বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[শিল্প]

[শিল্প]

ডা. স্থবির দাশগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধা

ধীমান বসাক

photo

ডা. স্থবির দাশগুপ্তের নাম আবছাভাবে শুনেছিলাম ২০০০ সালের আসেপাশে, কেমোথেরাপিস্ট হিসেবে। সে শুধু শোনাই, এও শুনেছিলাম যে তার একটা রাজনৈতিক অতীত আছে।
কিন্তু সত্যিকারের পরিচয়ের শুরু মুম্বাইতে, মুখোমুখি নয় কিন্তু। বাবাকে নিয়ে টাটার ক্যান্সার হাসপাতালে গেছি, সালটা সম্ভবত ২০০৭। ওখানে বইয়ের একটা কাউন্টার আছে, সেখানে দেখি একটা বই, “ক্যান্সার - একটি অবভাস”, অনুবাদক শাঁওলি মিত্র এবং স্থবির দাশগুপ্ত। মুম্বাইয়ের দুই ডাক্তার গবেষক লিখেছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়ে যা চলছে, তা নিছক কর্পোরেট ব্যবসা ছাড়া কিছু নয়, তার সঙ্গে মানবশরীরে তেজষ্ক্রিয়তার ফলাফল নিয়ে একটা পরীক্ষাও বটে। সেখানেই পড়ি শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্র দুজনেই মারা গেছেন ক্যান্সারজনিত কারণে, আর সেকারণেই এই বইয়ের অনুবাদক হতে তাঁদের মেয়ে শাঁওলি রাজি হয়েছেন, আর স্থবির দাশগুপ্ত তো এই চিকিৎসার এক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। বইটা আমাকে সেই বিদেশবিভুঁইয়ে আমাকে খানিকটা সাহস জোগায়, বাবাও পড়েন বইটি।
এরপরের পরিচয় সরাসরি। দক্ষিণ কলকাতার একটি চিকিৎসালয়ে বাবাকে দেখাতে নিয়ে যাই ডাক্তার স্থবির দাশগুপ্তের কাছে। সেখানেই আমি বলি বইটার কথা, সন্তোষ রাণার কথা। রোগী ডাক্তার সম্পর্কের বাইরে কিছুটা নৈকট্য গড়ে ওঠা।
স্থবির দাশগুপ্তের লেখা পড়তাম মাঝেমাঝেই খবরের কাগজের পোস্ট-এডিটোরিয়ালে। যারা পড়েছেন, তারা জানেন সে লেখার গুণ, আমার অনেকটা সন্তোষ রাণার লেখার ফ্লেভার পেতাম বলে মনে হ’ত। স্থবিরদা রাজনৈতিক জীবনেও সন্তোষদার ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জেনেছি। সত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলো নিয়ে লিখেছেনও, যা বই হিসেবে বেরিয়েছে।
এর পরের পরিচয়টা করোনা ও লকডাউন পর্যায়ে, যখন গুটিকয়েক চিকিৎসক বিজ্ঞানী গবেষক সমাজকর্মী, করোনা এবং লকডাউনকে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। সেসময় এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে গোটা দেশ, গোটা বিশ্ব। আমাদেরকে প্রথমেই নিদান দেওয়া হল, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, সামাজিক দূরত্ব তৈরি করো। ভয়ের আবহ বাজছে ব্যাকগ্রাউন্ডে সবসময়। ঐ ‘সংকটে’ সবাই একসঙ্গে লড়ার বদলে ‘লক্ষ্মণগণ্ডী’র বাইরে বেরোতে বারণ করা হল, জেগে থাকবে শুধু রাষ্ট্র। এলো লকডাউন। কোটি কোটি দেশান্তরী শ্রমিক বেঘর, বেরোজগার, বেকার হয়ে এক ট্র্যাজিক চলমান মহাকাব্যের জন্ম দিলেন। সেইসময় নিশ্চিত বেতনের নিরাপত্তায় ঘুমোতে থাকা মস্তিষ্কে যারা ‘কেমিক্যাল লোচা’ ঘটানো শুরু করলেন, স্থবিরদা তাদের একজন। আমি সেসময় লকডাউনের বেআইনি, অ-সাংবিধানিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছি, ডাঃ ভাস্কর চক্রবর্তী একটা বইতে আমার লেখা নিলেন। কিছুদিন পরে আবার ডাকলেন কলকাতার এক আলোচনায়। সেখানেই আবার স্থবিরদার সঙ্গে দেখা। আমার বোধবুদ্ধিতে আমি এটুকু বুঝেছিলাম যে যে রোগ যত সংক্রামক হবে, সে তত কম মারক হবে, যে রোগ যত মারক বা ফ্যাটাল হবে, সে ছড়াবে কম, আর বায়ু বা কফ হাঁচি বাহিত রোগে মাস্ক দিয়ে জীবাণু আটকানোর মধ্যে ফাঁকি আছে। কিন্তু এই সহজ সত্যগুলোকে তখন রাষ্ট্র ও তার সহযোগী চিকিৎসকরা বলছেন না। স্থবিরদা সেই কাজ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে এল তীব্র ব্যঙ্গ, উষ্মা। পারলে এই বিরুদ্ধ মতের লোকগুলোকেই যেন কোয়ারান্টাইন করে দেয়, অচ্ছুত করে দেয়। গড়ে উঠলো গ্রাফ। স্থবিরদা তার কেন্দ্র, সহপথিক, আমাদের ঢাল।
তারপর এলো অপরীক্ষিত ভ্যাকসিন। জোর করে সেই ভ্যাকসিনকে বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলাম আমরা। তখন ফেসবুকে এক ডাক্তারবাবু বেশ জনপ্রিয়ে লিখিয়ে। খুবই ব্যবহৃত একটি চালু ওষুধের নাম প্রথমে না নিয়ে, তার প্যাকেটে বর্ণিত সাইড এফেক্ট নিয়ে আলোচনা করে তিনি লিখে বললেন, এই এত কিছু সাইড এফেক্টের সম্ভাবনা আছে যে ওষুধে, সে ওষুধটা কী জানেন, সেটা আমরা হরবখত ব্যবহার করি, সেটা হল এই। কাজেই ভ্যাকসিনের সাইড এফেক্ট নিয়ে এত চিন্তার কী আছে? সে লেখায় স্থবিরদার প্রতি প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গও ছিল, লেখাটার শেয়ারও হয়েছিল বহু। স্থবিরদা এক কথায় তার উত্তর দিলেন। বললেন তুলনাটাই চলে না, কারণ ওটা ওষুধ, অসুস্থ শরীরে প্রয়োজনের তাগিদে তা দিতে হয়, আর ভ্যাকসিন দেওয়া হবে একটা সুস্থ শরীরে। চমকে দেওয়ার মতো সরল কিন্তু গভীর জবাব।
স্থবিরদা ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ মারা গেলেন। জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের ক্ষতি, সাহিত্যগুণসম্পন্ন চিকিৎসা নিয়ে লেখার জগতে ক্ষতি, প্রতিক্রিয়া ও কর্পোরেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষতি। শ্রমজীবী মানুষ একজন সাথীকে হারালো।
ডা. স্থবির দাশগুপ্তকে আমরা ভুলবো না।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.