বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[সম্পাদকীয়]

[সম্পাদকীয়]

কৃষক আন্দোলনের এক বছর

কৃষক আন্দোলনের এক বছর

সম্পাদকীয়, ১ নভেম্বর, ২০২১

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১ নভেম্বর, ২০২১— কৃষক আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কৃষি আইন প্রত্যাহার ও ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারেন্টির দাবিতে এই আন্দোলন দেশের বলদর্পী সরকারকে প্রবল চাপে ফেলে দিয়েছে। যত দিন যাচ্ছে এই আন্দোলন ততোই শক্তি সংগ্রহ করছে। বিভিন্ন রাজ্যে এই আন্দোলনের সমর্থনে প্রতিক্রিয়ার তারতম্য থাকলেও নতুন নতুন এলাকায় এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষক সমাজের প্রায় সমস্ত স্তর— ধনী কৃষক থেকে ছোট, মাঝারি, প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকেরা এই আন্দোলনের সমর্থনে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। এই আন্দোলনের বড় শক্তি কৃষক পরিবারের নারী ও নবীন প্রজন্ম। কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিক আন্দোলন বা ছাত্র আন্দোলন অনির্দিষ্টকালীন সময় ধরে চালানো কঠিন। কিন্তু কৃষি কাজ বন্ধ না রেখেই দীর্ঘস্থায়ী এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষক পরিবারগুলি— পরিবারের একাংশ কৃষি কাজ সামলাচ্ছেন, অন্যরা আন্দোলনে ভাগ নিচ্ছেন। এই সমন্বয় প্রকাশ করছে আন্দোলনের ব্যাপক গণচরিত্রকে। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতপাতের বিভাজনের সমীকরণ ও ঘৃণার রাজনীতিকে হাতিয়ার করে যে নিষ্ঠুর শক্তিটি শাসন ক্ষমতায় দ্বিতীয় বারের জন্য আরোহণ করেছে— সেই শক্তিটির বিভাজন ও ঘৃণার হাতিয়ারকে অনেকাংশে ভোঁতা করে দিয়েছে চলমান কৃষক আন্দোলন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-জাঠ কৃষকদের আন্দোলনের ঐক্য ভারতবাসীর সামনে যেন নতুন রাস্তা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, শঙ্কিত করে তুলছে সরকার এবং পৃষ্ঠপোষক কর্পোরেট লুঠেরাদের— ‘ভাগ করো ও শাসন করো’র নীতি সামনের দিনগুলিতে আগের মতো কার্যকরি হবে তো।
সারা দেশের শ্রমজীবী মানুষ, শ্রমিক-কর্মচারী, ছাত্র-যুব, মহিলা, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, প্রতিবাদী মানুষজন এই আন্দোলনের সমর্থনে সাগ্রহে এগিয়ে আসছেন। কৃষক আন্দোলনের মঞ্চ ক্রমশ হয়ে উঠছে দেশব্যাপী পরিবর্তনকামী মানুষের আন্দোলনের মঞ্চ— কৃষক আন্দোলন কর্পোরেট স্বার্থে সরকারের বেলাগাম সংস্কারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের আহ্বায়ক হয়ে উঠছে। এই আন্দোলন আত্মস্থ করছে, সমর্থন করছে শ্রমিক-কর্মচারী ও অন্যান্য স্তরের মানুষের দাবিগুলি। আন্দোলনের এই অভিমুখও সরকার ও কর্পোরেট শক্তির কাছে ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
সুতরাং কৃষক আন্দোলনকে ভাঙার উদ্দেশ্যে সরকারের আক্রমণ এবং ভিতর থেকে আন্দোলনকে দুর্বল করার কূটকৌশল চলছেই। এই আক্রমণ ও কূটকৌশল তাদের শক্তি নয়, দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করছে। সরকার ও কর্পোরেট শক্তি এখন ‘ট্রোজান হর্স’ খুঁজে বেরাচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশে লখিমপুর খেরিতে মন্ত্রীপুত্রের চলন্ত গাড়িতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদরত কৃষকদের পিষে মারা— শাসকদের নিষ্ঠুরতা ও ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ হলেও সরকার বাধ্য হয়েছে মন্ত্রীপুত্রকে গ্রেপ্তার ও নিহত-আহতদের পরিবারকে বড় পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে। একইভাবে, হরিয়ানার কারনালেও শান্তিপূর্ণ কৃষকদের উপর নিষ্ঠুর লাঠচার্জের পর কৃষক বিক্ষোভের কাছে নত হয়ে সরকার বিচারবিভাগীয় তদন্ত এবং অভিযুক্ত আধিকারিককে ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। এ ঘটনাগুলি অমিত পরাক্রমী শাসকদের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করছে।
সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর গণপ্রতিবাদকে স্তব্ধ করতে যেভাবে কাশ্মীর জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ, গৃহবন্দী করা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সহ কাশ্মীরের সমস্ত বিরোধী নেতাকে— প্রায় ঠিক সেই কায়দাতেই লখিমপুর জেলা জুড়ে ১৪৪ জারি করা হয়। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে একটি গেস্টহাউসে ৩০ ঘন্টা আটক রাখা হয়। অখিলেশ যাদবকে কার্যত গৃহবন্দী করা হয়। তিনি বাড়ির সামনেই ধর্নায় বসেন। লক্ষ্ণৌ এয়ারপোর্ট থেকে বার হতে দেওয়া হয় না ছত্তিসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ও পাঞ্জাবের উপমুখ্যমন্ত্রীকে। কারনালে বন্ধ করা দেওয়া হয় ইন্টারনেট এবং মেসেজিং পরিষেবা। এসব কিছুই শাসকদের অমিত শক্তি নয়, দুর্বলতারই পরিচায়ক।
কর্পোরেটদের আশীর্বাদধন্য প্রবল পরাক্রান্ত শাসকদের অভিযানের সামনে হতোদ্যম বিরোধী দলগুলি আসন্ন উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনকে মাথায় রেখে কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে উজ্জীবিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই ঘটনাক্রমও শাসকদের চিন্তায় রেখেছে। যদিও বিরোধীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ শাসকদের আশায় রাখছে।
এমতোবস্থায় প্রবল বিজেপি বিরোধী শক্তি বলে কথিত তৃণমূল কংগ্রেসের পেশাদার ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর সংবাদমাধ্যমের কাছে কেন্দ্রের শাসকদের অপার শক্তির ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, আগামী কয়েক দশক ভারতীয় জনতা পার্টি দেশের রাজনীতিতে অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে।
এখন দেখা যাক, কৃষক আন্দোলনের জয় হয়, নাকি কর্পোরেটের স্বার্থবাহী কেন্দ্রের শাসকদের অমিত শক্তির জয় হয়।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.