বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাঙ ইলেকট্রনিক্সের নাম বিশ্বজোড়া। আমাদের দেশে স্যামসাঙের দুটি কারখানা রয়েছে। একটি দিল্লির অদূরে উত্তরপ্রদেশের আধুনিক শিল্প শহর নয়ডায়। অপরটি তামিলনাডুর রাজধানী চেন্নাই থেকে ৫৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে শ্রীপেরেমবুদুরে। দক্ষিণ ভারতের এই কারখানাই এখন সিওলে স্যামসাঙের হেডকোয়ার্টারের কর্তাদের কপালের ভাঁজ বাড়িয়ে তুলেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলের হেডকোয়ার্টারে স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষের বেতন বৈষম্য সহ অন্যান্য কর্মী স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তিরিশ হাজার কর্মী ‘ন্যাশনাল স্যামসাঙ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’র নেতৃত্বে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। এই আন্দোলনের অভিঘাতেই গত বছর ২০২৩ সালের জুলাই মাসে শ্রীপেরুমবুদুরে স্যামসাঙ কারখানায় সিআইটিইউ’র নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় ‘স্যামসাঙ ইন্ডিয়া ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’। কারখানার ১৭২৩ জন স্থায়ী কর্মীর মধ্যে ১৫৫০ জন স্বেচ্ছায় সিআইটিইউ অনুমোদিত ইউনিয়নের সদস্য হন।
বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে তামিলনাড়ুর স্যামসাঙ ইন্ডিয়া কারখানার ১৫৫০ শ্রমিকের ৩৭ দিনের লাগাতার ধর্মঘট শেষ হল। ৯ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট শুরু হয়েছিল। শেষ হয়েছে ১৭ অক্টোবর। চেন্নাইয়ের কাছেই শ্রীপেরামবদুরে বহুজাতিক স্যামসাঙ কোম্পানির এই কারখানায় টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেসিন তৈরি হয়। স্যামসংয়ের ভারতের মোট ব্যবসার এক তৃতীয়াংশ আসে এই কারখানা থেকে। মজুরি বৃদ্ধি, কাজের পরিবেশের উন্নতি সহ নানা দাবি থাকলেও মূল দাবি ছিল সিটু অনুমোদিত স্যামসাঙ ইন্ডিয়া ওয়ার্কারস ইউনিয়ন নামের ইউনিয়নের স্বীকৃতি। কারখানার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক সিটু ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হলেও স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষ ইউনিয়নটিকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। তামিলনাড়ু সরকারও ইউনিয়নটির রেজিস্ট্রেশন দিতে রাজি হয়নি। ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আইন অনুযায়ী সাতজন শ্রমিক একত্রিত হলেই ইউনিয়ন তৈরি করা যায়। রেজিস্ট্রেশনও মেলার কথা। ১০ শতাংশ শ্রমিক এক ইউনিয়নের সদস্য হলে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার অধিকার মেলে। আইনে বলা আছে আবেদনের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারকে ইউনিয়নের রেজিষ্ট্রেশন দিতে হবে। কিন্তু গত জুলাই মাসে আবেদন করলেও আজ পর্যন্ত স্যামসাঙ এর এই ইউনিয়নকে রেজিস্ট্রেশন দিতে রাজি হয়নি তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার। শুধু তাই নয় ব্যাপক পুলিশি নির্যাতন নামিয়ে প্রধান ১১জন নেতা সহ ৩০০ জন শ্রমিককে জেলে পোরে সরকার। এমনকি ইউনিয়নের অশ্রমিক নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়, যারা আবার সিটু ও সিপিআই(এম) দলের রাজ্যস্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ফলে ইন্ডিয়া জোটের সদস্য চেন্নাইয়ের বন্ধু সরকারের এই আচরণে রাজনৈতিক মহলেও হইচই পড়ে যায়। সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ শুরু হয়। রাজ্যের মন্ত্রীরাও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। দ্রুত বৈঠকের ব্যবস্থা হয়। তামিলনাড়ু সরকার ধর্মঘটী নয় এমন শ্রমিকদের নিয়ে একটা কমিটি বানিয়ে দেয় এবং সরকারি উদ্যোগে তাদের সঙ্গে মালিকপক্ষ একটা চুক্তিও করে। মজুরি বৃদ্ধি ইত্যাদি মেনে নেওয়া হয়। সিটু ইউনিয়ন এই চুক্তির দায় নিতে অস্বীকার করে। সিটু ইউনিয়নের সঙ্গে সরকারি মধ্যস্থতায় একটা আলাদা বৈঠকেরও আয়োজন করে সরকার। তাতে কিছু বোঝাপড়া তৈরি হয় - যার উপর দাঁড়িয়ে সিটু ইউনিয়ন ধর্মঘট তুলে নিয়ে কাজে যোগ দিতে রাজি হয়েছে। বহুজাতিক একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৩৭ দিন এই ধর্মঘট চলেছে যা সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্যামসাঙ ইন্ডিয়ার জীবনেও এত বড় ধর্মঘট অবিশ্বাস্য। ইউনিয়নের কোনও কার্যকলাপই তারা এতকাল চলতে দেননি।
কিন্তু মূল যে প্রশ্ন নিয়ে ধর্মঘট শুরু হয়েছিল তা কিন্তু অমীমাংসিত থেকে গেল। ইউনিয়নের স্বীকৃতির দাবি কিন্তু আদায় হল না। শুধু তাই নয় স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষ এমন প্রশ্ন তুলে ইউনিয়নকে মানতে অস্বীকার করেছে যা এদেশে আগে বিশেষ শোনা যায়নি। রাজ্য সরকারও ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন দেয়নি। তার জন্য ইউনিয়ন আদালতে গেছে। ৪৫ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার কথা থাকলেও তিন মাস পরেও কেন রেজিস্ট্রেশন দেয়নি রাজ্য সরকার সেই জবাবও দেয়নি। তবে সামসুং কর্তৃপক্ষের আপত্তিই যে মূল কারণ সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আন-অফিসিয়ালি। স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষের ইউনিয়নের ক্ষেত্রে মূল আপত্তি দুটো। প্রথমত, তাদের বক্তব্য ইউনিয়নে তাদের আপত্তি নেই কিন্তু কারখানার শ্রমিক নয় এমন কাউকে নেতৃত্বে রাখা যাবে না। অর্থাৎ সিটুর কোনও অশ্রমিক নেতাকে ইউনিয়নের নেতা করা যাবে না। শ্রমিকদেরই চালাতে হবে সেই ইউনিয়ন। তাদের মতে সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু ঢোকা মানে রাজনীতি ঢোকা এবং তাতে শ্রমিকদের উপর মালিক-কর্তৃপক্ষের আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ইউনিয়ন করতে পারে শ্রমিকরা কিন্তু সিটুর সঙ্গে থাকা যাবে না। বাইরের লোক নেতা হতে পারবে না। অথচ দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আইন অনুযায়ী ইউনিয়নের নেতৃত্বের এক তৃতীয়াংশ বাইরের লোক হতে পারে। সিটু কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবেও ভারত সরকারের স্বীকৃত। কোনও ইউনিয়ন চাইলে সিটুর অনুমোদন নিতেই পারে। এটা সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত। এব্যাপারে মালিকপক্ষের কিছু বলারই থাকতে পারেনা। স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষের অন্য দাবিটি বেশ অভিনব। স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষের দাবি ইউনিয়নের নামে স্যামসাঙ ব্যবহার করা যাবে না। তাদের মতে এতে ট্রেডমার্ক আইন লংঘন করা হবে। তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা তারা মানবেন না। অথচ আমাদের দেশে নিয়োগকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করেই ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয়। ইউনিয়ন কোনও ব্যবসায়ী সংস্থা নয়। ইউনিয়নে নাম ব্যবহারে ট্রেডমার্ক আইন ভাঙ্গার প্রশ্নই ওঠে না। ট্রেড ইউনিয়ন আইনে এটা স্বীকৃত। অজস্র বহুজাতিক কর্পোরেশনে শ্রমিক ইউনিয়নের নাম প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েই তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়া তো ইউনিয়ন হওয়াই অসম্ভব। ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে মালিক আর শ্রমিকের মধ্যেকার সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে। কে মালিক সেটা কোম্পানির নাম ছাড়া বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু স্যামসাঙ কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য তাদের নাম দিয়ে কোনও ইউনিয়ন করা যাবে না। এসব প্রশ্নের মীমাংসা ছাড়াই অর্থাৎ ইউনিয়নের স্বীকৃতির দাবির মীমাংসা ছাড়াই ব্যাপক সরকারি সন্ত্রাসের মুখে ইউনিয়ন নেতৃত্ব ধর্মঘট তুলে নিয়েছে। সেই সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে শ্রমিকরা। ৩৭ দিন ব্যাপী শ্রমিকদের এই সাড়া জাগানো আন্দোলন সংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে শুধু নয়, রাজনৈতিক মহলেও একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো বিশেষত দক্ষিণ ভারতে সাম্প্রতিককালে ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। বহু নতুন কারখানার স্থাপন করা হচ্ছে বা হবে বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু তারা দেশের শ্রম আইন মানবে কি মানবে না এই প্রশ্নটা খুব বড় হয়ে সামনে উঠে আসল স্যামসাঙ এর এই ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে। প্রশ্ন উঠলো শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিয়েই। ভারতের সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংগঠিত হওয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার। যা অলঙ্ঘনীয়। ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসেবে বন্ধু দলের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বা সামগ্রিকভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে ডিএমকে সরকারের তরফে যে আচরণ করা হল প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও। ৩৭ দিন ১৫০০ শ্রমিকের লাগাতার ধর্মঘটের পর মূল দাবি অমীমাংসিত রেখে সিটু নেতৃত্ব ধর্মঘট তুলে নেওয়াতেও বিস্ময় তৈরি হয়েছে। তবে জানা গেছে, ডিএমকে সরকার রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে হাইকোর্টের রায় মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। স্যামসাঙ কতৃপক্ষ ইউনিয়নের স্বীকৃতি না দিলেও ইউনিয়নের দাবি সনদ নিয়ে ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেবে বলে বোঝাপড়া হয়েছে।
নানা সংশয় সত্ত্বেও যে বিষয়টি সামনে আসছে, খরা কাটিয়ে এদেশের শ্রমিকরা কি অবশেষে আন্দোলনে ফিরছেন? শ্রীপেরেমবুদুরের স্যামসাঙ ইন্ডিয়া ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের লড়াইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জে কে টায়ারস, অ্যাপোলো টায়ারস, হুনডাই, ইয়ামাহা ও বিএমডব্লু-র মতো অটোমোবাইল শিল্পের শ্রমিকরা। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে অ্যাপল-এর উৎপাদন সরবরাহকারী সংস্থা ফ্লেক্সের শ্রমিকরাও ঠিক এভাবেই উন্নত বেতন কাঠামো ও ইউনিয়নের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। দিল্লির কৃষক আন্দোলনের পর বিদ্বজনেরা শ্রমিকদের আন্দোলন বিমুখতা নিয়ে হতাশ ছিলেন। কিন্তু চেন্নাইয়ের স্যামসাঙ, অ্যাপেলের সাপ্লায়ার ইউনিটে ধর্মঘট, গুরগাঁও এর মারুতি, টিভিএস সহ মোটর ও মোটর পার্টস কোম্পানিগুলির শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলন, পশ্চিমবাংলার চা শ্রমিকদের সাম্প্রতিক বোনাস আন্দোলন কোথায় যেন একটা আশার সঞ্চার করছে। আরজিকরের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে বাংলার নাগরিক সমাজে যে তুমুল বিস্ফোরণও দেখা গেছে তাতে স্পষ্ট একটা মন্থন শুরু হয়েছে।