বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[বিশ্ব]

[বিশ্ব]

অবাধ বাণিজ্য বনাম ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ

অবাধ বাণিজ্য বনাম ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ

নির্মলেন্দু নাথ

photo

ইতিহাসে এমন কিছু সময় থাকে যখন দেখা যায় দশকের পর দশক বিশেষ কিছুই ঘটে না। আবার এমন কিছু সপ্তাহ আসে যখন দেখা যায় ওই সপ্তাহের ঘটনার ঘনঘটার প্রভাব কয়েক দশক বজায় থাকে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখা তথা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি হল এই রকম একটা ঘটনা। মর্মবস্তুর বিচারে ট্রাম্পের শুল্কনীতি হল অবাধ বাণিজ্যের বিপরীতে কঠোর আমদানি নীতির মাধ্যমে অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা। এখন বিষয়টা হল কঠোর আমদানি নীতির মাধ্যমে বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত তথা দেশের উন্নয়নের ধারণা প্রাক শিল্পবিপ্লব-যুগের ধারণা। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদেরা এই নীতির সারবত্তাহীনতা তুলে ধরেছেন। তাঁদের মত হল, শুধুমাত্র বাণিজ্য নয়, উৎপাদনই হল উন্নয়নের প্রকৃত চালিকাশক্তি। এহেন বাস্তবতা সত্ত্বেও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে ট্রাম্পের কঠোর আমদানি নীতি বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমহ্রাসমান মার্কিন আধিপত্য
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ব্রিটিশ প্রভাব-প্রতিপত্তি অস্তমিত হতে থাকে এবং মার্কিন প্রভাব–প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। অর্থনীতির দিক থেকে বিচার করলে তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্র মার্কিন পণ্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই মার্কিন পণ্যে শিল্পজাত পণ্য ও কৃষিজাত পণ্য উভয়ই ছিল (এর উদাহরণ হল পিএল ৪৮০)। অপরদিকে পূর্বতন যুগে ব্রিটিশ পণ্য ছিল মূলত শিল্পজাত পণ্য। ১৯৬০ সালে সারা পৃথিবীর মোট পণ্য উৎপাদনের মূল্য ছিল ১৩৭০ লক্ষ কোটি ডলার। আর এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ৪০ শতাংশ। ২০২৪ সালে সারা পৃথিবীর মোট পণ্য উৎপাদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ মাত্র ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন প্রভাব প্রতিপত্তি ক্রমহ্রাসমান। তবে ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা একই ভাবে ঘটেনি। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ তিন দশকে টানা হ্রাস পেয়ে ২৫ শতাংশে নামে। তারপর প্রেসিডেন্ট রেগানের আমলে ১৯৮৫ সালে এই শতাংশ বেড়ে ৩৪ হয়। তারপর আবার হ্রাস পেতে থাকে। বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন অংশ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রেসিডেন্ট রেগান যে সব পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা হল ফেডারেল বাজেটের ভারসাম্য, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির হারকে শ্লথ করা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করা, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস করার জন্য অর্থ সরবরাহকে কঠোর করা ইত্যাদি। এক কথায় এটা হল ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’। একে রেগানোমিক্সও বলা হয়। এসবের ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাণিজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘শেয়ার’ বাড়লেও এর সামগ্রিক ফলাফল নেতিবাচক ছিল। প্রকৃত গড় মজুরি হ্রাস পায় এবং আট বছরে জাতীয় ঋণ তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রেসিডেন্ট রেগানের বিপরীতে পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও কর্পোরেটের ওপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থায়ন করা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা ও আয় বৈষম্য হ্রাসের উপর জোর দিয়েছিলেন। এসবের ফলে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ হয় এবং ১ কোটি ৩০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়। এক কথায় বলতে হলে বাইডেন যুগে অর্থনীতির দর্শন ছিল ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম’ যা কর্পোরেট লবির দ্বারা সমর্থিত হয়নি।
মার্কিন অর্থনীতির স্বাস্থ্যের মানদণ্ড
যে কোনও দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য অনুধাবনের জন্য তার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুটো দিককেই সমভাবে দেখা দরকার। ২০২৫ এর শুরুতে মার্কিন অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ অবস্থা বোঝার জন্য লুইগি প্যাসিনেত্তিকে অনুসরণ করে চারটি মূল অর্থনৈতিক চলককে (ভেরিয়েবল বা প্যারামিটার) নির্বাচন করা হয়েছে। এগুলি হল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও আয় বৈষম্যের মাত্রা। এছাড়া বৈদেশিক বিষয়কে অনুধাবন করার জন্য যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশগুলোর (যথা ইউরোপ ও জাপান)অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হবার প্রচেষ্টা ও প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলবর্তী দেশ সমূহে (এদের মধ্যে অন্যতম চীন) স্বাধীন অর্থনীতির উত্থান সম্পর্কিত বিষয়গুলো দেখা হবে।
উৎপাদনশীলতা বলতে বোঝায় উৎপাদনের উপাদানগুলি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০৮–এর আর্থিক সংকটের পর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমে যায়। একে উৎপাদনশীলতার প্যারাডক্স বলে। অ্যাকেমোগলু প্রমুখ দেখিয়েছেন ১৯৯০–এর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিল্পে খুব সামান্যই উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ঘটেছে। ১৯৮৭ সালেই রবার্ট সলো বলেছিলেন, কম্পিউটার যুগ আসা সত্ত্বেও সর্বত্র উৎপাদনশীলতা বাড়েনি।
উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির ক্রমহ্রাসমান প্রবণতার মতো শ্রমিকের কর্মনিযুক্তির হারও ক্রমহ্রাসমান। পুরুষের ক্ষেত্রে এই কর্মনিযুক্তির হার ১৯৫০ সালে ছিল ৮৬.৪ শতাংশ। ২০০৫ সালে এটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭৩.৩ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার হয়েছে ৬২.৪০ শতাংশ। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে শ্রমনিযুক্তির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ১৯৫০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ, ১৯৯৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬০ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ৫৭.৭ শতাংশ। তবে শ্রমনিযুক্তির হার আশাব্যঞ্জক হলেও গড় প্রকৃত মজুরির হার ২০০৭ সালে যা ছিল, বর্তমানে তা একই অবস্থায় রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতিকে ঘিরে এক নতুন ধারনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সূচিত হয়েছে। সাবেকি ধারণা হল ‘মজুরি বৃদ্ধির জন্য’ মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। ইতিমধ্যে দেখা গেল বিগত ১৪ বছরে প্রকৃত মজুরি বাড়েনি অথচ মুদ্রাস্ফীতির হার ২০২৩ সালে ছিল ৪.৩ শতাংশ। এহেন অবস্থাকে ইসাবেলা ওয়েবার ‘বিক্রেতাদের দ্বারা মুদ্রাস্ফীতি’ বলেছেন। ইসাবেলা দেখিয়েছেন বিক্রেতারা তাদের মুনাফার হারকে সুরক্ষিত করার জন্য ‘মুদ্রাস্ফীতি’ করে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আয়ের বৈষম্য সর্বাপেক্ষা গুরুতর। অ্যাকমেগলু প্রমুখ হিসেব করে দেখিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৫ সালে সর্বাপেক্ষা ধনী ১ শতাংশ মানুষের কাছে সে দেশের মোট সম্পদের ৯ শতাংশ ছিল। ২০১৮ সালে এই ১ শতাংশ মানুষের কাছে সে দেশের মোট সম্পদের ২০ শতাংশ রয়েছে। আয় বা সম্পদের বৈষম্য প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। সংক্ষেপে বললে ২০২৫ এর শুরুতে মার্কিন অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান ও শ্রমিকের শ্রমনিযুক্তির হারও ক্রমহ্রাসমান, বিক্রেতাদের দ্বারা মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান আয়ের বৈষম্য সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এক কথায় বললে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি মোটেই অনুকূল নয়।
একইরকম ভাবে দেখা যায় বৈদেশিক পরিস্থিতিও প্রতিকূল। পুরনো মিত্র দেশ ইউরোপ তার উৎপাদন কাঠামোকে আরও মজবুত করে তুলেছে। একই রকমভাবে জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলেছে। তবে পণ্য উৎপাদনের দিক থেকে সবচেয়ে অগ্রগতি হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোতে। এদের মধ্যে চীন অগ্রগণ্য। বর্তমানে চীনা পণ্য দুনিয়ার সর্বত্র বিরাজমান। ১৯৬০ সালে বিশ্ব বাজারে চীনা পণ্যের অংশ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে এটা দাঁড়ায় ১৬.৩ শতাংশ। একই রকমভাবে ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম বিশ্ব বাণিজ্যে তাদের অংশ বাড়াবার চেষ্টা করছে। এককথায় ঘরে ও বাইরে উভয় দিক থেকে পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে নেই।
ট্রাম্প অনুসৃত শুল্কনীতি ও তার প্রতিক্রিয়া
এহেন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’। কিন্তু কীভাবে? পূর্বসুরী প্রেসিডেন্ট রেগান যেভাবে চেষ্টা করেছিলেন সেই পথে, না অন্য কোনও পথে? আগেই বলা হয়েছে প্রেসিডেন্ট রেগান ১৯৩০-এর দশকের ‘নিউ ডিল’কে বর্জন করে নয়া উদারবাদী মতাদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রের ভূমিকাকে সর্ব নিন্মস্তরে নামিয়ে এনেছিলেন। পরিবর্তে বাজার ব্যবস্থা, মুক্ত বাণিজ্যই ‘উন্নয়নের যাদুকাঠি’, এই ধারণার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে এই মডেল আমেরিকার কর্পোরেট সেক্টরকে আরও পরিপক্ক করেছে, আয় বৈষম্য বেড়েছে, জাতীয় ঋণ তিন–চারগুণ বেড়েছে।
দ্বিতীয় দফায় ট্রাম্প একটু ভিন্নপথে হাঁটছেন। ট্রাম্প লক্ষ্য করেন বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের দাপট তার বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মধ্যে (বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলতে বোঝায় আমদানির থেকে অনেক বেশি রপ্তানি)।তিনি চীনের এই বাণিজ্য নীতিকে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কেনটাইলিজম এর সমগোত্রীয় বলে ভাবলেন — যা বস্তুতপক্ষে ভুল। পুরনো মার্কেনটাইলিস্টরা শুধু বাণিজ্য করত, উৎপাদন করত না। অপরদিকে চীন উৎপাদন করে এবং সেই উৎপাদিত পণ্যই রপ্তানি করে। এটা দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সংহত করা ও বিকশিত করার মধ্যে দিয়ে যে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে তাকেই রপ্তানি করার উপর জোর দিয়েছে ব্রাজিল, মেক্সিকো, ভারত, ভিয়েতনাম প্রমুখ দেশগুলো।
ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে লুইগি প্যাসিনেত্তির নির্দেশিত প্রধান চারটি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চলকগুলির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে অবাধ বাণিজ্য থেকে সরে এসে, বাণিজ্য উদ্বৃত্তের জন্য কঠোর আমদানি নীতির উপর জোর দিয়েছে। এটা চমকপ্রদ এবং কর্পোরেট স্বার্থকে বিঘ্নিত করে না। কলিন ক্রোক একে ‘কর্পোরেট নিও লিবারালিজম’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
ট্রাম্পের নীতি হল কর্পোরেট নয়া উদারবাদ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের ভরকেন্দ্র হল আমদানির উপর উচ্চহারে শুল্ক বসানো। এর মধ্য দিকে আভ্যন্তরীন শিল্পকে শুল্ক-প্রাচীর দিয়ে উদ্দীপ্ত করা। বিপরীতে, মার্কিন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ধারাবাহিকভাবে উদ্ভাবন শক্তির বিকাশ ঘটানো যা ট্রাম্প উপেক্ষা করছেন। যাইহোক, মার্কিন দেশে রফতানিকারী দেশগুলো কারা এবং কী কী পণ্য মার্কিন দেশ আমদানি করছে? সাম্প্রতিক সময়ের তথ্যে দেখা যাচ্ছে আমেরিকার প্রধান ১০টি রফতানিকারী দেশ হচ্ছে মেক্সিকো, চীন, কানাডা, জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, আয়ারল্যান্ড, ভারত ও ইটালি। ২০২৪ সালে দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোট ৩২৭০ লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে আর এই পণ্যের মধ্যে মেক্সিকো, চীন ও কানাডার সম্মিলিত অংশ হল ৪০ শতাংশ। এই তিনটি দেশ থেকে যে সমস্ত পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করছে সেগুলি হল গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ফার্মাসিউটিক্যাল ও সকল ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য যার মধ্যে পড়ে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও সেমি-কনডাকটর।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই ধাঁচ লক্ষ্য করে ট্রাম্প প্রশাসন প্রাথমিক পর্বে সমস্ত ‘ট্রেডিং পার্টনার’–এর উপর সমভাবে শুল্কনীতির প্রস্তাব করে। তবে পরবর্তী পর্যায়ে তা প্রত্যাহার করে বিভিন্ন গোত্রের দেশের জন্য বিভিন্ন হারে আমদানি শুল্কনীতি প্রয়োগ করে। বিবিসির ভাষ্য অনুযায়ী, আমেরিকার ‘ট্রেডিং পার্টনার’ ৬৭টি দেশ। এই দেশগুলিকে তিনটি গোত্রে ভাগ করা যায়। প্রথম গোত্র হল কানাডা ও মেক্সিকো। এই দুটি দেশকে বর্তমানে নয়া শুল্কনীতির আওতায় আনা হয়নি। ৯০ দিন বাদে এই সব দেশের জন্য আমদানি শুল্কের হার নির্ধারণ করা হবে। দ্বিতীয় গোত্র হল ইউরোপীয় ইউনিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভিয়েতনাম, আয়ারল্যান্ড সহ অন্যান্য দেশ। প্রাথমিক পর্বে ঠিক ছিল, এই সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর ১১ শতাংশ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক বসানো হবে। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন সিদ্ধান্ত করে তারাও আমেরিকা থেকে আগত পণ্যের উপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, তখন
মার্কিন প্রশাসন সরে আসে। বর্তমানে এই সব দেশ থেকে আগত পণ্যের উপর মার্কিন প্রশাসন ১০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। এছাড়া বলা হয়েছে ৯০ দিন বাদে বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করা হবে। তৃতীয় গোত্রের দেশ হল চীন। বস্তুতপক্ষে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের উপর ২৪৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনা সরকার আমেরিকার পণ্যের উপর ১২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। এই যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যে উভয় দেশের বাণিজ্য ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬,৬০০ কোটি ডলার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এতে দুটি দেশ দুটি ভিন্ন অবস্থার মধ্যে পড়বে। আমেরিকার অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার কবলে পড়বে। বিপরীতে, চীনা অর্থনীতি তার ‘বেল্ট এবং রোড’ এর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য আরও প্রসারিত করতে চেষ্টা চালাবে।
ট্রাম্পের আমলে নয়া উদারবাদী মতাদর্শ এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। এই মতাদর্শের দুটো দিক। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। রাজনৈতিক দিক হল, কর্পোরেট স্বার্থ সুরক্ষিত করা আর অর্থনৈতিক দিক হল মুক্ত বাজার, অবাধ বাণিজ্য। ১৯৮০–এর দশকে প্রেসিডেন্ট রেগান এই উভয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেন। ২০২৪ এ ট্রাম্প এই ভারসাম্যের দিকে না হেঁটে অবাধ বাণিজ্যকে বিসর্জন দিয়ে কর্পোরেট স্বার্থকে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করেছেন। এতে আয় বৈষম্য বাড়বে, মার্কিন শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ আরও দুর্দশাগ্রস্ত হবেন, মার্কিন সমাজে আরও অস্থিরতা তৈরি হবে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.