বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

অগ্নিবীরেদের আন্দোলনের আগুন

অগ্নিবীরেদের আন্দোলনের আগুন

শৌভিক দে

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১ জুলাই ২০২২— “বর্ডার পে জওয়ানো মাইনাস বিশ কী টেম্পারাচর মে লড় রহা হ্যয়”।
সত্যিই তো সিয়েচেনের মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি তাপমাত্রায় কিম্বা গুজরাট রাজস্থানের সীমান্তে ৫০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় ভারতীয় সেনারা দিন রাত এক করে পাহারা দিয়ে চলেছেন।
কিন্তু কেন বলুন তো? অসাধারণ দেশভক্তি? দেশপ্রেমের তাগিদ?
নাকি নিজেদের জীবন জীবিকার তাগিদে— নিজেদের পরিবারকে আর্থিক-সামাজিক সুরক্ষা দেবার তাগিদে নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও তাঁরা কর্তব্যে অটল থাকেন।
এই বিতর্কটাই উস্কে দিল অগ্নিপথ প্রকল্প।
এই প্রকল্প আরএসএস-বিজেপি সরকারের সেনাবাহিনীতে ঠিকা সেনা নিয়োগ করার প্রকল্প। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঠিকাকরণ শুরু।
সেনাবাহিনীতে স্থায়ী জওয়ানের সংজ্ঞাটাই পাল্টে ফেলতে চাইছে মোদি সরকার। ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প ঘোষণা করে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক ঠিকাকরণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে তারা।
সেনাবাহিনীর জওয়ানদের পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা থেকে হাত গুটিয়ে ফেলো। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সীমান্তে লড়াই করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া সেনাবাহিনীর জওয়ানদের পেনশনের দায়িত্ব নিতে আর রাজি নয় আরএসএস-বিজেপি’র সরকার।
তাদের উদ্দেশ্য নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইজরায়েলের ধাঁচের ‘শট সার্ভিস আর্মড ফোর্স’ বানানো। নয়া উদারবাদী সংস্কারের দিকে ক্রমশ আরও এক পা এক পা করে এগোনো।
এতদিন পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘শট সার্ভিস কমিশন’ ছিল শুধু মাত্র অফিসার ক্যাডারদের জন্য। পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য অফিসারদের নিয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে বাড়তে থাকে মেয়াদ। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ‘শট সার্ভিস কমিশন’এর একজন অফিসার প্রতি খরচ হত ৬ কোটি টাকা, ট্রেনিং থেকে বেতন, সবটা ধরে। ‘শট সার্ভিস কমিশন’এর অফিসাররাও পেনশন পান না!
সরকারের চালু করতে চলা এই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পে সাড়ে সতেরো বছর থেকে একুশ বছর বয়সী যুবরা আবেদন করতে পারবেন। সেনাবাহিনীতে তাদের মেয়াদ হবে মাত্র চার বছর। চার বছর পর সেনার তালিম নেওয়া, অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, ট্যাঙ্ক চালানো ২২ থেকে ২৫ বছরের যুবরা ফিরে আসবেন খালি হাতে! সরকার বলেছে, তারপর যদি তাঁরা পড়াশোনা করতে চান, সস্তায় ব্যাঙ্ক ঋণ দেবে সরকার! অবশ্য আবার এমনটাও বলা হচ্ছে সরকার তাঁদের নানা ধরনের শিক্ষাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নাকি করবে। সরকার ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিরা দাবি করছেন, তাঁরা নাকি প্রচুর পদ তৈরি করে এই সমস্ত চাকরি হারানো অগ্নিবীর সেনাদের চাকরি দেবেন। যেন তাঁরা অগ্নিপথ প্রকল্প ঘোষণার অপেক্ষাতেই ছিলেন।
কিন্তু কত সংখ্যক পদ? কী ধরনের সেই কাজ? সে কাজের জন্য অগ্নিবীররা কতটা উপযুক্ত? সবটাই ধোঁয়াশা। এটাও কোটি টাকার প্রশ্ন যে কাজ হারানো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদের প্রতি পুঁজিপতিদের এই বদান্যতার কারণটাই বা কী।
চলতি বছরেই ৪৬০০০ অগ্নিবীর নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। চার বছরের মেয়াদ শেষে এই অগ্নিবীরদের ৭৫ শতাংশকে আর রাখা হবে না। মাত্র ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরদের স্থায়ী ভাবে নেওয়া হবে সেনাবাহিনীতে ১৫ বছরের মেয়াদে। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ অগ্নিবীর রাতারাতি বেকারে পরিণত হবেন।
সেনাবাহিনীতে ‘শিক্ষানবিসি’ প্রথা চালু করতে চাইছে মোদি সরকার। পেনশন, মেডিকেল বেনিফিট থেকে সরাসরি হাত গুটিয়ে নিতে চাইছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্র সরকার রাজ্যসভায় জানিয়েছিল এই মুহুর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রয়োজন ১ লক্ষ ১৩,১৯৩ জন জওয়ান এবং ৯,৩৬২ জন অফিসার। সশস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী মিলিয়ে বহু শূণ্য পদ ফাঁকা থাকলেও আর স্থায়ী নিয়োগ করতে চাইছে না সরকার। অথচ এয়ারফোর্স বা নেভির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মাত্র ছ’ মাস ট্রেনিং দিয়ে নিয়োগের চিন্তভাবনাটা শুধু হাস্যকর নয়, বিপদজনক। দেশের প্রতিরক্ষা এবং অগ্নিবীরের প্রাণ নিয়ে কার্যত ছেলেখেলা বা আগুন নিয়ে খেলার সামিল।
আবার অগ্নিবীরেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে? চার বছর ধরে বন্দুক চালানো শেখো, বর্ডারে গিয়ে নিজের প্রাণ বিপন্ন করে ভয়ঙ্কর শীতের কামড়, চরম গরম সহ্য করে পাহারা দাও। তারপর চার বছর বাদে আবার বেকার হয়ে হাত পাতো ব্যাঙ্কের দরজায় দরজায় ঋণ নিয়ে লেখাপড়ার জন্য! আর এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের আগুন। বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিহার থেকে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা থেকে তেলেঙ্গানা।
মোদি জমানার বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক মন্দা, কাজ হারানো, কোটি কোটি সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ, মেহনতি মানুষের জীবনে আশঙ্কা, অনিশ্চয়তার ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, অগ্নিপথের ঘোষণা সেই ক্ষোভে আগুন ছুঁইয়ে দিয়েছে। আর তার ফলেই কেঁপে উঠেছে বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারগুলোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার। তাদের মনে পড়ে গেছে কৃষক আন্দোলনের সেই নাছোড় লড়াইয়ের কথা। হার না মানা জেদের কথা।
২০২২-২০২৩ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ৫.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই ৫.২৫ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে পেনশন খাতে বরাদ্দ ১.১৯ লক্ষ কোটি টাকা। প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ থেকে এই ‘পেনশনের বোঝা’ নামানোই মূল লক্ষ্য কেন্দ্র সরকারের। আক্ষরিক অর্থে সেনাবাহিনীতে ‘ঠিকা সৈন্য’। অগ্নিবীররা চার বছরের ‘‘শিক্ষানবিসি’র জীবনে প্রথম তিন বছর বেতন পাবেন তিরিশ হাজার টাকা। শেষ বছরে চল্লিশ হাজার টাকা। প্রতি মাসে তাঁদের মাইনে থেকে ৩০ শতাংশ টাকা কেটে নেবে সরকার। চার বছর বাদে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে ১১ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা, তাঁদের মাইনে থেকে কাটা ৩০ শতাংশ অর্থ।
আসলে সরকারের অন্যান্য সমস্ত দফতরের মতোই প্রতিরক্ষা বিভাগের মানুষদের পেনশনের দায়ও পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে চাইছে সরকার। সশস্ত্র বাহিনীর এই ঠিকাকরণ নয়া উদারবাদের সমীকরণ মেনেই। সেনাবাহিনীতে সৈন্য কমিয়ে ক্যাপিটাল ইনফিউশন বাড়াও। শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনে লকহিড মার্টিন, বোয়িং, এয়ারবেসদের মত গ্লোবাল অস্ত্র নির্মাতাদের মুনাফা কামানোর ব্যবস্থা করো। যুদ্ধ হোক বা না হোক, লকহিড মার্টিনদের খিদে মেটানোর জন্য অস্ত্র কিনতে থাকো। কিন্তু চার বছরের মেয়াদে সেনা ছাউনিতে কাটানো এই বিপুল সংখ্যক যুবরা, প্রতিবছর অস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাজ হারানো হাজার হাজার যুবরা যখন ফিরে আসবেন, কী হবে তখন। অস্ত্র চালানো, ট্যাঙ্ক চালানো ঠিকা সেনারা বেকার হয়ে ফিরে এলে আরও বেশি হবে সমাজের ‘সামরিকীকরণ’!
বেকার ঠিকা সৈন্যরাদের কি তখন ব্যবহার করবে আরএসএস-বিজেপি, তাদের ফ্যাসিস্ট বাহিনী গড়ে তোলার কাজে। হিটলারের ধাঁচে নয়া গেস্টাপো বাহিনী নির্মাণের ছক কি আদতে সমাজের সার্বিক সামরিকীকরণের মধ্য দিয়ে নিজেদের পেশিশক্তি বাড়ানো। ঠিক যেমন সিভিক ভলিন্টিয়ারদের কার্যত নিজেদের ঠ্যাঙারে বাহিনীতে পরিণত করেছে রাজ্য সরকার, তারই ভয়ঙ্কর রূপের প্রতিচ্ছবি কি ঘটানো হবে কাজ হারানো হাজার হাজার ঠিকা সেনাদের দিয়ে।
যারা দেশপ্রেমিকের আলখাল্লা পড়ে দেশ বিরোধী কাজ করতে পারে, প্রতিদিন যারা দেশ বিক্রি করে চলে, যারা নিজের দেশের সেনাবাহিনীকে পেনশন, স্থায়ী চাকরি দিতে অস্বীকার করে, যারা গোটা সেনাবাহিনীকে বহুজাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বিকিয়ে দিতে চায়, তাদের কার্যকলাপের পিছনে এই ধরনের গভীর চক্রান্তমূলক কোনও পরিকল্পনা যে নেই, এমনটাও কি নিশ্চিত বলা সম্ভব। সুতরাং সাধু সাবধান।
অগ্নিপথের অগ্নিবীররা যদি যুব আন্দোলনকে কৃষক আন্দোলনের মতোই নাছোড় মনোভাব নিয়ে চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে পুঁজি এবং পুঁজির তাবেদারী করা রাষ্ট্র, দুয়েরই সমূহ বিপদ।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.