বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[বিশ্ব]
পুঁজিবাদের জন্মলগ্ন থেকেই মেয়েরা পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রাঙ্গণে মজুর হিসাবে কাজ করেছে। যেসব দেশে পুঁজিবাদের প্রথম বিকাশ ঘটছিল সেখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও কম মজুরির কাজে সেসময়ে তাদের দেখা গেছে। তারা শুধু কল-কারখানাগুলিতেই নয়, কাজ করেছে খনিগহ্বরেও; ইংল্যাণ্ডে রেলপথের ব্যাপক প্রসারের আগে যখন কারখানার কাঁচামাল বা উৎপন্ন দ্রব্য নদীপথে গুণ টেনে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন ঘোড়া বা খচ্চরের বদলে সেকাজে অনেক সময়ে মেয়েদের ব্যবহার করা হতো। পুরুষদের জায়গায় মেয়েরা কাজ করলে তাদের কম মজুরিতে অধিক সময় খাটানো যেত, একারণেই এই পর্বে পুঁজিপতিদের কাছে মেয়েদের চাহিদা ছিল বেশি। একই সঙ্গে যাদের ঘরের কাজ ও শিশুপালনও করতে হতো তাদের শীঘ্রই শরীর ভেঙে পড়ত, আয়ু হতো খুবই সীমিত। তদুপরি টিঁকে থাকার এবং পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবার তাগিদে অল্পবয়সেই মালিকের যৌনশোষণের শিকারও হতে হতো তাদের অনেককে। শরীরকে ভাড়া খাটানো ছিল অবধারিত।
যে পারিবারিক জীবন ও ঘরকন্নার কাজের ক্ষেত্র বরাবরই মেয়েদের আসল জায়গা বলে চিহ্নিত হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে নারী-মজুরদের ক্ষেত্রে সেপরিসর সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। যেখানে নারী ও পুরুষ সন্তানসহ একত্রে থাকত, সেখানে অনেক সময়েই দেখা যেত স্ত্রী ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত বাড়ির বাইরে কাটাতে এবং বেকার স্বামী গৃহকর্মে ব্যাপৃত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু কার্ল মার্কস যেমন লক্ষ্য করেছিলেন, তার ফলে নারীমুক্তি ঘটছে বা পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটছে এমনটা বলা যাবে না। মেয়েটি আর গৃহস্থালির খাঁচায় আটকে নেই, সে সামাজিক উৎপাদনে অংশ নিচ্ছে বটে, কিন্তু গৃহশ্রম তাই বলে কোনও সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছে না। পুঁজিবাদ শুধু দ্বিগুণ শোষণ চাপিয়ে মেয়েটির শ্রমশক্তির এক বড়ো অংশকে কব্জা করে নিচ্ছে। ঘরে বা বাইরে কোথাও মজুর হিসাবে মেয়েটির ন্যায্য সম্মান নেই।
পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রশক্তি যতোই দৈহিক মেহনতের জায়গা নিয়েছে মালিকেরা মুনাফা বাড়ানোর স্বার্থেই ক্রমে মেয়েদের সে জায়গা থেকে বহিষ্কার করে পুরুষ-শ্রমিকদের কিছুটা বেশি মজুরিতে সেকাজে নিয়োগ করা শুরু করেছে। যদি বা সেখানে মেয়েরা কোথাও টিঁকে থাকতে পেরেছে সেটা অনিয়ন্ত্রিত অনিয়মিত কাজের বা তথাকথিত চুক্তিভিত্তিক ‘ঘরেলু’ কাজের অন্ধকার পরিসরে কোনঠাসা হয়ে। যেখানে মজুরি বা কাজের ঘন্টার কোনও ঠিকঠিকানা নেই, শোষণের কোনও সীমা নেই। গৃহশ্রম প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব বিষয়ে পরিণত হয়ে গৃহিণীর বেগার শ্রমের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থেকে গেছে। কোনও কোনও দেশে পুরুষ-শ্রমিকের মজুরিকে ‘ফ্যামিলি ওয়েজ’ বলার কায়দাটা আসলে গৃহশ্রমকে ঘরের আওতাতেই বেঁধে রাখার একটি পরোক্ষ উপায়। তাতে মেয়েদের সামাজিক উৎপাদনে অংশ নেবার অধিকার কার্যত নাকচ হয়ে যায়।
সমাজতান্ত্রিক চিন্তাই প্রথম একথাকে প্রতিষ্ঠা দিল যে মেয়েরা ঘরের ভিতরে যে পালনপোষণের কাজ করে সেটাও আসলে সমাজেরই কাজ; মালিকদের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর মতো উদ্বৃত্ত শ্রমিকবাহিনী বহাল রেখে পূর্বোক্তদের স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্যেই একাজকে পরিবারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক প্রতিশ্রুতি এটাই যে মেয়েদের সামাজিক উৎপাদনে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ মিলবে, একই সঙ্গে পুষ্টি, সুস্থতা বজায় রাখা, শুশ্রূষা, সন্তানপালনের যেকাজগুলি পরিবারের মধ্যে মেয়েদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে গণ্য ছিল, সমাজই তার পূর্ণ দায়িত্ব নেবে। সোভিয়েত রাশিয়ার শ্রমিকরাষ্ট্র কঠিন পরিস্থিতিতেও এই ব্যাপারে যে বিপুল অগ্রগতি ঘটিয়েছিল তারই ধাক্কায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পাশ্চাত্যে এবং সদ্য স্বাধীন হওয়া কিছু দেশের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মধ্যেই জায়গা পেয়েছিল ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে’র তত্ত্ব। সামাজিক উৎপাদনে মেয়েদের সমান অংশীদারির অধিকারও এইসব দেশে অন্তত সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। ভারত এই দেশগুলির একটি। তাই মে-দিবস যদি শ্রমিকের অধিকার জারি রাখার সূচক একটি দিন হয় তাহলে তার আকাশের অন্তত অর্ধেকটা মেয়েদের।
মে-দিবসের ইতিহাস এই নিবন্ধের বিষয় নয়, ১৮৮৯ সালের পর থেকে শিকাগোর হে-মার্কেটে মালিকপক্ষের অন্তর্ঘাতী ষড়যন্ত্রের ফলে যে শ্রমিক-নেতারা শহিদ হন, তাঁদের স্মরণ করে শ্রমিকশ্রেণী এই দিনটি পালন করে থাকেন এটা আমাদের সবারই জানা। এটা সমস্ত শ্রেণীর পক্ষেই এক সংহতিদিবস। তার মধ্যে যাঁরা সংগঠিত এবং যাঁরা অসংগঠিত, যাঁরা পুরুষ এবং যাঁরা নারী তাঁদের সবার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের বার্তা বহন করে এই দিনটি। কিন্তু আসলে এই লড়াইতে মেয়েরা যে খুব স্বচ্ছন্দেই স্থান পেয়ে যান এমনটা মনে করার কারণ নেই। ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস, বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস একথা স্পষ্ট করে দেয়।
সেখানে রোজা লাক্সেমবার্গ, ক্লারা জেটকিন বা আলেকজান্দ্রা কলোনতাইয়ের মতো কমিউনিস্ট নেত্রীদের জোরালো অবস্থান নিতে হয়েছিল কেবল নারীশ্রমিকদের শ্রেণীভিত্তিক দাবি নিয়েই নয়, ট্রেড ইউনিয়নে এবং বিভিন্ন শ্রম-আন্দোলনে মেয়েদের বিশিষ্ট সমস্যাগুলিকে যথাযথ জায়গা দেবার জন্যও। জার্মানিতে বিশ শতকের গোড়ায় যে প্রবল প্রভাবশালী সমাজতান্ত্রিক দল ও তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ছিল তার মধ্যেও এই মনোভাব ছিল যে মেয়েশ্রমিকদের উৎপাদনের ক্ষেত্রে আনা হয় শুধু মালিকের স্বার্থে শ্রমিক-আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করতেন, শ্রমিকদের সামগ্রিক দাবির পাশাপাশি নারীশ্রমিকদের দাবিগুলি তোলার চেষ্টা করলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জঙ্গি অভিমুখকে তা দুর্বল করে দেবে। এমনও কেউ কেউ বলতেন যে, মেয়েরা আনপড় এবং অবোধ, কাজেই ট্রেড ইউনিয়নে তারা এলেও পুরুষরাই পারবে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে।
অথচ এইসময়ে উৎপাদনের দ্রুত বিকাশের ফলে অনেক জায়গায় প্রচুর সংখ্যায় নারীরা কারখানার কাজ যোগ দিচ্ছিলেন, যদিও সেখানে কাজের পরিবেশ ছিল খুবই নিম্নমানের। মেয়েদের মধ্যে তা নিয়ে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। শ্রমিক-সংগঠনে এঁরা সচেতন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করলে যে আন্দোলন বহুগুণে শক্তিশালী হতে পারে এই বোধ ট্রেড ইউনিয়নের ভিতরে ছিল দুর্বল। এই মহিলানেত্রীরা আরো লক্ষ্য করেছিলেন যে যেখানে ট্রেড ইউনিয়নের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী নিজেদের অবস্থানকে জোরদার করতে পেরেছে সেখানে এইধরনের সংস্কার শ্রমিকদের মধ্যে আরো বেশি, যেমন জার্মানিতে। অন্যদিকে রাশিয়াতে তখন পর্যন্ত পুঁজিবাদী বিকাশ যথেষ্ট সীমিত ছিল এবং শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন ছিল দুর্বল। সেখানে কিন্তু যাঁরা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন পরিচালনা করতেন তাঁদের মনোভাব ছিল তুলনায় খোলামেলা। মেয়েদের সংগঠনে যুক্ত করার এবং তাঁদের নিজস্ব দাবিগুলিকে সংগ্রামের মধ্যে কিছুটা জায়গা করে দেবার সম্ভাবনা রাশিয়াতে ছিল অনেক বেশি। নাদেজ্দা ক্রুপস্কায়া, আলেকজান্দ্রা কলোনতাই, ইনেসা আরমান্দের মতো নেত্রীরা বিপ্লবের অনেক আগে থেকেই সেই কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে মেয়েদের সংগঠিত করে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকায় তাঁদের নিয়ে আসার এই জোরালো উদ্যোগ বৃথা যায়নি। ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের প্রথম পর্বের সূত্রপাত হয় যখন ৮ মার্চ তারিখে পিটার্সবার্গ শহরের বড়ো বড়ো কারখানা থেকে নারীশ্রমিকেরা দল বেঁধে বেরিয়ে আসেন রুটি এবং শান্তির দাবি নিয়ে, এবং অন্য কারখানাগুলির জানালা দিয়ে পাথর ছুঁড়ে পুরুষ সহকর্মীদের আহ্বান জানান রাস্তায় বেরিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক জার-জমানার অবসান ঘটানোর লড়াইয়ে যোগ দিতে। বিপ্লবের পরে সোভিয়েত রাশিয়াতে প্রথম নারীশ্রমিকদের সম্মেলনে লেনিন মুক্তকণ্ঠে বলেছিলেন, এই বিপ্লব মেয়েদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ব্যতীত সম্ভব হতো না।
বস্তুত, আগে ট্রেড ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে যে সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের কথা বলেছি পুরুষ-সংগঠকদের একটি বড়ো অংশের মধ্যে তার প্রভাব থাকলেও এমন নেতারও অভাব ছিল না যিনি স্বচ্ছ সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টির মোকাবিলা করতে তৈরি ছিলেন। লেনিন ছিলেন এই দৃষ্টিভঙ্গির অগ্রণী ধারক ও বাহক, যিনি বিশ শতকের গোড়া থেকেই এবিষয়ে পুরো খেয়াল রাখছিলেন, মেয়েদের আন্দোলনের অভিমুখ নির্ণয়ে নেত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তাঁর প্রতিমুহূর্তে, আলাপ-আলোচনা বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের কাজে মেয়েদের সংগঠিত করার ওপর বারবার জোর দিচ্ছিলেন। শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও সেখানে মেয়েদের ভূমিকাকে যথাযথ স্থান দিতে কোনও দ্বিধাগ্রস্ততায় ভোগেননি লেনিন ও তাঁর সহযোদ্ধারা। আবার এইসবের পরেও সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যে নারীমুক্তির লড়াই এক লম্বা লড়াই, শুধু রাষ্ট্রকাঠামো বদলে তা আনা যায়না, সেজন্য দরকার সমাজের আমূল পরিবর্তন, সেপ্রক্রিয়ায় ছেদ পড়তে দিলে চলবে না। আগ্রাসী নয়া উদারবাদের জমানায় যখন বহু বছরের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মেয়েদের অর্জিত অধিকারের সমস্তটাই গভীর সংকটে, তখন মে-দিবসে আমাদের এই ইতিহাসকে নতুন করে মনে করা প্রয়োজন।