বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[সম্পাদকীয়]

[সম্পাদকীয়]

পরিযায়ী শ্রমিকদের ভারত

পরিযায়ী শ্রমিকদের ভারত

সম্পাদকীয়, ১৬ মে, ২০২০

photo

২০২০ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে আমরা চিনলাম এক নতুন ভারতবর্ষকে। এ হল পরিযায়ী শ্রমিকদের ভারত। আমরা যারা নয়া উদারবাদের বিরোধিতায় সোচ্চার, এতদিন তারা চিনতাম লুঠেরাদের ভারতকে। চিনতাম কেন্দ্রের আধিপত্যবাদী সরকারের মদতপুষ্ট কর্পোরেট ও ক্রোনিদের ভারতকে। চিনতাম মোবাইল পরিষেবা দেওয়ার নামে কিংবা যুদ্ধবিমান তৈরির নামে দেশের সম্পদ লুঠেরা আম্বানি ভাইদের। চিনতাম কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি সস্তা দামে বা লিজে কিনে নেওয়া আদানিদের। চিনতাম নীরব মোদি, মেহুল চোকসি কিংবা বিজয় মাল্যকে। এরা হলো সেই সব ক্রোনি যারা সরকারের আশ্রয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকা লুঠ করে বিদেশে গা ঢাকা দিয়েছে। পরে জানা গেছে, এদের দেশত্যাগ পর্ব পুরোটাই জ্ঞাত ছিল সরকারের কর্তাদের। আর চিনেছি দেশজুড়ে সাম্প্রদাযিকতার বিষ ছড়ানো সঙ্ঘ পরিবারকে। হাড়ে হাড়ে চিনেছি বর্তমান সরকার যারা এদেশের সাত দশকের গণতন্ত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশজুড়ে জারি করছে নির্মম শোষণ ও মানবাধিকার হরণের পালা। এরা হল সেই শক্তি যারা গত ৬ বছর ধরে হাতে হাত মিলিয়ে আমাদের এতদিনের চেনা ভারতের রঙ বদলে দিতে যায়, এদেশকে করে তুলতে চায় একইসঙ্গে মৌলবাদী ও ফ্যাসিবাদী। গত তিন দশকে আমরা চিনেছি মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষা। দেশে কিংবা বিদেশে মোটা মাইনের চাকরি, একাধিক ফ্ল্যাট, একাধিক গাড়ি, সপ্তাহান্তে রেস্তোরাঁয় গিয়ে আকণ্ঠ ভোজন ও মদ্যপান, বিনোদনের নামে যৌনতার বিকৃতি, প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িকতাকে মদত, মুখে ভারতীয় প্রাচীন সংকৃতির জয়গান আর আড়ালে আচার-আচরণ-শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিদেশি হয়ে ওঠার সাধনা, নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে সব ঝাড়ঝাপ্টা এড়িয়ে শুধুই অর্থ ও পার্থিব সুখের কামনায় অভ্যস্ত এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত। বদলে যাওয়া ভারতকে চেনার পর্বে আমরা দেখেছি, দেশের সব রাজ্যে এবং দিল্লিতে বড় বড় কৃষক সমাবেশ। দেখেছি শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কৃষককে ফসল পোড়াতে, রাস্তায় দুধ ঢেলে দিতে, পাকা ফসলের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিতে। দেখেছি উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ভারতের বিশাল গ্রাম গ্রামান্তর জুড়ে আত্মঘাতী কৃষকের ঝুলন্ত লাশ আর তাদের পরিবারের অসহায় কান্না। দেখে মনে হয়েছিল, এ ভারতভূমির দুর্দশার শেষ বুঝি দেখে ফেলেছি আমরা। এরই মাঝে অন্য এক ভারতকে আমরা চিনেছিলাম ২০১৮ সালের মার্চে। ঋণ মকুব, ফসলের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য পথে নেমেছিলেন মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা। মাঝারি, গরিব, আদিবাসী— সব ধরনের কৃষক সেদিন একজোট হয়ে দখল নিয়েছিলেন মুম্বইয়ের রাজপথ। তাদের স্বাগত জানাতে পথে নেমে এসেছিল মুম্বই নগরী। সে ছিল মহত্তম সংগ্রামের এক পর্ব। কিন্তু ২০১৮র মার্চের দু’বছর পর, ২০২০র মার্চে দেখলাম এক অচেনা ভারতকে। কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস। দলে দলে লোকে কাজ হারিয়ে রুটিরুজির খোঁজে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র, একথা শুনেছি। অল্প কিছু দেখেছি। কিন্তু গোটা দেশজুড়ে শিকড়চ্যুত লক্ষ লক্ষ অসহায় নরনারী ও শিশুদের এই চলাচল, এমন নিরুদ্দেশ পরিযায়ী বৃত্তি, ঝড়ের মুখে পড়ে থাকা এই বিপুল শ্রমজীবীদের আসল চেহারাটা, গোটা ছবিটা অজানা ছিল। যেটুকু জানা ছিল তা খণ্ড খণ্ড। সবগুলোকে জুড়ে জুড়ে এক চালচিত্রে গেঁথে গেঁথে মানুষের এই মানবেতর অস্তিত্ব স্বাধীনতার পর দেখা যায়নি। মানুষের দুর্দশার শেষ দেখা বাকি ছিল। চার ঘণ্টার মধ্যে নরেন্দ্র মোদির গোটা দেশজুড়ে লকডাউন চালু করার নির্মম সিদ্ধান্ত নতুন করে চিনতে শেখাল আমাদের দেশকে, এই নিরন্ন, পদদলিত ভারতবর্ষকে। এই ভারত লুকিয়ে ছিল দেশের বড় বড় শহরগুলির কোনায় কোনায়, আলো আঁধারির অন্তরালে। কোনওক্রমে জীবনটাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষয়িষ্ণু, অসম সংগ্রামে রাত্রিদিন লিপ্ত থেকে এই ভারত নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল লজ্জায়, ক্ষোভে, অসম্মানে, অপমানে। মোদির লকডাউন এক ধাক্কায় সেই অন্ধকারের ওপর থেকে ঢাকনাটা খুলে দিল। আর দেশ দেখল আত্মনির্ভর, সমৃদ্ধ ভারত গড়ার নামে শোষিত, বঞ্চিত, অসহায় জনগোষ্ঠীকে কি কৌশলে আড়াল করে রেখেছিল মোদি সরকার। দূর দূরান্তের গ্রাম, গ্রামান্তর, ছোট শহর, দারিদ্রের ভারে মুমূর্যু জনপদ থেকে কোন এক হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা ঘর খালি করে এদের টেনে গিয়েছিল দেশের বড় বড় শহরে। সেখানে শহরের এক প্রান্তে কোনওক্রমে জুটেছিল আশ্রয়। তাও চড়া ভাড়ায়। কাজ জুটেছিল বড়, ছোট, মাঝারি কারখানায়। জুটেছিল বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পে। আইনে যা স্বীকৃত তার চেয়ে কম মজুরি। পিএফ নেই, বোনাস নেই, ইএসআই নেই, স্বাস্থ্যবিমা নেই। সবরকম নিরাপত্তাহীন একটা অস্তিত্ব। কাজ করলে জুটবে শুধু মজুরি। তাতেও ভাগ বসাবে কন্ট্রাক্টর, পুলিশ থেকে সব রকমের মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। অন্য রাজ্য থেকে আসা বলে স্থানীয়দের সহানুভূতিও নেই। তবুও তারই মাঝে শুধু শ্রমশক্তির জোরে আর অদম্য বাঁচার আগ্রহে টিকে ছিল এই ভারত। নিজেরা নিঃশেষিত হয়েও স্বপ্ন দেখত, পরের প্রজন্মকে একটা সুস্থ জীবনের পথসঙ্কেত দিয়ে যাবে। তারপর আমরা একদিন দেখলাম, লকডাউনের সুযোগে বড় বড় শহরের এই সব শ্রমজীবীদের টাকা মেরে উধাও ঠিকাদারেরা। মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। রাতারাতি বন্ধ সব হোটেল, দোকান, ছোটখাটো কারখানা, নির্মাণ প্রকল্প। বাড়িভাড়া দিতে পারবে না বলে বের করে দিয়েছে বাড়ির মালিকেরা। পূর্ব ও উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির সেই বিশাল জনসমুদ্র, যারা কাজের খোঁজে পরিযায়ী হয়ে পাড়ি দিয়েছিল দেশের নানা প্রান্তে, সব আশ্রয় হারিয়ে তারা নেমে এল রাজপথে। দেখা গেল, তাদের ফেরাতে কোনও ব্যবস্থা করবে না মোদি সরকার। সব দায় তারা ঠেলে দিল রাজ্য সরকারগুলির ঘাড়ে। রাজ্য সরকারগুলি ভয় পেল, ওদের ফেরালে করোনা সংক্রমণ বাড়বে না তো? তাহলে তো ভোটারেরা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠবে। অতএব তারাও বসে রইল হাত গুটিয়ে। ভয়ঙ্কর করোনা আর ভয়ঙ্কর দারিদ্র, দুটোই ওদের জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠল দ্রুত। ক্রমশ পরিযায়ী শ্রমিকেরা দেখলেন, তাঁদের টাকা ফুরিয়ে এসেছে। এবার ফিরতে হবে স্বভূমিতে। খেতে না পাই শান্তিতে মরতে তো পারব। ওঁরা বুঝলেন, সরকার কোনও সাহায্য করবে না। লকডাউন দফার পর দফা বাড়ে। পরিযায়ীদের নিয়ে সরকার নীরব। উপায়ন্তর না দেখে রাজপথ আর রেললাইন ধরে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন শ্রমিকেরা। পায়ে হেঁটে চলছেন পুরুষ, নারী, অশক্ত, বয়স্ক, প্রবীণেরা। হাঁটছে তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী, হাঁটছে শিশুরা। যে মহিলা কখনও ঘোমটা খোলেন না, তিনিও মাথা মুখ ঢেকে হাঁটছেন দিনের আলোয় রাজপথ ধরে। ক্লান্ত শিশুটাকে ঝুলিয়ে দিয়েছেন চাকা লাগানো সু্টকেসের ওপর। হায় রে নারীর সম্ভ্রম, হায়রে শৈশব। দেখে মনে হল, পরিযায়ীদের পরিবারের নারীরা সবাই যেন দ্রৌপদী। একবিংশ শতকে মহাভারতের রৌদ্রদগ্ধ, উম্মুক্ত রাজপথে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে শতশত দ্রৌপদীকে। আর তা দেখে হা হা করে অট্টহাসি হাসছে দিল্লির মসনদে বসে থাকা দুর্যোধন, দুঃশাসনেরা। তাদের শাগরেদরা ঠান্ডা ঘরে টেলিভিশন চালিয়ে দেখছে মহাভারত। হাঁটতে হাঁটতে কেউ রাস্তায় পড়ে মারা যাচ্ছেন। কত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের লোকেদের প্রাণ গেল রেলের চাকায় কিংবা ট্রাকের তলায় পিষে। আধপোড়া রুটি পড়ে থাকে রেল লাইনে। সেই ‘রক্তমাখা’ রুটি মনে করিয়ে দেয় দেশে দেশে রুটিই ছিল রাজদ্রোহ, রাষ্ট্র বিপ্লবের কারণ। হাঁটতে হাঁটতে ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বাড়ির কাছে এসে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল ১২ বছরের জামালো মাকদম। আর উঠল না। জামালোর নিথর শরীরটা কীভাবে জঙ্গলের রাস্তায় পড়েছিল তা আমরা দেখিনি। হয়ত অরণ্যকন্যাকে সান্ত্বনা দিতে গাছেরা তার শরীরের ওপর টুপটাপ করে ঝরিয়ে দিচ্ছিল অন্ধকার রাতে ফুটে ওঠা কুসুম। হয়ত তার চেয়ে থাকা চোখ দুটো ছিল বাড়ির সামনের মাটির উঠোনের স্পর্শ পাওয়ার জন্য স্বপ্নাতুর। আমরা জামালোর মৃতদেহ কেউ দেখিনি। কিন্তু ওইটুকু বালিকার নিথর পড়ে থাকা দেহের সঙ্গে আর একটা দৃশ্যের কি মিল পাওয়া যায় না? মনে কি পড়ে না, ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির কোলে নির্জন এক সাগরতটে নীল গেঞ্জি, লাল প্যান্ট আর জুতো পরা, বেলাভূমির বালিতে মুখ গুঁজে পরে থাকা ছোট্ট আয়লান কুর্দির নিথর দেহের ছবি? কোথাও একটা গিয়ে কি জামালো আর আয়লান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় না? এই পৃথিবীর এক প্রান্তে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদীদের ক্ষেপণাস্ত্রে গুঁড়িয়ে দেয় গোটা শহর, জনপদ। সেখান থেকে রবারের ডিঙি কিংবা ছোট মোটর বোটে ভূমধ্যসাগরের অতল জলরাশি পার হয়ে দলে দলে শিকড়চ্যুত পরিযায়ীরা পাড়ি জমায় ইউরোপের তটভূমির দিকে। মাঝপথে সলিল সমাধি হয় কারও। যাত্রীবোঝাই, ঢেউয়ের ঝাপটায় অস্থির নৌকাকে দিনের পর দিন পাহারা দিয়ে রাখে সশস্ত্র জলপুলিশ। এই তট তোমার নয়। তুমি এই ভূমিস্পর্শ করতে পারবে না, এই নিদান হাঁকে তারাই যারা ওদের বাস্তুচ্যুত করেছে। অবশেষে হয়ত আশ্রয় মেলে সভ্য দেশের এমন এক কোনে যা বরাদ্দ ছিল সার্কাসের জানোয়ারদের জন্য। এরাই আবার সভ্য ইউরোপের জন্য যাবতীয় মানবেতর পেশা মেনে নিতে বাধ্য হয় প্রাণটুকুকে বাঁচানোর আশায়। আর এদেশে অনাহারে, অর্ধাহারে হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকেরা যখন বাড়ির কাছে পৌঁছয়, তখন তাদের পুলিশ লাঠিপেটা করে, পথে প্রসব হয়েছে জেনেও মা ও সদ্যোজাতকে নিগ্রহ করে, তাদের নিজের ভূমিটুকুতে ফেরার অনুমতি পর্যন্ত মেলে না। কারণ তারা নাকি করোনা ছড়াবে। মধ্যযুগে কুষ্ঠরোগীদের সঙ্গে এমন ব্যবহারের কথা শোনা যায়। এদেশে বিজেপি-আরএসএসের শাসন ফিরিয়ে এনেছে সেই মধ্যযুগ। দিল্লির সরকারে যারা বসে আছেন তাদের অন্যতম রেলমন্ত্রী পীযূষ গয়াল। নামে অমৃত, আসলে গরল। কারণ এই মন্ত্রীর নির্দেশেই পরিযায়ীদের ঘরে ফেরার জন্য ভাড়া চেয়েছে রেল। যাদের খাবার কেনার অর্থটুকু নেই, তারা দেবে রেলের ভাড়া? মহামারির এই মহাসঙ্কটের দিনে? শেষ পর্যন্ত যখন কংগ্রেস সভানেত্রী বললেন, ওঁদের ভাড়া মিটিযে দেবে তাঁর দল, তখন জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে টনক নড়ল সরকার তথা রেলের। শুরু হল ভর্তুকির চাপান উতোর। এখনও টাকা দিয়ে টিকিট কেটে রাজ্যগুলি ফেরাচ্ছে পরিযায়ীদের। তবে সেখানেও রয়েছে টালবাহানা। আসল কথাটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল কর্ণাটক সরকার। পরিযায়ীরা ফিরে গেলে লকডাউনের পর কাজ করবে কারা। কোথায় পাওয়া যাবে এত সস্তায় এত বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তি। অতএব, মানবেতর পরিবেশে থাকতে বাধ্য করো ওদের। ফিরতে দিয়ো না। কারণ, এত সস্তার শ্রম আর মিলবে না। চাপের মুখে কর্ণাটক সরকার পিছু হঠলেও আসলে বহু পরিযায়ী শ্রমিককে নানা কৌশলে আটকে রাখা হয়েছে। সরকারের ভয়, এঁরা বাড়ি ফিরলে গ্রামে করোনা ছড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, এদের আটকে রাখলে লকডাউনের পর থমকে যাওযা কাজ ফের শুরু করা যাবে। অতএব, উপায়ন্তর না পেয়ে একাংশ পরিযায়ী শ্রমিকের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা চলবেই। তাই আগামী দিনে সামনে আসবে আরও অসহনীয় দুর্দশার ছবি, পথেই মৃত্যুর আরও সংবাদ। পরিযায়ীদের দুঃখকষ্টের ছবি আঁকার জন্য এ নিবন্ধ নয়। আমরা শুধু এই কথাটা মনে করাতে চাই যে, আমরা যারা এই ভারতের ছবিটার বদল চাই, তাদের সঙ্গে পরিযায়ীদের ভারতের যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি। একটা দুস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে এদের সঙ্গে অধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত শক্তিগুলির। সংগঠিত শ্রমিক, কৃষক, নানান অফিস কাছারি, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের মধ্যবিত্ত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দোকান কর্মচারী— এঁদের সকলের দেশব্যাপী কিংবা রাজ্যব্যাপী আলাদা আলাদা সংগঠন রয়েছে। তাঁদের প্রতিদিনকার লড়াই, সংগ্রামের খবর আমরা পাই। কিন্তু পরিযায়ীদের এই দুঃসহ অস্তিত্বের বিশদ খবর এতদিন অন্তরালে ছিল। যদি এদের সংগঠন থাকত, তাহলে এভাবে বিচ্ছিন্ন, সহায়সম্বলহীন হয়ে এদের হাজার হাজার মাইল হেঁটে দেশে ফিরতে হতো না। সংখ্যায় এরা নেহাত কম নন। পরিযায়ী ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত মোট শ্রমিকদের সংখ্যা হবে প্রায় ১০ কোটি। পরিবরের সংখ্যা ধরলে সংখ্যাটা ৪০ কোটির কাছে। আমাদের তাই আর্জি, অচেনা এই ভারতের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের প্রয়াস শুরু হোক। প্রদেশ, জেলা, শহর কিংবা গ্রাম, এসব কিছুর ভিত্তিতে এদের নাম ও পরিচয় নথিভুক্ত করার একটা বিকল্প ব্যবস্থা হোক। ‘মাইগ্র্যান্টস কেয়ার’ বা এই রকম কোনও নামে খোলা হোক বিকল্প তহবিল। সেই ফান্ডের তরফে দেশজোড়া অর্থ সংগ্রহ অভিযান চালু হোক। সেই অর্থে পরিযায়ী ও অসংগঠিত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসার জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সরকারের কাছে দাবি তোলা হোক— আগামী ৮ মাস দেশের সমস্ত পরিযায়ী ও অসংগঠিত শ্রমিক পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উপযুক্ত পরিমাণ চাল-গম-আটা সরবরাহ করা হোক; এই শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করুক সরকার; আগামী ৮ মাস এই শ্রমিকদের জীবন ধারণের জন্য পরিবার পিছু মাসে ১০ হাজার টাকা করে পৌঁছে দেওয়া হোক; পরিযায়ী ও অসংগঠিত শ্রমিক ও গরীবদের জন্য শহরে ও গ্রামাঞ্চলে উপযুক্ত শৌচালয় ও পানীয় জলযুক্ত অন্তত দু’ কামরা আবাসনের তৈরির জন্য সরকার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করুক এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করুক। আর এই সমস্ত কাজ করার জন্য সরকার অতিধনী ও কর্পোরেটদের উপর করোনা ট্যাক্স চালু করুক। পরিযায়ী ও অসংগঠিত শ্রমিকদের কাছে সরাসরি পৌঁছে যান রাজনৈতিক দলের কর্মীরা, সমাজকর্মীরা। সংগঠিত শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলি তাঁদের সঞ্চিত তহবিলের একাংশ দিন পরিযায়ী তহবিলে। পরিযায়ী পরিবারের কাছে পৌঁছে যান শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের কর্মীরা। ছাত্র-যুব, মহিলারা এগিয়ে আসুন শ্রমজীবী মানুষের পাশে। এগিয়ে আসুন শ্রমজীবী দরদী অসংখ্য অসরকারি সংগঠন। ব্যাপকতম সহমর্মী মানুষ ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশ জুড়ে গড়ে তোলা হোক জনমত। এভাবে দেশজুড়ে এক বিকল্প, ব্যাপকতর উদ্যোগ শুরু হোক। ভেঙে পড়া এই সব মানুষদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারলে এই নিঃস্ব শ্রমজীবীরাই আগামীদিনে অধিকার আন্দোলনের মশালকে আবারও দীপ্ত শিখায় দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে পারবেন। সেখান থেকে শুরু হতে পারে আরেক আরম্ভ।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.