বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[বিশ্ব]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ নভেম্বর, ২০২১— বাংলাদেশে আবার ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। এবার চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ঢাকা, ফেনী, রংপুর, নোয়াখালী সহ বিভিন্ন জায়গায়। দুর্গামূর্তি ভাঙা, মন্ডপ পোড়ানো, মন্দিরে আক্রমণ, ভক্ত খুন ইত্যাদি সবকিছুই যেভাবে কিছুটা সময়ের মধ্যেই বিস্তির্ণ অঞ্চলে পরপর ঘটেছে, তাতে উগ্র মুসলমান সাম্প্রদায়িক শক্তির পরিকল্পিত চক্রান্ত অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের মতে, জামাত ও বিএনপি মারফৎ এইসব উগ্র-সাম্প্রদায়িক ঘটনায় প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে পাকিস্তানের আইএসআই-এর।
'ওপার' বাংলার এসব ঘটনায় যথারীতি 'এপার' বাংলায় তথা ভারতবর্ষে শুরু হয়েছে তীব্র মুসলমান-বিরোধী প্রচার। এটাই হয়। মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি কোথাও হিন্দু-বিরোধী সহিংস আক্রমণ চালালেই আপামর মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধেই ঘৃণা ও হিংসা ছড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি। আর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি যদি কখনও মুসলমান-বিরোধী হিংসাত্মক ঘটনা ঘটায়, তখন সমগ্র হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধেই ঘৃণা ও হিংসা ছড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি। এর ব্যতিক্রম কখনোই ঘটেনা। হিন্দু ও মুসলমান সমাজের ধর্মবিশ্বাসী ব্যাপক জনগণের সাথে এইসব সাম্প্রদায়িক বৈরিতার কোনও সম্পর্কই নেই। অথচ, হিন্দুদের মনে মুসলমান-বিরোধিতার আগুন এবং মুসলমানদের মনে হিন্দু-বিরোধিতার আগুন বাড়তেই থাকে। হিন্দু-সমাজ এবং মুসলমান-সমাজ, দু'য়ের মধ্যে মানসিক দূরত্ব, অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বৈরীতা বাড়তেই থাকে সময়ের সাথেসাথে! তবুও, পশ্চিমবঙ্গের খিদিরপুর অঞ্চলে আজও ৮৪-জন মুসলমান এবং ২-জন হিন্দুর কাঁধে ওঠে দুর্গাপ্রতিমা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গন্ডগোলের সময়ে সহিংস জামাত শক্তির গলায় আওয়াজ উঠেছে "বাংলাদেশ বনেগা আফগানিস্তান"। এটাই হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারের বিষয়। কিন্তু লাখো মুসলিম-হিন্দু জনতার দৃপ্ত মিছিলে যে ধ্বনিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সাবধানবাণী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক, সেসব গুরুত্ব পায়না। ভারতবর্ষে হিন্দু-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে বারবার। কিন্তু বাংলাদেশে এ'বারের জামাত-সমর্থনপুষ্ট হামলার পরপরই বাঙালি হাসিনা সরকার ২২-টি জেলায় হামলাকারী মুসলিম-সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যে আধাসামরিক বাহিনী নামিয়েছে এবং কয়েকশো দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তার করেছে, তার কোনও গুরুত্বই নেই হিন্দু-দাঙ্গাবাজদের কাছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বাঙালিদের ভাগ করার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা; উগ্র মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তির তরফ থেকে সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বাংলাভাগ সহ 'দেশভাগ'-এর দাবি উত্থাপন; এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতাদের তরফ থেকে সেই দাবিকে কার্যত সমর্থন। এই তিনের মিলিত পরিণাম চল্লিশের দশকে 'বাংলাভাগ'। কোটিকোটি হিন্দু-মুসলমান জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না ক'রে এবং বাংলাকে অবিভক্ত রাখার দাবিকে উপেক্ষা ক'রে, দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্ত রাজনৈতিক মোড়লদের উদ্যোগে চিরস্থায়ী ধর্মীয় বিভাজনের ভিতকে পাকা ক'রে তোলা হ'লো! এপার-ওপার, দুই পারের লক্ষ লক্ষ হিন্দু-মুসলমানকে বাপ-ঠাকুর্দার ভিটে ত্যাগ ক'রে, 'সীমা'-র ওপারে অজানা অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করা হ'লো। বারবার দাঙ্গা বাধানো হ'লো সীমান্তের দু'পারেই। শুরু হ'লো পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, ঘৃণার কুৎসিত আবহ। দুই সম্প্রদায়ের উগ্র সাম্প্রদায়িক অংশ প্রথম থেকেই দাঙ্গা, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ইত্যাদিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিণতি, সময়ের সাথেসাথে পারস্পরিক সম্পর্কের বেদনাদায়ক ক্রমাবনতি!
দুই ধর্মের বহু কিছুই আলাদা। আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, পোশাকআশাক, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি অনেক বিষয়েই। কিন্তু শত শত বছর ধরে প্রতিবেশীদের মধ্যে এইসব ভিন্নতা সত্বেও একসাথে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাসের ক্ষেত্রে কোনও বাধাই সৃষ্টি হয়নি। মাতৃভাষা বাংলা ছিল সবচেয়ে বড়ো বন্ধন। বিভিন্ন কারণে এবং নানাসময়ে ঝগড়াঝাঁটি-মারামারির মতো ঘটনা অবশ্যই ঘটেছে। যেমন ঘটেছে হিন্দুতে হিন্দুতে, এবং মুসলমান-মুসলমানেও। কিন্তু হিন্দূ-মুসলমানের ঝগড়াঝাঁটি-মারামারির গায়ে সাম্প্রদায়িকতার ভয়ঙ্কর তকমা সেঁটে বসেনি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সংঘর্ষ যেমন ঘটেছে, তার পরেই আবার তা মিটেও গেছে। হিন্দু-মুসলমানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্নই থেকেছে যুগের পর যুগ। দুর্গাপূজোয় মুসলমানের অংশগ্রহণ এবং ঈদে হিন্দুর উৎসাহ ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা।
কিন্তু বাংলাভাগ-কে কেন্দ্র ক'রে যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দানা বাঁধলো, বলা যায়, তা স্থায়ীভাবে গেঁড়ে বসলো উভয় সম্প্রদায়ভুক্ত কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মনেও! পূর্ববাংলা ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো কার্যত 'মুসলমান বাংলা', আর পশ্চিমবাংলা হয়ে উঠলো যেন 'হিন্দু বাংলা'! হিন্দু-মুসলমান উগ্র সাম্প্রদায়িক নেতাদের স্বপ্ন অনেকটাই পূরণ হয়েছে!
রাজনৈতিক মোড়লদের এ'ক্ষেত্রে ভূমিকা কী? গণহত্যা-দাঙ্গা-হাঙ্গামা-অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটনা ঘটলেই তাঁদের 'ধর্মবোধ' চিড়বিড়িয়ে ওঠে! বাংলাভাগের সময় যাঁরা সেই ভাঙনের সক্রিয় বিরোধিতার বদলে কার্যত সমর্থন করেছিলেন বিচিত্র ছলনাময়ী যুক্তির আশ্রয় নিয়ে, তাঁরাই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন তথাকথিত অ-সাম্প্রদায়িক! হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতো যারা খোলাখুলিই ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাভাগ চেয়েছিলেন, তাদের সাম্প্রদায়িক অবস্থান তো স্পষ্ট। তারা সর্বদাই হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি (মানেই বৈরিতা, সংঘাত, সংঘর্ষ) চাইবেন। আগেও চেয়েছেন, আজও তা-ই চান। সুযোগ পেলেই সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বাড়িয়ে তুলতে তৎপর হয়ে ওঠেন। এটা তাদের 'আদর্শ'।
কিন্তু 'ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু' তালেবররা? বছরের পর বছর, দশকের পর দশক তাদের 'হিন্দুপ্রেমী' মনের খোঁজও পাওয়া যায়না। হিন্দু প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন ক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশের বেনারসে যখন হিন্দুদের ২০০/ ৩০০ বছরের পুরানো কয়েকশো বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় "উন্নয়ন"-এর স্বার্থে, যখন এই কর্মকান্ডের ধাক্কায় ভাঙা পড়ে কয়েকশো বাড়ির শিব মন্দিরও, তখন তারা মেরুদন্ডহীন 'বাঙালি' হিসাবে চুপ ক'রেই থাকেন। কোটি কোটি হিন্দুর কয়েক লক্ষ কোটি টাকা চুরি ক'রে যখন 'হিন্দু' জালিয়াতরা দেশ ছেড়ে চলে যায়, তখনও নানা রকম কুযুক্তি খাড়া ক'রে এরা সরকারের চোখে 'সুবোধ বালক' হয়েই থাকতে চান। কিন্তু যেই বাংলাদেশে কয়েকটি দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে উগ্র মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি হামলা চালিয়েছে, ওমনি তারা রাস্তায় নেমে পড়েছেন ভীষণ 'হিন্দু' হিসাবে! মুসলমান-বিরোধিতার কর্মসূচি নিয়ে। নানা মাধ্যমে চলছে অবিরাম মুসলিম-বিরোধী প্রচার। আসলে হিন্দু-প্রেম নয়, মুসলমান-বিদ্বেষই এদের একমাত্র অ্যাজেন্ডা।
মানবসমাজে নানা ধরনের সাম্প্রদায়িকতার শিকড় অত্যন্ত গভীর। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতারও। আমরা পৃথিবীজুড়ে নিয়মিতই তার প্রমাণ পাচ্ছি। এই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই আসলে প্রতিবছর, প্রতিমাস, প্রতিদিনের নিরলস কর্মসূচি। ভগবান কিম্বা আল্লাহ, কারও কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করলেও সাম্প্রদায়িক উপদ্রবের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা। সামাজিক মেলামেশা, অর্থনৈতিক আদান-প্রদান, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, রাজনৈতিক একাত্মতা, - এ'গুলির নিয়মিত চর্চাই সাম্প্রদায়িকতাকে ঠেকানোর পথ। হঠাৎ হঠাৎ "আমরা ভাই-ভাই" বলে বুকে জড়িয়ে ধরার নাটক করলেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠার তিলমাত্র সম্ভাবনা নেই। কোনও নেতা-নেত্রীর তরফ থেকেই আমরা নিয়মিতভাবে সেই সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী কর্মসূচির উদ্যোগ কখনোই দেখিনা; সেই কথাও শুনিনা! কোনও সরকারও প্রতিনিয়ত, নানা মাধ্যমে এবং বাস্তব কর্মসূচি মারফৎ জনগণের মন থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ দূর করতে তৎপর হয়না। কখন মন্দির আক্রান্ত হয় কিম্বা মন্দিরে গরুর মাংস পাওয়া যায়; কখন মসজিদে হামলা হয় অথবা সেখানে শূয়োরের মাংস ফেলা হয়; কখন প্যান্ডেল পোড়ে অথবা দেবমূর্তি ভাঙে, - এ'সব খবর মুহূর্তমধ্যে জনগণের কানে পৌঁছে যায়! যেন এইসব অবাঞ্ছিত ঘটনার অপেক্ষাতেই থাকেন তাঁরা! তখন, এবং একমাত্র তখনই তাঁরা সোচ্চার হবেন 'সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী' কর্মসূচিতে!
সবসময়েই আমরা বরং এইসব নেতা-নেতৃদের কার্যত আধিপত্যবাদী মানসিকতা নিয়েই চলতে দেখি অনেক বেশি। আমার দেশ, আমার দল, আমার রাজনীতি, আমার শাসন, আমার ধর্ম, আমার জাতি, আমার জাত, আমার বর্ণ, আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি, … প্রতিমুহূর্তে এগুলিই প্রধান গুরুত্বপূর্ণ এইসব রাজনীতির কারবারিদের কাছে। 'সমাজ' বিষয়টাই যেন সর্বদা গৌণ! শুধুমাত্র গদী দখলের 'রাজনীতি'-ই বিচার্য। বৃহত্তর সামাজিক বিষয় নিয়ে এঁরা কখনোই ভাবিত নন। সাম্প্রদায়িকতার অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রসঙ্গ ছাড়াই রচিত হয় এঁদের 'নিত্যকর্মপদ্ধতি'। ফলে সমাজে নানা ধরনের "উন্নয়ন"-এর পাশাপাশি বাড়তে থাকে ধর্মভিত্তিক, জাতিভিত্তিক, জাতভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা। 'অপর'-এর উপর ছড়ি ঘোরানো। এব্যাপারে 'এপার' এবং 'ওপার', দুই বাংলায় একই চিত্র।
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতবর্ষের হিন্দু-সাম্প্রদায়িক শক্তিও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে, একথা ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশের সবকিছুই 'ধর্মনিরপেক্ষ', এমনটা ভাবারও কোনও কারণ নেই। এবছর মোট ৩২ হাজার ১১৮-টি (গতবছরের চেয়ে ২ হাজার বেশি) দুর্গাপূজা হয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের ৭০-টি পূজায় সাম্প্রদায়িক তান্ডব চলেছে, একথাও সত্যি। এবং তা চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নজির। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দুর্গাপূজোর জন্য এবছর ৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ব'লে, হিন্দুদের সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে ৮.৫%-এ নেমে আসা কোনওভাবেই প্রশাসনের 'ধর্মনিরপেক্ষ' চরিত্রের প্রমাণ হ'তে পারেনা। ১৯০১ সালে (বর্তমান 'বাংলাদেশ' নামাঙ্কিত অঞ্চলে) হিন্দুদের জনসংখ্যা ৩৩% ছিল, ১৯৪১-এ ২৮%; ১৯৫১ সালে ২২%, ১৯৬১-তে ১৮.৫%; ১৯৭৪ সালে ১৩.৫%, ১৯৮১-তে ১২%, ১৯৯১-এ ১০%; বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে (২০০১) ৯.৬% এবং ২০১১ সালে হয়েছে ৮.৫%। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমল অথবা পাকিস্তানি শাসন কিম্বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, কিছুই হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াকে আটকাতে পারেনি। এই সত্যকে মাথায় রাখতে হবে।
হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সহ সমগ্র বাঙালি সমাজ বহুসময়ে ও নানা কারণেই একত্রে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালে "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" এবং "সমস্ত রাজবন্দীর মুক্তি চাই" - বাঙালির তেমনি দুটি প্রতিবাদী দাবি। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের 'হজরতবাল মসজিদ' থেকে হজরত মহম্মদের কেশ চুরি যাওয়ার পর যেমন সম্মিলিত কন্ঠে শ্লোগান উঠেছিল "পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও।"
পাশাপাশি, বাংলাদেশের সরকারি স্তরেও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ক্রমবৃদ্ধি এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। উদাহরণ হিসাবে ইস্কুলের পাঠ্যসূচির কথা বলা যায়। গতবছর ক্লাস নাইনের যে নতুন পাঠ্যসূচি তৈরি হয়েছে তাতে বাদ গেছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানদাস, ভারতচন্দ্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; যুক্ত হয়েছে শাহ মহম্মদ সগীর, আলাওল এবং আব্দুল হাকিমের রচনা। ক্লাস এইটের পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ পড়েছে উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর 'রামায়ণ কাহিনী'। ক্লাস সেভেনের পাঠ্যসূচি থেকে বাদ গেছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'লাল ঘোড়া'; যুক্ত হয়েছেন হবিবুল্লা বাহার।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" গানটি বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে, সেই রবীন্দ্রনাথ রচিত "আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে" রচনাটি বাদ গেছে ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যসূচি থেকে!
বলা বাহুল্য এসব ঘটনা দু'দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠার পক্ষে, দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের পথে নিশ্চিতভাবেই বাধা স্বরূপ। এবং তা বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষ, দুই দেশের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের উগ্র সাম্প্রদায়িক অংশকেই উৎসাহিত করবে।
যে রাজনৈতিক নেতারা যথাযথভাবে নেতৃত্ব দিলে মুসলমান ও হিন্দু ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেওয়াকে ঠেকানো যেতো, সেই যথার্থ কমিউনিস্ট রাজনীতি আজও বেদনাদায়ক ভাবে অনুপস্থিত! ১৯৪৭ সালে বাংলাভাগের সময়ে অনেক কমিউনিস্ট নেতাই দেশ ছেড়ে ভারতবর্ষে পালিয়ে আসেননি। তাঁরা সুন্দর-সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে, মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে কৃষকদের মধ্যে পড়ে থেকে কৃষক সংগ্রাম গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে গেছেন। কারণ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, 'তেভাগা' আন্দোলনের সময়ে কিম্বা বিভিন্ন শ্রমিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে, হিন্দু-মুসলমান জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তি তখন সেখানে সুবিধে করতে পারেনি। মাঠে ময়দানে কৃষক-শ্রমিক লড়াইয়ে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক নেতারা যাঁরা বাংলাভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গেলেন, তাঁদের কেউ হয়তো পরে পার্টির নির্দেশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন; কেউ গ্রেপ্তার হয়ে জেলবন্দী অবস্থায় অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন; কেউ কেউ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মাটিতেই খুন হয়েছেন উগ্র-সাম্প্রদায়িক জামাতের হাতে। এঁরাই ছিলেন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আদর্শ রাজনৈতিক যোদ্ধা। এঁরা পালিয়ে নিজেরা বাঁচার আত্মকেন্দ্রিক ভাবনার বশবর্তী হয়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন নি। মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে বৃহত্তর বাঙালি জনগণের সামাজিক স্বার্থে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ ক'রে গেছেন। নিশ্চিন্ত ও নিরুপদ্রব দূরত্বে বসে "সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি" নিয়ে ভাষণবাজী করেননি। সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে সমস্যা দূরীকরণে বিরামহীনভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ধারাবাহিকভাবে এই যথার্থ জনস্বার্থবাহী কাজের অভাবেই বর্তমানে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে (তথা ভারতবর্ষে) ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক সংঘাত-সংঘর্ষের যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে সমাজকে।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধলে পশ্চিমবঙ্গে আমরা রাজনৈতিক নেতাদেরও দেখি পুলিশের কাছে ছুটতে। কিন্তু বিভাগ পরবর্তী পূর্ববঙ্গের খুলনায় (পরবর্তীকালের বাংলাদেশে) দাঙ্গা ঠেকাতে, ১৯৪৮ সালে, কমিউনিস্ট পার্টির অফিসেও পুলিশকে ছুটতে হয়েছে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতার সাহায্যপ্রার্থী হয়ে— এ'ঘটনাও ইতিহাসের অঙ্গ। আগের মুহূর্তেও "পলাতক" নেতার নেতৃত্বেই সংগঠিত হয়েছে মুসলমান-হিন্দুর যৌথ ও বিশাল 'শান্তি মিছিল'। দাঙ্গার সম্ভাবনা দূর হয়ে গেছে। এঁরাই ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যথার্থ সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা।
রাজনৈতিক নেতারা কী চান, তা তাঁদেরকেই ঠিক করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর শুধু নিজেদের 'সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী' আন্দোলন? নিজেদের দলের মিছিল, মিটিং, সেমিনার, প্রবন্ধের বন্যা? নাকি ধর্ম-বর্ণ-জাত-জাতি নির্বিশেষে সকলকে সঙ্গে নিয়ে নিরলস, ধারাবাহিক, প্রাত্যহিক, কষ্টকর সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজে যথার্থই সাম্প্রদায়িক চিন্তা-ভাবনাকেই প্রতিহত করার প্রচেষ্টা?
পথ বাছাইয়ের উপরেই নির্ভর করছে বাঙালি সমাজে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।