বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[শিল্প]
আকাশটা যেন চিৎসাঁতারে কাসাইয়ের বুকে নেমে এসেছে। মাথার উপরের অথৈ আকাশটা কেমন একলাফে নেমে এসেছে কাসাই নদীর জলে। আকাশের বুকে ফুটকি দেওয়া তারাগুলো কাসাইয়ের জলে পড়ে জলময় গুটিবসন্তের আদল তৈরি করেছে। চৈত্রের শেষ বাতাসে জলটা দুলতে-দুলতে চামরিক মেঝেনের মুখের আদল পায়। অবিকল সেই গুটিবসন্ত ভরা কালো তেলা-তেলা অপূর্ব সুন্দর মুখখানা। নাচনি চামরিক মেঝেন। জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুর হিসাব নিয়ে মানভূমের মাটিতে বড়ো হয়নি সে। মানভূমের টাঁড় জমির পাথুরে শুষ্ক কঠিন মাটিতে সে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত ছিল নাচনি ঘরের ‘মেয়্যা'। ঝনিয়া মায়ের মুখের আদলের মত কাসাইয়ের গুটিবসন্তের ছোপ ধরা জল দেখে আর নিজের সঙ্গে লড়াই করে। এই বোরা গ্রামের খবর কোন্মানচিত্রে আছে - ঝনিয়ার তা জানা নেই। সে শহর দেখেছে বছর তিনেক আগে টুসুর উৎসবে গিয়ে - মানবাজার শহর। মায়ের কাছে শুনেছে - তারপরেও জেলাশহর পুরুলিয়া আছে। চামরিক তাকে সেই শহরের গল্প শুনিয়েছিল। কথা দিয়েছিল একদিন সেখানে নিয়ে যাবে। তারপরেও শহর আছে। শহরের পর রাজ্য আছে, রাজ্যের পর দেশ আছে। সে-সবের খবর অবশ্য চামরিক জানে না। ঝনিয়া মেয়ে হয়ে জন্মানোয় চামরিকের চিন্তার আঁতিপাতির শেষ ছিল না। বোঙাবুরুর থানে মাথা কুটে-কুটে কাঁদতো আর বলতো - তুই এত্ত পাথর বটে!
ভাতুরাম রসিক যখন বর্ষার সন্ধ্যায় ওই বড় পাথরের চাঁইটার উপর বসে বসে ঝনিয়ার মায়ের সঙ্গে টুকে-টুকে হাড়িয়া খেতো, ঝনিয়া তখন দূরে দাঁড়িয়ে দেখতো ওদের। দেখতো আর ভয় পেত। রসিককে সে শুধু ভয়ই পেত। চামরিকও তাকে বাবা ডাকতে শেখায়নি। বরং ভাতুরামের থেকে ঝনিয়াকে সবসময় দূরে দূরে রাখতে চাইতো। বর্ষার জলে ভেজা চাঁই পাথরটায় পিছলে ওঠার ঢঙে চামরিক ফুঁসে উঠতো। ঝগড়া লাগতো ভাতুরামের সঙ্গে। ঝগড়া থেকে শুরু হতো মারপিট। চামরিকই মার খেতো বেশি। মার খেয়ে ভাতুরামকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতো। তারপর কাঁদতে-কাঁদতে ঝনিয়াকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে যেত।
ঝনিয়া মরামাছের মতো বড়-বড় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কাসাইয়ের জলে। আজন্মপালিত পরিচিত ঝোরাটা, জঙ্গলটা, দূরের ওই মুকুটমণিপুর পাহাড়টা - সব যে একটা গোটা দিনের মধ্যে এত তাড়াতাড়ি ঘোলা হয়ে যাবে, সেটা সে জন্মেও ভাবতে পারেনি। তাকে নিয়ে এমন একটা পরব শুরু হতে পারে সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। রাঢ়ভূমির শুকনো ধূ-ধূ বিস্তৃত নেড়া জমির শূন্য উদারতায় সে চৈত্রের দুপুরের মত ঠা-ঠা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকতে-থাকতে তার কান্না পায়। তার মা চামরিক মেঝেনও কাঁদতো। কাঁদতো আর ইনিয়ে বিনিয়ে বোঙাবুরুর থানে কেরাময়ের কাছে মানসা জানাতো। কিন্তু কী লাভ হল? ঝনিয়াকে কি সে রক্ষা করতে পারলো?
ভাতুরাম অযোধ্যা পাহাড়ের নিচে মাঠাগ্রামে থাকে। সেখানে তার বৌ, গোটা তিন-চার ছেলেমেয়ে আছে। ভাতুরাম মাঝেমাঝে যায় সেখানে। খুব ছোটবেলায় ভাতুরামের সঙ্গে সেখানে যেতে চেয়ে সজোরে গালে থাপ্পড় খেয়েছিল ঝনিয়া।
২
জেলাশহর পুরুলিয়া থেকে মাত্র ছ’ঘণ্টা দূরের এই বোরাগ্রামে আজ একজন নাচনির নথ ভাঙার আসর বসবে। সেই উপলক্ষ্যে জায়গাটা একটা উৎসবের চেহারা নিয়েছে। রাত থেকেই মেয়ে-মরদের হল্লার সঙ্গে ধামসা-মাদলের দ্রিমিত দ্রিমিত বোল ঝনিয়ার বুকের ভিতর ধুক্পুকানি তোলে। ভয় পাওয়া কেঁচোর মত এমুখ-ওমুখ করে পালাতে চেষ্টা করে ঝনিয়া, কিন্তু পারে না। সে-ই রাত থাকতে ভাতুরাম এসে ঝনিয়াকে বলে যায় - ঝনিয়া, হই ঝনিয়া, উঠ ছুঁড়ি, গতর উঠা। পর পর বেলা বাড়িবে। কত্ত লোক আসছে। যা যা, ঝোরার জলে গতর চুপায়ে আন।
কাসাই নদীর কালো জল মুঠি ভরে সে মাথায় ঢালে। জলের অবয়ব ভেঙে যায়। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যায় গুটিবসন্ত ভরা চামরিক মেঝেনের কালো মুখ। গুঙরিয়ে কেঁদে ওঠে ঝনিয়া। একটু পরে সনকা বুড়ি আসবে তাকে কৌরঞ্জার তেল মাখাতে। একটু-একটু করে সুগন্ধি করে তুলবে। ঝনিয়া শুনেছে, তার জন্য যে রসিক আসবে, সে ওই মাঠাগ্রামেরই সম্পর্কে ভাতুরামের খুড়াতো ভাই। ঝনিয়ার জন্য আনবে লাল ডুরে শাড়ি, জরির ফিতে। ভাতুরামকে দেবে নগদ পাঁচশো এক টাকা।
সনকা বুড়ি গতকাল রাতে বলে গেছে - তুর কপাল ভাল হইলে রসিক তুর লগে রূপার মল আনবেক হ।
দু’দিন আগে থেকে বোঙাবুরুর ভাত পচিয়ে জড়িবুটি মিশিয়ে হাড়িয়া তৈরির আয়োজন চলছে। তিনটে খুক্রি, একটা শুয়োর বাঁধা আছে। ওগুলো ভোজ হবে। গাঁয়ের লোকের মুখে মুখে ফেরে - হ বটে, বিশ বচ্ছর বাদে নাচনি হবেক। সেই বিশ বচ্ছর আগে চামরিক মেঝেনের নথ ভেঙেছিল ভাতুরাম রসিক।
জবজবা ভিজে শরীরে গুটিসুটি মেরে নিজের ঘরে ঢোকে ঝনিয়া। ভাতুরাম উঠোনের উপরে খাটিয়ায় বসে পুরুলিয়া টাউন থেকে আনা হাত-রেডিওটা নব ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে কীসব কিরিমিরি শুনে যাচ্ছে। ভিজে শরীরে বসে থাকতে-থাকতে ঝনিয়ার কাঁপন লাগে। কাঁপতে কাঁপতে সে বিড়বিড় করে - মাঈ, তু কুত্থায় গেলি, তু তো হামারে বলিচিলি নাচনির জেবন ভাল লয়। হামি বীরসা মুণ্ডার পুতির পুতি, হামি কেনে লিব নিন্দের জেবন?
মহুয়ার গন্ধে মাখামাখি করে বাতাস ভেসে আসছে। গ্রামের লোকেরা এক হাড়িয়া লোভী দাঁতাল হাতিকে বান্দোয়ান রেঞ্জের জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ক্যানেস্তারা পিটাচ্ছে। আর বিডিও অফিস থেকে দেওয়া চকোলেট বোমগুলো ফাটাচ্ছে। ঝনিয়া উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে আঁতিপাতি চেয়ে দেখে। রাতের কালো ভাবটা কেটে গেছে, তার বদলে ধূসর রঙের আস্তরণে ছেয়ে গেছে চারদিক। ঝনিয়া সেই ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকারে চামরিককে দেখতে পায়। অবিকল তার মা চামরিক মেঝেন। আসর শেষে হাড়িয়া খাওয়া মাদি হাতিটার মতো টলতে টলতে আসছে। বেসামাল বেশভূষার মাঝে হাতে ধরে আনে ঝনিয়ার জন্য আনা কোনো উপহার। ঝনিয়া দু’হাত বাড়িয়ে ধরতে যায় ছায়ামানুষটিকে, কিন্তু দাঁতাল হাতিটার মতো ধোঁয়ার কুণ্ডুলিটাও যে কোন্পুটুসের বনে হারিয়ে যায় তা আর ঠাওরে আসে না ঝনিয়ার।
৩
প্রতিবারই চামরিক যখন আসরে নাচ দেখিয়ে বাবুদের মন ভিজিয়ে রাত ভোর করে অর্ধবিবস্ত্র হয়ে ঘরে ফিরতো, ঝনিয়ার জন্য কিছু-না-কিছু আনতোই। কখনও শহুরে বিস্কুট, রংপেন্সিল, একবার তো চুলওয়ালা একটা ফর্সা পুতুল এনেছিল। চামরিকের সঙ্গে ঝগড়া লাগতো ভাতুরামের।
চামরিক গলা তুলে চেঁচাতো - হামারি বিটির লিগ্যা টেকা জমাইব। উর বিহা দিব। লিখাপড়া শিখাইব। উ নাচনি হবেক লাই।
ভাতুরাম গালি পাড়তো - হ শখ কত্ত! নাচনি প্যাটে পয়দা লিয়া লিখাপড়া শিখাইবি! তু মরলে শালি তুর পোড়া গত্তরে পোকা পড়িবে।
চামরিক ফুলে ফুলে কাঁদতো - হ্যাঁ গো, ঝনিয়া তুমার মেয়ে লয় গো!
- হ হামার বটে। তবে উ নাচনির বিটি আছে।
চামরিক মার খেতে-খেতে বাধ্য হতো টুকে-টুকে লুকিয়ে রাখা জমা টাকাটুকু বার করে দিতে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে ঝনিয়া মেঝেনের মা নাচনি চামরিক মেঝেন বহুদিনের পুরনো রোগে ভুগে-ভুগে মরে গেছে। ভাতুরাম সেই মরা দেহটা গুরুম নদীর পাশের জঙ্গলে ফেলে দিয়ে এসেছে। ঝনিয়া তখনও খুব কেঁদেছিল, কিন্তু কিছু করতে পারেনি। মনে-মনে সে ভাবে, এখনও গেলে হয়তো মায়ের পচা-গলা লাশটা পাওয়া যেতে পারে। এমন একটা চিন্তা মাথায় আসতে ভয়ে শিউরে ওঠে সে। না না, সে কিছুতেই পারবে না নাচনির জীবনে বেঁচে থাকতে। দরজার আগল খুলে উঠোনে নেমে আসে ঝনিয়া। ভাতুরামের দিকে টিপ-টিপ করে এগোয়, বিনবিন করে বলে - বাপু হামি নাচনি হইতে পারবোক লাই।
ঠিক সেইসময় মানুষখেকো চিতাটা অযোধ্যা পাহাড়ের কোল থেকে ভয়ানক হুঙ্কার ছাড়ে। গ্রাম কেঁপে ওঠে। কেঁপে ওঠে ঝনিয়ার বুক। ভাতুরাম পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে ঝনিয়ার দিকে, চোখ দুটো চিতার চোখের মতোই জ্বলজ্বলে। মুখটা অদ্ভুতভাবে বেঁকেচুরে চিতাটার আদল নিচ্ছে। ওই তো সামনের দাঁত দুটো বেরিয়ে আসছে। তবে কি চিতাটা ঝনিয়ার রক্ত চায়? এক ছুটে ঘরে গিয়ে দোর বন্ধ করে ঝনিয়া। খুব শীত করে তার। সাপের শীতঘুমের ঠান্ডার মতো কাঁপতে কাঁপতে দাঁতে দাঁত লেগে যায় তার। মা চামরিক মেঝেন মরার আগেও তাকে বলে গেছে - নাচনির জেবন ভাল লয় রে ঝনিয়া।
দেওয়ালে টানানো কেরামায়ের কুলুঙ্গীর নিচে মাটির হাড়িতে রাখা শেয়ালমারা গুলিগুলোর দিকে লোভাতুর বিড়ালের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ঝনিয়া। বীরসা মুণ্ডার পুতির পুতি সে। সে কিছুতেই নাচনি হবেক লাই।
পর-পর বেলা বাড়ে। ঝরঝরে সূর্যের আলোয় সনকা বুড়ি লাঠি হাতে চামরিনের ভিটায় আসে। খ্যান্খ্যানে গলায় চিৎকার করে - ও রসিক, তু কুত্থায় গেলি? তুর ছুঁড়ির লেগে কৌরঞ্জার তেল আনিছি।
শূন্য উঠোনের খালি খাটিয়ায় সেই হাত-রেডিওটার ভিতর থেকে কারা যেন কথা বলছে – আজ নারীদিবস। নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেহ নাহি দিবে অধিকার। নারী এখন আর অর্ধেক নয়, সম্পূর্ণ আকাশ।