বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

আসামে নাগরিকত্ব হরণের দহনলিপি

আসামে নাগরিকত্ব হরণের দহনলিপি

কমল চক্রবর্তী

photo

লোকসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ১২ মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার সিএএ বিধি প্রকাশ করেছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সিএএ বিধি প্রকাশ করার পর বললেন, আসামের এনআরসি-র সময় এনআরসি ফর্ম পূরণ ও নথিপত্র জমা দেওয়ার সময় সবাই নিজেদেরকে ১৯৭১ সালের আগেই আসামে বসবাস করছেন বলেই জানিয়েছিলেন এবং সবাই ভারতীয়। কিন্ত বর্তমান বিধি তৈরির পর তারা আবেদন করলে তাদের বলতে হবে তারা আগে মিথ্যে কথা বলেছিল। এই মিথ্যে কথা বলার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায় করার সম্ভাবনা থাকবে। এদিকে উদ্বাস্তুরা সিএএ বিধির ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানেন না। না জানার মূল কারণ আসাম সরকার এই বিধি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কোনও উদ্যোগ নেয়নি। এছাড়াও বরাক উপত্যকার বিজেপি-আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মকর্তারা সিএএ আবেদন করার ক্ষেত্রে নীরবতা পালন করছেন।
ব্রহ্মপুত্র এলাকার অসমিয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো সিএএ-এর বিরোধিতা করেছিল ২০১৯ সালে। সেসময় আসাম ছিল উত্তাল। আসাম সরকার গৌহাটি শহরে বাধ্য হয়েছিল কারফিউ জারি করতে। কিন্তু এবার সিএএ বিধি প্রকাশ করার পর সেই জাতীয়তাবাদীদের বিরোধিতা অনেকটা লোক দেখানো। আসামবাসীর বর্তমান সিএএ বিধি নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই, কেননা এই বিধি কাউকেই নাগরিকত্ব দিতে পারবে না।
কাজেই সিএএ বিধি তৈরি করাই হয়েছে মূলত পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু হিন্দুদের জন্য! অথবা বলতে পারেন নথিপত্রহীন মানুষের জন্য! আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মধ্যে! যেমন আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল আসামে এনআরসি-র সময়।
২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিবাদ তীব্রতা পাচ্ছিল আসামে। দেশভাগের শিকার ছয়টি জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের সপক্ষে একটি মত গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছিল। সেই মতবিনিময়কে কেন্দ্র করে শিলচরে বেশ কয়েকজনের একটি ঘরোয়া বৈঠক হয়। কী করলে দেশভাগের বলি মানুষের সমস্যার মুক্তি পাওয়া যায়, সে নিয়ে একটি মঞ্চ গড়ার প্রস্তাব আসে। বিজেপি সরকার বিলটি পেশ করায় বিলের সমর্থকদের মধ্যে কিছু অসঙ্গতিও তখন থেকেই শুরু হল।
ইতিমধ্যে এনআরসি, নাগরিকত্ব বিল, দেশভাগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখিও হল। এই সময় বিষয়গুলিকে যার যার রাজনৈতিক অবস্থান মতো সাধারণের মধ্যে নিয়ে প্রচারের জন্য বিভিন্ন সংগঠনও তৈরি হল। সেই সময় নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দাবি নিয়েই আমরা “নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দাবি মঞ্চ” (Unconditional Citizenship Demand Forum) গড়ে তুলি। ২০১৮ সালের ৯ জুন মঞ্চের পক্ষ থেকে একটি নাগরিক সভার আয়োজন করা হয়েছিল শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ে।
একেই তো গরিব মানুষের কাছে নথি নেই, এরপরও দুই তিন নথিপত্র জমা দেওয়ার পর কয়েকবার তাদের ডাকা হচ্ছে ভেরিফিকেশনের জন্য। এতে মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে এক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দাবি মঞ্চ থেকে প্রস্তাব আসে শুধু বরাক উপত্যকা নয় আসামের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জোট বেঁধে একসঙ্গে লড়াইয়ের করতে হবে। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সকল জনগোষ্ঠী ভারতে আশ্রয় নিতে এসে থাকলে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হোক এবং জন্মসূত্রে ভারতীয় হোক সবার ক্ষেত্রেই।
শিলচর শহরে ছয়টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল আছে। নিয়ম মতো প্রতিটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে একজন করে সদস্য ও একজন করে সরকারি আইনজীবী থাকার কথা। তখন এক নম্বরেই সরকারি আইনজীবী ছিল, বাকিগুলোতে ছিল না। ঠিক একই ভাবে এক, তিন, চার, ছয় নম্বর ট্রাইব্যুনালে সদস্য ছিল কিন্তু বাকিগুলোতে ছিল না। সমস্যা হচ্ছিল, বিভিন্ন কোর্টে মামলার তারিখ পড়লে, দূর দূরান্ত থেকে আসা গরিব মানুষেরা এসে দেখতেন, হয় সদস্য আছে তো সরকারি আইনজীবী নেই। আবার উল্টোটাও হতো। এতে কেসগুলো দীর্ঘায়িত হতো। এনিয়ে শিলচরে Unconditional Citizenship Demand Forum (ইউসিডিএফ)-এর পক্ষ থেকে সরব হওয়ায় সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসে।
গত সেপ্টেম্বর মাসের ২০১৮ সালে আমরা ১২ ঘন্টার অনশনে বসেছিলাম। আমাদের সাতটি দাবি ছিল—
১) জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং দেশভাগের শিকার মানুষের নাগরিকত্ব প্রদান করতে হবে কোনও ধরনের শর্ত ছাড়াই।
২) ডি-ভোটার নোটিশ দেওয়া বন্ধ করা হোক। সক্রিয় হোক রাজ্য সরকার ও প্রশাসন। আদালতে ভারতীয় ঘোষণার পর পরই ভোটার তালিকায় ডি মুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।
৩) ডিটেনশন ক্যাম্পের অস্তিত্ব বিলোপ করা হোক।
৪) বিদেশি নোটিশ না দিয়ে এক তরফাভাবে বিদেশি ঘোষণা করা বন্ধ হোক।
৫) ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, ইন্দিরা আবাস, জব কার্ড ইত্যাদি বিভিন্ন সরকারি নথিকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৬) বিদেশি ট্রাইব্যুনালে পড়ে থাকা মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রাজ্য সরকারকে সদা সক্রিয় ও তৎপর থাকতে হবে। কারণ, মামলার নিস্পত্তির দেরি মানে সাধারণ গরিব মানুষের নিরন্তর হয়রানি।
বিভিন্ন সংগঠন গ্রামেগঞ্জে সভা করে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এর বিরুদ্ধে সরব হওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু জনগণ করবেটা কী সেই বিষয়ে কোনও সঠিক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে তাদের আন্দোলনও স্তিমিত হয়ে যায়। এদিকে আসামের এনআরসি ছুটদের কী হবে, কবে তারা রিজেকশন স্লিপ পাবে, সে নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তার জন্য সমস্ত সংগঠনের আন্দোলনও বন্ধ হয়ে যায়।
আমরা পড়ে রইলাম ডি-ভোটার ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা ব্যক্তিদের মুক্তির জন্য। এখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। তাদের মামলা হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। নতুন নতুন ডি-ভোটাররাও আসছে।
সামনে ভোট। ভোটের জন্য সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো এখন ব্যস্ত! ‘ডি ভোটার’রা’ এখনও বেঁচে আছে তাদের মতো করে।
অনেক ছক কষে সিএএ বিধি প্রকাশের সপ্তাহ পেরোনোর আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানান যে, সিএএ নথিহীনদের নাগরিকত্ব দেবে না – যাদের নথি নেই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। এটি নির্ভেজাল ধাপ্পা।
সিএএ বিধি জারির পর পশ্চিমবাংলার মতুয়ারা যখন প্রচণ্ড উত্তেজিত তখন জনতাকে ঠাণ্ডা করতে বিজেপি সাংসদ মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বললেন, নথি কিছু লাগবে না। নিজের ঘোষণা বা সেল্ফ ডিক্লেয়ারেশন দিলেই চলবে...। আরেক নির্ভেজাল ধাপ্পা। মাত্র সেদিন বিধি তৈরি করা হল আমলা নেতা আরএসএস যোগসূত্রে।
“চাই নিঃশর্ত নাগরিকত্ব। কোনও শর্ত আরোপ না করে নাগরিকত্ব। কোনও শর্ত নয়।” আমাদের এই দাবি ছিল সঠিক ও সময়োচিত ছিল। আমাদের সংগঠনের নামে তা উচ্চারিত। আমার প্রকাশিত বই “আসামে নাগরিকত্ব হরণের দহনলিপি”তে সারা দেশের নথিপত্রহীন মানুষের জন্য চেয়েছি নিঃশর্ত নাগরিকত্ব। আজ পশ্চিমবঙ্গে ও সারা দেশেই নিঃশর্ত নাগরিকত্বের দাবি উঠেছে।
কেন সিএএ বিধি আসামে অপ্রাসঙ্গিক?
১) আসামে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম এনআরসি থেকে বাদ পড়ে। তার মধ্যে ১৩ লক্ষ হিন্দুদের নাম বাদ পড়েছিল। আসামে এনআরসি-র ফর্ম পূরণ করার সময় প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সমস্ত নথিপত্র জমা দিয়েছেন। এই নথিপত্র আসাম সরকারের কাছে বা এনআরসি অথরিটির কাছে আছে। সেই সময়ে নিজের, মা-বাবা ও ঠাকুর্দা সহ সবার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার সময় লিখেছিলেন তারা ভারতীয় এবং ১৯৭১ সালের আগে আসামে এসেছিলেন।
২) যারা ডি-ভোটার তালিকায় আছেন তাদের নামে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল থেকে নোটিশ গেলে তারাও নিজেদের ভারতীয় ঘোষণা করে written statement কোর্টে জমা দেন এবং বলেন তারা ১৯৭১ সালের আগে থেকেই আসামে বসবাস করছেন।
৩) এছাড়াও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল থেকে “সন্দেহ ভাজন” ব্যক্তিদের নামে নোটিশ গেলে তারাও নিজেদের ভারতীয় দাবি করেন এবং written statement দেওয়ার সময় লিখেন তারা ১৯৭১ সালের আগে থেকেই আসামে বসবাস করছেন।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সিএএ-র বিধি প্রকাশ করার পর বললেন, “আসামে সিএএ পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক। মানুষ আসে না এখানে। আসামকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে দেশের অন্য রাজ্যে চলে যায়। এমনকী নতুন করে মুসলমান কোনও আসেনি আসামে। কারণ, এখানে ডি-ভোটার রয়েছে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। নাগরিক পঞ্জী রয়েছে আসামে।”
আসামবাসীর বর্তমান সিএএ বিধি নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই, কেননা এই বিধি কাউকেই নাগরিকত্ব দিতে পারবে না। সিএএ বিধি তৈরি-ই করা হয়েছে মূলত পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু হিন্দুদের জন্য! অথবা বলতে পারেন নথিপত্রহীন মানুষের জন্য! আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মধ্যে! যেমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল আসামে এনআরসি-র সময়।
এইসূত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতের বিশাল সংখ্যক সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রসঙ্গে কোনও উচ্চবাচ্য নেই সিএএ বিধিতে। এই হিমশীতল নীরবতা আসলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিভাবনা জারিত। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। q — লেখক আসামের শিলচরের নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.