বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[বিশ্ব]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২১— যারা বলেন আজকের দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ একটা ক্লিশে ধারনা, তাঁরা আসলে বোঝাতে চান যে মার্কিন মুলুক বা পশ্চিম ইউরোপ হল গণতন্ত্রের স্বর্গ। বুর্জোয়া গণতন্ত্রই সভ্যতার বিকাশের পরাকাষ্ঠা। এরপর সোভিয়েত, চীন, কিউবা কিংবা ভিয়েতনাম যা করেছে বা করছে, তা সবই আসলে স্বৈরতন্ত্র। সোভিয়েত টেকেনি, কিউবা টিমটিম করছে, চীনও টিকবে না। সমাজতন্ত্র টিকবে নাকি টিকবে না, সেই বিতর্কের জন্য এই নিবন্ধ নয়। আমরা বলতে চাইছি, আজকের দুনিয়ায় মুমুর্ষু সাম্রাজ্যবাদকে দেখতে চান। তাহলে তাকান আফগানিস্তানের দিকে। সেখানেই চেনা যাবে ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে।
সোভিয়েতের পতনের পর পরমাণু অস্ত্র রাখা আছে এই অজুহাতে প্রথমে সৈন্য পাঠিয়ে ইরাক দখল করে আমেরিকা ও ব্রিটেন। তারপর সিরিয়া। ওই দুই দেশে মার্কিন মদতে ক্রমশ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আল কায়দা ও আইসিস। শেষে সিরিয়ায় আসাদের হয়ে রাশিয়া নেমে পড়ায় আইসিসকে সামনে রেখে আমেরিকার সিরিয়া দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর সামরিক আগ্রাসনে ইরাক নামক দেশ ও তাদের সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে সেখান থেকে সেনা সরাতে বাধ্য হয়েছে আমেরিকা। যদিও যে অজুহাতে ইরাক দখল করা হয়েছিল, সেই সাদ্দামের ইরানে কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার প্রমাণ মেলেনি। সবটাই ছিল আগ্রাসনের স্বপক্ষে গড়ে তোলা ন্যারেটিভ।
এবং আফগানিস্তান। প্রথমে সোভিয়েতকে ঠেকানোর নামে মুজাহিদ ও তালিবানদের মদত। সোভিয়েত সমর্থনে গড়া সরকারকে উৎখাত করে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা। শেষে সেই তালিবানের মদতে আল কায়দা খোদ আমেরিকায় সন্ত্রাস হানা চালালে আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোট আফগানিস্তান দখল করে। আমেরিকার মদতে ও পশ্চিমী সেনা বাহিনীর ছায়ায় গড়ে ওঠে সেখানকার সরকার ও সেনা। গত ২০ বছরে আমেরিকা আফগানিস্তানে ঢেলেছে ২ লক্ষ কোটি ডলারের বেশি অর্থ। দিয়েছে কয়েকশ কোটি ডলারের অস্ত্র। সবটাই মার্কিন করদাতাদের টাকায়। অথচ দেখা গেল কোভিডের সময় আমেরিকায় মাস্ক নেই, গ্লাভস নেই, ওষুধ নেই, হাসপাতাল নেই, লোকের কাছে খাবার কেনার টাকা নেই। বেঘোরে বিনা চিকিৎসায় আমেরিকার কত লক্ষ নাগরিক যে মারা গেল কোভিডে, তার হিসাব নেই। চীনকে দোষারোপ করা ছাড়া অতিমারি মোকাবিলার কোনও প্রস্তুতিই ছিল না বিশ্বের একনম্বর শক্তিধর দেশের। কোভিডের চিকিৎসার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রের হাতে টাকা ছিল না। অথচ আফগানিস্তানে, ইরানে, ভেনেজুয়েলায় হামলা ও অন্তর্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার টাকা ছিল। রাশিয়াকে দুর্বল করতে ইউক্রেন কিংবা মিনস্কে কমলা বিপ্লব ঘটানোর জন্য খরচ করার মতো টাকা ছিল। চীনকে ব্যস্ত করতে উইঘুর নিয়ে ঝামেলা পাকানোর টাকা ছিল। আর এখন মার্কিন বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার কাছ থেকে সরকারি অর্থে চড়া দামে টিকা কেনার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এবং জনতার করের টাকায় কেনা টিকা জনতাকেই বিনা পয়সায় দিয়ে বাহবা কিনছে মার্কিন সরকার। একেই বোধহয় কবি বলেছেন, বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেল।
আর আফগানিস্তান? দেশে দেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালাতে গিয়ে শক্তি খুইয়েছে মার্কিন অর্থনীতি। সামরিক নয়, স্রেফ চীনের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ক্রমশ ক্ষমতা হারাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী নায়ক আমেরিকা। তাই আগ্রাসনের খরচ কমাতে সেনা সরাতে হয়েছে ইরাক ও সিরিয়া থেকে, ন্যাটো থেকে কমানো হচ্ছে মার্কিন সেনা এবং সবশেষে, মার্কিন সেনা ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে আফগানিস্তান থেকে। আসলে সব এলোমলো খরচ কমিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে যাতে চীনকে কোনঠাসা করা যায় তারই ছক সাজানো হচ্ছে। সেই কারণে এরই মধ্যেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সফর সেরে ফেললেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। তবে তাঁর ভিয়েতনাম সফরের আগে হ্যানয়ে কেন কিউবার মতো হাভানা সিনড্রোম দেখা গেল, তা কিন্তু খতিয়ে বোঝার ব্যাপার আছে।

কিন্তু আফগানিস্তানের কি হল? দোহায় আলোচনা করে তালিবানের হাতে আফগানিস্তানকে তুলে দেওয়ার ছক তৈরি করছিলেন বাইডেন। আর গনি সরকারকে বলা হল আমেরিকা ও পশ্চিমী বাহিনী যতদিন নিরাপদে সরে না পড়ছে ততদিন আমেরিকার অস্ত্র নিয়ে আফগানরা তালিবানকে ঠেকিয়ে রাখুক। গনি আসলে বিশ্বব্যাঙ্কের লোক। আফগান সরকারে আমেরিকার দালাল হিসাবে ছিলেন। তিনি যখন দেখলেন আমেরিকা নিজে আর না লড়ে সরে পড়ছে এবং তালিবানের সঙ্গে যুদ্ধে আফগানদের শহিদ হতে বলছে, তখন তিনি দোহায় বাইডেনের ছক ধরে ফেললেন। গোড়াতেই গনি ঠিক করেছিলেন তিনি আর লড়বেন না। আফগান সেনাবাহিনীর কমান্ডারদেও তেমন পরামর্শ দিয়েছিলেন সম্ভবত। সেই কমান্ডার ও সৈন্যরা দেখলেন আমেরিকা পালিয়ে গেলে তালিবানের হাতেই তাদের মরতে হবে। কারণ এখন আমেরিকা সমঝোতা করছে তালিবানের সঙ্গে, তখন কমান্ডাররাও লড়লেন না। ডিভিশনের পর ডিভিশন আফগান সেনা আত্মসমর্পণ করল তালিবানদের কাছে। কান্দাহার, হেরাট, গজনি, মাজার এ শরিফ সহ একের পর এক শহর দখল করে নিল তালিবান। আমেরিকার বিপুল অস্ত্রসম্ভার পড়ল তাদের হাতে। বাইডেন ভেবেছিলেন, গনি লড়বেন। গনি দেখলেন আমেরিকার জন্য তাঁর শহিদ হওয়ার দরকার নেই। তিনি কোটি কোটি ডলার নিয়ে পালিয়েছেন। দরকারে আফগানিস্তানে সবপক্ষের সরকার হলে তিনিও তাতে ভিড়ে যাবেন। দালাল গনি যে এভাবে পগার পার হবেন সেটা বুঝতে পারেননি মার্কিন কর্তারা।
ফলে পিছনে পড়ে রইল পরিত্যক্ত আফগানিস্তান। তালিবান সেখানে কায়েম করবে শরিয়াত আইনের শাসন। দলিত হবে গণতান্ত্রিক অধিকার, নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা। আর পিছন থেকে ছড়ি ঘোরাবে পাকিস্তান এবং পশ্চিম দুনিয়ার মৌলবাদী রাষ্ট্রগুলো। ফের আফগানিস্তান ফিরবে পিছনের দিকে। এই হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যা সাধারণ, গণতন্ত্রপ্রিয় আফগানিস্তানকে তুলে দিয়ে যাচ্ছে তালিবান এবং যতো রাজ্যের জেল থেকে ছাড়া পাওয়া সন্ত্রাসবাদীদের হাতে। অথচ এই আমেরিকাকেই গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে আখ্যা দিয়ে রীতিমতো পারিতোষিক পেয়ে থাকেন এদেশের কত যে লোকজন!
ছক আরও আছে। তালিবান কাবুলের তখতে মানে সেখানে দুনিয়ার আল কায়দা, আইসিস, হাক্কানি, লস্কর এ তৈবা জঙ্গিদের ভিড়। এদের মদত দিয়ে ভারতকে ব্যতিব্যস্ত করতে চাইবে পাকিস্তান। আবার আমেরিকা চাইবে শরণার্থীদের স্রোতে ভিড়ে জঙ্গিরা পৌঁছে যাক সীমান্তবর্তী তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরঘিজস্তানে এবং জঙ্গি সংগঠন ইস্টার্ন তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট ছড়িয়ে পড়ুক চীনের উইঘুর প্রদেশে। তারা সন্ত্রাস চালিয়ে এসব জায়গা ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে পারলে বিপদে পড়বে রাশিয়া আর চীন। তাহলে এই সুযোগে জার্মানির সঙ্গে মিত্রতা বাড়িয়ে ইউরোপে ঢুকে পড়তে পারবে না রাশিয়া। আর চীন সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দক্ষিণ চীন সাগরে সমরসজ্জা বাড়িয়ে বেজিংকে চ্যালেঞ্জ জানানো সুবিধা হবে আমেরিকার। এই ছক জানে মস্কো ও বেজিংও। তাই দু’ পক্ষ আরও কাছাকাছি আসছে। চীন জানে দেশ চালাতে তালিবানের দরকার টাকা। কারণ পাহাড়ি এই দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে তেমন কিছু করেনি ওয়াশিংটন। আফগানিস্তানে আছে বিপুল পরিমাণ তামা ও লিথিয়াম। লিথিয়াম দরকার হয় মোবাইল ও বিদ্যুতচালিত গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে। সেজন্যই চিলির নির্বাচিত সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করেছে আমেরিকা। কারণ চিলিতে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম লিথিয়াম ভাণ্ডার। সুতরাং, চীন চায় তালিবানের সঙ্গে আর্থিক চুক্তি যাতে আদানপ্রদানের মাধ্যমে আফগানিস্তানের আর্থিক উন্নতি হয়। আর কে না জানে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে কত শত কট্টরপন্থীরা কত দিন আগে থেকেই নিজেদের নরম করে ফেলেছে। কারণ ক্ষমতায় থাকার মধু খুবই শক্তিবর্ধক। অতএব দেশের ক্ষমতায় টিকে থাকতে যদি তালিবান কট্টরপন্থা ছেড়ে নরমপন্থী ধর্মীয় শক্তি হওয়ার দিকে এগোয় তখন তার সঙ্গে আর্থিক আদান প্রদান বাড়ালে আদর্শগত সংঘাত কমে। সংঘাতের আবহের বদলে তৈরি হয় বাফার জোন। এ হল পারস্পরিক দেওয়া নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া। এটাই হল ট্যাঙ্ক রোড বনাম ডেভেলপমেন্ট রোডের ফারাক। আমেরিকা দেশ দখল করতে ট্যাঙ্ক পাঠায়। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশগিরি করতে বিশ্বের ৭০টি দেশ ও এলাকায় আমেরিকার রয়েছে ৮০০ সামরিক ঘাঁটি। অথচ বিশ্বের কোনও দেশেই চীনের সেনা মোতায়েন করা নেই। নেহত আর্থিক উন্নয়নের নীতিতেই তারা এগোতে চায়। পিছিয়ে পড়া আফ্রিকাকে এভাবে উন্নতির পথে এনেছে চীন আর সেকারণেই আমেরিকা তৈরি করেছে আফ্রিকম। মানে চীনকে আফ্রিকার মাটিতে মোকাবিলা করার জন্য মার্কিন সেনার আফ্রিকান কমান্ড। এখানে চীন সমাজতান্ত্রিক কিনা সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় আমেরিকা ও চীন এগোনের রাস্তা হিসাবে দাঁড়িয়ে দুটি ভিন্ন মেরুর পথে। ফলে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা তালিবানকে লড়িয়ে দিতে চাইলেও চীন এবং রাশিয়া সেই ছকে পা দেবে না বলেই মনে হয়।
সব মিলিয়ে আফগানিস্তানকে তালিবানের হাতে ছেড়ে দেওয়ায় কালি লাগল আমেরিকার ভাবমূর্তিতে। তার শক্তি নিয়ে এবার সন্দেহ প্রকাশ করবে পশ্চিমী মিত্ররা। ফলে একদিকে মস্কো-বেজিং-হাভানা-হ্যানয় অক্ষ নতুন করে জোরদার হতে পারে। আবার চীন-রাশিয়া জুটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠাতা বাড়াবে জার্মানি, ফ্রান্স সহ ইউরোপের একাধিক দেশ। এসবের জেরে আমেরিকার দাদাগিরির দিন ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে, এমন কথা এখনই বলতে শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তৈরি করা আল কায়দার মতো তালিবানও শেষ পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়ালো।