বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[বিশ্ব]

[বিশ্ব]

ব্রাজিলে লুলার জয় — কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

ব্রাজিলে লুলার জয় — কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

বসন্ত মুখোপাধ্যায়

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১ ডিসেম্বর, ২০২২— দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারোকে হারিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে ফের জয়ী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলা। প্রথম দফায় জিতলেও প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট লুলা পাননি। ফলে দ্বিতীয় দফায় ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয় তাঁকে। দ্বিতীয় দফার শুরু থেকেই ব্রাজিলের মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম প্রচার করতে শুরু করে, যেহেতু প্রথম দফায় লুলা জিততে পারেননি তার মানে তিনি হেরে গেছেন। এই প্রচার লাগাতার চলতে থাকে। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদলে বোলসোনারো হুমকি দেন, সামান্য ভোটের ব্যবধানে হারলে তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না। কারণ, তিনি কম ভোট পেয়েছেন মানে ভোটে জালিয়াতি হয়েছে। বোলসোনারোর সমর্থকেরা ইঙ্গিত দেন দরকারে বোলসোনারোর সমর্থনে সেনাবাহিনী রাস্তায় নামতে পারে। সরকারি নিয়ম ভেঙে দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে বোলসোনারো দেশের গরিব এলাকাগুলিতে কার্যত সরকারি টাকা দেদার বিলি করতে শুরু করেন। বিভিন্ন কারখানা মালিকেরা কারখানা ছুটি দিয়ে শ্রমিকদের নির্দেশ দেয় বোলসোনারোর মিছিলে যোগ দিতে এবং জানায় বোলসোনারোকে ভোট দিলে মিলবে নগদ তোফা। আর না দিলে চাকরি যাবে। ধর্মীয় গোষ্ঠী ও চার্চের নেতারা প্রচার করতে শুরু করেন, লুলা ক্ষমতায় এলে ব্রাজিলে এলজিবিটিদের অধিকার আইনসিদ্ধ হবে। ধর্মের দিকে থেকে রক্ষণশীল ব্রাজিলীয়দের লুলার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে এটা বেশ জোরালো প্রচার। তবে এত কিছুতেও লুলার জয় আটকানো যায়নি। বহু বছর ফের তিনি ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হয়েছেন। ব্রাজিল ফের বামপন্থী। যদিও বোলসোনারোর সঙ্গে লুলার জয়ের ব্যবধান অল্প। লুলা পেয়েছেন ৫০.৯ শতাংশ ভোট এবং বোলসোনারে ৪৯.১ শতাংশ ভোট। মানে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ব্রাজিল আড়াআড়ি ভাবে দু'ভাগ, তার আধখনা বাম, বাকি অর্ধেক দক্ষিণ। এমনকী দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালেও বিভাজন স্পষ্ট হয়। দেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের ১৩টি রাজ্যে জয়ী লুলা। দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের ১৪টি রাজ্যে জয়ী বোলসোনারো। এই সব তথ্যই দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী শাসককে নির্বাাচনে পরাজিত করতে কী বিপুল পরিশ্রম করতে হয়েছে ব্রাজিলের বামপন্থীদের।
ফলে ব্রাজিলের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি বোঝার দরকার বামপন্থার শক্তির উৎসকে। এবং নানা দিক থেকে ব্রাজিলের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণের দরকার রয়েছে।

কিছু এলাকা ধারাবাহিকভাবে বাম ঘাঁটি


ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুলার শক্তির উৎসগুলিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বের গরিব এলাকাগুলি হল মারানহাও (১.২%), পিয়াউই (০.৫%), বাহিয়া (৩.৮%), সিয়ারা(২.০%), রিও গ্র্যান্ডে ডো নোরতে (০.৯%), পারাইবা(০.৮%),পারনামবুকো (২.৩%) ,অ্যালাগস(০.৭%), এবং সেরগিপে(০.৬%)। এই এলাকাগুলি কতটা গরিব তা বোঝাতে বন্ধনীর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের মোট জিডিপিতে এই রাজ্যগুলির অংশ কত। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় এই সব পিছিয়ে পড়া রাজ্যে লুলার প্রাপ্ত ভোটের হার যথাক্রমে মারানহাও ৬৮.৮ %ও ৭১.৩ % , পিয়াউই ৭৪.৩% ও ৭৬.৯ %, বাহিয়া ৬৯.৭% ও ৭২.১%, সিয়ারা ৬৫.৯% ও ৭০.০%, রিও গ্র্যান্ডে ডে নোরতে ৬৩.০% ও ৬৫.১%, পারাইবা ৬৪.২% ও ৬৬.৬%, পারনামবুকো ৬৫.৩% ও ৬৬.৯%, অ্যালাগস ৫৬.৫% ও ৫৮.৭ %, এবং সেরগিপে ৬৩.৮% ও ৬৭.২%।
এখানে দুটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো।
এক, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দু দফাতেই দেশের এই ৯টি গরিব রাজ্যের ভোটারদের দুই তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সমর্থন পেয়েছেন লুলা। এবং দ্বিতীয় দফায় এই ৯টি প্রদেশের প্রত্যেকটিতে লুলার ভোট বেড়েছে। মানে দ্বিতীয় দফায় লুলাকে জেতাতে আরও বেশি সংখ্যায় গরিবেরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছেন। প্রথম দফায় ভোট দেননি এমন আরও গরিব মানুষ লুলার সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন।
দ্বিতীয়ত, দুদফায় ব্যাপক হারে এই ভোটদানে লুলার রাজনীতির প্রতি গরিব মানুষের কমিমেন্টের মাত্রাটা স্পষ্ট।
তৃতীয় একটি বিষয়ও আছে। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি পদে বাম প্রার্থী হাডাড দক্ষিণপন্থী প্রার্থী জাইর বোলসোনারোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে জিতেছিলেন বোলসোনারো। তবে ভোটর হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সেই বছরও বাম প্রার্থী হাডাড মারানহাওতে ৭৩.৭%, পিয়াউইয়ে ৭৭.১%, বাহিয়ায় ৭২.৭%, সিয়ারায় ৭১.১% , রিও গ্র্যান্ডে ডো নোরতেয় ৬৩.৪%, পারাইবায় ৬৫%, পারনামবুকোয় ৬৬.৫%, অ্যালাগসে ৫৯.৯%, এবং সেরগিপেতে ৬৭.৫% ভোট পেয়েছিলেন। এমনকী ২০১৪ সালে যখন লুলার অনুগামী দিলমা রুশেফ যখন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন তখনও এই সব প্রদেশগুলি প্রায় একই হারে ভোট দিয়েছিল তাঁকে। এর মানে লুলা প্রথম ও দ্বিতীয়বার ভোট জেতার পর ২০০৩ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গরিবদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যে সরকারি উদ্যোগে যে অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলি নিয়েছিলেন, গত দু দশক ধরে তার স্থায়ী ছাপ রয়ে গেছে এই সব রাজ্যগুলির সমাজ অর্থনীতিতে এবং গরিব মানুষের চেতনায়। বলা চলে সেই ২০০২ সাল থেকে টানা দুদশক ব্রাজিলের গরিব এই প্রদেশগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বামেদের পক্ষেই রয়েছেন। এটাই লুলার অন্যতম স্থায়ী সাফল্য। সেই সব উপকৃত গরিব পরিবারগুলিই এবার ভোটে দ্বিতীয় দফায় আরও বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়ে তাঁকে জিতিয়ে এনেছেন।

বোলসোনারোর ভোট


উল্টেদিকে এই সব প্রদেশগুলি থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় বোলসোনারোর ভোটের হার ছিল এরকম। মারানহাও ২৬.০ ও ২৮.৯ % , পিয়াউই ১৯.৯ ও ২৩.১ %, বাহিয়া ২৪.৩ ও ২৭.৯%, সিয়ারা ২৫.৪ ও ৩০.০%, রিও গ্র্যান্ডে ডে নোরতে ৩১.০ ও ৩৪.৯%, পারাইবা ২৯.৬ ও ৩৩.৪%, পারনামবুকো ২৯.৯ ও ৩৩.১%, অ্যালাগস ৩৬.০ ও ৪১.৩ %, এবং সেরগিপে ২৯.২ ও ৩২.৮%। এখানেও দেখা যাচ্ছে, বোলসোনারোর সমর্থকেরাও দ্বিতীয় দফার ভোটে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে সমর্থন করেছেন জেতানোর জন্য। ফলে দ্বিতীয় দফায় বোলসোনারোর ভোটও বেড়েছে। কিন্তু এই সব প্রদেশের ভোটদানের মূল ছাঁচটিকে বদলে দিতে কোনওভাবেই সক্ষম হয়নি দক্ষিণপন্থীরা। তাদের সমর্থন মোট ভোটের এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশেই আটকে রয়েছে। এটা ব্রাজিলের এই সব অঞ্চলে দক্ষিণপন্থার স্থায়ী পরাজয়ের অন্যতম নিদর্শন।

বোলসোনারোর শক্তি


ব্রাজিলের মধ্য ও দক্ষিণের রাজ্যগুলি বোলসোনারো বা দক্ষিণপন্থীদের ঘাঁটি। দক্ষিণের মোট ৫টি প্রদেশে বোলসোনরা দুই তৃতীয়াংশ বা তার বেশি ভোট পেয়েছেন যে সব প্রদেশে সেগুলিতে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় দফার প্রাপ্ত ভোট এরকম— মাটো গ্রোসো (৫৯.৮% এবং ৬৫.১%), অ্যাকরে (৭০.৩% এবং ৬২.৫%), রোনডোনিয়া (৬৪.৪ % এবং ৭০.৭%), রোরাইমা (৬৯.৬% এবং ৭৬.১%), সান্টা ক্যাটারিনি (৬২.২% এবং ৬৯.৩%)। এই পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে প্রথম চারটি জিডিপির অনুপাতে বিচার করলে, বিশেষত রোনডোনিয়া, অ্যাকরে এবং রোরাইমা খুবই পিছিয়ে পড়া। তবু এসব জায়গায় বোলসোনারো ভোট পেয়েছেন লুলার চেয়ে বেশি। তার মানে, ব্রাজিলের গরিব মানুষের একটা অংশের সমর্থন রয়েছে বোলসোনারোর দিকে। এই সমর্থন নানা ধরনের অনুদান পাওয়ার কারণে নাকি মতাদর্শের কারণে তা বিশ্লেষণ করার দরকার আছে।

শ্রমজীবী, মধ্যবিত্তের সমর্থন লুলার দিকে


এবার অন্য একটা হিসাব দেখা যাক।
ব্রাজিলের মোট জিডিপিতে সাও পাওলো রাজ্যের অংশ ৩২.১% (প্রায় এক তৃতীয়াংশ), রায়ো ডি জেনেইরো প্রদেশের অংশ ১১.৫%, মিনাস গেরাইস প্রদেশের অংশ ৯.২% এবং মাটো গ্রোসো ডো সুল প্রদেশের অংশ ৬.৩%। এই চারটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ প্রদেশের মোট জিডিপি ৫৯.১%, যা গোটা দেশের জিডিপির প্রায় দুই তৃতীয়াংশের কাছাকাছি।
এবার দেখা যাক এই প্রদেশগুলির ভোটের হার এবার কেমন ছিল। সাও পাওলো প্রদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় লুলা পেয়েছেন ৪০.৯ ও ৪৪.৮ শতাংশ ভোট। উল্টোদিকে বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৭.৭ ও ৫২.২ শতাংশ ভোট। রায়ো ডি জেনেইরো প্রদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় লুলার ভোট ৪০.৭ ও ৪৩.৫ শতাংশ, উল্টোদিকে বোলসোনারোর ভোট ৫১.১ ও ৫৬.৫ শতাংশ। মিনাস গেরাইস প্রদেশে দুদফায় লুলার ভোট ৪৮.৩ ও ৪৯.৮ শতাংশ, উল্টোদিকে বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৩.৬ ও ৫০.২ শতাংশ। মাটো গ্রোসো ডো সুল প্রদেশে লুলার ভোট ৩৯.০ ও ৪০.৫ শতাংশ। অন্যদিকে এই প্রদেশে বোলসোনারোর ভোট ৫২.৭ ও ৫৯.৫ শতাংশ। এর মানে দেশের চারটি সমৃদ্ধ প্রদেশে দ্বিতীয় দফায় ভোট বেড়েছে দুজনেরই। তবে তুলনায় বোলসোনারোর ভোট বেড়েছে বেশি। এর মানে অর্থনৈতিক ভাবে সম্পন্ন এই সব এলাকার ভোটাররা বোলসোনারোকে জেতাতে মরিয়া ছিলেন, যদিও লুলার সমর্থকেরাও ঘরে বসে থাকেননি। লক্ষ্য করার বিষয় হল, সাও পাওলোতে লুলা ও বোলসোনারোর ভোটের ব্যবধানের শতাংশ খুব একটা বেশি নয়। এর মানে এই সব এলাকার বাসিন্দা, যাদের মধ্যে রয়ে গেছেন বিপুল সংখ্যায় শ্রমিক ও শ্রমজীবীরা তারা ব্যাপক সংখ্যায় লুলাকে সমর্থন করেছেন। একই প্রবণতা রায়ো ডি জেনেরেইতেও দেখা যাচ্ছে। মিনাস গেরাইস প্রদেশ ব্রাজিলের ভোটের হাওয়া মোরগ। সাধারণত এই প্রদেশে প্রথম দফায় যিনি ভোটে এগিয়ে থাকবেন তিনিই জিতবেন — এটাই ব্রাজিলের ভোটের দস্তুর। দেখা যাচ্ছে এবার এই হাওয়া মোরগ প্রদেশ দু'দফাতেই বার্তা দিয়েছে জিতছেন লুলাই। তুলনায় মাটো গ্রোসো ডো সুল প্রদেশে লুলার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে বোলসোনারো।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্রাজিল আড়াআড়িভাবে বিভাজিত হয়ে গেছে। তবে বামপ্রার্থী শুধুই গরিবের ভোটে জেতেননি। দেশের সমৃদ্ধ এলাকাগুলিতেও ভোটের পাল্লা প্রায় সমান সমান। এর মানে শ্রমিকদের বিপুল অংশ এবং শহুরে মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ এবার সমর্থন করেছে লুলাকে। দক্ষিণপন্থার এই হাওয়ায় শহুরে মধ্যবিত্তের ভোট আদায় করাটা যে অত্যান্ত কঠিন কাজ, তা মানবেন সকলেই। অর্থাৎ বোলসোনারোর দক্ষিণপন্থী অর্থনীতি, রাজনীতি ও জনবিরোধী কোভিড নীতি ব্রাজিলকে আড়াআড়িভাবে বিভক্ত করেছে। এবং এই পরিস্থিতিতে অনুদানের রাজনীতিও দক্ষিণপন্থাকে জয়ী করতে পারেনি। এই প্রথম ব্রাজিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাময়িক নগদ অনুদানের বদলে স্থায়ী অধিকার পুনরুদ্ধারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এটাও ব্রাজিলের ভোটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং বামপন্থার প্রতি আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত। এভাবে ব্রাজিলের ভোটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নজরে আসবে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.