বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[বিশ্ব]

[বিশ্ব]

নিশ্চল বিশ্ব অর্থনীতি এখন স্থায়ী সঙ্কটে

নিশ্চল বিশ্ব অর্থনীতি এখন স্থায়ী সঙ্কটে

প্রভাত পট্টনায়েক

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ অগাস্ট, ২০২২— এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে মার্কসবাদী বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের বক্তব্য ছিল, বৃদ্ধি অক্ষুন্ন রাখতে হলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির দরকার ‘বাইরের’বাজার এবং তিনি এটাও লক্ষ্য করেছিলেন যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রণোদনা যোগাত প্রাক–পুঁজিবাদী (ঔপনিবেশিক)বাজারগুলি। তিনি যে সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন পরে তার কয়েকটি সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর সামগ্রিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল একেবারে সঠিক। সেই সঠিকত্বের বিষয়টা আরও পরে দেখিয়েছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাইকেল কালেচকি। বিষয়টার যুক্তিশৃঙ্খল এরকম, ধরা যাক কোনও অর্থনীতির বৃদ্ধি একেবারে শূন্য। তাহলে সেই বাজারে নিট বিনিয়োগও হবে শূন্য। যেহেতু বৃদ্ধি নেই তাই বাজারও বাড়ছে না। একই কারণে বাজারে নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগেরও কোনও প্রণোদনা নেই। এর ফলে নিট বিনিয়োগ শূন্যই থেকে যাচ্ছে এবং তার জেরে অর্থনীতির চলচ্ছক্তিহীনতা স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে। যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতির গতি রুদ্ধ হয়, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেই নয়, ‘বাইরে থেকে’ও যদি পুঁজি বিনিয়োগের কোনও প্রণোদনা না আসে, তাহলে সেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি বদ্ধদশাতেই থেকে যাবে।
যদি আমরা ‘বাইরের বাজার’এর বিষয়টার গভীরে গিয়ে দেখি তাহলে তার সাহায্যে মেট্রোপলিটান পুঁজিবাদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের পর্বে দেখা গিয়েছিল দীর্ঘ একটা সময়জুড়ে অর্থনীতির তেজি ভাব, সেই তেজি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল ঔপনিবেশিক বাজারগুলির ওপর নির্ভর করেই। ঔপনিবেশিক বাজারের সম্ভাবনা নিঃশেষিত হওয়ায় এবং ব্রিটেনের এশিয়ার বাজার নতুন করে শিল্পসমৃদ্ধ হয়ে ওঠা জাপান খানিকটা দখল করায়, দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের পর্বে একটা দীর্ঘকালীন মহা মন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেসন দেখা দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলিতে আবার দেখা গেল সুনির্দিষ্ট পুঁজিবাদী ক্ষেত্রের ‘বাইরে’ও নতুন একটা বাজারের দরজা খুলে গেল, সেটা হল রাষ্ট্রীয় ব্যয়। এর ফলেও দেখা গেল অর্থনীতির একটা দীর্ঘকালীন তেজি ভাব। এটাকে বলা হয় ‘পুঁজিবাদের সোনালি যুগ’। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সোনালি যুগটা টিকে ছিল।
এই তেজি বাজারের সময়েই মেট্রোপলিটান ব্যাঙ্কগুলিতে এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চিত হয়েছিল বিশাল পরিমাণ লগ্নি পুঁজি। সঞ্চিত লগ্নি পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে হয়ে উঠল বিশ্বায়িত লগ্নি পুঁজি। লগ্নি পুঁজি চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সর্বদা বিরোধিতা করে। কারণ তাতে পুঁজির, বিশেষত লগ্নি পুঁজির সামাজিক বৈধতা খর্ব হয়। নতুন এই বিশ্বায়িত পুঁজি দেশগুলির ওপর চাপ দিতে থাকে যাতে তারা নয়া উদারবাদী নীতিসমূহ কার্যকর করে এবং ফিসক্যাল সক্রিয়তাকে এড়িয়ে চলে। সুতরাং, নয়া উদারবাদী পর্বে বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রকৃতই কোনও ‘বাইরের’প্রণোদনা থাকে না। এই কারণেই পুঁজিবাদের সোনালি যুগের তুলনায় এই পর্বে বৃদ্ধির হার তুলনায় ধীরগতি হয়ে পড়ে।
তাসত্ত্বেও, এমনকী নয়া উদারবাদের পর্বেও এক ধরনের ছদ্ম-প্রণোদনার অস্তিত্ব ছিল। এটা ছিল সম্পত্তির দাম ফুলেফেঁপে বুদবুদ তৈরি হওয়া। সম্পত্তির বাজারে বেপরোয়া ফাটকার মাধ্যমে কোনও কোনও সম্পত্তির দামকে ফুঁলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সবাই জানে যে এই দামটা একদিন ধ্বসে পড়বে। তবু অত্যাধিক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া দামেই লোকেরা সেই সম্পত্তি কিনেছিল। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, যতটা বেশি দামে তারা কিনছে তার চেয়েও বেশি দামে তারা ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে। এবং তা পারবে বাজারে ধ্বস নামার আগেই। অর্থাৎ ফাঁপানো বুদবুদ ফেটে যাওয়ার আগেই। যারা এই ধরনের সম্পত্তি কিনেছিল তাদের সম্পদ আপাতদৃষ্টিতে বেড়ে গেল এবং তারা নিজেরা বড়লোক হয়ে গেছে ধরে নিয়ে মনের আনন্দে সাধ্যের চেয়ে বেশি খরচ করতে শুরু করেছিল। ফলে বাজারে আর্থিক কাজকর্ম বাড়ল, বাড়ল কর্মসংস্থানও।
নিউ লিবারাল যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের দুটি বুদবুদ বিশ্ব অর্থনীতিতে তেজি ভাব এনেছিল। এর একটা হল ডট কম বুদবুদ। এই পর্বে ডট কম কোম্পানিগুলির শেয়ারের দাম হয় আকাশছোঁয়া। কিন্তু ২০০৮ সালে মার্কিন আবাসন বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পর এই ছদ্ম-প্রণোদনারও সমাপ্তি ঘটেছে। অতিমারির আগের দশকে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের যে কোনও দশকের হারের চেয়ে নীচু।
অতিমারিতে দারুনভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল অর্থনীতিতে। এর আগে থেকেই নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ‘বাইরের’প্রণোদনার উৎস শুকিয়ে গিয়েছিল। এর ফলে আর্থিক বৃদ্ধির গতি কমে তৈরি হয়েছিল কাঠামোগত সঙ্কট। সেই অন্তর্লীন সঙ্কটের ওপর চেপে বসল অতিমারি। এখন আর উপনিবেশের বাজারগুলি বাইরের প্রণোদনার ভূমিকা পালন করতে পারে না। নয়া উদারবাদের আওতায় রাষ্ট্রীয় ব্যয়কেও বিনিয়েগের প্রণোদনা হিসাবে কাজ করতে দেওয়া হয় না, কারণ ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বায়িত ফিনান্সের আধিপত্য। এমনকী সম্পত্তির দামের বুদবুদ, যা একদা ছদ্ম-প্রণোদনা হিসাবে কাজ করেছিল, তাও এখন অধরা। কারণ সম্পত্তির দামে ফাটকাবাজি নিয়ে বিপদের খাঁড়া এখনকার পরিস্থিতিতেও বিশেষভাবে মাথার ওপর ঝুলে রয়েছে। এবং এখন রুশ–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যপণের দাম রীতিমতো চড়া। এটাও আবার হয়েছে সর্বোপরি পণ্যের দাম নিয়ে ফাটকার কারণে। এগুলোই বিশ্ব অর্থনীতির দুর্ভাগ্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে এমনকী আইএমএফও গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ধরনের মন্দার সম্ভাবনার কথা বলতে শুরু করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও, অতিমারির প্রকোপ হ্রাস পেলেও নয়া উদারবাদের কাঠামোগত সঙ্কটের নিরসন হবে না। অথচ প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পক্ষে সওয়ালকারী অর্থনীতিবিদেরা এবিষয়ে নীরব রয়েছেন। তবে তাঁরা যে নীরব থাকবেনই সেকথা আগাম বলেই দেওয়া যায়। এখানে মূল বিষয়টা হল, কীভাবে এই ব্যবস্থা কাঠামোগত সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা যায়। দেখাই যাচ্ছে যে, নয়া উদারবাদী শাসনব্যবস্থার গণ্ডীকে ভেঙে ফেলতে না পারলে এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
ফিসক্যাল প্রণোদনার মাধ্যমে যদি নির্দিষ্টভাবে কোনও দেশ যদি বেকারি কমাতে যায় (অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে সুদের হার কমিয়ে অর্থ সংক্রান্ত প্রণোদনা দেওয়ার প্রভাব খুবই দুর্বল)তখন সেই প্রচেষ্টায় ফিনান্সের শক্তির দিক থেকে বাধাটা আসে দেশ থেকে পুঁজির পলায়ন ত্বরান্বিত করে। ফলে সেই দেশটিকে পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। কিন্তু সেটা করলে আবার ব্যালান্স অফ পেমেন্টস–এ চলতি হিসাবের খাতে ঘাটতি মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। এবং এর জেরে বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার দরকার হয়ে পড়বে। সংক্ষেপে বললে, সেই দেশটাকে ফের নয়া উদারবাদী শাসনব্যবস্থার খপ্পরে গিয়ে পড়তে হবে।
উন্নত অর্থনীতির একগুচ্ছ দেশ নিজেদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে ফিসক্যাল প্রণোদনা সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ তারা তালমিল রেখে রাজকোষ ঘাটতি বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়াতে পারে। তাহলে সেই সব দেশ থেকে পুঁজি পলায়নের প্রণোদনার শক্তি কম হবে। তবে এই পদক্ষেপের রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করবে ফিনান্স পুঁজি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক ধরনের মুদ্রাস্ফীতি ফের দেখা দেবে যা ছিল সত্তরের দশকের গোড়ার দিকের বৈশিষ্ট্য। যার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে এখনকার মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে।
এই জাতীয় মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলার উপায় হল তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ না করে প্রাথমিক পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো। নয়া উদারবাদ বিশ্বকে এমন একটা সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে যেখান থেকে বেরোনো সম্ভব একমাত্র নয়া উদারবাদের চাপানো গণ্ডিকে ভেঙে ফেলেই।
সৌজন্য: দ্য টেলিগ্রাফ, ৩ আগস্ট, ২০২২

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.