বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
১
২০২৪এর লোকসভা নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের মুখে এসে দাড়িয়েছে সমগ্র ভারত। বিজেপি-আরএসএস-দেশি বিদেশি কর্পোরেট শক্তির ফ্যাসিবাদী জোট ভারতকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির একেবারে উন্মুক্ত ক্ষেত্র হিসাবে স্থায়ী রূপ দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে এবার ভোটে জিতলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে আরও অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে বিজেপি-আরএসএস জোট। বলা যায়, রাষ্ট্রের রঙটাই বদলে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে বিজেপি।
এই যে ‘নতুন’(!) ভারত গড়ার কাজ হাতে নিয়েছে বিজেপি-আরএসএস এবং দেশি-বিদেশি লগ্নি পুঁজি, তারা অগ্রগতির প্রতিটি ধাপে স্বাধীনতার পরের সাত দশকে গড়ে ওঠা ভারতকে ধ্বংস করেই এগোচ্ছে। স্বাধীনোত্তর ভারত, যা গড়ে উঠেছিল গত সাত দশক ধরে, তার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিষেবা, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র — এসব কিছুকেই অবাধ লুঠের পরিসরে পরিণত করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে এগোনোর ক্ষেত্রে বাধা ছিল যে সব প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন— সবকিছুকেই ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে এনে সেগুলির অন্তর্বস্তুকে বদলে দেওয়ার কাজ চলছে ধারাবাহিক ভাবে। এমন কী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও বদলে ফেলা হচ্ছে একেবারে পরিকল্পনা মাফিক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পৃথিবীর রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়ে উঠল বহুপাক্ষিক। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব দাঁড়িয়ে পড়ল পরস্পরের মুখোমুখি। এটা ছিল একেবারেই নতুন একটা পরিস্থিতি। এই দুই শিবিরের দ্বন্দ্বের কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলি নিখাদ পুঁজিবাদী থেকে পৃথক এক মিশ্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেল। এই সব দেশগুলির মধ্যে বড় ভূমিকা নিয়েছিল স্বাধীনোত্তর ভারত। গণতন্ত্র, মিশ্র অর্থনীতি, অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের বড়সড় ভূমিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বহুমুখী ভারতকে একসূত্রে গেঁথে ফেলার চেষ্টা— এসবের মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠল এক নতুন ভারত, যে ভারত ছিল ঔপনিবেশিক আমলের চেয়ে আলাদা। বড় বুর্জোয়া, বড় জমিদারদের এই পুঁজিবাদী ভারতে যেমন কৃষক শোষণকে অব্যাহত রাখতে সামন্তবাদের অবশেষগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল, তেমনই আবার অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে জায়গা করে দেওয়া হয়েছিল এমন সব নীতিমালাকে যা আদতে চরিত্রের দিক থেকে ভাবধারার বিচারে সোশাল ডেমোক্রেটিক। এভাবে আমরা স্বাধীনতার পরবর্তী সাত দশকে পেয়েছিলাম সোশাল ডেমোক্রেসির জোরালো ইমপ্রিন্ট বা ছাপ রয়েছে এমন এক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এবং একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার সঙ্গী ছিল সামন্ত অবশেষ ও জাতপাতের মতো শতাব্দীপ্রাচীন ব্যবস্থা, যা স্বাধীনোত্তর ভারতের রাষ্ট্রীয় জীবনকে অনপনেয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলেছিল।
এই কাঠামোর মধ্যে পুঁজির শোষণ ছিল ঠিকই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিতে নানা ধরনের সোশাল ডেমোক্রেসির ছাপ থাকায় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারও কিছু পরিমাণে নিশ্চিত ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্র ও সোশাল ডেমোক্রেসির সম্মিলিত প্রভাবে স্বাধীনতার পর যে নতুন ভারত গড়ে উঠল, সেখানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তায় এমনকী সমাজতন্ত্রেরও কিছু ভাবনা ছিল সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে।
নয়া উদারনীতি ঠিক এই মিশ্র কাঠামোটাকেই ধ্বংস করতে চায়, যেখানে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে একেবারে শূন্যে নামিয়ে এনে পুরো অর্থনীতিকেই পুঁজির অবাধ লুন্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে। এবং তা করতে গেলে পুরানো ব্যবস্থাকে আগলে রেখেছে যে সব উপাদান, সেগুলিকেও ধ্বংস করতে হবে। নরেন্দ্র মোদির আমলে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আমরা সেই প্রক্রিয়াই প্রত্যক্ষ করছি। বিজেপি লগ্নি পুঁজির অবাধ লুণ্ঠন চায় বলেই ওয়াশিংটন, প্যারিস বা টোকিওয় মোদিকে এত সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়।
গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরও একটা মাত্রা যোগ করেছে বিজেপি-আরএসএস। সেটা হল হিন্দুত্ব। ভারতবর্ষ আবহমান কাল ধরে হয়ে থেকেছে নানা জাতি, নানা ধর্ম, নানা বিশ্বাসের সমন্বয়ের চর্চা ক্ষেত্র। বহুমাত্রিক চর্চার পলি থেকেই উদ্ভূত হয়েছে এমন ভারত যে কাউকে দূরে ঠেলে না, বরং সবাইকে আপন করে নিয়ে ঠাঁই দেয়। নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ বইয়ে নেহরু লিখেছিলেন, ‘ভারতবর্ষ হল বারে বারে লিখে মুছে ফেলার মতো একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যার ওপর স্তরে স্তরে নানা চিন্তাধারা ও স্বপ্নবিহ্বল ভাবনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এবং তথাপি স্তরে স্তরে লিপিবদ্ধ বিষয়গুলির কোনওটাই পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা যায়নি কিংবা আগে লেখা কোনও কিছুই মুছে ফেলা যায়নি।’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন,/ শক-হুন-দল-পাঠান-মোগল একদেহে হল লীন।’ এই হল আজন্মকালের ভারতের দেহ, এটাই ভারতের সত্তা। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম গড়ে তোলার পর্বে নতুন করে জন্ম হয়েছিল এই ভারত সত্তার, যাকে বলা হয় আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া বা ভারত ভাবনা। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম পুনরুজ্জীবিত করেছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদকে, স্বাধীন ভারতের সংবিধানে যার স্বীকৃতি এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। এবং দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে রাজ্যগুলির ক্রমশ প্রসারিত হয়েছিল বহুত্ববাদের স্বীকৃতি।
হিন্দুধর্মের সমন্বয়ের বার্তাকে ছেঁটে ফেলে শতাব্দী প্রাচীন জাতপাত ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে হিন্দুত্ব রাজনীতির একটা নতুন কাঠামো দাঁড় করিয়েছে বিজেপি-আরএসএস। হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার নামে একদিকে যেমন তারা এদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর (হিন্দি বলয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু মুসলিম, দলিত, আদিবাসীরা, আবার কেরল, উত্তর পূর্বাঞ্চল বা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে খ্রিস্টানরা) আক্রমণ নামিয়ে আনছে, অন্যদিকে নির্মম অত্যাচার নামিয়ে আনছে তপশিলি জাতি, পিছড়ে বর্গ ও দলিত ও আদিবাসীদের ওপর। এভাবে ধর্ম ও জাতপাতের সমীকরণে ভারতীয় সমাজকে টুকরো টুকরো করতে চায় তারা, এবং সেই বিভাজিত ভারতের ওপর একদিকে উচ্চবর্ণের এবং অন্যদিকে দেশি বিদেশি পুঁজির একচেটিয়া ফ্যাসিস্ত শাসন কায়েম করতে চায়। এটা করতে গিয়ে তারা ধ্বংস করছে আবহমান কালের ভারতকে, ধ্বংস করছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদকে। এক কথায় তারা ধ্বংস করতে চাইছে আইডিয়া অফ ইন্ডিয়াকে বা ভারত গড়ার ভাবনাকে। এই বিষয়টি ভারত ইতিহাসে একেবারে নতুন। এমনকি মোগল আমলেও এভাবে ভারতকে কোনও নির্দিষ্ট একটি ধর্মের ছাঁচে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি। আসলে আরএসএস-বিজেপির এই ভাবনা হিটলারের ফ্যাসিবাদী অনুসারী। ঘৃণার ভিত্তিতে জার্মানদের ঐক্যবদ্ধ করতে হিটলারের হাতিয়ার ছিল ইহুদি ঘৃণাকে চাগিয়ে তোলা। আর এখনকার ভারতে বিজেপি-আরএসএসের হাতিয়ার হল মুসলিম ও খ্রিস্টান ঘৃণা। সমাজের মধ্যেই কাউকে অপর সাজিয়ে তাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে বাকিদের এককাট্টা করার চেষ্টা করা। এটা ফ্যাসিবাদের নিখাদ হিটলারি মডেল।
সুতরাং, ঘৃণা ও বিভাজনের ভিত্তিতে যে নতুন ভারত গড়ার কাজ শুরু করেছে বিজেপি ও আরএসএস, তা হল আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া বা ভারত গড়ার ভাবনাকে ধ্বংস করে, আবহমানকালের ভারতকে ধ্বংস করে, বিভাজনের বিষে নিষিক্ত এক অন্য ভারত গড়ে তোলা। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সব আদর্শ ও ভাবনাকে ধ্বংস করা।
তাই বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াই নিছক একটা নির্বাচনী লড়াই নয়। এ হল আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া তথা ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত-কে রক্ষা করার লড়াই। আবহমানকালের ভারতকে রক্ষা করার, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জন্ম নেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদকে রক্ষা করার লড়াই। ভারতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক উপাদানগুলিকে রক্ষা করা এবং সেগুলিকে আরও প্রসারিত করার লড়াই।
২
সম্প্রতি পাটনা ও বেঙ্গালুরুর বৈঠকের মধ্যে দিয়ে যে বিজেপি-আরএসএস বিরোধী যে ইন্ডিয়া জোটের সূচনা হয়েছে সেই রাজনৈতিক প্রয়াসকে দেখতে হবে এই পরিপ্রেক্ষিতেই। ‘ইন্ডিয়া’ বলতে বোঝানো হয়েছে Indian National Developmental Inclusive Alliance. এখানে আলাদা করে ন্যাশনাল, ডেভেলপমেন্টাল, ইনক্লুসিভ — এই তিনটি শব্দ লক্ষ্যণীয়। নয়া উদারবাদী রাজনীতি ও অর্থনীতি জাতীয় উন্নতি, সমাজের সকলের জন্য উন্নতি— এসব কিছুই চায় না। তাদের দাবি, জাতিরাষ্ট্রের বাধা ভেঙে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির অবাধ চলাচলের পরিসর তৈরি করা এবং তার লক্ষ্য হল ক্রমশ বেশি বেশি করে কোটিপতি তৈরি করে বিপুল জনসংখ্যাকে দারিদ্রে ডুবিয়ে রাখা। বিজেপির ভারতে লগ্নি পুঁজির স্বার্থে জাতিরাষ্ট্রের তৈরি করা বাধাগুলি কীভাবে উপড়ে ফেলা হয়েছে তা আমরা দেখেছি। দেখেছি, কীভাবে সমাজে আর্থিক বৈষম্য বাড়িয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে চরম দারিদ্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং, বিজেপি-আরএসএস বিরোধী এই জোট তার নামকরণেই নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধতা করার অভিজ্ঞান স্পষ্ট করেছে। একইসঙ্গে ইন্ডিয়া নামটি সামনে আনার পিছনে আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া বা ভারত গড়ার ভাবনাকে রক্ষা করার বিষয়টিও প্রতিফলিত। সুতরাং, বিরোধীদের এই জোট যে বিজেপি-আরএসএসের মতাদর্শের বিকল্প একটি মতাদর্শের কথা বলতে চায় তাও বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। বেঙ্গালুরুর বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে যে সব বিষয়গুলি আনা হয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, রেকর্ড বেকারি, নোটবন্দির কারণে এমএসএমই ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের দুর্দশা, যুবদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারি, লাগামছাড়া ভাবে জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি— এসবের বিরোধিতা করার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের জোরালো ভূমিকা থাকবে এমন অর্থনীতিতে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, শ্রমিক ও কৃষকদের কল্যাণে আর্থিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, সংবিধানের ওপর এবং সংবিধান সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর আক্রমণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, পরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করার বিরোধিতা করতে হবে, রাজ্য সরকারের কাজে রাজ্যপাল ও লেফটন্যান্ট গভর্নরদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, বিরোধীদের হেনস্থা করার কাজে এজেন্সিগুলোকে ব্যবহার করা চলবে না, রাজ্যগুলির ন্যায্য দাবি পূরণ করতে হবে, সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ ও মহিলা, আদিবাসী ও দলিতদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে, সকলের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, কেন্দ্রের শাসক দলের ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতির বিরোধিতা করতে হবে ইত্যাদি একগুচ্ছ বিষয়। বেঙ্গালুরু বৈঠকের প্রস্তাবে এরকম তাৎক্ষণিক ও দূরায়ত গুরুত্বের বহু বিষের উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বিষয়ের উল্লেখ থেকেই স্পষ্ট যে ইন্ডিয়া জোট বিজেপি-আরএসএস বিরোধী একটা মতাদর্শ, বিকল্প একটা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে এগোতে চাইছে। এখানেই বিজেপির হিন্দু ভারত ভাবনার সঙ্গে বিরোধী জোটের বিকল্প ভারত ভাবনার ফারাক স্পষ্ট।
৩
তবে ভাবনা ও মতাদর্শের দিক থেকে ইন্ডিয়া জোটের উদ্যোগ যতটা উজ্জ্বল দেখায়, বাস্তবে বিষয়টা অনেক বেশি সমস্যাসঙ্কুল। এই জোটে যে সব রাজনৈতিক শক্তি জড়ো হয়েছে তাদের সাধারণ স্বার্থ হল, বিজেপি-আরএসএস জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করা। কিন্তু এখানে যেহেতু বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দলগুলি রয়েছে, তাই এদের পরস্পরের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বও রয়েছে। এই জোট নিজেই যেন এক বহুত্ববাদী ভারতের প্রতিফলন যেখানে বহুবিধ রাজনৈতিক শক্তি যুগপৎ ঐক্য ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে রয়েছে।
এই জোটে এখনও মূল শক্তি কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ফিরতে চায় আগের পর্বের সমাজ গণতন্ত্রে। হিমাচল, কর্ণাটক, রাজস্থানে কংগ্রেস সরকারের আর্থিক পদক্ষেপগুলিতে তা স্পষ্ট। কিন্তু এটাও ঠিক যে, এদেশে নয়া উদারবাদকে জায়গা করে দিয়েছিল মনোমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার। আবার বামেদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গরিবদের জন্য ১০০ দিনের কাজকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল সেই ইউপিএ সরকারই। বড় বুর্জোয়া বড় জমিদারদের দল হিসাবে কংগ্রেস চিরকালই নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ বজায় রেখেই দু' নৌকোয় পা দিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। ফলে দেশি বিদেশি লগ্নি পুঁজির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস কতদূর যাবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকছে।
এই জোটে বামেরা হল সেই শক্তি যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত গড়ার কাজকে সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করতে চায়। শেষ পর্যন্ত দেশি বিদেশি লগ্নি পুঁজির বিরোধিতা করতে চায়। তবে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বামেরা এখন দুর্বল।
জোটে রয়েছেন আরজেডি, জেডি ইউ, এনসিপি, শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলি। এই দলগুলি কংগ্রেসের মতাদর্শের কাছাকাছি হলেও রাজ্যভিত্তিতে কংগ্রেসের সঙ্গে এদের দ্বন্দ্ব তীব্র। আবার জোটে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দল যাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই রয়েছে বাম-কংগ্রেস জোটের। রয়েছে আম আদমি পার্টি, যাদের সঙ্গে দিল্লি ও পাঞ্জাবে তীব্র দ্বন্দ্ব রয়েছে কংগ্রেসের। এত সব বহুমুখী, পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে এককাট্টা করে তোলাটা বেশ কঠিন কাজ।
এখনকার ভারতে বিরোধী এই জোটের বৈশিষ্ট্য হল, জোটে সামিল বিরোধী দলগুলি বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। অথচ রাজ্যভিত্তিতে জোট শরিকদের মধ্যে মৌলিক রাজনৈতিক ফারাক ও দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেকারণে বলা হচ্ছে, বিজেপি বিরোধী ভোট এককাট্টা করতে রাজ্যভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা হবে। এটাও সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিস্থিতি যার মোকাবিলা করতে হবে।
৪
এই জোট প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বামেদের নিয়ে। কেরলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করেই বামেদের শক্তি সংহত করতে হবে। আবার পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তীব্রতর করেই বামেদের শক্তি সম্প্রসারিত করতে হবে। এখানে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জোট শরিক হিসাবে বামেরা পাচ্ছে কংগ্রেসকে। এতেই প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় স্তরে যখন জোট হচ্ছে তখন এরাজ্যে তৃণমূল সম্পর্কে কী অবস্থান হবে বামেদের। এনিয়ে পরিকল্পিতভাবে সংশয়ও ছড়ানো হচ্ছে। একই সমস্যা যে কংগ্রেসকে নিয়ে কেরলেও রয়েছে তা আর সামনে আনা হচ্ছে না।
এখনও অসমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, তৃণমূল এরাজ্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করেই। একেবারে মনোনয়ন পর্ব থেকে গণনা পর্ব— পুরো পর্যায় জুড়েই তৃণমূলের গণতন্ত্র বিরোধী ভূমিকা একেবারে স্পষ্ট। পুলিশ, প্রশাসন, সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে এরাজ্যের শাসক দল গণতন্ত্রের সমাধি রচনা করেছে। আসলে কোনও দল যদি দেশজুড়ে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার চায়, অথচ নিজেদের শাসনাধীন রাজ্যে গণতন্ত্রের চরম কণ্ঠরোধে করে বসে থাকে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। তৃণমূল জনতার হাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবে না, এই বিষয়টি নানাভাবে প্রকাশিত। তাই এরাজ্যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে বামেদের লড়াই জারি রাখতেই হবে।