বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায়, সরকার গঠনের সাফল্য পেয়ে রাজ্যের শাসক তৃণমূল দল নিশ্চয়ই উৎসাহিত হতে পারে এবং হয়েছে। কিন্তু যখন দেখলাম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে থাকা মানুষগুলো, কয়েকটি দল, গোষ্ঠীও তৃণমূলের ওই জয়ে উৎসাহিত এবং আনন্দিত, তখনই অশনি সংকেত দেখলাম। কারণ আমি এমন অনেকেই চিনি জানি, যারা সত্যি সত্যিই ফ্যাসিবাদী বিজেপি ও আরএসএর’র বিরোধী। তাঁদের কেউ কবি, কেউ অভিনয়ে বা সাহিত্যে যথেষ্ট স?ম?্?ম?া?ন? অর্জন করেছেন, তাঁরা নিজ গুণেই জনগণের কাছে আইকন। তাঁদের কারুরই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূল দলের আনুকূল্যের কোনও প্রয়োজন নেই। তাঁরা কেন উৎসাহিত!
রাস্তায় যে সাধারণ মানুষ আবির মেখে নেচেছে তাদেরও কোনও দোষ দেই না। কারণ যাদের ওপরে দায়িত্ব ছিল দেশের সাধারণ শ্রমজীবীদের চেতনাগত দিক থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করার, দায় তো তাদের। অর্থাৎ বামপন্থী দলগুলোর। আজকে তাদের দুর্বলতার জন্যই এই অবস্থা দেখতে হচ্ছে। এই মন্তব্যটা শুধু এই দেশ বা রাজ্যের বামপন্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেই আছে এই মন্তব্যের বাস্তবতা। বিশ্ব পরিস্থিতি যেমন দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমনি বিশ্ব ও জাতীয় পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে রাজ্যের রাজনীতিতে। মানুষের চেতনার জগতে।
এবার এক এক করে বিষয়গুলো দেখা যাক।
একথা সকলেরই জানা, তৃণমূলকে ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দল হিসেবে, ভোটদাতাদের কাছে গত পাঁচ বছরে তাদের কাজের হিসাব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এই ভোটটা রূপান্তরিত হয়েছিল বিজেপি বিরোধী ভোটে। এটাই ছিল তাদের বড় সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ। বামেদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হল, অধিকাংশ গরীব নিম্নবিত্ত মানুষের ভোট বিভাজিত হয়েছে দুই দক্ষিণপন্থী দল— বিজেপি ও তৃণমূল-এর মধ্যে। এই পরিস্থিতি নির্মাণের কৃতিত্ব অবশ্য শুধুমাত্র তৃণমূল বা বিজেপি নয়। মিডিয়ার আনুকূল্য এই ফলাফলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
রং বেরঙের মানুষরা ভোট দাতাদের কাছে প্রচার করেছিল, “নো ভোট টু বিজেপি’। কর্পোরেট মিডিয়াও নেমে পড়েছিল পালা করে তৃণমূল ও বিজেপি’র প্রচারে। বামেদের প্রায় ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। মিডিয়া ভালো করেই জানতো বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই সাজানো বাইনারি প্রচার করে কার্যত তারা তৃণমূলের পাশে দাঁড়াল।
ফিনান্স পুঁজি ও কর্পোরেট পুঁজি যেমন নিজেদের মুনাফার স্বার্থরক্ষায় বামপন্থীদের রুখতে চায়, ঠিক তেমনি বিজেপি, তৃণমূল তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে চায় বামপন্থীদের শেষ করতে।
বিজেপি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তারা কিন্তু দেশের শাসন ক্ষমতায় আছে। দলটি মনুবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। তাদের হাতে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক ন্যায়, দেশের আর্থিক সার্বভৌমত্ব। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের ভূমিকায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক শক্তির আঁতাত। এই আঁতাতের ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত। রাষ্ট্রীয় মদতে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর চলছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠিত হিংস্র আক্রমণ। বিরুদ্ধ কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতা। অন্য দেশের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর মতো বিজেপি দলটিও এক নেতা নির্ভর দল। তিনিই মূখ্য মুখ এবং শেষ কথা। এই দলটির আদর্শ ও সংগঠনের দিক নির্দেশ হয় আরএসএস থেকে। এই পর্যন্ত পড়ে পাঠক বলতেই পারেন, “তাহলে তো এই বিজেপি ভোটে পরাজিত হলে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা যেতেই পারে”।
এই ফলাফল মোটেও আনন্দ উচ্ছ্বাসের ছিল না। মনে রাখতে হবে, বিজেপি পরাজিত হলেও এই প্রথম এ রাজ্যে দু’ কোটির বেশি ভোট এবং ৭৭টি আসন পেয়েছে বিজেপি। আপনি কি মনে করেন, বিজেপি’র পরাজয়ের এই ছবি কি ফ্যাসিবাদের বিপদের আশঙ্কা আগের থেকে কমার না বাড়ার লক্ষণ? বিপদ কি কমলো?

জানি, তৃণমূলের মধ্যেও অনেকে আছেন যাঁরা বাম বিরোধী হলেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী। রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ বিরোধী অথচ বামপন্থী নয়, আমি তাদের জন্যেই তৃণমূলের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছি। আলোচনা ও চর্চার জন্য। বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
(১) তৃণমূল দলটিরও মধ্যেও দেখা যাচ্ছে একজন নেত্রী নির্ভরতা। শেষ কথা তিনিই। সুপ্রিমো তিনিই! তিনিই কার্যত সব নির্বাচন কেন্দ্রে প্রার্থী। তাঁর মৌলিক পরিচয় তিনি তীব্র বাম বিরোধী। আভিজাত্যের তকমা বিরোধী হিসেবেই তাঁর জনপ্রিয়তা।
(২) এই তো তিনি বললেন, “আরএসএস এত খারাপ বলে আমি মনে করি না”। মাননীয়া নেত্রীর এই উক্তির পরেই দক্ষিণবঙ্গের আরএসএস মুখপাত্র বিপ্লব রায় তাঁর ওই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, “তাৎপর্যপূর্ণ”। কখন মুখ্যমন্ত্রী এই উক্তি করেছেন? যখন বিজেপি’র শাসনে উপরে উল্লেখিত ওই আক্রমণগুলো সমাজ জীবনে নেমে এসেছে।
(৩) তৃণমূল দলের জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের শাসন কালে। সেই সময়ে কংগ্রেসেরও সারা দেশে যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি। তার মধ্যেই জন্ম হয় তৃণমূল কংগ্রেস। শোনা যায়, কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির পিছনে ছিল আরএসএস-এর গোপন পরিকল্পনা। যাদের লক্ষ্য বামপন্থী, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস মুক্ত ভারত গঠন— “বিরোধী মুক্ত ভারত” গঠন।
(৪) মমতা ব্যানার্জি কেন কোনও দিন আরএসএস-র নিন্দা দূরের কথা, সমালোচনা করেন না!
(৫) আরএসএস-এর মতাদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে কি বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব?
(৬) ২০২০ সালে ১৯শে ডিসেম্বর তৃণমূল ত্যাগ করে শুভেন্দু অধিকারী। ওই দিনই তিনি অমিত শাহের হাত থেকে বিজেপি’র ঝান্ডা নেওয়ার সময়ে বলেন, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমি অমিত শাহের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলছিলাম। একজন রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সঙ্গে মিটিং করছেন, যোগাযোগ রাখছেন অথচ মুখ্যমন্ত্রী জানতেন না, একি বিশ্বাসযোগ্য!
(৭) তৃণমূল নেত্রীর এক সময়ের প্রধান সেনাপতি মুকুল রায় বিজেপি-তে যাওয়ার পর বলেছিল: বিজেপি’র মদত না থাকলে তৃণমূল দলটারই জন্ম হতো না।
আবার এই মুকুল রায় তৃণমূলে ফিরে এসে বলল, বিজেপি আর তৃণমূল এক। কেন?
(৮) ভারতে প্রথম আরএসএস-এর প্রচারক হিসেবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। পরে তিনিই হন প্রধানমন্ত্রী।
অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর যোশীরা বা বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা কেউই কিন্তু আরএসএস-এর প্রচারক ছিলেন না। এই তথ্য জানার পরেও কেন ২০০২ সালে গুজরাটের ভয়াবহ দাঙ্গার নিন্দা করে সংসদে বিরোধী দলগুলোর নিন্দা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিজেপি, আরএসএস-এর পাশে দাঁড়িয়েছিল তৃণমূল?
(৯) ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির জয়ের পর তৃণমূলের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির পুষ্পস্তবক পাঠানো কি নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল? নিছক সৌজন্য!
(১০) ২০০৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসেই আর এস এস’র কার্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি? অনুষ্ঠানটি ছিল সঙ্ঘ মুখপাত্রের বই প্রকাশের। সেখানেই মমতা ব্যানার্জি দেশপ্রেমিক (!) আরএসএস-এর সাহায্য চেয়ে ছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের উচ্ছেদের জন্য!
আরএসএস-এর পক্ষ থেকেও কেন তাঁকে বলা হয় “দেবী দূর্গা”!
তৃণমূল ও বিজেপি-আরএসএস বোঝাপড়ার দীর্ঘ তালিকা থাকলেও শেষ করবো আর কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে।
(১১) এই বছর ২০২২র মে মাসে বসেছিল কেশয়ারীতে আরএসএস প্রধান মোহন ভগবতের প্রশিক্ষণ শিবির। দেখা গেল, সমস্ত প্রোটোকল উপেক্ষা করে প্রশাসনকে দিয়ে তার কাছে মুখ্যমন্ত্রী ফল মিষ্টি পাঠালেন। কেন!
(১২) ২০১১ সাল পর্যন্ত এই রাজ্যে আর এস এস’র শাখা সংগঠন ছিল মাত্র ৪৫০টি, আর গত এগার বছর তৃণমূলের শাসনে তাদের শাখা বেড়ে হয়েছে ১৫০০।
(১৩) বিজেপি ও তৃণমূলের এই মিল বা অন্তমিলের বাহিরে লক্ষ্য করা যায়, কর্পোরেট পুঁজি, বৃহৎ পুঁজি ও ফিনান্স পুঁজির স্বার্থের প্রতিনিধি বিজেপি’র মতোই এই রাজ্যে একাধিক ক্ষেত্রে তৃণমূল সেই স্বার্থের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। লকডাউনের দু’বছর বাদ দিয়ে প্রতি বছরই তৃণমূল সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাণিজ্য মেলা করে আসছে। বাণিজ্য মেলা থেকে শিল্প কি হয়েছে সে কথা থাক।
এবার ২০২২এর বাংলার বাণিজ্য মেলায় প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে ঘোষণা হয়েছিল। আসেন নি। জগদীশ ধনকড় গিয়েছিলেন। তিনি টিপ্পনি কেটে বক্তব্যও রেখেছেন। তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী ওই মঞ্চ থেকে বলেছেন, আপনি দেখবেন এখানে এসেছে বলে যেন শিল্পপতিদের বাড়িতে কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে ইডি পাঠিয়ে না দেওয়া হয়। ইত্যাদি। এই বাণিজ্য মেলায় লক্ষ্যণীয় ছিল গৌতম আদানির উপস্থিতি। নিন্দুকেরা বলেন, দেশ চালাচ্ছে গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানি। এক সময় মমতা ব্যানার্জি এই গৌতম আদানিকেই কটাক্ষ করেছিলেন। অথচ তাঁকেই দেখা গেল এই মঞ্চে। এও তো জানেন, কিছুদিন আগে নবান্নে এসে নিভৃতে বৈঠক করে গিয়েছিলেন তাঁর সুপুত্র। তারপরেও গৌতম আদানিকে দেখা গেছে এই রাজ্যেই একাধিকবার চক্কর খেতে। কেন? (ক) তাজপুর বন্দর নির্মাণ, (খ) দেউচা পাচামি কয়লা খনি হাতানো।
মেলা মঞ্চে গৌতম আদানি ভাষণে অবশ্য মমতা ব্যানার্জির স্তুতি করলেন এবং ঘোষণা করলেন তিনি এই রাজ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দরে এত টাকা লাগবে না। তবে বাকি টাকা কোথায় ঢালবেন? অবশ্য গৌতমজী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অঙ্গিকার করেন নি। আদিবাসী মানুষের আইনগত সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এরা এখন নজর দিয়েছে তৃণমূল সরকারের সখ্যতায়।
তবে বিজেপি ও তৃণমূল দুই দলের মধ্যে এতো মিল, অন্তমিল থাকার পরেও এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে না যে, তৃণমূল নামের রাজ্যের শাসক দলটি একটি ফ্যাসিবাদী দল। একটি রাজ্যের ক্ষমতায় থেকে কোনও দলই পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদী দল হয়ে উঠতে পারে না। তবে হিংস্র ফ্যাসিবাদী প্রবণতা সহ তৃণমূল দলটি এই মূহুর্তে পশ্চিমবাংলার জনগণ এবং এই রাজ্যের গণতন্ত্রের সব থেকে বড় বিপদ।
বিগত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের সূচনায় সোভিয়েতের পতনের পর বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী প্রবণতার বিস্তার ঘটেছে। একটি রাজনৈতিক গবেষণা পত্রে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, পশ্চিম ইউরোপের ২১টি দেশে এই রকমের পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। চিরাচরিত যে শ্রমজীবীরা বামপন্থীদের সমর্থন করতেন, এখন তারা ঢলে পড়ছে দক্ষিণপন্থার দিকে।
এই তো সেদিন বর্ধমানের গ্রামের একজন খেতমজুরকে তার মনিব প্রশ্ন করছে,
“কুঞ্জ, তোরা কি এবার পঞ্চায়েতে আসবি”?
কুঞ্জ উত্তরে বলে, “তোমরা ভোট দিলেই আসবো”!
মনিব বলে, ‘আমরা তো আগেও তোদের ভোট দিতাম না। এখনও দেব না। তাও তোরা পঞ্চায়েত জিতেছিস। এখন তোরা হেরে যাস কেন জানিস? আগে তোরা খেতমজুরা সকলে বামেদের ভোট দিতি। এখন তোদের অনেকেই বামেদের ভোট দিস না, এই জন্যেই হারিস! দেখিস না, ভোট করে তোদেরই ঘরের ছেলেরা!” অর্থাৎ গরীব মানুষ দক্ষিণপন্থীদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ ফ্যাসিবাদী প্রবণতার ইঙ্গিত।
ইতিহাসে দেখা যায়, কোনও দেশে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পরে বৃহৎ পুঁজিপতিদের উগ্র অংশটি তার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে। গণতন্ত্রের পথে ক্ষমতায় আসলেও যখন তারা দেখে, সংবিধানিক ব্যবস্থাপনায় তাদের অভিপ্রেত শ্রেণীস্বার্থের আরও প্রসার সম্ভব নয় তখন তারা গণতন্ত্রের কাঠামোর ওপরই আঘাত হানে। গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে। অবশ্য ফ্যাসিবাদের এই উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির দুর্বলতা। সমাজে শ্রমজীবীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক চেতনার অবনমন। এই রকম পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই শ্রমজীবীরা হতাশ হয়ে পড়ে বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলোর ওপর। এই পরিপ্রেক্ষিতে তারা জড়ো হয় ফ্যাসিবাদী দলের ঝান্ডার তলায়। আর এই সুযোগের সৎব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী দলগুলো। আজগুবি মিথ্যা প্রচার বার বার বলে মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। কুরুচিকর বচন ও আচরণের মধ্যে দিয়ে গরীব অল্প শিক্ষিত মানুষদের আকর্ষণ করে। এরা রাজনীতিতে খোলাখুলি ভাবে ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, ভাষা ইত্যাদি ব্যবহার করে।
বর্তমানে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী শাসকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণকে বোঝাতে চাইছে এই দেশের জাতীয় সংস্কৃতি একমাত্রিক এবং তা অবশ্যই হিন্দু। আর এর ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে তাদের হিন্দুরাষ্ট্র। ফ্যাসিবাদীরা নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বে বিশ্বাস করে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা অন্য রাজনৈতিক দলকে কোনও স্পেস দেয় না।
উপরের উল্লিখিত ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশ ও রাজ্যের শাসকদের ভূমিকা তুলনা করলে দেশের ফ্যাসিবাদের চরিত্র স্পষ্ট হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট জার্মানি আক্রমণ করেছিল সোভিয়েতকে। পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর ওপর নামিয়ে এনেছিল ভয়ঙ্কর আক্রমণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েতের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধে ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হয়। পৃথিবীর জনমনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র বিতৃষ্ণাও গড়ে ওঠে। কিন্তু পুঁজিবাদীদের ক্রুর অংশ তাদের শোষণের মৌরসি পাট্টা চালানোর স্বপ্ন ছাড়াতে পারে নি। পরাজয়ের পর মূহুর্ত থেকেই তারা সলতে পাকানোর কাজ চালাচ্ছিল। “যেখানে যেমন সেখানে তেমন” নীতিতে জনমতকে নিজের পক্ষে নিতে চেষ্টা করে। মনে পড়ে, কালো ধন উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি, প্রত্যেকের হাতে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার, সবকো সাথ সবকো বিকাশ কিংবা পেটে ভাত হাতে কাজ ইত্যাদি আরও কত কি! ভাষণে কথায় হিপনোটাইজ করে ফ্যাসিবাদীরা। আমাদের দেশ ও রাজ্যে এই তো চলছে।
আজকেও দেশে দেশে নব্য ফ্যাসিবাদীদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হল শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিগুলোকে কোণঠাসা করা। আর সেই জন্যেই তারা সন্ত্রাস ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন ঘটায় জনমতকে বিভ্রান্ত করে নিজের পক্ষে টানতে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল, এরা জনগণের কথা বললেও তারা কখনও চায় না এই জনগণ শ্রেণী ভিত্তিক ঐক্য ও তার ভিত্তিতে সংগ্রাম গড়ে তুলুক। জনগণকে অধিকারের দাবিতে সংগঠিত হতে দেয় না। এই শাসকের কাছে জনগণ হয়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গের যোগফল। যারা ওই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করে কিছু আর্থিক প্রাপ্তি আদায় করে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কখনই পেশা, জীবিকা বা শ্রেণীর সম্মিলিত লক্ষ্য নির্মাণ করতে বাধা দেয়। কারণ ফ্যাসিবাদীরা জানে শ্রেণী চেতনা বিযুক্ত জনগণই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের উর্বর জমি। রাজ্য কিংবা কেন্দ্রের সরকারি কাজের দিকে নজর করলেই দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছাই আইন, নিয়ম, সংবিধান! লাল ফিতের বিরুদ্ধে একক মুখ শাসকের, সঙ্গে প্রতিবাদী ভাবমূর্তি, ইমেজ! গরীবের মানুষেরাও মেনে নেন তাদের ওপরে শাসকদের জবরদস্তি ও হুকুমগুলো। শ্রমজীবী স্বার্থ রক্ষার আইন, বিধি কিছুরই তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই। ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট এসবেরই তীব্র বিরোধী এরা।
এই শাসকরা জনপ্রিয় কিছু কিছু প্রকল্প নিচ্ছে। তাতে মানুষ কিছু উপকারও পাওয়া যাচ্ছে। তবে তাদের ওই প্রকল্পগুলো কখনই স্থায়ী সর্বজনীন অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। উজালা থেকে মোদি, মমতার নাম পদ উল্লিখিত প্রকল্পগুলো তার উদাহরণ। নির্বাচনী ডিভিডেন্ট আদায়ই এই প্রকল্পগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য।
ফ্যাসিবাদী শক্তি কাজ করে বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক অভিমুখকে মর্যাদা দিয়ে। একদিকে, বিশ্বায়নের ফর্মুলা অনুযায়ী সরকারি বাজেটকে আম জনতার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করে, অন্যদিকে, জনমতকে বিশ্বায়নের জন্য খোলা ময়দান গড়তে সাহায্য করে। এইসব প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় শাসকদের সঙ্গে রাজ্যের শাসকদের দ্বন্দ্ব বেধেছে। আলোচনা শুরু হয়েছে দান খয়রাতি চালানো নিয়ে। অনেকেই “তু তু মে মে” করছে। এরা কেউ কিন্তু বলছে না, “কর্পোরেটদের ট্যাক্স বা অন্যভাবে ছাড় দেয়া চলবে না”।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হল শ্রমজীবীদের ঐক্য গড়ে তোলা। আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, সচেতন জনমত গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি স্তরে থাকতে হবে শ্রেণীদৃষ্টির পরিষ্কার প্রতিফলন।
বিকল্প বামপন্থা
আজকের পরিস্থিতিতে এই উৎসমুখে পৌঁছাতে গেলে ওপরের সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই যে কর্তব্য পালন করতে হবে তা হল, শ্রেণী সংগ্রামের আধারে গরীব হতাশাগ্রস্ত মানুষদের আকর্ষণ করে সংগঠিত করা এবং শুধুমাত্র প্রচার আন্দোলন নয় শ্রেণী সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুতি চালানো। যে ভয় শাসকরা শ্রমজীবীদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে সেই ভয়ই শাসকদের মধ্যেও ঢুকিয়ে দিতে হবে। যেখানেই উদ্বৃত্ত মূল তৈরি হয়, সেখানেই শ্রেণী সংঘর্ষ গড়ে তুলতে হবে। খেতেখামারে, কলে কারখানায়, বন্দরে, খনিতে কিংবা পরিষেবা ক্ষেত্রে চলবে এই সংগ্রাম। আভিজাত্য বিরোধী চেতনা গড়তে হবে। লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে শ্রমজীবী মানুষ চিনতে শেখে কে তার সমাজের কাঠামোগতভাব শ্রেণী শত্রু বা কে তার প্রকৃত মিত্র।
সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষ বামপন্থীদের নেতৃত্বে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অনেক অধিকার অর্জন করেছিল। এখন তারা মোট শ্রমশক্তির নিরিখে সংখ্যালঘু। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় সংগঠিত ক্ষেত্রে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ ও আউটসোর্সিং চলছে। এই অংশের শ্রমজীবীদের কাছে সংগঠিত শিল্পের স্থায়ীদের “বিশেষ সুবিধাবাদী” অংশ বলে শ্রমজীবীদের মধ্যে বিভাজনের চেষ্টা চালাচ্ছে পরিকল্পনা করেই। সংগঠিত শ্রমিক সংগঠনগুলির উদ্যোগ নিয়ে ঠিকা ও চুক্তি শ্রমিকদের জন্য লড়তে হবে।
ছোট শিল্পের শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ, মুটে মজুর, গৃহ সহায়িকা, গিগ কর্মী, খেতমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক এরাই এদেশের শ্রমজীবীদের প্রধান গরিষ্ঠ অংশ। সমাজে এরা দরিদ্র নিপিড়িত হলেও, এই অংশের শ্রমজীবীদের শ্রেণী অস্তিত্ব সমাজে স্বীকৃতি পায়নি। অথচ এই শ্রেণীর মানুষদের জন্য লড়াইতেই বামপন্থীদের আগামীদিনের ভবিষ্যৎ।
বিজেপি বা তৃণমূলের চরিত্র বদলে যাবে না। একটা দলকে ঠেকাতে আরেক দলকে ডেকে কোনওভাবেই জনজীবন নিরাপত্তার দিশা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না। কর্পোরেট-সম্প্রদায়িক শক্তির ছত্রছায়া থেকে লাল ঝান্ডার নীচে শ্রমজীবীদের সামিল করা সম্ভব হবে কিনা তার ওপর নির্ভরশীল ফ্যাসিবাদের পরিণতি। আগামীদিনের লড়াইয়ে শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত করতে বামপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।
সংসদীয় সংগ্রামে বামপন্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটা হারিয়েছে এবং সেজন্যও সমাজের একটা অংশে তাদের প্রতি আস্থা হ্রাস হয়েছে। প্রতি পদক্ষেপে এই আস্থা উদ্ধারের প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।
পাশাপাশি, যারা বামপন্থায় বিশ্বাসী তাঁদের প্রত্যেকের আত্ম-মূল্যায়নের প্রয়োজন: আমরা কি বামপন্থী সংস্কৃতি অনুসরণ করছি তো? আমাদের দৈনন্দিন যাপনে কি বামপন্থার আদর্শ প্রতিফলন ঘটছে? প্রতিদিনের কাজের মাঝেই আত্ম-সমীক্ষা করে যেতে হবে, বামপন্থার বিশ্বাসযোগ্যতা সামাজিক স্তরে এবং ব্যক্তিগত পরিসরেই ঠিক রাখতে পারছি কিনা!