বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ জুলাই ২০২২— অগ্নিপথ যোজনার বিবরণ মাত্র দু’ পাতার, কিন্তু তার সাফাইয়ের বহর লিখে ফেললে রামায়ণ হয়ে যাবে। এই প্রথম সরকারি যোজনার সাফাইয়ে সেনাবাহিনীর এতজন উচ্চ পদস্থ এবং অবসরপ্রাপ্ত পদাধিকারীকে ময়দানে দেখা গেল। সাফাইয়ের বিরোধিতাতেও দেখা গেল প্রায় সমান সংখ্যক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত পদাধিকারীকে। অগ্নিপথ, নোটবন্দীর মত প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নে পাওয়া যোজনা নয়। সেনাবাহিনীর পদাধিকারীগণ প্রায় এক বছর যাবৎ এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এক সপ্তাহ ধরে এত সাফাই দিতে হচ্ছে যে জল পরিস্রুত হবার বদলে এতটাই জল ঘোলা হয়ে গেছে যে এই যোজনার সম্ভাব্য সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই সাফাই-বিরোধিতার প্রধান যুক্তিগুলি সাজিয়ে দিলেই যথেষ্ট হবে।
সেনাবাহিনীর তরফে এই যোজনার পিছনে তিনটি মূল ভাবনার কথা বলা হয়েছে, এবং তা নিয়ে কারোর দ্বিমত নেই। সারা দুনিয়া জুড়েই সেনাবাহিনীতে একটা বিষয়ে মতৈক্য আছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ সৈন্যবলের উপর নির্ভর করে হবে না, হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিবল ও কৌশলের উপর নির্ভর করে। তাই সেনাবাহিনীতে সৈন্যের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা অন্য কিছু দেশও করছে। চীন ইতিমধ্যেই সেনা কমিয়ে ২৬ লক্ষ থেকে ২১ লক্ষ করে ফেলেছে, আমেরিকাও প্রায় গত দেড় দশক ধরে সেনাবাহিনীতে সৈন্য কমাচ্ছে। রাশিয়াও একই পথে হাঁটছে। পাশাপাশি তিনটি দেশই নিরন্তর আধুনিকীকরণ করে চলেছে। দ্বিতীয় কারণটি ভারতীয়। ২৫ লক্ষ অবসরপ্রাপ্ত সেনার পেনশন দিতে এ বছর খরচ ধার্য করা হয়েছে ১ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকা যা প্রতিরক্ষা বাজেটের ২৩%। তুলনায় আমেরিকার পেনশন দিতে খরচ হয় ৩৯%, চীনের ৩১%। এক রাঙ্ক - এক পেনশন কিছুটা চালু হবার পর থেকেই সরকার সেনাবাহিনীকে স্পষ্ট বলেছিল, পেনশনের ভার কমাতে হবে। সেনাবাহিনীতে অধিকাংশই অবসর নেন ৩৫-৩৮ বছর বয়সে, অর্থাৎ সরকারি কর্মচারী-র তুলনায় তাঁরা প্রায় আরও কুড়ি বাইশ বছর বেশি সময়ে ধরে পেনশন পান। আর তৃতীয় কারণটিও ভারতীয় বলা চলে। বলা হয়েছে সেনাদের গড় বয়স কমাতে হবে, এখন আছে ৩২, করতে হবে তিরিশের নিচে। এই ভাবনার কোনও আন্তর্জাতিক তুলনা নেই। চীনে সেনার গড় বয়স ৩৪, আমেরিকায় ৩৯, ইউরোপের প্রায় সব দেশেই ৪২-এর বেশি!
অগ্নিপথ যোজনায় চার বছর সময়সীমা ধার্য করা হয়েছে। সেই প্রস্তাব যে সেনাবাহিনীর থেকেই এসেছিল এটাও স্পষ্ট। কারণটা সেনাবাহিনীর মুখেই শোনা গেছে— পাঁচ বছর হয়ে গেলে গ্র্যাচুইটি দিতে হবে। অর্থাৎ সেটাও খরচা বাঁচানোর এক উপায়। দুই থেকে চার বছর মিলিটারি সেবার ব্যবস্থা পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে, সেনাবাহিনীর কাছে সেটা কিছু নতুন নয়। পাশাপাশি ৮ থেকে ১৫ বছর মিলিটারি সেবার ব্যবস্থাও অনেক দেশে আছে। দেশের আর্থিক ও সামরিক ক্ষমতা ও প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় থেকে তা নির্ধারিত হয়। মনে রাখতে হবে, যে চীন, উত্তর কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মত কমিউনিস্ট শাসিত দেশে মিলিটারি সেবা প্রত্যেক পুরুষের জন্য আবশ্যক, ভারতের বা ইংলন্ড আমেরিকার মত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা পদাধিকারীরা এই যোজনার বিরোধিতায় যা বলেছেন, তার মধ্যে তিনটি মূল যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। এক, স্থলসেনার জন্য এই যোজনার কিছুটা প্রয়োজন থাকলেও বায়ুসেনা এবং নৌসেনার জন্য এই ব্যবস্থা যথার্থ নয়, কারণ এই দুই বাহিনীতে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন সেনাকে পুরোপুরি তৈরি করতে প্রায় সাত বছর লেগে যায়। দুই, সেনাবাহিনীর প্রতিটি ব্যাটালিয়নে কিছু অস্থায়ী ও কিছু স্থায়ী সেনা থাকলে, তাদের মধ্যে নানাবিধ অসাম্য তৈরি হবে, এবং তা ব্যাটালিয়নের আক্রমণ বা প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করবে। তিন, স্থল সেনাতেও একজন জওয়ানকে পুরোপুরি তৈরি করতে চার বছর অতি কম সময়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এই যোজনা সেনাবাহিনীর কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করবে।
এ তো গেল সেনাবাহিনীর কথা। এর পাশাপাশি আরেকটা বড় এবং গভীর বাস্তবতা আছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ইত্যাদি রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা কয়েক লক্ষ। ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি ও সম্মিলিত ডিফেন্স সেবার পরীক্ষা দেয় প্রতি বছর সাড়ে চার লক্ষ ছেলে মেয়ে, তার মধ্যে নেওয়া হয় মাত্র কয়েক’শ। ২০১৯ সালে ১০০ মহিলা পদের জন্য ২ লক্ষ যুবতী আবদেন করেছিলেন। জওয়ান ভর্তি করা হয় অবশ্য ক্যাম্প করে - মিলিটারি ভাষায় তাকে বলে র্যালি - তাই সঠিক কতজন আবদেন করে সেই তথ্য পাওয়া যায় না। নানা হিসাব থেকে মনে হয় সেই সংখ্যাও প্রায় এক লক্ষ হবে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল উত্তরাখণ্ডে গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীতে চাকরি পাওয়া, পরিবারের এমনকি গ্রামের সম্মান বলে গণ্য হয়। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানায় সেনাভর্তির জন্য প্রাইভেট ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান আছে, সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টির মত। এছাড়া নথিভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানও কিছু কম নয়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অবসরপ্রাপ্ত সেনা পদাধিকারীরা এই সব ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। সেনা বাহিনীর চাকরি ভারতের যুবশক্তির একাংশের স্বপ্নের অঙ্গ।
অগ্নিপথ যোজনা এই স্বপ্নে আঘাত হেনেছে সরাসরি। কয়েক লক্ষ যুবকের বৎসরাধিক পরিশ্রম, অর্থ এবং স্বপ্ন এক ধাক্কায় ধুলায় মিশে গেছে। তার পাঁচটি কারণ। প্রথমত সেনা বাহিনীর পাকা চাকরি ও আজীবন পেনশনের সুরক্ষা আর রইল না। দ্বিতীয়ত, চার বছর বাদে তাঁরা যখন আবার চাকরি খুঁজবেন তখন তাঁদের আবার বিএ, বিএসসি, এমএ, এমএসসি বা ম্যানেজমেন্ট, ইঞ্জিয়ারিং ডিগ্রি লাগবে, নিদেন পক্ষে এমন অনেক বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা লাগবে যা সেনার চাকরিতে মিলবে না। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট আমেদাবাদে একটি বিশেষ কর্মসূচি আছে যার মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের সেই সব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তার সঙ্গে যুক্ত নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কম্যান্ডার কে পি এস সঞ্জীব কুমার একটি ইন্টারভিউতে জানালেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই অবসরপ্রাপ্তরা সাধারণ চাকরিতে বিবেচিত হন না, কারণ মিলিটারি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এমন বিশেষ ধরনের যে তা সাধারণ চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কাজে লাগে না। তাঁরা তাই এই সব অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করেন, তার সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা দেয় ওই ইনস্টিটিউট।
তৃতীয়ত, এই যুবারা এটাও জানেন, আজ প্রায় ১০ বছর ধরে সরকারি চাকরি একটানা কমে আসছে, শুধু তাই নয়, অন্তত ১৫-১৬টি রাজ্য সরকারের এমনকি কেন্দ্রীয় সরকরের বিভিন্ন চাকরিতে এক টানা ঠকানোর পালা চলছে— বিজ্ঞাপন বেরোচ্ছে তো পরীক্ষা হচ্ছে না, পরীক্ষা হচ্ছে তো রেজাল্ট বেরোচ্ছে না, রেজাল্ট বেরোচ্ছে তো মেডিক্যাল হচ্ছে না, মেডিক্যাল হচ্ছে তো নিয়োগপত্র আসছে না। আগ্রহী পাঠক এ ব্যাপারে এনডিটিভির রবিশ কুমারের প্রাইম টাইম শোয়ের ১৯টি এপিসোড দেখতে পারেন। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যে বড় গলায় ঘোষণা করে দিলেন, তাঁর রাজ্যে অগ্নিবীরদের সরকারি চাকরিতে প্রাথমিকতা দেওয়া হবে, সেই মধ্যপ্রদেশেই ২০২০ সাল থেকে সরকারি চাকরির পরীক্ষা হয়ে বসে আছে, এখনো নির্বাচিত প্রার্থীরা নিয়োগপত্র পান নি। চতুর্থত, অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের সরকারি চাকরিতে সত্যিই কতটা স্থান হয়, তার চালচিত্রও একই কথা বলে। সরকারি তথ্য উল্লেখ করে ২১ জুনের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা লিখছে সরকারি বিভাগ ও সরকারি কোম্পানির চাকরিতে ১০-২৪% পদ অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের জন্য সুরক্ষিত আছে ঠিকই, কিন্তু মাত্র ২ থেকে ৪% পদেই তাঁরা চাকরি পেয়েছেন। এমনকি আধা সামরিক বাহিনীতেও মাত্র ১% চাকরি পেয়েছেন এই অবসরপ্রাপ্তরা। কারণ হিসেবে বলা হয়, শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব, প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব। পঞ্চমত, সেনাবাহিনীতে প্রতি বছর ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ জওয়ান ভর্তি করা হয়, কিন্তু দু’বছর ধরে এই প্রক্রিয়া বন্ধ আছে। যাদের ২০২০-২১ সালে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রার্থীদের মেডিক্যাল পরীক্ষা পর্যন্ত হয়ে গেছে, শুধু নিয়োগপত্র পাবার অপেক্ষায় বসে ছিলেন প্রায় ৬০,০০০ প্রার্থী। তাঁদের নতুন করে শুরু করতে হবে। তাঁদের ক্ষোভের যথেষ্ট কারণ আছে।
এই যুবা শক্তির বৃহদাংশই মোদির সমর্থক এবং বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে এঁরাই বিজেপির সমর্থন বলয়ের অন্যতম অংশ। সেই কারণেই আরবান নকশাল ইত্যাদি কোনও আখ্যাতেই ভূষিত করে নি, এদের কারুর বাড়িতে বুলডোজার পৌঁছে যায় নি, এদের থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোনও ঘোষণাও হয় নি। ১০-১১টি রাজ্যে প্রায় ৬০-৬৫টি জায়গায় যে প্রতিবাদ দেখা গেল তাকে আন্দোলনের চেয়েও মারাত্মক ক্ষোভের সহিংস বহিঃপ্রকাশ বলাই যথার্থ হবে। সেই কারণেই পাঁচ দিনের মাথায় তার শক্তি নিঃশেষিত হয়ে গেল। আন্দোলন করতে গেলে ধৈর্য লাগে, সংগঠন ও প্রস্তুতিও লাগে। তার কোনওটাই দেখতে পাওয়া যায় নি।
ভবিষ্যতে কি হবে তাই নিয়ে অনেক জল্পনা চলছে। সেই জল্পনায় ঘি না দিয়েও একথা বলা যায়, আমাদের দেশে রাজনীতিরর যে হিংস্র বিবর্তন নিরন্তর ঘটে চলেছে, তার অঙ্গাঙ্গী অংশ হিসেবে যুবশক্তির একটা বড় অংশও ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে। চার বছর পর থেকে প্রতি বছর যে ৩৫,০০০ থেকে ক্রমশ ৫০,০০০, ২১-২২ বছর বয়সী বলবান নিষ্ঠাবান বন্দুকবাজ যুবা সমাজে ফেরত আসবে, তারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে তার একেবারেই কোনও নিশ্চয়তা নেই। সেই অবস্থায় তারা যে হিংস্র রাজনীতি বা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকবে সেই সম্ভাবনা বিপুল। উগ্র রাজনীতি ও সংগঠনগুলি যে এদেরই খুঁজবে, তার বহু প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সারা বিশ্ব জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। ভারতে হিংস্র রাজনীতির বাহক যারা, তারা যে এই বিশেষ প্রজন্মকে লুফে নেবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পাশাপাশি মাফিয়া নিয়ন্ত্রিত অসংগঠিত অর্থনীতিও এই প্রকল্পে বিনা খরচায় লাভবান হবে।