বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
২০২৪ এর ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে সংযুক্ত কিসান মোর্চার ডাকে সারা দেশের কৃষকরা ট্রাক্টর মিছিল সংগঠিত করেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে গ্রামীণ ভারত ধর্মঘটে সামিল হন লক্ষ লক্ষ কৃষক ক্ষেতমজুর। গ্রামীণ ভারত ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলির ডাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু শিল্প-কারখানার শ্রমিকরাও ওই দিন ধর্মঘটে সামিল হন। ১৩ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবাংলার শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুররা তাদের বেঁচে থাকার দাবিগুলি নিয়ে জেলায় আইন অমান্য আন্দোলন সংগঠিত করে। এই আইন অমান্য আন্দোলনে সাম্প্রতিককালে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ বামপন্থীদের ডাকে সামিল হন। রাজ্য সরকারের পুলিশ এই আইন অমান্য আন্দোলন দমন করতে আক্রমণ নামিয়ে আনে। সেই আক্রমণে প্রাণ হারান মুর্শিদাবাদের আনারুল ইসলাম।
দেশের নানা প্রান্তে ও পশ্চিমবাংলায় শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক নারী শক্তির সক্রিয় অংশ গ্রহণ আন্দোলনগুলিকে শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি সন্দেশখালিতে জমি লুঠ, চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে দিয়ে অবৈধ মাছের ভেড়ি গড়ে তোলা, ১০০ দিনের কাজের মজুরি সহ সরকারি প্রকল্পের টাকা লুঠ, নারীদের প্রতি অসম্মানের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত জনরোষের বহিঃপ্রকাশে নারীশক্তির উত্থান লক্ষ্যণীয়।
২০২০-২১ সালে ১৩ মাস ব্যাপী রাজধানী দিল্লির প্রান্তে কৃষকদের বিক্ষোভের ফলে শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। ব্যাপক দমন পীড়ন, প্রলোভন, অপপ্রচার ছড়িয়েও কৃষকদেরকে আন্দোলনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি সরকার। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য করার বিষয় একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারপরে আরো দুটো বছর পার হয়ে গেছে। বেইমান সরকার তাদের লিখিত প্রতিশ্রুতি কার্যকরি করেনি। বরং প্রত্যাহার করে নেওয়া তিনটি কৃষি আইনের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী নানা ছলনায় কৃষি ও কৃষকের ঘামে ঝরা ফসলের উপর কর্পোরেট লুটের প্রয়াস সমানে চলছে। সরকারের বেইমানীর বিরুদ্ধে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষকের ঋণ মুক্তি সহ বিভিন্ন দাবিতে ২৬ জানুয়ারি ও ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী কর্মসূচি সংগঠিত করেছে সংযুক্ত কিসান মোর্চা।
পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষক সংগঠনগুলির দিল্লি অভিযান রুখতে সরকার অভূতপূর্ব দমনের রাস্তা নিয়েছে, দিল্লি থেকে বহুদূরে পাঞ্জাব হরিয়ানার সীমান্তে তাদেরকে ব্যারিকেডে আটকে দেওয়া হয়েছে। কংক্রিটের প্রাচীর গড়ে তোলা হয়েছে। ড্রোন ব্যবহার করে কৃষকদেরকে পাহারা দেওয়া হচ্ছে — টিয়ার গ্যাস চালানো হচ্ছে। পুলিশের বর্বর আক্রমণে নিহত হয়েছেন তরুণ কৃষক শুভকরণ সিং। সংযুক্ত কিষান মোর্চা কৃষক এই হত্যা ও কৃষক আন্দোলনের উপর বর্বর হামলার তীব্র ধিক্কার জানিয়ে এই আন্দোলনে সামিল হয়েছে।
মোদি সরকার কৃষি বিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথনকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করেছেন। কিন্তু কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মতো ফসলের লাভজনক দাম দিতে অস্বীকার করে যাচ্ছে।
ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করার সরকারি কমিটিতে প্রত্যাহৃত কৃষি আইনের সমর্থকরাই ছিল বিপুল সংখ্যায়। কৃষক সংগঠনগুলির প্রতিনিধি ছিল মাত্র তিনজন। সে কারণে কৃষক সংগঠনগুলি ওই কমিটি বয়কট করে। সরকার কৃষক সংগঠনগুলির দাবি মতো ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ দাম দিতে ক্রমাগত অস্বীকার করে যাচ্ছে।
সরকার জানাচ্ছে, কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি পণ্য কিনে মজুত করার মতো গোডাউন নেই। তাহলে সারাদেশে উপযুক্ত সংখ্যক গোডাউন তৈরি করা হচ্ছে না কেন। সরকারি গোডাউনগুলি ব্যবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে কেন। সরকার বলছে নূন্যতম সহায়ক মূল্যে কৃষকের ফসল কেনার জন্য, গোডাউন তৈরি করার জন্য, কৃষি ঋণ মুকুবের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকারি কোষাগারে নেই।
কৃষি ঋণ মুকুবের প্রশ্নে সরকারের বক্তব্য: এর জন্য প্রয়োজন ১০ লক্ষ কোটি টাকা। সরকারের নাকি সেই অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। অথচ সরকার বড় বড় কর্পোরেটদের ২৫ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দিয়েছে। দেশের কৃষি এবং অন্তত ৭৫ কোটি কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের বাঁচাতে ১০ লক্ষ কোটি টাকা কেন বরাদ্দ করা যাবে না! কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের ঋণ মুকুব করলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয় না, কর্মসংস্থান হয় না। কিন্তু কৃষকের হাতে ফসলের লাভজনক দাম আসলে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। তাদের ভোগ্যপণ্য কেনার সামর্থ্য বাড়ে। দেশের অর্থনীতি ও বাজারে প্রাণসঞ্চার হয়। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান অরুন্ধতী ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছিলেন, কৃষি ঋণ মুকুব করলে কৃষকদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু অল্প সংখ্যক কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের ঋণ মুকুব করেলে তাদের অভ্যাস খারাপ হয় না!
এই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন আর্থিক সংস্থাগুলি জানে কাদের স্বার্থে কাজ করতে হবে, কাদের স্বার্থে কথা বলতে হবে। কাদের জন্য তাদের মন কাঁদে বুঝতে অসুবিধা হয় না। কর্পোরেট পুঁজির মুনাফার স্বার্থে সরকার খনি জল জঙ্গল জমি অধিগ্রহণ করছে। গরিব মানুষের জীবন-জীবিকা, বাসস্থান, পরিবেশ রক্ষা কোনও কিছুই তাদের বিবেচ্য নয়। উচ্ছেদ হওয়া মানুষের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে সরকার ও কর্পোরেটদের বেজায় আপত্তি। সরকার ও কর্পোরেট পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে কৃষকরা দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু আমাদের দেশে নয় সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে চলছে শ্রমিক কৃষকের একের পর এক আন্দোলন গড়ে উঠছে। নয়া উদারবাদী নীতির কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মন্দার ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে ইউরোপীয় রাষ্ট্রনায়কদের যুদ্ধবাজ নীতি। সংকটের সমস্ত বোঝাটাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিক কৃষকের উপর। ইউরোপীয় পুঁজি আজ কেইনসের পুঁজিবাদী অর্থনীতির পথ গ্রহণেও অনিচ্ছুক। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে যুদ্ধে সাহায্য করতে গিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করায় ইউরোপের সমস্ত দেশেই গ্যাস ও তেলের দাম ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে চলেছে। মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। রাশিয়া থেকে সস্তা তেল ও গ্যাস আমদানি উপর ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশই নির্ভর করত। জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা শ্রমজীবী জনতার পক্ষে ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারগুলি ও কর্পোরেট মালিকরা মূদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি ও বেতন বৃদ্ধি করতে অস্বীকার করছে। সামাজিক সুরক্ষা ছাঁটাই করছে। কৃষি ও কৃষকদের ভর্তুকি ছাঁটাই করছে। ডিজেলের উপর ভর্তুকি ছাঁটাই করা হচ্ছে। ইউরোপের সরকারগুলি যুদ্ধের খরচ মেটাতে ট্যাক্স চাপাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের উপর। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী কম দামে বিদেশি কৃষি পণ্য আমদানির ফলে সবকটি ইউরোপীয় দেশে কৃষকের ফসল বিক্রি হচ্ছে না, কৃষি পণ্যের দাম কমে যাচ্ছে। এর ফলে কৃষকরা বড় সংকটে পড়েছে।
তারই প্রতিরোধে নেমেছে ইউরোপের শ্রমজীবী জনতা। ধর্মঘট ও আন্দোলনের ফেটে পড়ছেন। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, ব্রিটেন বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, গ্রিস, রুমানিয়া, নেদারল্যান্ড সর্বত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। বিশাল ট্রাক্টর মিছিল করে কৃষকরা কার্যত অবরোধ করে দেয় জার্মানির রাজধানী বার্লিন। ব্যাপক কৃষক বিক্ষোভে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শহর অচল হয়ে পড়ে। পোল্যান্ডের কৃষকরা ইউক্রেন সীমান্তে পথ অবরোধ করে। ওই দেশের ১৮০ টি জায়গায় কৃষক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। গ্রিসের সমস্ত প্রান্ত থেকে কৃষকরা ট্রাক্টর মিছিল করে রাজধানী এথেন্সের পথে অবরোধ সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক কালে, ইউক্রেনকে যুদ্ধের জন্য নতুন করে অনুদান, সাহায্য ও অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর এবং বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে নানা দেশের কৃষকরা ট্রাক্টর মিছিল করে সমবেত হয়ে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন।
কর্পোরেট পুঁজি তার বেপরোয়া লুঠ চালাতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নীতি নিয়ে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়াতে তৎপর। শাসকরা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ার জন্য দেশের শ্রমজীবী জনতার ঐক্য ভাঙতে চায়। আদালতের রায়ে বন্দি দাঙ্গাবাজ ধর্ষকদের মুক্ত করে দেয় শাসকরা। অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমকে তারা কব্জা করেছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকদের উপর চলছে আক্রমণ। সাংবাদিক প্রবীর পুরোকায়স্থকে বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা হয়েছে কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করার অপরাধে।
একইভাবে ইউরোপের দেশে দেশে জনতার দুর্দশার জন্য অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষদের দায়ী করা হচ্ছে। অভিবাসী শ্রমজীবীদের সস্তা শ্রম নিংড়ে ইউরোপীয় পুঁজির বাড়বাড়ন্ত। এখন সংকটের সময় সেই অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে বিভাজনের নীতি নিয়েছে ইউরোপীয় পুঁজি।
কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অক্লান্ত শ্রম ও মেধার ফসল হিসেবে যে আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, অর্থলোলুপ পুঁজির দৌরাত্মে সভ্যতার ধারক-বাহকরাই গুরুতর সংকটে। শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের আন্দোলনকে দুর্বল করতে বিভাজনের নানা কৌশল নিয়ে চলেছে। স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পথে প্রতিবাদী মানুষের আন্দোলনকে মোকাবেলা করার পথ গ্রহণ করেছে। এই গণতন্ত্র বিরোধী ব্যবস্থায় সভ্যতায় অগ্রগতি তো দূরের কথা, সভ্যতার অস্তিত্ব রাখাই কার্যত অসম্ভব। এই ব্যবস্থা ভাঙ্গার জন্য শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। মানুষে মানুষে বিভাজনের ঘৃণ্য নীতিকে পরাজিত করেই শ্রমজীবী মানুষের বাঁচার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।