বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

আফস্পা: মূল ভুখন্ডে প্রতিবাদ জোরালো হোক

আফস্পা: মূল ভুখন্ডে প্রতিবাদ জোরালো হোক

রঞ্জিত শূর

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১— সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে যাবে তাই তাদের নির্বিচারে মানুষ খুনের অধিকার দিতে হবে? প্রশ্নটা ফের উঠে এল নাগাল্যান্ডে আসাম রাইফেলসের জওয়ানদের হাতে ১৪ জন কয়লা শ্রমিকের হত্যার ঘটনায়। সারা দেশের মানুষ ৪ঠা ডিসেম্বরের ওই গণহত্যার ঘটনায় ফের সোচ্চার হয়েছে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট (আফস্পা) অর্থাৎ সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের দাবিতে। নাগাল্যান্ড, মণিপুর সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সেনাবাহিনীর হাতে নির্বিচার গণহত্যা এই প্রথম নয়। মনিপুরে এরকমই এক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আফস্পা বাতিলের দাবিতে টানা ১৬ বছর ধরে অনশন করেছেন ইরম শর্মিলা চানু। আসাম রাইফেলস এর জওয়ানদের হাতে ১৪ জন কয়লা শ্রমিকের হত্যার ঘটনায় সারা দেশের মানুষ ফের সোচ্চার হয়েছে 'আফস্পা' বাতিলের দাবিতে। যখনই আফস্পা বাতিলের জন্য জনমত তীব্র হয়েছে সেনা কর্তারা ও সরকার অজুহাত দিয়েছে সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল করা যাবে না কারণ সেনা বাহিনীর মনোবল ভেঙে যেতে পারে। সেনা কর্তাদের হুঁশিয়ারিকে অজুহাত করে পিছিয়ে গেছে রাজনৈতিক দলগুলি- কংগ্রেস বা জনতা দল বা বিজেপি পরিচালিত সরকার। সবার ক্ষেত্রেই ঘটেছে একই ঘটনা। দেশের নীতিনির্ধারণে সেনা বাহিনীর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত আপত্তিকর। তবুও গণতন্ত্রের এই পূজারীরা সেই হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে টিকিয়ে রেখেছে এই ভয়ঙ্কর কালাকানুনকে। আইনে বলা আছে প্রশাসনের প্রয়োজনে সেনাবাহিনী যে কাউকে গুলি করে হত্যা করলেও তাকে কোনও কৈফিয়ত দিতে হবে না। গ্রেপ্তার, তল্লাশি, ভাঙচুর চালানো - প্রশাসনকে সাহায্যের প্রয়োজনে সেনারা সবই করতে পারে। কোন প্রশ্ন তোলা হবে না। সবটাই 'ইন গুড ফেইথ' করেছে ধরে নিতে হবে। ভালোর জন্য করছে! আর এই ভালোর জন্য করে গত সাত দশক ধরে সেনাবাহিনী এই আইনকে ব্যবহার করে হত্যা, ধর্ষণ, গুম খুন লুটতরাজ, কি না করে চলেছে কাশ্মীর এবং সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে। কারও সাজা হয় না। চরম ইমপিউনিটি। সুপ্রীমকোর্টও এই 'ইমপিউনিটি' বা শাস্তিহীনতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তি জানিয়েছে রাস্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলও। বাতিলের পরামর্শ দিয়েছে বারবার। শোনেনি ভারত সরকার।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যে ছবি উঠে এসেছে ৪ ডিসেম্বর এর ঘটনার তা থেকে জানা যাচ্ছে ৪ ডিসেম্বরের ঘটনা কোনও অপরিকল্পিত হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। বরঞ্চ পরিকল্পিতভাবেই, গভীর ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছিল। কারণ হত্যাকাণ্ডের পর এই সেনারা মৃত শ্রমিকদের পোশাক পাল্টে তাদের 'জঙ্গীদের মত' সেনা-পোশাক পরানোর চেষ্টা করছিল। গ্রামবাসীদের দ্রুত এসে যাওয়া ভেস্তে দিয়েছে ওদের সেই পরিকল্পনা। মৃতদেহগুলো নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল সেনারা। পরে পোশাক পাল্টে ওদের জঙ্গী সাজিয়ে পুরস্কার নিত এবং নাগাল্যান্ডসহ উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়ে ভয়ংকর অত্যাচার নামিয়ে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করত। প্রসঙ্গত কাশ্মীরের মতই নাগাল্যান্ড, মণিপুর প্রভৃতি রাজ্যে দশকের পর দশক ধরে চলছে জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে লড়াই। ভারত সরকার উপদ্রুত এলাকা ঘোষণা করে উপদ্রুত এলাকা আইন এবং আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট ব্যবহার করে সেনা নামিয়ে জাতিসত্তার লড়াইকে স্তব্ধ করতে চাইছে। দশকের পর দশক ধরে চলছে এই রক্তক্ষয়ী লড়াই। মাঝে মধ্যে আলোচনার প্রহসন চলে। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সত্যিই যে সমাধান চায় ভারত সরকার এরকম প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ৪ ডিসেম্বরের নির্বিচার হত্যা আরো একবার এটা প্রমাণ করলো। তাই কাশ্মীরের মতোই সমগ্র উত্তর-পূর্ব জুড়েই দাবি উঠেছে, সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন আর্ম ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট এবং উপদ্রুত এলাকা আইন বাতিল করতে হবে। যথারীতি কেন্দ্রের শাসক দলগুলি সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল না করার অজুহাত দিচ্ছে। দেশের মূল ভূখণ্ডের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবিষয়ে যথেষ্ট সোচ্চার নয়। শুধুমাত্র মানবাধিকার রক্ষার সংগঠনগুলি সোচ্চার হলে এই দাবি আদায় করা কঠিন। আসমুদ্রহিমাচল থেকে আওয়াজ তুলতে হবে উপদ্রুত এলাকা আইন সহ আফস্পা বাতিল করতে হবে। তবেই ইউএপিএ, এনএসএ, সিডিশন প্রভৃতি কালা কানুন বাতিলের জমি তৈরি হবে। এই আন্দোলনগুলি একটা আরেকটার অবিচ্ছেদ্য অংশ, পরিপূরক। তাই মূল ভূখন্ডের গণতান্ত্রিক শক্তির আরো জোরদার ভূমিকা খুব জরুরি।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.