বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
পারসা কয়লা খনিতে জবরদস্তি বেআইনি গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত গ্রামবাসীদের উপর লাঠিচার্জ অত্যন্ত অমানবিক, সাই সরকার আদানির নির্দেশে কাজ করছে। ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলন জারি করা বিবৃতির অংশ এটা। রায়পুর, ১৭.১০.২০২৪।
হাসদেও জঙ্গলে জবরদস্তি একটি নতুন খনি, পারসা কয়লা খনি, খুলতে নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের উপর লাঠিচার্জ এবং দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা করে ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলন। খনির জন্য জঙ্গল কাটার ছাড়পত্র জাল নথির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলন খনিটি চালু করার কাজ অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানিয়েছে। ছত্তিশগড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ জমি এখনও ঘন বনাঞ্চল। এই রাজ্যেই হাসদেও অরণ্য ভারতের অন্যতম বৃহৎ একটানা বনভূমি অঞ্চল। এই বনাঞ্চল বাঘ ও হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এই বনাঞ্চলে অনেক বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস - এশিয়ান হাতি, চিতা, শ্লথ ভালুক, ধূসর নেকড়ে এবং ডোরাকাটা হায়েনা। পাশাপাশি ৯২টি প্রজাতির পাখি এবং ১৬৭টি বিরল ও ঔষধি উদ্ভিদও পাওয়া যায় এই বনাঞ্চলে। হাসদেও বনাঞ্চল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ধারণ করে উষ্ণায়ন কমায়। এই বনাঞ্চল হাসদেও নদীর জলধারণ এলাকা, যে নদী মহানদীতে প্রবাহিত হয় এবং হাসদেও বাঁগো জলাধারের জলের উৎস। জলাধারটি থেকে প্রায় ৭,৪১,০০০ একর কৃষিজমিতে সেচ হয়। এখান থেকে বিলাসপুর এবং কোরবার মতো শহরে পানীয় জল সরবারাহ হয়। হাসদেও বনাঞ্চল অত্যন্ত প্রাচীন এবং অবিকৃত। একে মধ্য ভারতের ফুসফুস বলা হয়। এখানকার আদিবাসীরা বহু শতাব্দী ধরে এই বনগুলিকে রক্ষা করেছে।
হাসদেও অরণ্যে প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন টন কয়লার মজুত রয়েছে, যা ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কয়লা ভান্ডার। ২০১০ সালে কংগ্রেস সরকারের শাসনকালে দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের কারণে হাসদেও বনগুলিকে খনির জন্য “নো-গো” এলাকা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ঘোষণাটি আইনে রূপান্তরিত হয়নি। ফলে হাসদেও ও এরকম অন্যান্য অরণ্যগুলো খনিজ কয়লার লোভে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের মতো হাসদেও অরণ্যকে তুলে দিয়েছে কর্পোরেট সংস্থার হাতে। ২০১২ সালে, রাজ্য সরকার ১,৮৯৮ হেক্টর জমি কয়লাখনির জন্য লিজ দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ গৌতম আদানির আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয় এবং বনের মধ্যে পাঁচটি কয়লাখনির অনুমতি দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে ১,৮৮২ একর বন বিশাল কয়লা খাদে পরিণত হয়েছে।
২০১৫ সালে, জনসাধারণের ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও হাসদেও বনাঞ্চল ধ্বংস করে তিনটি কয়লা ব্লক আদানি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখান থেকে রাজস্থানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির জন্য কয়লা পাঠানো হয়।
২০২১ সালে, প্রায় ৩৫০ জন আদিবাসী এবং কৃষক ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা করে ছত্তিসগড়ের রাজধানী রায়পুরে পৌঁছান। সেখানে তারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খনি প্রকল্প বাতিলের দাবি জানান। কিন্তু সুরাহা মেলেনি। ক্রমাগত এবং ব্যাপক গণআন্দোলনের কারণে এখনও পর্যন্ত একটি মাত্র কয়লাখনি চালু হয়েছে - পারসা ইস্ট কেন্তে বেসিন (PEKB)।
হরিহরপুর, সালহি, ফতেপুরের গ্রামসভা এখনও বন ছাড়পত্রের জন্য সম্মতি দেয়নি। গ্রামসভাগুলিতে খনির বিরোধিতাই করা হয়েছে।
কিন্তু ২০১৮ সালে, কোম্পানি সরপঞ্চ (গ্রামের প্রধান) ও সচিবের উপর চাপ প্রয়োগ করে এবং ভুয়ো নথি তৈরি করে অনুমোদন নিয়েছে। সমস্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও তাই ঘটছে উল্টোটাই।
জিডিপি কেন্দ্রিক উন্নয়ন সমুদ্রকে করেছে বিষবৎ, ভূমিকে করেছে ধর্ষিতা, পৃথিবীর আকাশকে ছেয়েছে গ্রিনহাউজ গ্যাসে, সমুদ্রের জলস্তরকে বাড়িয়েছে, ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে দিয়েছে নামিয়ে। আজ পৃথিবীতে উৎপাদন করতে গেলেই, পৃথিবী বসবাসের আরও বেশি অযোগ্য হয়ে উঠছে। অচিরেই বহু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মানুষ প্রজাতিটির জন্য এই বিপন্নতা সর্বাধিক, এমনই মত দিচ্ছেন বিজ্ঞানীদের এক বড় অংশ। সর্বস্তরের সংবেদনশীল মানুষ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠানও চিন্তিত। ঘনঘন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। লক্ষ্য, উৎপাদনে লাগাম না টেনে বিকল্প পথের অনুসন্ধান। এরকমই এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের নাম সিওপি। কনফারেন্স অফ পার্টিজ । ২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে কীভাবে কার্বন নিঃসরণ ‘শূন্যে’ নামানো যায় তার পরিকল্পনা গ্রহণ ও শপথ নেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্বের ২০০টি দেশ এই জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে (১৮৯০ ভিত্তিবর্ষ ধরে) ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তা বেড়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে পৃথিবীতে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। এসব কথা ভেবেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিনিময় ও শপথ গ্রহণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কনফারেন্স অফ পর্টিজ (UNCCC) আহ্বান করে যাতে এই নীল গ্রহ থেকে মানুষ নামক প্রজাতিটি অবিলম্বে বিলুপ্ত না হয়ে যায়। ২০৩০কে লক্ষ্য ধরে বিভিন্ন দেশ পরিবেশমুখি সিদ্ধান্ত নেবে এই আশা নিয়ে দেশগুলি মুখোমুখি বসে। যদিও লক্ষ্য পূরণে তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। দুবাইয়ে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৮তম অধিবেশন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধানত কয়লার ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত ও চীন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তারা কয়লা ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করার বদলে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়েছে। ২০৩০ নয় ‘জিরো এমিশন’ অর্থাৎ গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য ২০৭০কে লক্ষ্যবর্ষ নির্ধারণ করেছে ভারত। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতে এই মুহূর্তে ৪০০টির বেশি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ দেশে উৎপন্ন বিদ্যুতের শতকরা ৭৫ ভাগই কয়লা-বিদ্যুৎ।
পরিবেশগতভাবে হাসদেও বনাঞ্চল বাতাসের কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ করে। এছাড়াও ছত্তিসগড়ের জলচক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই হাসদেও অরণ্য। বহু প্রজন্ম ধরে গোঁড়, উরাঁও, এবং অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় এই বনের ওপর নির্ভরশীল। বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং কৃষির মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করে বনকে বাঁচিয়ে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংকলিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ১৫ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল ভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ লক্ষ হেক্টরের বেশি খননকাজের জন্য এবং বাকি অংশ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, বাঁধ ও অন্যান্য প্রকল্পের জন্য।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে, ভারত সরকার ছত্তিশগড়ের ১,৭০,০০০ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত হাসদেও বনাঞ্চলের একটি বড় অংশে আদানি গোষ্ঠীকে খোলা মুখ কয়লা খনির জন্য পর্যায়-১ ছাড়পত্র দেয়। এখন পর্যায়-২ এর কাজের জন্য উদ্যোগ শুরু হয়েছে। জ্বালানী কয়লা, বিদ্যুতের সঙ্গে তৈরি করবে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড। পৃথিবী আরো উষ্ণ হবে। পরিবর্তিত হবে জলবায়ু। বিপন্ন হবে মানুষ ও না-মানুষের দল। লক্ষাধিক গাছ কাটা পড়ায় এই বিপন্নতা বাড়বে বহুগুণ। কার্বন প্রতিরোধী প্রাচীর নষ্ট হবে। নষ্ট হবে প্রাচীন বনের মহার্ঘ জীববৈচিত্র্য ও অমূল্য বাস্তুতন্ত্র। বনকে প্রতিস্থাপনের আছিলায় হয়ত আর্থিক কর্মকান্ড বাড়বে কিছুটা যা আবার প্রকৃতিকে পণ্যরূপ দেবে ও প্রকৃতি-পুঁজির (নেচার ক্যাপিটাল) উদ্ভব হবে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্য একটি সমালোচনা পুঁজিবাদের পরিবেশ ধ্বংস সাধনের জন্য অবশ্যই বরাদ্দ যা ‘ফিকটিশাস পুঁজি’ নামে চিহ্নিত। আন্তর্জাতিকভাবে, ফিকটিশাস পুঁজির পরিমাণ কয়েকশ ট্রিলিয়ন ডলার বলে মনে করা হয়, বিশেষ করে গ্লোবাল ডেরিভেটিভস মার্কেটে। ২০২২ সালের একটি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডেরিভেটিভস মার্কেটের মোট পরিমাণ প্রায় ৬০০-৭০০ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিল, যা প্রকৃত উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পুঁজির তুলনায় অনেক গুণ বেশি। এর বিপরীতে, সারা বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার বা তার কাছাকাছি, যা বাস্তব পণ্য ও সেবা উৎপাদনের একটি সূচক।
এই বিশাল ফিকটিশাস পুঁজির পরিমাণ বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফিকটিশাস ক্যাপিটাল এমন প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যেখানে দ্রুত মুনাফা করা সম্ভব, যেমন খনন, নির্মাণ বা কৃষিজমি দখল করে শিল্পায়ন। এ ধরনের বিনিয়োগ দ্রুত পরিবেশগত সম্পদ যেমন বনভূমি, নদী, পাহাড়, এবং কৃষিজমিকে দখল নিয়ে আর্থিক মুনাফার স্তরে নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক সম্পদগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়, যা পরিবেশের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। দুনিয়াজুড়ে পরিবেশ ধ্বংস তথা সভ্যতার সংকট তাই পুঁজিবাদেরই ঔরসজাত। ফিকটিশাস পুঁজিকে ‘রিয়েল’ পুঁজিতে পরিবর্তিত করে পুঁজির সংকটকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা। এখানেও তার প্রকাশ রয়েছে। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারিতে অগ্রণী স্নেহধন্য কর্পোরেট সংস্থাটি ইতিমধ্যেই কুখ্যাত।
বহু প্রাণের বলিদানে স্বাস্থ্যবান হবে পুঁজিতন্ত্র। পরিবেশ ধ্বংস হবে, মরবে মানুষ ও না-মানুষের দল।
বনভূমি আজ প্রবল উত্তপ্ত। স্ফুলিঙ্গ থেকে প্রতিরোধ তৈরি কেবল সময়ের অপেক্ষা।