বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[শিল্প]
উর্বশীর অভিশাপে অর্জুন এক বছরের জন্য বৃহন্নলা হয়েছিলেন। বার বছরের বনবাসান্তে এক বছরের অজ্ঞাতবাসকালে তাঁর এই বৃহন্নলাজীবন। বৃহন্নলাজীবনে অর্জুনের কোনও গ্লানি ছিল না, অর্থাভাবের কোনও কথাও জানা যায় নি মহাভারতের পাতা থেকে। রাজকুমারী উত্তরার নৃত্যশিক্ষক হিসাবে বিরাট রাজার রাজসভায় তাঁর সমাদর ছিল। এই সময় তাঁর শৌর্যপ্রদর্শনের পরিচয়ও আমরা পাই রাজকুমার উত্তরকে সামনে রেখে বিশাল কৌরব বাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে। পরাজিত ভীষ্মাদি বীরদের উত্তরীয় হরণ করে এনেছিলেন রাজকুমারী উত্তরার পুতুল খেলার সামগ্রী হিসাবে। অর্থাৎ বৃহন্নলার জীবন সামগ্রিকভাবে অর্জুনের জীবনে কোনও কলুষতার স্পর্শ এনে দিতে পারেনি। হ্রাস পায় নি অর্জুনের বীরমাহাত্ম্য।
মহাভারতের যুগ থেকে বা তারও আগে থেকে বৃহন্নলারা সমাজে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। সৃষ্টির এক অদ্ভুত নিয়মে তাঁদের জন্ম— তাঁরা না-পুরুষ, না-নারী। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তাঁদের জন্মের জন্য তাঁরা দায়ী নন কিন্তু সমাজ তাঁদের মানুষ হিসাবে মেনে নেয় না— ভাবে মনুষ্যেতর। তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ এবং ঘৃণা ঘিরে রাখে তাঁদের অস্তিত্বকে। সমাজে সুস্থ পিতা-মাতার সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করেও তারা পরিত্যক্ত, অপাঙক্তেয়, অগ্রাহ্য। আমাদের ছোটবেলা থেকে দেখা দুই হাতে তালি বাজিয়ে অদ্ভুত সাজপোষাকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো একদল মানুষ (?), যাঁদের প্রশ্ন “কি দিদি ছেলে হল, না মেয়ে হল?” ছেলে হলে গৃহকর্তার কাছে তাঁদের দাবি দশ হাজার বা তার বেশি টাকা, আর মেয়ে হলে সাত-আট ; অর্থাৎ তাঁরাও বুঝে নিয়েছে সমাজে একটি মেয়ের মূল্য একটি ছেলের মূল্যের থেকে কম। আর যদি ছেলে বা মেয়ে না হয়ে ভাগ্যদোষে বা জটিল জৈবিক নিয়মে অন্য কিছু হয় অর্থাৎ তাঁদের মত তৃতীয় লিঙ্গের মানব হলে তথাকথিত ভদ্র মনুষ্যসমাজে তাঁদের ঠাঁই হবে না, এই হাততালি বাজানো মানুষগুলোই বাবা-মায়ের কোল থেকে শিশুটিকে নিয়ে যাবে অন্য এক সমাজে যেখানে অশিক্ষা এবং দারিদ্র্য থাবা গেড়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ভিক্ষাবৃত্তি, যে পেশা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজকর্মের আতুড়ঘর।
আজকাল প্রশস্ত রাজপথের প্রায় প্রত্যেকটি সিগন্যালে গাড়ির বন্ধ জানালার কাঁচে টোকা দেন এই বৃহন্নলারা। হাত পাতেন ভিক্ষার জন্য দশ-বিশ টাকার আশায়। মুখে পর্যাপ্ত প্রসাধন, অদ্ভুত সাজ, পরনে নারীর পোষাক, কন্ঠস্বর পুরুষালি— দল বেঁধে প্রকাশ্য জনবহুল পথে ঘুরেঘুরে দিনযাপনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। বিরক্তিতে, ঘৃণায় মুখ ফেরান সাধারণ মানুষ, কেউ বা কিছু দেন ভয়ে— অকথ্য গালাগালির ভয়, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির ভয় বা নির্জলা অভিশাপের ভয়। জীবনযন্ত্রণার দুর্বিপাকে পড়া এই মানুষগুলো কি এভাবেই প্রাণধারণ করবে? কী ভাবছেন আমাদের সরকার? শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ? নাকি মনুষ্যেতর ভেবে দূরে ঠেলে দেওয়া এইসব মানুষদের কথা ভাববার মত অবকাশ আমাদের নেই। তাঁদের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারাই বুঝি মঙ্গলজনক।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কাছে তার সমস্ত অধিবাসীই সমতুল। জাতের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করা জনকল্যাণের পরিপন্থী। যখন চাকুরিক্ষেত্রে বা অন্য নানা আবেদনপত্রে নারী-পুরুষ বা ‘আদার্স’ স্বীকৃত হয়েছে, যখন বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে লিঙ্গান্তর সম্ভব হয়ে উঠেছে এবং রূপান্তরকামী মানুষেরা যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে সমাজে স্বীকৃতি পাচ্ছেন তখন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা কেন সমাজের প্রান্তে অবস্থান করবেন? কেন তাঁরা পাবেন না শিক্ষালাভের সুযোগ, উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুবিধা? যে ঘৃণার বাতাবরণে তাঁরা বড় হয়েছেন, যে ভিক্ষাবৃত্তিকে তাঁরা একমাত্র উপজীব্য হিসাবে জেনেছেন তার বাইরে এসে এই ছোট গোষ্ঠীর মানুষগুলি যদি জীবনের একটা ভিন্ন অর্থ খুঁজে পান তাতে কার কী ক্ষতি? সকলের উপহাসের পাত্র না হয়ে, নিজেদের মনুষ্যেতর ঘৃণ্য প্রাণী হিসাবে বিবেচনা না করে যদি তাঁরা সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, বরণ করে নিতে পারেন অর্জুনের মত গ্লানিহীন সম্মানের জীবন, তবেই তো একটি উন্নততর মানবসমাজ গড়ে উঠতে পারে। যে সামাজিক বিন্যাসে নাগরিক জীবন অভ্যস্ত তার পরিবর্তন ঘটানো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তবুও আমরা কি একবার এইসব মানুষদের একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের আস্বাদ দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হতে পারি না? কোনও সংগঠন কি গড়ে তোলা যায় না এদের নিয়ে যে সংগঠন এদের সুস্থ জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন নিয়ে সরব হতে পারে? ভিক্ষা নয়, শ্রমের বিনিময়ে খাদ্য এবং শিক্ষার অধিকারটুকু অর্জনের দ্বারা শ্রমজীবী জনতার অংশীদার হতে পারা যথেষ্ট গৌরবের নয় কি?