বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[বিশ্ব]

[বিশ্ব]

কো-অপারেশন জ্যাকসন: একটি বিকল্প মডেল

কো-অপারেশন জ্যাকসন: একটি বিকল্প মডেল

বঙ্কিম দত্ত

photo

বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি চরম সংকটের মুখোমুখি। ৯০-এর দশক থেকে বিশ্বায়নের নামে মার্কিন পুঁজিবাদ তার শিল্পগুলোকে ন্যূনতম মজুরির দেশে (চীন, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম) আউটসোর্স করার ফলে লক্ষ লক্ষ মার্কিন শ্রমিক কাজ হারিয়ে ভবঘুরেতে পরিণত হয়। কোভিড-১৯ মহামারি এই সংকটকে তীব্রতর করে, বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো সম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারি ও উচ্ছেদের মাত্রা চরমে পৌঁছায়। ১৯৯০ পরবর্তী নয়া উদারবাদী নীতির ফলে মার্কিন শিল্প শহরগুলো (ডেট্রয়েট, ক্লিভল্যান্ড, জ্যাকসন) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০০৮-এর অর্থসংকটে ৯০ লক্ষ পরিবার বাড়ি হারায়, যার শতকরা ৪০ জন কৃষ্ণাঙ্গ। জ্যাকসনে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ, যেখানে শতাংশে জাতীয় গড় ১১.৪ (২০২৩-এর তথ্য)। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির পটভূমিতে, জ্যাকসনে একটি সমষ্টিগত মালিকানাভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেল গড়ে উঠেছে, যা গোটা আমেরিকায় পুঁজিবাদবিরোধী বিকল্প হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। পুঁজিবাদ নির্ধারিত সংকটের মোকাবিলায় আমেরিকার মিসিসিপি রাজ্যের জ্যাকসন শহরে একটি নতুন আশার আলো জ্বলছে— কো-অপারেশন জ্যাকসন। এই বিপ্লবী প্রকল্প যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে সে সম্পর্কে এই নিবন্ধে আলোকপাতের চেষ্টা করা হবে।
আমেরিকায় পুঁজিবাদ এবং শ্রমিক শোষণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সর্বদাই শ্রমিকদের শোষণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ৯০-এর দশকে শুরু হওয়া অফশোরিং এবং আউটসোর্সিং-এর প্রবণতা আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণীকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে মিসিসিপি এবং অন্যান্য দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা বেশি, এই সমস্যার প্রকোপ আরও তীব্র হয়েছে।
বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক নীতিগুলির কারণে, শহরাঞ্চল থেকে প্রচুর কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি কোভিড মহামারির সময়ে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর ব্যাপক প্রসার আরও বেশি কাজ শ্রমিকদের কেড়ে নিচ্ছে। ২০২৫ আমেরিকার জনসংখ্যার ৩৪.১ কোটির শতকরা ১১ ভাগের বেশি দারিদ্র্য-সীমার নীচে, বেকারি শতকরা ১২ ভাগের বেশি।
কো-অপারেশন জ্যাকসন: একটি বিপ্লবী উদ্যোগ
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, কো-অপারেশন জ্যাকসন বাঁচার লড়াই হিসেবে উঠে এসেছে। মিসিসিপির জ্যাকসন শহরে অবস্থিত এই বিপ্লবী প্রকল্প একটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার পথ দেখাচ্ছে। উদ্যোগটির নিজস্ব বয়ানে – “জ্যাকসন, মিসিসিপিতে সহযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হচ্ছে, যা সহ-অংশীদারভিত্তিক সমবায় ও শ্রমিকদের মালিকানাধীন, গণতান্ত্রিকভাবে স্ব-পরিচালিত উদ্যোগের একটি নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কো-অপারেশন জ্যাকসন ব্যক্তি মালিকানার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সমষ্টিগত মালিকানাধীন উৎপাদন ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে”।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্যগুলি হল:
সমতা ও সহযোগিতার নীতির ভিত্তিতে একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা। শ্রমিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যেখানে শ্রমিকরাই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, পরিবেশগত স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া, জাতিগত ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করা, জীবন যাপনের উপযুক্ত মজুরির মাধ্যমে কাজ প্রদান করা।
কো-অপারেশন জ্যাকসন শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, বরং একটি সামগ্রিক সামাজিক আন্দোলন। এর মাধ্যমে সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করছেন।
একটি সমন্বিত বিপ্লবী মডেল
স্থানীয় মুদ্রা ও MPA (মিসিসিপি পিপলস অ্যাসেম্বলি), এই দুটি প্রক্রিয়া, একসঙ্গে কাজ করে জ্যাকসনে “ডুয়াল পাওয়ার” (Dual Power) কৌশল গড়ে তুলছে। যেমন, অর্থনৈতিক ক্ষমতা যা স্থানীয় মুদ্রার মাধ্যমে তা পুঁজিবাদী বাজারকে উপেক্ষা করে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ক্ষমতা, যেমন MPA-র মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে চাপ দেওয়া। দু’একটা উদাহরণ দেওয়া যায় — MPA একটি সমাবেশে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শহরের খালি জমিতে সমবায় ফার্ম গড়তে হবে এবং সেই ফার্মে উৎপাদিত পণ্য জ্যাকসন এক্সচেঞ্জে বিক্রি হবে, ডলারের প্রয়োজন ছাড়াই। যেমন, একজন কৃষক স্বাধীনতা ফার্মগুলি (Freedom Farms) থেকে সবজি বিক্রি করে ‘জ্যাকসন এক্সচেঞ্জ ক্রেডিট’ পায়, যা দিয়ে সে স্থানীয় দর্জি বা টিভি মেরামতকারী ইত্যাদির সেবা নিতে পারে। এই পদ্ধতিতে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায় না, কিন্তু সম্পদ স্থানীয়ভাবে ঘুরতে বাধ্য হয়।
প্রকৃতি-কেন্দ্রিক অর্থনীতি
কো-অপারেশন জ্যাকসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর প্রকৃতি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই মডেল স্বীকার করে যে পরিবেশগত স্থায়িত্ব ছাড়া কোনও অর্থনৈতিক মডেল টেকসই হতে পারে না। কর্পোরেট পুঁজিবাদ যেখানে পরিবেশকে শুধুমাত্র শোষণের উৎস হিসেবে দেখে, কোঅপারেশন জ্যাকসন সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ওপর জোর দেয়।
এই প্রকল্পে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন, সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মতো উদ্যোগগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলি শুধু পরিবেশকেই রক্ষা করে না, বরং সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ঐক্য
কো-অপারেশন জ্যাকসনের প্রভাব শুধু মিসিসিপিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই মডেল সমগ্র আমেরিকা মহাদেশে প্রকৃতি-কেন্দ্রিক জীবনধারার একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। কিউবা, বলিভিয়া এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলিতে অনুরূপ প্রকল্প বিকশিত হচ্ছে।
ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধতা গড়ে উঠেছে, তার সঙ্গে কো-অপারেশন জ্যাকসনের আদর্শগত মিল রয়েছে। এভাবে, মার্কিন দেশের মধ্যে এবং বাইরে প্রকৃতিবান্ধব মানুষের মধ্যে একটি নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সংহতি তৈরি হচ্ছে।
ইকোসোশালিজ়ম: নতুন সমাজতন্ত্রের দিকে
কো-অপারেশন জ্যাকসনের মতো উদ্যোগগুলি ইকো-সোসালিজমের ধারণাকে শক্তিশালী করছে। ইকোসোশালিজ়ম হল একটি রাজনৈতিক দর্শন যা সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে পারিবেশিক চেতনাকে একত্রিত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে পরিবেশ সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ পুঁজিবাদের মূল চালিকা শক্তিই হল অসীম বৃদ্ধি ও মুনাফা, প্রকৃতির সীমিত সম্পদের সঙ্গে যার সম্পর্ক বৈরিতামূলক।
ইকোসোশালিজ়ম মনে করে যে পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই ধারণা অনুসারে, শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক অর্থনীতি একমাত্র পথ যা আমাদের বর্তমান পরিবেশ সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে।
কর্পোরেট মিডিয়া এবং সত্যের অনুপস্থিতি
কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলি কো-অপারেশন জ্যাকসন ও অনুরূপ উদ্যোগগুলি সম্পর্কে প্রায়শই নীরবতা পালন করে। এর কারণ স্পষ্ট: এই উদ্যোগগুলি কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। কর্পোরেট মিডিয়া নিজেই বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে নিয়ন্ত্রিত, তাই তারা এমন কোনও বার্তা প্রচার করবে না যা বর্তমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে। কর্পোরেট মিডিয়া এটিকে “অরাজকতাবাদী” আখ্যা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা এই বিকল্প মডেলগুলি সম্পর্কে সচেতনতা ছড়াতে পারি। কারণ, জ্যাকসনের লড়াই গোটা পৃথিবীর শতকরা ৯৯ জনের লড়াই।
সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের নতুন দ্বন্দ্ব
কো-অপারেশন জ্যাকসনের মতো উদ্যোগগুলি প্রমাণ করছে যে পুঁজিবাদের বিকল্প শুধু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাস্তবে রূপায়িত হতে পারে। এগুলি দেখাচ্ছে যে সমাজতন্ত্র শুধু একটি ঐতিহাসিক ধারণা নয়, বরং একটি জীবন্ত, বিকশমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন যা আজকের সমস্যাগুলির সমাধান প্রদান করতে পারে।
এআই (AI) এর প্রসার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অসমতার মতো সমস্যাগুলি আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে, পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব আবার বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
কো-অপারেশন জ্যাকসনকে “অ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট থ্রেট” হিসেবে চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি চলে প্রতিনিয়ত। মিসিসিপি রাজ্য সরকার সমবায়গুলিকে কর সুবিধা দিতে অস্বীকার করে। তা সত্ত্বেও স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ, এআই ও অটোমেশনের কারণে চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য বিকল্প অর্থনীতি, কিউবা-ভেনিজুয়েলা-বলিভিয়ার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পগুলির সঙ্গে নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক সংহতি এই ভাবনা ও তার গণভিত্তিকে প্রসারিত ও শক্তিশালী করে তুলছে।
কো-অপারেশন জ্যাকসনের মতো প্রকল্পগুলি দেখাচ্ছে, একটি অন্য ধরনের বিশ্ব সম্ভব — এমন একটি বিশ্ব, যেখানে অর্থনীতি মানুষের কল্যাণ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার কাজ করে, শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কর্পোরেট মালিকদের মুনাফা বা পুঁজিবাদের জন্য নয়।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.