষকদের মতে সোমপ্রকাশের সমস্ত সংখ্যা উদ্ধার করা গেলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নতুনভাবে লিখিত হতে পারত। এখন লক্ষ্য করার বিষয় আমি যে দুটো সূত্রের উল্লেখ করেছি, দুটোতেই কিন্তু 'রাজনীতি' শব্দটি বিদ্যমান। এখন সোমপ্রকাশ-এ প্রকাশিত এই রাজনীতি বিষয়ের দু’একটি লেখার উল্লেখ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ১৮৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত 'সঞ্চয়' নামের প্রবন্ধের একটি উদ্ধৃতি– "ইওরোপে কমিউনিস্ট নামক মতাবলম্বী কতকগুলি লোক আছেন। তাঁহারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির স্বতন্ত্র ভাবে অর্থ সঞ্চয় অন্যায় মনে করেন। যিনি যাহা উপার্জন করিবেন সমুদায় সাধারণ ধনাগারে অর্পিত হইবে এবং সংসার নির্বাহ করিতে যে ব্যক্তির যাহা আবশ্যক হইবে তিনি তাহা সাধারণ ধনাগার হইতে পাইবেন। উদ্বৃত্ত অর্থ সাধারণ হিতের জন্য ব্যয়িত হইবে।" কমিউনিজমের 'এই মতটি অতিশয় উন্নত ও সভ্যতা সাপেক্ষ।'
১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের যে বিরাট অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, ইতিহাসে তা 'প্যারি কমিউন' বিপ্লব নামে পরিচিত। ৭২ দিনের এই বিপ্লবী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জনসমর্থনমূলক, শ্রমিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। বিদেশি ও দেশীয় নাগরিকদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছিল। কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু দেশীয় ধনী আর প্রাশিয়ার যুক্ত আক্রমণে কমিউনার্ডদের রক্তস্নানে শেষ হয়েছিল এই বিপ্লব। 'প্যারি কমিউনের' পতন ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও ১৮৭১ সালের এই আন্দোলন পরবর্তীকালের শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। প্যারিতে কমিউনিজমের প্রয়োগই মার্কসকে'কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের' সম্ভাব্য চেহারাটা বুঝতে সাহায্য করেছিল। এই 'প্যারি কমিউন' আন্দোলনের কথাও সোমপ্রকাশ প্রকাশ করেছে।
ওই একই বছরে ১৮৭১-এ 'ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেন্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভায় কলকাতা থেকে লেখা কোনও এক লেখকের একটি চিঠি পাঠ করা হয়। মার্কস ও এঙ্গেলসের উপস্থিতিতে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং যাতে সভাপতি ও সম্পাদক স্বাক্ষর করেন, সেই সিদ্ধান্তের অংশবিশেষ চারদিন পর The Eastern Post No. 151, ১৯ আগস্ট ১৮৭১-এ প্রকাশিত রিপোর্টে কলকাতা থেকে পাওয়া চিঠির অংশবিশেষ প্রকাশিত হল। ভারতের সেদিনের দুঃসহ অবস্থা তাতে স্পষ্ট– 'great discontent exists amongst the people, and the British Government is thoroughly disliked. The taxation is excessive and the revenues are swallowed for maintaining a costly system of officialdom. As in other places the extravagancies of the ruling class construct in a painful manner with the wretched condition of the workers, whose labour creates the wealth thus squandered. The principles of the international world bring the mass of the people into an organisation if a sector was started.'
আন্তর্জাতিকের এই সভায় চিঠিটি পড়া হল এবং পড়ার পর আলোচনা হল। আলোচনান্তে ঠিক হল সম্পাদক কলকাতার পত্রলেখককে এর উত্তর দেবেন। এত স্পষ্ট হল ভারতে আন্তর্জাতিকের শাখা গঠনে এদের কোনও আপত্তি নেই, তবে তা করতে হবে ভারতীয়দের নিয়েই এবং নিজস্ব শক্তিতে।
১৮৭৩-এর ১০ মার্চ সংখ্যায় সোমপ্রকাশ কমিউন ও আন্তর্জাতিক নিয়ে নানা ইতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ করেছে। সুতরাং একথা বুঝতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, 'কমিউনিজম অতিশয় উন্নত ও সভ্যতা সাপেক্ষ' কথাটি কোনও আলটপকা মন্তব্য নয়। আন্তর্জাতিকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সমগ্র বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব, যুদ্ধ-বিগ্রহ পরিত্যাগ করে সকলে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করবেন– এমন নানা তথ্য সংগ্রহ করে সোমপ্রকাশই আমাদের জানিয়েছে।

'বিশ্বজুড়ে এই কমিউনিজমের চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিকের মধ্যে নানা দেশের শ্রমিক ও বৈপ্লবিক শক্তি সমবেত হচ্ছে। কমিউনের উপর রক্তাক্ত আক্রমণের কথা জানতে পারলেও কমিউনের প্রশংসা করেছে সোমপ্রকাশ। সোমপ্রকাশ এক প্রবন্ধে শিরোনাম করেছে, 'যুদ্ধ কি সভ্যতার অঙ্গ? 'কেবল এই টুকুই নয়– পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রকে যখন সর্বরোগ ধন্বন্তরি বলে উচ্ছ্বাস চলছে– তখনই সোমপ্রকাশ তার স্বরূপ তুলে ধরেছে এইভাবে'– 'ইংলন্ড ধনী প্রধান দেশ। সেখানে ধনীর পূজা ও দরিদ্রদের মৃত্যু, সেই দেশে পার্লামেন্ট মহাসভার সভ্য হইতে যে পরিমাণ ধনের প্রয়োজন, সে পরিমাণ সদ্ গুণের প্রয়োজন হয় না।' ... 'আজকের স্বাধীন ভারতের চলমান রাজনীতিতে আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই উক্তিগুলো কী সুন্দরভাবে মিলে যায়। মনে রাখতে হবে - এই রাজনৈতিক বোধ সোমপ্রকাশ বারবার তুলে ধরেছে এবং এটা ব্রিটিশ শাসন যুগের প্রচণ্ড দাপটের কালে। এই পত্রিকা বিশ্বের দেশে দেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে লেখা বারবার তুলে ধরেছে তাই-ই নয়,কমিউনিস্টআন্দোলন, সমাজবাদীদের কর্মতৎপরতা, নিহিলিজম, ফেবিয়ানিজম, সোশালিজম সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু লক্ষ্য বিস্তৃত করেছে।'
সোমপ্রকাশ গবেষিকা নন্দিনী সেন 'সোমপ্রকাশ ও সমকাল' পুস্তকে লিখেছেন, 'এই পত্রিকার পাতায় পাতায় নিয়মিত স্থান পেয়েছে... সমকালীন স্পেন, কিউবা, জার্মানির বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন... নিহিলিজম, কমিউনিজমের সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সংশয় আশায় ভরা তাত্ত্বিক আলোচনা, প্যারি কমিউন ও আন্তর্জাতিকের নিয়মিত সংবাদ ও কমিউনিজম চিন্তার বিকাশের পূর্বের ইংল্যান্ড... আন্দোলন। ফরাসী ও রেড রিপাবলিকানদের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে নানা আলোচনাও বারবার সোমপ্রকাশ ছেপেছে।
সংগৃহীত তথ্য থেকে এটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার যে সোমপ্রকাশে কাব্য, গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশিত হলেও রাজনীতিই ছিল তার কেন্দ্রবিন্দু।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শিবনাথ শাস্ত্রী, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকেও জানা যায় বাংলা ভাষায় রাজনীতি চর্চার জন্যেই বিদ্যাসাগর মহাশয় সোমপ্রকাশ পত্রিকাটি প্রবর্তন করেছিলেন। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী অন্যান্য রচনাতে লেখকের নামের উল্লেখ থাকলেও প্রবন্ধে লেখকের নামের কোনও উল্লেখ থাকতো না। সুতরাং সোমপ্রকাশে প্রকাশিত রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলো কারা লিখেছিলেন, তা আজও রহস্যাবৃত। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, যাঁরাই লিখে থাকুন– তিনি বিদ্যাসাগর নিজেই হোন বা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ বা অন্য কেউ, বিদ্যাসাগরের প্রত্যক্ষ অনুমোদন ব্যতিরেকে যে একটি লেখাও ছাপা হয়নি তা নিশ্চিত। কারণ, পত্রিকাটি প্রবর্তন করেছিলেন বিদ্যাসাগর নিজে, তিনি যে ধরণের মানুষ ছিলেন তাতে তাঁর প্রত্যক্ষ অনুমোদন ব্যতীত কোনও প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, এটা কষ্টকল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। এর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সম্মানও অনেকটাই জড়িয়ে ছিল।
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন বা কমিউনিস্ট পার্টি সূত্রপাত হওয়ারও আগে বিদ্যাসাগর তাঁর প্রায় সমসাময়িক (দু-বছরের বড়) মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের শিক্ষা ও চিন্তা সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন বলেই মনে হয়। মার্কসের দেখানো 'সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীকে যতই অসহায় মনে হোক না কেন, তাদের মধ্যেই রয়েছে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলার সত্যকার চাবিকাঠি, তারাই পারে বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে সর্বহারার রাজ কায়েম করতে।' ('প্রমিথিউসের পথে' দ্বিশতবর্ষে কার্ল মার্ক্স, সম্পাদকীয়)। বিদ্যাসাগরের সারা জীবনের কর্মকাণ্ডের বিজ্ঞানসম্মত কাঁটাছেঁড়া করলেও একই সত্য বেরিয়ে আসবে।
সবশেষে বিদ্যাসাগরের শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অশোক মিত্রের লেখা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনের ইতি টানছি। "চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে স্নিগ্ধ-সিক্ত জমিদারশ্রেণী মহা ঢক্কানিনাদ সহকারে তাঁদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, ভারত সভা– ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন – স্থাপন মুহূর্তে অনেক চেষ্টা করেছিলেন প্রথম সভাপতি হিসেবে বৃত হতে তাঁকে রাজি করানোয়, তাঁরা চাইছিলেন কিছু-কিছু বিদ্বজ্জনের আড়ালে বিরাজ করতে, যাতে সংস্থাটির আসল উদ্দেশ্য, জমিদারশ্রেণীর অধিকতর স্বার্থবর্ধন, চট করে বাইরে উদ্ঘাটিত না হয়। ভূম্যাধিকারী মহোদয়গণ তাঁর স্নেহবৎসল বেশ কয়েকজনকে বিদ্যাসাগরের কাছে দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাঁকে সম্মত করাতে পারেননি। ঢাকঢোল পিটিয়ে তাঁর অস্বীকৃতির আসল কারণ ঘোষণা করেননি তিনি, কিন্তু যারা পরোক্ষ শোষণ করেন, তাদের পৃষ্ঠপোষক হতে তিনি আড়ষ্টতাবোধ করেছিলেন, আমাদের পক্ষে তাই শ্লাঘার বিষয়।
তাঁর শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির অপর একটি অপরোক্ষ প্রমাণ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ। বর্ধমানের মহারাজা বীরসিংহ গ্রাম ও তার সংলগ্ন অঞ্চল বিদ্যাসাগরকে তালুক হিসেবে উপঢৌকন দিতে চেয়েছিলেন। সেই উপঢৌকন সবিনয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বিহারীলাল সরকারের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি, বিদ্যাসাগর মহারাজাকে বলেছিলেন, 'যখন আমার এমন অবস্থা হবে যে সমস্ত প্রজার খাজনা আমি নিজে দিতে পারবো, তখন আপনার তালুক গ্রহণ করবো।' অশোক মিত্র এটার উল্লেখ করে নিজেই প্রশ্ন করেছেন, 'কাকে বলব শ্রেণী বন্ধনমুক্তি? কাকে বলব শ্রেণীবদ্ধতা?' (শ্রেণীবদ্ধ বিদ্যাসাগর, প্রবন্ধ সংগ্রহ)।
সোমপ্রকাশ সাপ্তাহিকীর দুষ্প্রাপ্য সংখ্যাগুলো, অন্তত কিছুও যদি উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে ভারত তথা বঙ্গদেশে কমিউনিজম বিষয়ক ভাবনার পথিকৃৎ হিসেবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাম স্বীকৃতি পেতে পারে। এবং বর্তমান সময় কালে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নতুন ভাবনার দিগন্তও উন্মোচিত হতে পারে।
তথ্যঋণ: সোমপ্রকাশ সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য – পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ প্রকাশিত স্মরণীয়-বরণীয় গ্রন্থ থেকে হেমেন মজুমদারের লেখা "বিদ্যাসাগর - বিদ্যাভূষণের 'সোমপ্রকাশ বলেছিল, কমিউনিজম অতিশয় 'উন্নত ও সভ্যতা সাপেক্ষ' " প্রবন্ধ থেকে গৃহীত।