বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে মোদির ভারতের সম্পর্ক

ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে মোদির ভারতের সম্পর্ক

সঞ্জয় পূততুণ্ড

photo

সুদীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতিতে দেশ আজ স্বাধীন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ এখনও সক্রিয়। সময়ের প্রবাহে তার লুণ্ঠনের রূপ বদলেছে, নিচ্ছে নতুন নতুন কৌশল। দেশের স্বাধীনতার ৭৮তম বর্ষে নতুন শঙ্কা ক্রমবর্ধমান বিপদের ইঙ্গিত নিয়ে মাথা তুলছে। সাম্রাজ্যবাদের পান্ডা বিশ্বের সর্বপেক্ষা বাহুবলি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের শাসকদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সম্পর্ক কখনও আত্মসমর্পণের পর্যায় পৌঁছে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যেন আদিম যুগের রাজা এবং বর্তমান সময়ের মস্তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই ভূমিকা কার্যত মাথা নিচু করে মান্যতা দিচ্ছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের প্রতি আমেরিকার যে কোনও অসম্মানজনক কাজ, মন্তব্য ও ফরমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস দেখা যাচ্ছে না। সুদীর্ঘকাল ব্যাপী দেশের অনুসৃত নীতি ট্রাম্পের ধমকে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসেই তার নিজের দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণ শানিয়েছেন। আমেরিকায় কর্মরত অভিবাসী ভারতীয় শ্রমিকদের শিকল বেঁধে বিমানে করে এদেশে ফেরত পাঠানোর পরেও কোনও তীব্র প্রতিবাদ শোনা যায়নি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কন্ঠে।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা থেকে ভারত আজ চীনকে ঘেরাও করার আমেরিকার কৌশলগত সঙ্গীর ভূমিকায় ‘কোয়াড’ এর সদস্যে পরিণত হয়েছে।
দফায় দফায় ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তাঁর ব্যবসায়িক হুমকিতেই ভারত পাকিস্তানের সংঘাত থেমে যায়। ভারত সরকার অনেক দেরিতে প্রতিবাদ করলেও ট্রাম্পের দাবিকে বিশ্ব মান্যতা দিয়েছে।
ইজরায়েলের জন্ম লগ্ন থেকে ভারত প্যালেস্তাইনবাসীদের উপর আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেছে — স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের দাবি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু আজ যখন ইজরায়েল দু’ বছর ধরে গাজা নিশ্চিহ্ন করতে অমানবিক যুদ্ধ অপরাধ করে চলেছে, ভারত কার্যত নিশ্চুপ। মার্কিন অস্ত্র ও অর্থে পুষ্ট ইজরায়েল প্যালেস্তাইনে বর্তমান শতাব্দীর সর্বপেক্ষা ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চালাচ্ছে। গাজায় ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইজরায়েল বাহিনী। যাদের বেশিরভাগই শিশু ও মহিলা। ধ্বংস করে দিয়েছে সেখানকার হাসপাতালগুলি, জল সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। ত্রাণ শিবিরেগুলিও আক্রমণ থেকে বাদ যাচ্ছে না। ত্রাণের সরাবরাহের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে ইজরায়েল বাহিনী। অনাহার, অপুষ্টি, মহামারি এখন গাজায় নিষ্ঠুর বাস্তব। রাষ্ট্রপুঞ্জে বারবার আমেরিকা ও ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি, শান্তি, স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠন এবং আন্তর্জাতিক প্রাণ পাঠানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। ভারত এই যুদ্ধ অপরাধ বন্ধ করতে সুস্পষ্ট অবস্থান ও উদ্যোগ নেয়নি।
সারা বিশ্ব যুদ্ধবাজ আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন আগ্রাসনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে। আমেরিকা ইউরোপের দেশগুলিতে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন ছাত্র, যুব, সাধারণ মানুষ এবং শ্রমিকরা। খোদ ইজরায়েলে যুদ্ধ বিরতি ও পণবন্দীদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে বারবার বিক্ষোভে উত্তাল হচ্ছে। সারা বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণী এক নতুন ধরনের আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। ইজরায়েলে অস্ত্র ও পণ্যবাহী জাহাজ চালাতে অস্বীকার করছেন নাবিকরা — অস্ত্র ও পণ্য নামাতেও অস্বীকার করছেন শ্রমিকরা। প্যালেস্তাইনের দীর্ঘদিনের বন্ধু ভারত, মোদির সরকারের সময়কালে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট ইজরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দূরের কথা ইজরায়েলে কাজ করতে শ্রমিক পাঠাচ্ছে। এমন অবমানবিক অবস্থানের পেছনে আছে যুক্তিহীন মুসলমান বিদ্বেষ। কারণ প্যালেস্তাইনবাসীরা মুসলমান। ভারত সরকারের কাছে মানবতার দাবি ঢেকে যায় ধর্মান্ধতায়। ভারত, আমেরিকা ও ইজরায়েল থেকে যুদ্ধাস্ত্র আমদানি বাড়াচ্ছে।
ভারত সরকার কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করবে তা স্থির করার মালিকও যেন ট্রাম্প সাহেব। রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল কেনে ভারত। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধকে অজুহাত করে আমেরিকা রাশিয়ার উপর আর্থিক-বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইউরোপও রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞায় সামিল। ঠান্ডা ইউরোপ সস্তা জ্বালানির অভাবে বাঁচবে কি করে? সে কারণে ইউরোপ ভারতের মাধ্যমে রাশিয়ার তেল আমদানি করছিল। ইউরোপ আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। দোষ পড়ল ভারতের উপর। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসেবে ভারতের পণ্য আমেরিকায় রপ্তানি করতে গেলে ২৫ শতাংশ শুল্ক লাগবে। তার সঙ্গে যুক্ত হবে ২৫ শতাংশ জরিমানা। সর্বমোট ৫০ শতাংশ শুল্ক ও জরিমানা বাবদ। ২৭ অগাস্ট থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হওয়ার কথা। এখন দেখা যাক কি দাঁড়ায়।
আমেরিকার শুল্কযুদ্ধের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল চীন। শুল্ক বাড়িয়ে চীনকে শুকিয়ে মারার জন্য ট্রাম্প চীনা পণ্যে ২৪৫ শতাংশ শুল্কের আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু চীন যখন পাল্টা আমেরিকার উপর ১৪৫ শতাংশ শুল্ক জারি করল, তার চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত চীনা পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্কে আপস রফা করেছে বাহুবলি আমেরিকা। ভারতের রাষ্ট্রবিদ ও তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা জল্পনা করেছেন, চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসী শুল্ক নীতির সুযোগ নিয়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি এবং আমেরিকার পণ্য ভারতে আমদানি বাড়ানোর যায় কী করে। এখন পরিস্থিতি উলটে যাওয়ায় রাষ্ট্রবিদ ও বিশেষজ্ঞরা হিমশিম খাচ্ছেন কী করবেন।
একসময় ইরান থেকে পাইপ লাইনে সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাস আনার চুক্তি হয়েছিল ভারতের। ভারতের সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক সত্ত্বেও পাকিস্তান ইরান-ভারত গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্পে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার আপত্তিতে সেই প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। এখন অবশ্য ইরানের চাবাহার বন্দর গড়ে তোলার বরাত পেয়েছে ভারত। তাতেও আপত্তি আমেরিকার।
পাঁচ বছর আগে দেশি-বিদেশি বৃহৎ বহুজাতিকদের কাছে কৃষিজ পণ্যের বাজার খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মোদি সরকার তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করেছিল। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের ফলে সরকার ওই তিনটি আইন প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকার দেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এবার কৃষি পণ্য মার্কেটিং বিধি এনেছে। দেশের কৃষিজ পণ্যের বাজার দেশি-বিদেশি বহুজাতিকদের জন্য খুলে দিতে এই ব্যবস্থা। আমাজন, ওয়ালমার্টের মতো আমেরিকান বৃহৎ বহুজাতিকগুলি উন্মুখ হয়ে আছে ভারতের কৃষিজ পণ্যের বাজারে ঢোকার জন্য। ট্রাম্প সাহেব ভারতকে চাপ দিচ্ছে বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য। ইউরোপ আমেরিকার বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত সস্তা দুগ্ধজাত ও কৃষিজ পণ্য এদেশের বাজারে আসলে আমাদের দেশের অর্ধেক মানুষের সর্বনাশ হবে। কোটি কোটি মানুষ বাধ্য হবে কৃষি থেকে উৎখাত হবে।
আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের কোম্পানীগুলির লুঠের প্রয়োজনে দেশের খনি ও খনিজ আইন পরিবর্তনের তোড়জোড় চলছে। পরমাণবিক ক্ষয়ক্ষতির দায় এড়াতে অ্যাটমিক এনার্জি আইনও পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ সমস্ত পরিবর্তনের লক্ষ্য হল বিদেশি কোম্পানির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার। এর ফলে দেশবাসীর জীবিকা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে — দেশের সার্বভৌমত্বও ক্ষুন্ন হবে।
আমেরিকা থেকে ভারতে জনগণের উপরে নামিয়ে আনা হচ্ছে সর্বাত্মক আক্রমণ। এর মূল কারণ পুঁজিবাদের বিশ্বব্যাপী গভীর সংকট। গভীর সংকটে আমেরিকার অর্থনীতি। বিপুল ঋণভারে ন্যুব্জ তাদের অর্থনীতি। সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে না। উৎপাদনের স্থিতাবস্থা। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তালমিলিয়ে মজুরি বাড়ছে না। বিভিন্ন মহাদেশ থেকে আগত অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষের সস্তা শ্রমে গড়ে উঠেছে আমেরিকার সভ্যতা। সম্পদশালী হয়েছে আমেরিকার বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী। হিটলারের মতো অস্থির মস্তিষ্ক ট্রাম্প সাহেব আমেরিকার অর্থনীতির সংকটের দায় অভিবাসী শ্রমিকদের উপর চাপাচ্ছে। অভিবাসী শ্রমিক ও বিদেশি ছাত্রদের আমেরিকা থেকে তাড়াবার নানা ফন্দি করছেন। মোদির ভারতেও দেশের সংকটের জন্য দায়ী করা হচ্ছে মুসলমানদের। এদেশের মুসলমানরা প্রধানত পিছিয়ে থাকা কৃষিজীবী শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষ। ট্রাম্পের আমেরিকায় অভিবাসী বিদ্বেষ এবং মোদির ভারতে মুসলমান বিদ্বেষ নীতির পিছনের অন্যতম কারণ কার্যত এক। ভীত-আতঙ্কিত করে তাদের সস্তার শ্রমকে আরো সস্তা করা। আরো কম মজুরিতে মজুর খাটানো। তার জন্য অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গায়ের রঙ, জন্মস্থান বা ধর্ম, জাতপাত, ভাষাগত বিভাজনের রাজনীতি।
বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে আমেরিকার একাধিপত্যের বিপরীতে গড়ে উঠেছে ব্রিকস জোট। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভারতও আছে এই জোটে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি ডলারের বদলে নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু করেছে। যার ফলে বিশ্বে ডলারের বিশ্ব আধিপত্য ক্ষুন্ন হতে পারে। এতে বেজায় চটেছে ট্রাম্প সাহেব। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার রণনৈতিক সমঝোতা ব্যবহার করে ব্রিকসকে আঘাত করার জন্য ট্রাম্প সুযোগ খুঁজছেন।
দেশে-বিদেশে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শক্তিশালী গড়ে তুলতে শ্রমজীবী শ্রেণীগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও দুর্বলতা ফ্যাসিবাদী ও দক্ষিণপন্থী শক্তির সহায়ক হবে। এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা জন্য সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার পথে এগোতে হবে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.