বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

কৃষি অর্থনীতির সাম্প্রতিক সংকট ও উন্নয়নশীল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ভবিষ্যত

কৃষি অর্থনীতির সাম্প্রতিক সংকট ও উন্নয়নশীল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ভবিষ্যত

রানা মিত্র

photo

“…স্বাধীনতার শত্রু ও স্বেচ্ছাতন্ত্রের মিত্ররা জয়ী হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত কোনদিন জয়ী হবেও না…” – রামমোহন রায়, ১১ অগাস্ট, ১৮২১ (অস্ট্রিয়ার দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতাকামী নেপলস্ গুপ্তসমিতির প্রতি সহানুভূতিতে সিল্ক বাকিংহোমকে লেখা রামমোহন রায়ের পত্র)
ভারতের কৃষি অর্থনীতি ১৯৯১ সালের নয়া উদারবাদী পথ গ্রহণের পর থেকে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। নিঃসন্দেহে এই সমস্যা বিগত এক দশকে আরও ঘনীভূত হয়েছে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি, যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কিং, সমবায়, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, নাবার্ডের মত উন্নয়নশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপর কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গের মতো বেশ কিছু রাজ্য সরকারের লাগাতার আক্রমণের ফলে। এর ফলে লক্ষাধিক কৃষক, কৃষি মজুর নিরুপায় হয়ে নির্মম আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই সংখ্যাটা জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০২৩র মধ্যে ১,১২,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এর সঙ্গে দিন মজুরিতে যুক্ত শ্রমিকদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যানটি হল এই একই সময়কালে ৩,১২,২১৪। এই দুটি সংখ্যাকে যোগ করলে, মোদি রাজত্বের এক দশকের তথাকথিত ‘অমৃতকালে’ সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক, শোষিত মানুষের আত্মহত্যার মোট সংখ্যাটি দাঁড়াবে প্রায় ৪,২৫,০০০। মনে রাখতে হবে, এই পরিসংখ্যানে আবার তৃণমূলী রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গে কৃষক আত্মহত্যার তথ্য নেই। এই রাজ্যে একইভাবে বিগত ২০১১ সাল থেকে যে কৃষক আত্মহত্যার মিছিল চলমান, তার কোনও পরিসংখ্যান মমতা সরকার জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোকে জমা দেয় না। (আমরা জানি, এই ব্যাপারে প্রখ্যাত সাংবাদিক পি. সাইনাথ একাধিকবার উষ্মা প্রকাশ করেছেন)। কোনও গণতান্ত্রিক দেশে এই পরিমাণে প্রান্তিক মানুষের আত্মহত্যার মিছিল যে কোনও সরকারকে লজ্জা দেবে। কিন্তু আমাদের কী কেন্দ্র, কী রাজ্য, এ ব্যাপারে লজ্জাহীন। এই নিদারুণ বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ভারতের কৃষক সমাজ বিগত কয়েক বছরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে ঐক্যবদ্ধ প্রত্যাঘাত করতে শুরু করেছে সংযুক্ত কিসান মোর্চার নেতৃত্বে। যার ফলস্বরূপ তিনটি কালা কৃষি কানুন কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বাধ্য হলেও, কেন্দ্রীয় সরকার বিগত ২০২১ সালে সংযুক্ত কিসান মোর্চাকে আরও যে প্রতিশ্রুতিগুচ্ছ দিয়েছিল লিখিত আকারে, যেমন ফসলের দাম নির্ধারণে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ লাগু করা, কালা বিদ্যুৎ আইন প্রত্যাহার ইত্যাদি, তার থেকে সরে এসেছে। এর ফলে কৃষক আন্দোলন আবার যৌথ প্রত্যাঘাতের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। পাশে আছে শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য মেহনতী জনগণ, ছাত্র-যুবরাও, তাদেরও ক্ষেত্রভিত্তিক আশু দাবিদাওয়া নিয়ে। স্বাধীনতার পর সম্ভবত এত ব্যাপক মেহনতী জনগণের ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম দেখা যায়নি। এই আন্দোলনের ব্যাপক চেহারা খাদ্য, বস্ত্র, রোজগার, বাসস্থান, শিক্ষা, উৎপাদিত ফসল ও শ্রমের মূল্য (মজুরি) নির্ধারণের মত বুনিয়াদি বিষয়গুলোকে আবার জাতীয় রাজনীতির সামনে নিয়ে আসছে, ধর্মের অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতার মত জনগণের ঐক্যবিরোধী বিষয়গুলোকে গুরুতর চ্যালেঞ্জ জানিয়ে। তবে দেশি বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির স্নেহধন্য প্রতিক্রিয়ার শক্তিও প্রত্যাশিতভাবেই বসে নেই। তারাও প্রত্যাঘাতে মরিয়া। আশার কথা, মোদি ও মমতাদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও, ১৮তম লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি সংকট, ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, নির্বাচনী বণ্ডকে কেন্দ্র করে ও অন্যান্য দুর্নীতি প্রভৃতি জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলো আবার জাতীয় এবং রাজ্য রাজনীতির চর্চার কেন্দ্রে চলে আসছে। স্বভাবতই, কেন্দ্র ও রাজ্যের উভয় শাসক গোষ্ঠীই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক জিগির তুলে এই বুনিয়াদি বিষয়গুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে তৎপর।

                                  প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাঘাত – কেন্দ্রীয় অন্তবর্তীকালীন বাজেট, ২০২৪-২৫

কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতির এই গুরুতর সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রীয় সরকার তার সাম্প্রতিক বাজেটে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এই বাজেটে ২০২২-২৩ সালের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বাজেট বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৮১,০০০ কোটি টাকা। সারের ভর্তুকির ক্ষেত্রে ২০২২-২৩ সালের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৮৭,৩৩৯ কোটি টাকা। খাদ্যে ভরতুকি কমানো হয়েছে ৬৭,৫৫২ কোটি টাকা। স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ রূপায়ণে, (চাষের ক্ষেত্রের সমস্ত ব্যয় [C2] আর তার ওপর ন্যূনতম ৫০% ধরে ফসলের দাম নির্ধারণের ফর্মুলা, যা C2+ 50% নামে পরিচিত), কোনও বরাদ্দই এই বাজেটে করা হয়নি। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পে, যা সাধারণত ১০০ দিনের কাজ বলে পরিচিত, কেন্দ্রীয় সরকার গত দুই আর্থিক বছরে (২০২৩-২৪ এবং ২০০৪-২৫) বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ একই বজায় রাখছে, ৮৬,০০০ কোটি টাকা। বলা বাহুল্য, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির হার ধরলে, এই ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় কমানো হয়েছে। আরেক দিক দিয়ে দেখলে, এই বাজেট বরাদ্দ, মোট বাজেটের হিসেবে অতি নগণ্য, মাত্র ১.৩৩% (২০২৩-২৪), যা ২০১৪-১৫ সালের ১.৮৫% থেকে বেশ কিছুটা কমানো হয়েছে। আমরা যদি বিগত ৬ বছরের হিসাব মাথায় রাখি, তবে আমরা লক্ষ্য করব যে, নামেই এই প্রকল্প ১০০ দিন কাজের প্রকল্প বলা হচ্ছে, যা সংসদে ও সংসদের বাইরে, মূলত বামপন্থীদের চাপে প্রথম ইউপিএ সরকার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। এই প্রকল্পে বিগত ৬ বছরে কাজ দেওয়া হয়েছে গড়ে ৫০ দিনেরও কম। পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে, রাজ্য সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও কেন্দ্রের গরিব জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার মজুরি বকেয়া রেখেছে প্রায় ৭০০০ কোটি টাকা। এর ফল ভুগছে সাধারণ গরিব জনতা। অথচ, এই বাজেটকে প্রচারের আড়ম্বরে তুলে ধরা হচ্ছে কৃষক ও জনমুখী বলে। বরাদ্দ কমানোর মত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এমন একটা সময়ে যখন, সমস্ত বিরোধী সমালোচনাকে “সব ঝুট হ্যায়” বললেও, কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যানই বিপরীত সংকটের চেহারা তুলে ধরছে। লেবার ব্যুরোর গ্রাম ও শহরের প্রকৃত মজুরির উপর করা নিরীক্ষণ বা সার্ভে এক ভয়াবহ চিত্র প্রতিফলিত করছে। মে, ২০১৪ সাল (যখন কেন্দ্রে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়) থেকে গ্রামাঞ্চলে অকৃষি ক্ষেত্রে প্রকৃত মজুরি কমেছে গড়ে ০.৪% প্রতি বছর, সেখানে প্রকৃত কৃষি মজুরি প্রতি বছর বেড়েছে গড়ে মাত্র ০.৫% । ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ সময়কালে, গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত (regular) শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমেছে ০.৩% হারে প্রতি বছর। শহরাঞ্চলে এই প্রকৃত মজুরি কমার হার আরও ভয়াবহ, প্রায় ১.৭% প্রতি বছর। ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি কমেছে ০.৫% হারে প্রতি বছর। শহরাঞ্চলে প্রকৃত মজুরির হার একই আছে, অর্থাৎ, বাড়েইনি। সাম্প্রতিক নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির সময়ে ২০১৪ সাল থেকে প্রকৃত মজুরির এই প্রায় ধারাবাহিক হ্রাস, বা বন্ধ্যাত্ব, অর্থনীতিতে চাহিদার গুরুতর সংকট তৈরি করেছে। নোটবন্দি, কোভিড মহামারির সময়ে অপরিকল্পিত আকস্মিক লক ডাউন, জিএসটি–র ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগের ফলে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত শহর থেকে গ্রামে কৃষিক্ষেত্রে শ্রমশক্তির বিপরীতমুখী স্রোতের (reverse migration) পরিমাণ হল প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ। এই বিষয়ে, ২৪ মে থেকে ২ জুন, ২০২১, অর্থাৎ কোভিড মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়, নাবার্ডের অর্থনীতি বিশ্লেষণ বিভাগ এই শ্রমশক্তির বিপরীতমুখী স্রোতের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পত্র প্রকাশ করে। এতে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড রাজ্যগুলোকে বেছে নেওয়া হয়, কারণ এই রাজ্যগুলো থেকেই সর্বাধিক পরিযায়ী শ্রমিক ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যান কাজের সন্ধানে। এই বিষয়ে নাবার্ডের গবেষণা এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। শ্রমশক্তির এই বিপরীতমুখী স্রোত শুরু হওয়ার আগে মাত্র ১.৫% শ্রমিক মাসিক ৬০০০ টাকার কম রোজগার করতেন। এই স্রোত শুরু হওয়ার পর মাসিক ৬০০০ টাকা রোজগার করা শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩%। কোভিড মহামারি কালে যখন একদিকে ভ্যাক্সিন বেচে এবং বিজেপির নির্বাচনী বণ্ডে বিপুল পরিমাণ টাকা ঢেলে ( ৫২.৫ কোটি টাকা) ভ্যাক্সিন উৎপাদনের একচেটিয়া অধিকার হাসিল করছে পুনাওয়ালার সিরাম ইন্সটিটিউট, তখন পরিযায়ী শ্রমিকেরা নজিরবিহীন সংকটের আবর্তে তলিয়ে যাচ্ছেন। এরা হল মূলত ছোট-মাঝারি শিল্প থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক, যে শিল্পগুলো বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে, বিশেষ করে উপরের তিনটি সিদ্ধান্তের ফলে এখন ধুঁকছে। এই স্রোত কৃষিক্ষেত্রের উপর বাড়তি চাপ ভয়ানকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

                                                            কৃষি ঋণের সমস্যা

সময়ে ও সুলভে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ঋণের যোগান কৃষি উৎপাদনের এক আবশ্যিক শর্ত। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সারা দেশে মোট প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ঋণ বেড়েছে ১৪.৮%। ২০২২-২৩ সালের মার্চের শেষে এই প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ঋণ বিলি হয়েছে ২১.৭ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো বিলি করেছে ১৬.১ লক্ষ কোটি টাকা (মোট ঋণের ৭৪%), গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলো দিয়েছে ৩ লক্ষ কোটি টাকা ( মোট ঋণের ১৪%), কিন্তু সমবায় ব্যাঙ্কগুলো দিয়েছে মাত্র ২.৬ লক্ষ কোটি টাকা (মোট ঋণের ১২%)। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের যে, সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও, মমতা সরকারের নীতির কারণে, সমবায় ব্যাঙ্কগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় গরিব ও প্রান্তিক কৃষকরা কৃষি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন। কারণ সমবায় ব্যাঙ্কই ছিল এই শ্রেণীর কৃষকদের কাছে মূল আশ্রয়। নয়া উদারবাদী অর্থনীতি অনুসরণের বিষময় ফলস্বরূপ প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ বিলিতে সমবায় ব্যাঙ্কগুলোর অংশ ১৯৯২-৯৩ সালের মোট কৃষি ঋণের ৬২% থেকে কমে ২০২২-২৩ সালে মাত্র ১২% এ এসে ঠেকেছে। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক থেকে কৃষি ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ বেশ কিছু বছর ধরে বিলি হচ্ছে শহরাঞ্চলের শাখাগুলো থেকে। ২০১৫ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কৃষি ঋণ বিলি ক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম সংশোধন করে। এর আগে, সামাজিক অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের (priority sector) ঋণ বিলির ৪০% র পরিমাণের মধ্যে কৃষিঋণ ছিল ১৮%। কিন্তু, এই ১৮% কৃষি ঋণের মধ্যে সরাসরি বা প্রত্যক্ষ (direct) কৃষি ঋণ দিতে হতো ১৩.৫%। পরোক্ষ (indirect) কৃষিঋণ ছিল ৪.৫%। ২০১৫ সালের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সংশোধনীতে বলা হল, এই প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কৃষিঋণ বিলির আর কোনও ভাগ থাকবে না। এবার থেকে ব্যাঙ্কগুলোকে মোট ১৮% কৃষিঋণ দিলেই হবে। এর ফল দাঁড়াল এই যে, এর সুযোগ নিয়ে, বিশেষ করে, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো, বিপুল পরিমাণে কৃষিঋণ কর্পোরেটদের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, মজুতের জন্য পরিকাঠামো তৈরি ইত্যাদির জন্য দিতে শুরু করল (আগে যেটা শুধুমাত্র পরোক্ষ কৃষি ঋণ হিসেবে ৪.৫% র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হতো)। এর ফলে প্রকৃত কৃষি ঋণের আওতা থেকে ব্যাপক অংশের চাষিরা ছিটকে গিয়ে বেসরকারি মাইক্রোফিনান্স কোম্পানীর খপ্পরে গিয়ে পড়লেন, যারা চড়া সুদে চাষি, বিশেষ করে, গরিব মহিলাদের ঋণজালে জড়িয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত করছে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, অসম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে এখন এই সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চলেও এই মাইক্রো ফাইনান্স ঋণের কবলে পরে বহু গরিব, নিম্নবিত্ত পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

                                             কৃষি ঋণ মকুবের দাবি ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা

সংযুক্ত কিসান মোর্চা এই ভয়াবহ কৃষি সংকট মোকাবিলায় সঙ্গতভাবেই গরিব চাষিদের কৃষি ঋণ মকুবের জোরালো দাবি তুলেছে। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালের হিসেবে কৃষকদের মাথা পিছু ঋণের পরিমাণ ৭৪,১২১ টাকা। ২০১৩ সালের তুলনায় এই ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১.৬ গুণ। কোভিড মহামারি শুরুর আগে, সারা দেশে, ৯.৩ কোটি কৃষক ছিলেন ঋণগ্রস্ত। এর বড় অংশই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক চাষী, যারা নয়া উদারবাদী জমানায় ভয়ংকর কৃষি সংকটের কারণে ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে যাচ্ছেন। কোভিড মহামারির কারণে এই ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে অনুমান করাই যায়, যদিও এব্যাপারে কোন বিশ্বাসযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ঋণগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা ও ঋণগ্রস্ততার পরিমাণ একই আছে, অর্থাৎ, ৯.৩ কোটি কৃষক ও মাথাপিছু ঋণ ৭৪,১২১ টাকা, তাহলে কৃষকের মোট ঋণ দাঁড়ায়, ৬,৮৯,৩২৫ কোটি টাকা (৭৪১২১ টাকা গুণিতক ৯.৩ কোটি)। অর্থাৎ মোটামুটিভাবে, ৭ লক্ষ কোটি টাকা। এই টাকা কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাঙ্কগুলোকে দিলে, তারা সহজেই এই ঋণ মকুব করতে পারে। যখন কেন্দ্রীয় সরকার, মোদি জমানায়, ২০১৪ -২০২৩ এর মধ্যে ১৪.৫৬ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করতে পারে, যার ৫০% বেশি হল বৃহৎ পুঁজিপতিদের (সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক মকুবের পর যে ঋণ আদায়ের হার মাত্র ৯%), তখন দেশের কোটি, কোটি সাধারণ কৃষকদের এই পরিমাণ ঋণ মকুব যে জাতীয় স্বার্থে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু নয়া উদারবাদী জমানার এই হল দস্তুর — সেখানে তেলা মাথায় তেল দেওয়াই সরকারি নীতির মূল চালিকা শক্তি।

                                                            নাবার্ডের সমস্যা

কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সরবরাহ, পরিকল্পনা রচনা ইত্যাদির জন্য সুপরিচিত দেশের শীর্ষ উন্নয়নশীল ব্যাঙ্ক (Development Financial Institution, DFI) এখন নয়া উদারনীতির জমানায় সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এর মূল সমস্যাকে কৃষিক্ষেত্রের সামগ্রিক সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবলে ভুল করা হবে। ১৯৮২ সালে দেশের অন্যতম শীর্ষ উন্নয়নশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাবার্ডের জন্মই হয়েছিল কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের টেঁকসই (sustainable) উন্নয়ণের লক্ষ্যে, যার কেন্দ্রে থাকবেন দেশের কোটি, কোটি গরিব ও প্রান্তিক চাষি। নাবার্ড কাজ করবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি সম্প্রসারিত(extended) অংশ হিসেবেই। এই ছিল নাবার্ড তৈরির মূল উদ্দ্যেশ্য। একথা জাতির প্রতি উৎসর্গ করার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেছিলেন। বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নাবার্ড, বেশ কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও, এই মূল লক্ষ্য থেকে খুব একটা বিচ্যুত হয়নি। এর মূলে আছে সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতি ও অন্যান্যদের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই। কিন্তু, নয়া উদারবাদী জমানায় নাবার্ডের সুলভ তহবিলের যোগান ক্রমশ কমছে। এর ফল ভুগছেন দেশের কৃষকেরা। ২০২৩ সালের আর্থিক বছরের শেষে নাবার্ডের মোট ব্যালেন্স শিটের পরিমাণ ৮ লক্ষ কোটি টাকা হলেও, এর মধ্যে নাবার্ডের নিজস্ব তহবিল মাত্র ৮২,৮৬৮ কোটি টাকা(১০%)। বাকিটা ঋণ ভিত্তিক তহবিল, যার জন্য নাবার্ডকে বছরে মোটা টাকা সুদ গুণতে হয়। এর ফলে গরিব, প্রান্তিক চাষি, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা, সমবায়, গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে নাবার্ডের পুনর্বিনিয়োগ ঋণে (refinance) সুদের হার বাড়িয়ে দিতে হয়। এটা কাম্য নয়। নয়া উদারবাদী অর্থনীতি শুরুর আগে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে বছরে উদ্বৃত্তের অংশ হিসেবে বিনা সুদে নাবার্ডকে কৃষি ঋণের দীর্ঘমেয়াদী তহবিলে যোগান দেওয়া হতো বছরে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা (১৯৯১-৯২)। এটা পরের বছর থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের রাজকোষ ঘাটতি (fiscal deficit) মেটাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের উদ্বৃত্তের প্রায় সিংহ ভাগ তখন থেকেই সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে জমা পড়তে থাকে। এর ফলে শুধু নাবার্ড বঞ্চিত হয়, তা নয়। প্রকৃতপক্ষে বঞ্চনার শিকার হন গরিব চাষিরা যারা আরো সুলভে কৃষি ঋণ পেতে পারতেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে এই কাজ করা হচ্ছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইন, ১৯৩৪ এর ৪৬ এ ধারা ও নাবার্ড আইন, ১৯৮১ র ৪২ ও ৪৩ ধারাকে প্রায় লঙ্ঘন করে। সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতি সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ পেপারে দেখিয়েছে যে, যদি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উপরোক্ত আইন প্রকৃতপক্ষে মেনে নিয়ে বছরে তার কার্যকালীন উদ্বৃত্ত অংশ (operational surplus), যার পরিমাণ ২০২৩ সালের আর্থিক বছরের শেষে প্রায় ২.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা, থেকে বছরে মাত্র ৮-৯% নাবার্ডের দুটি দীর্ঘ মেয়াদী কৃষি বিনিয়োগ তহবিলে যোগান দিত (যেটিই ছিল ১৯৯২ পর্যন্ত এই দুটি তহবিলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের যোগানের হার), তাহলে নাবার্ডের হাতে আসত বছরে প্রায় ১৮,৮০০ কোটি থেকে ২১,১৫০ কোটি টাকার সুলভ তহবিলের যোগান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আইন অনুসারে নাবার্ড পুনর্বিনিয়োগ করতে বাধ্য থাকত কৃষি ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের পিছনে। এর ফলে ভারতের কৃষি ক্ষেত্রের একটি মূল সমস্যা, দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের অপ্রতুল যোগান, যা মূলত দেশের সমবায় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, কৃষিক্ষেত্রের পুঁজি তৈরিতে (capital formation) করা হয়ে থাকে, তার কিছুটা হলেও সুরাহা হতে পারত। সঙ্গে চাঙ্গা হতে পারত দেশের কৃষি সমবায় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতি এই প্রশ্নে সরব। তারা এই বিষয়ে বারে বারে নাবার্ড, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে। কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকার অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের মতই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছ থেকে বিগত এক দশকে মোট ৫,৭৪,৯৭৬ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত হিসেবে নিয়ে নিয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাতে থাকা বা নাবার্ডের মত সংস্থায় আইন মোতাবেক যোগান দেওয়ার প্রয়োজন ছিল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে।

                                                            মোদ্দা কথা

এই সমস্ত বিষয়ে দেশের কৃষি, ব্যাঙ্ক কর্মচারী, সমবায়, ট্রেড ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আরও সরব হওয়ার সুযোগ রয়েছে নির্দিষ্ট বিকল্প পথ বারেবারে তুলে ধরে। বর্তমান ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার শক্তির শুধু নেতিবাচক সমালোচনাই যথেষ্ট নয়। অষ্টাদশ সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষ্যে, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তার ভিত্তিতে বিকল্প তুলে ধরাও লড়াইয়ের অঙ্গ হিসেবেই কার্যকর করতে হবে বলে মনে হয়। আশার কথা, লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীরা যে বিকল্প কর্মসূচি–ভিত্তিক ইস্তাহার প্রকাশ করেছে তাতে এই বিকল্পের দিশা অনেকাংশে তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। কর্পোরেট পুঁজি নব্য উদারবাদী নীতির সংকট থেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে নয়া ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। এই ভয়াবহ বিনাশের হাত থেকে বাঁচতে হলে বাম, প্রগতিশীল বিকল্প গঠন তাই এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে সারা দেশে এবং পশ্চিমবাংলায় বাম, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে নির্বাচনী ময়দানে শক্তিশালী করতে হবে। q
— লেখক সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.