বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
শ্রমিক আন্দোলনের বর্তমান কঠিন সময়ে রাজস্থানের গিগ শ্রমিক কল্যাণ সংক্রান্ত আইন ২০২৩, নিঃসন্দেহে একটা আশার খবর, তাই আলোচনার দাবি রাখে।
গিগ শ্রমিক কথাটির সঠিক সংজ্ঞা নির্ণয় করা সোজা নয়। শ্রমিক মালিকের যে পরিচিত সম্পর্ক আছে সেখানে কমপক্ষে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এক, মালিক বা তার প্রতিনিধিদের নির্দেশে শ্রমিক কাজ করে। দুই, কাজের একটা জায়গা থাকে। তা ফ্যাক্টরি হতে পারে, অফিস, গুদাম, দোকান, রেস্তোরাঁ, ঘর-গেরস্থালী – অনেক কিছুই হতে পারে। আর তিন, মালিক শ্রমিককে মজুরি দেয়। তার সঙ্গে আরও শর্ত জোড়া যায়, যেমন একজন শ্রমিক একজন মালিকের জায়গাতেই সারা দিন কাজ করে। কাজের জন্য লিখিত বা মৌখিক চুক্তি থাকে, ইত্যাদি।
এই মুল কাঠামোর বাইরে নানা ধরনের শ্রমিক মালিক সম্পর্ক আছে, যা আমাদের শ্রম ও শ্রমিক সংক্রান্ত ধারণায় ধাঁধা তৈরি করে। যেমন আমদের খবরের কাগজ দেন শশাঙ্ক। তিনি এক ডিলারের কাছ থেকে রোজ প্রায় ১৫০টি খবরের কাগজ সংগ্রহ করেন, পাড়ায় পাড়ায় বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি করেন। আমরা তাঁকেই খবরের কাগজের দাম দি। শশাঙ্ক কার শ্রমিক? ডিলারের শ্রমিক তো নয় কারণ ডিলার তাঁকে কোনও মজুরি দেন না, সামান্য ছাড় দিয়ে খবরের কাগজগুলি শশাঙ্ককে বিক্রি করেন। শশাঙ্ক আমাদের শ্রমিকও নয়, কারণ আমরা তাঁকে মজুরি দি না। তাঁর কোনও মালিক নেই, মজুরি নেই, এবং কাজের ক্ষেত্রটিও বিস্তৃত। সকাল ৯-৩০টার মধ্যে কাগজ বিলি হবার পর তিনি একটা দোকানে সারাদিন কাজ করেন। শশাঙ্কের মত বহু ধরনের শ্রমিক আছেন যাদেরকে বলা হয় স্বনিযুক্ত শ্রমিক।
আমাদের উপরের তলায় থাকেন পবিত্রদা, তবলা বাদক। তিনি নানা গানের দল, নানা গায়ক ও ব্যান্ডের কাজ থেকে কাজ পান, অনুষ্ঠানে তবলা বাজিয়ে আসেন। শশাঙ্কের মতো একজন ডিলারের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক নয়, অনেক গায়ক, গানের দল, ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক। প্রতিটি কাজের জন্য পবিত্রদার সঙ্গে তাঁদের কাজের মৌখিক চুক্তি হয়, পবিত্রদা সেই চুক্তি অনুযায়ী কাজের পারিশ্রমিক পান। ঠিক পবিত্রদার মতই জ্যাজ সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রবাদকেরা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে গিগ কথাটার অবতারণা করেন। তাঁদের কাজের জগতে এর মানে ছিল খেপ খাটা যন্ত্রবাদক, যাদের কোনও স্থির কাজ নেই। পরে অবশ্য এয়ার বিএনবি আর উবেরের দৌলতে সারা পৃথিবীতে গিগ অর্থনীতি বা গিগ কর্মী কথাটা প্রচলিত হয়।
স্বনিযুক্ত শ্রমিক বা কনট্রাকটর, বা স্বনিযুক্ত পেশাদার, যেমন উকিল ডাক্তার চার্টার্ড আকাউন্টান্ট ইত্যাদি বর্গের মানুষদের সঙ্গে গিগ কর্মীদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হবে কি করে? আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় যখন গিগ ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করার নিয়ম চালু হয়, তখন এবিসি টেস্ট নামক তিনটি শর্ত পূরণের কথা বলা হয়। বলা হয় গিগ কর্মীকে ওই সংস্থার একজন কর্মচারী হিসেবেই গণ্য করা হবে তিনটি শর্তে।
গিগ কর্মী যে সংস্থার হয়ে কাজ করছেন তিনি তাঁরই কর্মচারী, যদি সেই কর্মী সেই সংস্থার নির্দেশেই ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকেন।
কর্মী যে সংস্থার হয়ে কাজ করছেন সেই সংস্থার বাইরে সাধারণভাবে কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। কর্মী সেই সংস্থার হয়ে যে কাজ করেন, সেই কাজ তিনি স্বাধীনভাবে কোনও ব্যবসা, পেশা বা বাণিজ্যের অঙ্গ হিসেবে করেন না।
রাজস্থানের আইন অবশ্য একটা সহজ ব্যাখ্যা করেছে। গিগ কর্মচারীর ব্যাখ্যা করেছে এই বলে যে চিরাচরিত শ্রমিক মালিক সম্পর্কের বাইরে যে কোনও রকম কর্মচুক্তিতে নিযুক্ত শ্রমিকরাই গিগ কর্মী। এই গিগ কর্মীরা যেহেতু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনও অনলাইন প্লাটফর্ম-এর তরফে কাজ করেন, তাই আলাদা করে আবার প্লাটফর্মকে ব্যাখ্যা করেছে এই বলে, যে কোনও অনলাইন প্লাটফর্ম যেখানে কোনও ব্যক্তি দ্রব্য বা পরিষেবা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং উপভোক্তারা অর্থের বিনিময়ে সেই পরিষেবা নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ওই আইনে আরও দুটি সংজ্ঞা আছে। একটি Aggregator ও অন্যটি Primary Employer-এর। এয়ার বিএনবি, উবের, জোমাটো ইত্যাদিদের প্রথম বর্গে ফেলা হয়, যারা গ্রাহক ও পরিষেবাপ্রদানকারীকে সংযুক্ত করে। দ্বিতীয় বর্গে ফেলা হয় আরবান কোম্পানিকে, যারা নিজেরা আমাদের থেকে অর্ডার পেলে দক্ষ কর্মীদের দিয়ে বাড়ির নানা কাজ করে থাকে। এদের সবাইকে একত্রে প্লাটফর্ম কোম্পানি বা প্লাটফর্ম ব্যবসা বলা হয়ে থাকে যদিও এদের মধ্যে শ্রমিক মালিক সম্পর্কের চরিত্র আলাদা।
সব রকমের প্লাটফর্ম ভিত্তিক গিগ কর্মীদের শ্রমিক কল্যাণের আওতায় আনা এই আইনের উদ্দেশ্য, সে কথা মানলেও রাজস্থানের আইন অনুযায়ী এয়ারবিএনবি-তে যে সব বাড়ির মালিকেরা তাঁদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া খাটান তাঁরাও কর্মী হিসেবে বিবেচিত হবেন, কিন্তু সেই বাড়ি বা ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার গিগ কর্মী হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারেন। সেই কেয়ারটেকার তো চিরাচরিত শ্রমিকের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে যাবেন। আইনে কনট্রাক্টর আর গিগ শ্রমিকদের আলাদা করার দরকার ছিল।
রাজস্থানের আইনে বলা আছে এই শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যে গিগ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল নামে একটি সরকারি তহবিল তৈরি করা হবে, যার জন্য প্লাটফর্ম ভিত্তিক প্রতিটি বেচাকেনার মূল্যের উপর ১-২% সেস বসানো হবে। এছাড়া রাজ্য বাজেট থেকেও সেই তহবিলে সহায়তা দেওয়া হবে। তার সঙ্গে গিগ শ্রমিকদের কাছ থেকেও অবদান (contribution) নেওয়া হবে। কিন্তু রাজ্য সরকার বা শ্রমিকদের অবদান বাধ্যতামূলক নয়, শুধুমাত্র মালিকদের কাছ থেকে সেস নেওয়াটাই বাধ্যতামূলক। শ্রমিকদের ও রাজ্য সরকারের অবদান কেন বাধ্যতামূলক নয় বোধগম্য হল না।
রাজস্থানের আইনে গিগ শ্রমিকদের নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তার দায়িত্ব প্লাটফর্ম কোম্পানিগুলির ঘাড়ে। কোম্পানিকেই গিগ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের কাছে তাদের কাজে নিযুক্ত কর্মীদের তথ্য দিয়ে নথিভুক্ত করাতে হবে। কিন্তু গিগ কর্মী নিজে থেকে সেই শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের কাছে নিজেকে নথিভুক্ত করতে পারবে না। প্লাটফর্ম কোম্পানি নথিভুক্ত না করলে পেনাল্টির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কোনও কোম্পানি যদি ১০০ জন গিগ শ্রমিকের জায়গায় ৯০ জনকে নথিভুক্ত করে, তাহলে বাকি দশজনকে নথিভুক্ত করাতে শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের যে কাঠখড় পোহাতে হবে, তার থেকে অনেক সহজে গিগ শ্রমিকের স্ব-নথীকরণ সম্ভব ছিল। গিগ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড, প্লাটফর্ম কোম্পানিগুলির তালিকা পোর্টালে প্রকাশ করবে বলা আছে, কিন্তু তাতে শ্রমিকদের নাম প্রকাশ হবে কিনা লেখা নেই। অধিকারটা শ্রমিকদের কিন্তু শ্রমিকরা নিজেরা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না, এটা সত্যিই অদ্ভুত! অথচ প্লাটফর্ম শ্রমিকদের নথিকরণ অতি সহজেই করা সম্ভব। আইনে বলা আছে গিগ শ্রমিকরা আপনা থেকেই (automatically) শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের কাছে নথিভুক্ত, যার কোনও মানে নেই!
গিগ শ্রমিকদের নথিভুক্তিকরণ, তাদের জন্য শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড— সবই গিগ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য, অথচ আইনে সামাজিক সুরক্ষাটিকেই সংজ্ঞা দেওয়া হল না। শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়া হল। যে আইনটা আনাই হচ্ছে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্যে, সেই আইন সামজিক সুরক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করল না এটা কি করে সম্ভব? শুধু তাই নয়, কন্সট্রাকশন কর্মীদের মত গিগ কর্মীদের গ্রুপ বিমা আইনে বাধ্যতামূলক হল না কেন, তাদের ন্যুনতম মজুরি সুনিশ্চিত করার বিধান কেন আইনের অন্তর্গত হল না তাও স্পষ্ট নয়।
আইনে অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি প্রক্রিয়ার উল্লেখ আছে। অভিযোগকারী সরাসরি অনলাইনে শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। তবে তাঁর অভিযোগের নিষ্পত্তি কিভাবে হবে, সেই বিষয়ে বিশদ কিছু না থাকায়, এখনো এ বিষয়ে সন্তুষ্টির সময়ে আসে নি। তেমনি, প্রতিটি আর্থিক লেনদেন বা বেচাকেনার উপর যদি সেস নিতে হয়, তাহলে প্রতিটি কোম্পানির প্রতিটি লেনদেনকে একটা কেন্দ্রীয় লেনদেন ম্যানেজমেন্ট ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সেই ব্যবস্থা প্রতিটি লেনদেন ‘দেখতে’ পাবে এবং তার থেকে সেস কেটে নেবে। এইটা করতে পারলে অতি উত্তম, কিন্তু করা সহজ নয়, কারণ ব্যাবসায়িক গোপনীয়তার সঙ্গে এই বিষয়টি জড়িত। কতটা কি হচ্ছে ক্রমশই স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে রাজস্থানের এই আইন থেকে অনেক আশাই অপূর্ণ রয়ে গেল। আইনের সাধু উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু অনেক সময়ই একটা সাধু উদ্দেশ্য আলগা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্য হারিয়ে যায়। Street Vendor Act ২০১৩ তার অতি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ ক্ষেত্রেও তাই হবে না তো?