বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ আগস্ট, ২০২২— ডলারের তুলনায় টাকার দামে পতন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই ৮০ টাকা ছাড়িয়েছে ডলারের দাম। এর মানে ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম কমেছে। আগে ১ ডলার মূল্যের পণ্য কিনলে দাম দিতে হতো, ধরা যাক, ৭৫ টাকা। এখন দিতে হবে ৮০ টাকা। অর্থাৎ এখন ১ ডলার মূল্যের পণ্য কিনলে দাম দিতে হবে বেশি। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলির অনুমান, ৮০ টাকায় না থেমে ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম পৌঁছতে পারে ৮২ টাকায়। তাতে আরও বেশি চাপ পড়বে আমাদের বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয়ের ভাণ্ডারে। তেমন সঙ্কট হলে অবস্থা সামাল দিতে ঋণের জন্য হাত পাততে হতে পারে আইএমএফের কাছে। এবং সেই সুযোগে আরও অনেক জনবিরোধী শর্ত চাপিয়ে দেবে আইএমএফ। ঠিক যেমন করা হচ্ছে শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।
স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দু’ দু’ বার বড়সড় সঙ্কটে পড়েছে ভারতীয় টাকা। রিপোর্ট অনুয়ায়ী, ১৯৪৯ সালে ১ ডলার কেনা যেত মাত্র ৪ টাকা ৭৫ পয়সায়। তখন ১ পাউন্ড স্টার্লিংয়ের জন্য দিতে হতো ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা। টাকা প্রথম বড় সঙ্কটে পড়ে ১৯৬৬ সালের জুনে। তখন টাকার দাম কমে যায় ৩৬.৫ শতাংশ। ফলে ডলারের বিনিময়ে তখন দিতে হতো ৭ টাকা ১০ পয়সা। এটাই চলেছিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। পরে ব্রেটন উড সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে যায়।
এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমেছে। মানে ১ ডলার কিনতে আগের চেয়ে আরও বেশি টাকা দিতে হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বে চালু হয় নয়া উদারনীতিক অর্থনীতি। তখন থেকে বাজারই নির্ধারণ করে আসছে টাকার দাম। সারণি থেকে বোঝা যায়, ১৯৯৫ সাল থেকে ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম কমেছে ধারাবাহিকভাবে। ২০০৭ সালের মাঝামাঝি ডলারের তুলনায় টাকার বিনিময় হার ছিল প্রায় ৪১ টাকা। যখন ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় এল তখন ডলারের তুলনায় টাকার দাম ছিল প্রায় ৬০ টাকা। এখন সেটাই ৮০ টাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। কখনও ৮০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘকালীন সময়ের বিচারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ভারতীয় টাকার গড় মূল্য হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা ধারাবাহিক। খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে খুব দ্রুত নেমে যাচ্ছে টাকার দাম এবং তা আর ফেরানো যাচ্ছে না। এর মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে টাকার বিনিময় হারে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতার পর্ব।
এই প্রবণতার কারণ দুটি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতির বিদ্যমান হারের তুলনায় সাধারণভাবে ভারতে মুদ্রাস্ফীতির হার সব সময়ই বেশি থাকে – এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ক্রয়ক্ষমতা যতটা না কমে তার তুলনায় দেশের বাজারে টাকার ক্রয়ক্ষমতা আরও বেশি দ্রুতগতিতে কমে। তাতেই ডলারের তুলনায় টাকার দাম আরও কমে। দ্বিতীয়টি কারণ হল, বছরের পর বছর ধরে পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানি করে দেশের যে মোট বিদেশি মুদ্রা আয় হয় তা আমাদের আমদানি বাবদ খরচের চেয়ে কম। রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ এতটাই বেশি যে, বিদেশে কর্মরত ভারতীয়রা যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা দেশে পাঠান তাতেও সেই ফারাক পূরণ হয় না। কাঠামোগত ভাবেই ভারত বিদেশি মুদ্রা ঘাটতির অর্থনীতি এবং এই ঘাটতি পূরণের জন্য ভারত নির্ভর করে বিদেশি পুঁজি আসার ওপর। এবং এভাবেই জমিয়ে তোলে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার। যখন কম সময়ের ব্যবধানে টাকার দামে বড় ধরনের ওঠানামা হয় তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করতে হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে। জমানো বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ব্যবহার করে আরবিআই বিদেশি মুদ্রা কিনে কিংবা বিক্রি করে সঙ্কটমোচনে হস্তক্ষেপ করে।
ভারতে বিদেশি পুঁজি আসে দু’ ভাবে। এক, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই। এফডিআই থেকে রপ্তানি তেমনভাবে বাড়ে না। এর থেকে বিদেশি মুদ্রার আয়ও বাড়ে না। এছাড়া রয়েছে অস্থির চরিত্রের পুঁজির চলাচল যা দ্রুত আসতে পারে এবং দ্রুত চলেও যেতে পারে। যেমন শেয়ার বাজারে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ (এফআইআই)। যেহেতু এধরনের বিদেশি পুঁজির অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী স্রোত বিদেশি মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহকে প্রভাবিত করে, তাই এই বিষয়টি বিদেশি মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যখন যতটা পরিমাণ পুঁজি দেশের বাইরে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি পরিমাণে আসছে, তখন টাকার দাম বাড়ে। উল্টোটা ঘটলে টাকার দাম কমে। ভারতে মুদ্রাস্ফীতি হার খুব চড়া, শুধু মাত্র এতেই টাকা ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ে না। যদি বিদেশি বিনিয়োগকারিরা ভেবে নেয় যে ভারতে মুদ্রাস্ফীতির হার চড়া হবে, তাহলেই টাকার দাম কমবে স্রেফ আশঙ্কাতেই। আর তখনই বিদেশি পুঁজি বহির্মুখী হবে এবং টাকার দাম আরও কমতে থাকবে।
টাকার দাম কমলে আমদানি খাতে বাড়তি খরচ করতে হয়। এর মধ্যে পড়ে জ্বালানি তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় আমদানির খরচও। এবং জ্বালানি তেলের আমদানি খাতে খরচ বাড়লে তার প্রভাব সব জিনিসের দামের ওপর গিয়ে পড়ে। এছাড়াও, পুঁজির চলাচল প্রভাবিত হয় বিশ্ব অর্থনীতির নানা ঘটনার কারণেও। এর দরুন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিরপেক্ষভাবেই ওঠাপড়ার অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আসল সমস্যা হল অর্থনীতিকে খুব বেশি মুক্ত করে রাখলে এবং রপ্তানির তুলনায় আমদানি বৃদ্ধির ফারাক মেটাতে বিদেশি পুঁজি ডেকে আনার চেষ্টা করলে বিপদ বাড়ে। এর জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারিদের ‘আস্থা’বজায় রাখাটা সরকারের কাছে একটা আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠে। সেটা করতে গিয়ে সরকার এমন সব নীতি গ্রহণ করতে থাকে যাতে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে গ্যারান্টি দিতে গিয়ে অর্থনীতিতে চাহিদাকেই সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়। সুদের হার বাড়ানো এবং রাজকোষ ঘাটতি কম রাখতে গিয়ে সরকারি খরচ কাটছাঁট করাটাই তখন এই পরিস্থিতি সামলানোর উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
যদি গত ৮ বছরে বিদেশি মুদ্রার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও সঙ্কট এড়াতে ভারত সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তার কোনও কৃতিত্বই মোদি সরকার দাবি করতে পারে না। মোদি দিল্লির ক্ষমতায় বসার আগে অবশ্য টানা তিন বছর জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরেই ছিল। সেই ধাক্কা সামালাতে হয়েছিল ইউপিএ সরকারকে। কিন্তু জুলাই ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে একেবারে ধ্বস নেমেছিল এবং তা কখনই আগের দামে ফিরে যায়নি। এই পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়েছে মোদি সরকার। তবে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অনেক বেশি টাকা দিয়ে তা কিনতে হচ্ছে। ফলে টান পড়ছে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে। ভারতে বেকারির হার বেশ উঁচু এবং বেশিরভাগ ভারতীয়ের আয় খুবই কম। ফলে চাহিদা বাড়ে না। মেক ইন ইন্ডিয়ার মতো নীতিগুলি ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর কাজে কোনও রকম উৎসাহ যোগাতে পারেনি। চাহিদার যখন এই দশা, তখন বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাও তাদের বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নতুন উৎপাদন ক্ষমতা সৃষ্টিতে আগ্রহী হয় না। ডিমানিটাইজেন, জিএসটি চালু করা এবং কোভিড অতিমারি সামলানোর কাজে ব্যর্থতার ফলে সমস্যাগুলি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ওপর মার্কিন ফেডারাল রিজার্ভ দফায় দফায় সুদের হার বাড়ানোয় বেশি সুদের লোভে বিদেশি বিনিয়োগকারিরা এদেশ থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়ে ডলারে বিনিয়োগ করবেন। এতেই ডলারের তুলনায় টাকার দাম আরও কমবে।
ফলে এখন দেখা যাচ্ছে এধরনের সবকটি সমস্যা একসঙ্গে এসে ধাক্কা দেবে– দেশ এমন সম্ভাবনার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। শোচনীয় বৃদ্ধির হার, ক্রমবর্ধমান বেকারি, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং সম্ভবত বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডারের একটা সঙ্কট – সবকিছুই এখন ভারতের সামনে বড় রকমের সমস্যা। অর্থনীতিতে কার্যকর ভাবে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা আত্মসমর্পণ করে বসে থেকেছে সরকার এবং তার দরুনই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের অবস্থা এখনও শ্রীলঙ্কার মতো হয়নি। কিন্তু গোটা বিশ্বের অর্থনীতির অবস্থা যেহেতু বেহাল হয়ে উঠছে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে না— একথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।