বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[সম্পাদকীয়]

[সম্পাদকীয়]

উদ্ধত শাসকরা থমকে দাঁড়ালো

উদ্ধত শাসকরা থমকে দাঁড়ালো

সম্পাদকীয়, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১— ১৫ মাস আগে উদ্ধত শাসকদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কৃষকরা এক অসম লড়াই শুরু করেছিলেন। মোদি সরকারের কর্পোরেট স্বার্থবাহী তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার এবং ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তার দাবিতে পাঞ্জাবের কৃষকরা অগ্রপথিক হিসাবে এই আন্দোলন শুরু করলেও অচিরেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে হরিয়ানা, রাজস্থান, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ সহ উত্তর ভারতে। আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে যায় সারা দেশের কৃষকদের কাছে। শাসকদের বিভাজনের নীতিকে মোকাবিলা করে কৃষক সমাজের নানা স্তর ও শ্রেণীকে ধর্ম-জাতপাত-ভাষা-জাতি নির্বিশেষে ক্রমান্বয়ে ঐক্যবদ্ধ করে কৃষক আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আদায় করে নিয়েছে সারা দেশের কৃষিজীবী-শ্রমজীবী, ছাত্র-যুব-মহিলাসহ প্রতিবাদী মানুষের সমর্থন এবং আশীর্বাদ। অবশেষে ৭১৫ কৃষকের প্রাণের বিনিময়ে প্রাথমিক জয় ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হয়েছে ঐতিহাসিক এই কৃষক আন্দোলন। আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে নত হতে বাধ্য হল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।
ক্ষমতাসীন শাসকরা এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ত্রিমুখী আক্রমণ শানিয়েছে। পুলিশি দমন, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ, জলকামানের ঠান্ডা জল, কংক্রিটের ব্যারিকেড, কাঁটাতারের পেরেক, অসংখ্য গ্রেপ্তার ও মামলা, পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ঘটিয়ে কৃষক আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চেষ্টা করছে। আন্দোলনের নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে ডেকে কালক্ষেপ করে কৃষকদের মনোবল ভাঙা ও ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর চেষ্টা করেছে। কৃষক সাধারণ ও দেশবাসীকে আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করতে কুৎসা ও অপপ্রচারের বন্যা বহিয়েছে। কর্পোরেট সংবাদ মাধ্যম শাসকদের কুৎসা ও অপপ্রচারে যোগ্য সঙ্গত চালিয়ে গেছে। কৃষক আন্দোলন তাতে বিভ্রান্ত, বিপথগামী, হীনবল হয়নি।
কৃষক আন্দোলন শাসক ও তাদের প্রচারকদের রণনীতি ও রণকৌশলকে মোকাবিলা করে দিনে দিনে অমিত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, বর্তমান শাসকদের নীতি নগ্নভাবে কর্পোরেট স্বার্থবাহী এবং কৃষক তথা দেশবাসীর স্বার্থের পক্ষে বিপজ্জনক। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে দেশের শ্রমজীবী ও প্রতিবাদী মানুষকে আন্দোলনে সাহসী হতে। কৃষক আন্দোলনের মঞ্চ ক্রমশ হয়ে উঠেছে শাসকদের কর্পোরেট স্বার্থবাহী নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মঞ্চ। প্রমাদ গুণেছে শাসকরা। কৃষক আন্দোলন শ্রমজীবী জনসাধারণের আন্দোলনের অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে শাসকদের সাধের শাসনকেই টলমল করে দিতে পারে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলির পালে হাওয়া এনে দিতে পারে। সুতরাং সরকার তিন কৃষি আইন সম্পর্কে দ্বিতীয় ভাবনায় বাধ্য হয়।
উত্তরপ্রদেশ সহ পাঁচ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি থেকে বাঁচতে আপাতত পিছু হটাই বুদ্ধিমানের কাজ হিসাবে বিবেচনা করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি স্বয়ং তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি কৃষক বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন যে কৃষকের স্বার্থেই তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করেছিলেন। যার অর্থ হল, কৃষকরা কর্পোরেট স্বার্থকে কৃষক স্বার্থ মানতে রাজি হননি। সংসদে কোনও আলোচনা ছাড়াই ইতিমধ্যে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কৃষক আন্দোলনকারীদের উপর মামলাগুলি প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের বিষয়ে কমিটি গড়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার যাতে কৃষক আন্দোলনের প্রতিনিধিরাও থাকবেন। যদিও শহীদ কৃষকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকার নির্দিষ্ট কিছু জানায়নি। এবং এটাও নিশ্চিত যে শাসকরা কৃষকদের আন্দোলনের ঐক্য ভাঙতে নতুন নতুন পরিকল্পনা করতে থাকবে।
কৃষক আন্দোলন প্রাথমিক জয় ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। এই জয় এক ঐতিহাসিক জয়। মোদি সরকারের সাত বছরের শাসনকালে কোনও আন্দোলন এই রকম গুরুত্বপূর্ণ জয় অর্জন করেনি। অধুরা আছে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সহ অন্যান্য দাবি। দিল্লি সীমান্ত থেকে কৃষকরা গ্রামে ফিরে গেছেন। এসেছিলেন অনেক বাধা পেরিয়ে, ফিরে গেলেন বিজয়ী বীরের মতো সম্বর্ধিত হতে হতে। সংযুক্ত কিসান মোর্চা বকেয়া দাবিগুলি শাসকদের অনিচ্ছুক হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে আন্দোলন জারি রাখবেন। সরকার প্রতিশ্রুতি না রাখলে আবারও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রস্তুতি জারি রাখছেন তাঁরা।
২০২১ সাল শেষ হচ্ছে কৃষক আন্দোলনের অগ্রগতি জানান দিয়ে -- নতুন বছরে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী শ্রমিক ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.