বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

কেলেঙ্কারির শেষ কোথায়!

কেলেঙ্কারির শেষ কোথায়!

উজ্জ্বল চ্যাটার্জী

photo

আদানি এন্টারপ্রাইজ গ্রুপের গত এক মাসে শেয়ারের দাম পড়েছে দু’হাজার টাকার বেশি। তাদের সম্পদের মূল্যের পতন ঘটেছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। ক’দিন আগেও যার বাজার মূল্য ছিল একশো টাকা তার মূল্য বর্তমানে দাঁড়িয়েছে চল্লিশ টাকা। আরও কত কমবে কেউ জানে না!
এরাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের ঝড় বইয়ে বাজার থেকে এফপিও বা ফরোয়ার্ড পাবলিক অফারিং এর মাধ্যমে কুড়ি হাজার কোটি টাকা তুলেছিল। আমেরিকার লগ্নি গবেষণা সংস্থা “হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ” এর রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর আদানিরা টাকা তোলা বন্ধ করার ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি ডলার ডিনোমিনেটেড বন্ড অফারও বাতিল করতে হয়েছে। তারা বামাল ধরা পড়ে গেছে।
গৌতম আদানির দশটি সংস্থার আটটি সংস্থার শেয়ার দরের পতন ঘটেছে। এইচডিএফসি সিকিউরিটিজের কর্তা দীপক জাসানি বলেছেন, ওদের শেয়ার সম্পদের মূল্য একান্ন শতাংশ নামবে।
ইতিমধ্যে জানা গেছে, আদানি গ্যাসের পঞ্চাত্তর শতাংশ, আদানি ট্রান্সমিশনের ছেষট্টি শতাংশ, আদানি পাওয়ারের চুয়াল্লিশ শতাংশ, আদানি এন্টারপ্রাইজের বাহান্ন শতাংশ শেয়ার মূল্যের পতন ঘটেছে। উদাহরণ আপাতত থাক।
রাজনৈতিক নির্দেশে যে কোম্পানিতে জীবন বীমা কর্পোরেশন লগ্নি করেছিল ও এসবিআই ঋণ দিয়েছিল এবং বিদেশি ব্যাঙ্ক ও অর্থলগ্নি সংস্থা থেকে এক দুই শতাংশ সুদ নিত আদানি, সেই কোম্পানি তলিয়ে যাচ্ছে!
দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চুপ। অমিত শাহ চুপ। চুপ কেন? অপরাধবোধ না ভয়?
সেবির নিয়মে আছে, শেয়ার বিক্রি করে টাকা তোলা সংস্থা কখনোই মূল প্রোমোটারের সম্পর্কযুক্ত কারুর থেকে লগ্নি নিতে পারবে না। অথচ এক্ষেত্রে বেশ কিছু লগ্নিকারীদের সঙ্গে আদানি ও তার সংস্থার সম্পর্ক স্পষ্ট। সেবি নীরব দর্শক। কেন? কারণ সেবির যে কমিটি রয়েছে তার একজন সদস্যের নাম সিরিল সুরেশ শ্রফ। এই সিরিল সুরেশ শ্রফের মেয়ে পরিধি শ্রফের বিয়ে হয়েছে করণ সঙ্গে। ইনি হলেন গৌতম আদানির ছেলে।
কী করে বিদেশি কলো টাকা ভারতের বাজারে লগ্নি হয়েছে, তাই নিয়ে এনর্ফোসমেন্ট ডাইরেক্টরেট বা ইডি, রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স হাত গুটিয়ে রয়েছে। কারণ গৌতম আদানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র তো পুরনো বন্ধু। গত শতকের নয়ের দশকে অমিত শাহ যখন প্লাস্টিক পাইপের ব্যবসা করার জন্য কারখানা খুলেছিলেন, তখন গৌতম আদানি প্লাস্টিকের কাঁচা মাল (গ্রানিউল) অমিত শাহকে যোগান দিত। অমিত ভাইয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব তখন থেকেই। কি করবে ইডি?
ভারত সরকারের একজন বিশেষ মন্ত্রীর সঙ্গে আদানির সম্পর্ক নয় সমগ্র শাসক দলটিই বর্তমানে কার্যত আদানির ক্রীতদাস। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে মোদির বসার অনেক আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে।
২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার পর কেউ মোদি অমিত শাহর পাশে ছিল না, তখন আদানি পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি ঝুঁকি নিয়ে গুজরাটে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। শুধু কি তাই!
শিল্পগোষ্ঠী সংগঠন সিআইআই মোদির বিরোধী হওয়ায় গৌতম আদানি পাল্টা শিল্পগোষ্ঠী সংগঠন গড়ে তোলে। “মোদিকে আগামী প্রধানমন্ত্রী” বলে প্রচারে জ্বালানির যোগান দেয়। ওই সময়ে মোদির নেতৃত্বাধীন গুজরাটের সরকার মুন্দ্রা বন্দরের আশপাশের জমি আদানি গ্রুপকে হস্তান্তর করা শুরু করে। ৭৩৫০ একর তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বর্গ মিটার প্রতি মাত্র ০.৫০ পয়সা দরে। যা তারা পরে বিক্রি করছে বর্গ মিটার প্রতি এগারো মার্কিন ডলার দরে। ভারতীয় মুদ্রায় ৯০৭.৫০ টাকায়। এই কেনা বেচায় যাবতীয় স্টাম্প খরচও মুকুব করা হয়েছিল। এমনকি সেজ (SEZ) করার জন্য যেসব বিধি আছে তাও আদানি গোষ্ঠীর জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এই সুবিধার মূল্যমান সত্তর কোটি টাকা।
২০১২ সালে কেন্দ্রীয় ইউপিএ সরকার আদানিকে দু’শো কোটি টাকা জরিমানা করেছিল। কারণ তারা মুন্দ্রা বন্দর নর্থ পোর্টে জমি দখল করে যে সেজ নির্মাণ করে তাতে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছিল। কিন্তু তৎকালীন বিজেপি রাজ্য সরকার বন্ধু আদানির দাঁড়ায়। পরিবেশ ধ্বংসকারী আদানিকে রক্ষা করে। জরিমানার নির্দেশ খারিজের ব্যবস্থা করে।
তার পরেও লক্ষ্য করে দেখুন শেয়ারের ফটকা বাজারের সঙ্গে কেমন চমৎকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে ধান্ধা পুঁজি। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদানির শেয়ারের দাম উল্কার গতিতে বেড়েছে। ২০১৪ সালে আদানি সারা পৃথিবীর মধ্যে সম্পদের মূল্যের বিচারে ছিল ৬০৯তম স্থানে। আর সেই আদানিই হিন্ডেনবার্গের রিপোর্ট প্রকাশের আগে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে।
আমরা সকলেই জানি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইডি এবং সিবিআই কে ব্যবহার করে বিরোধী দলের এমএলএ এবং এমপি-দের নিজের পক্ষে নিয়ে এসে একছত্র রাজনৈতিক পরিসর বাড়িয়ে চলেছে। একইভাবে আদানির জন্যেও এইসব এজেন্সিকে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণ? ২০১৮ সালে কৃষ্ণপত্তনম বন্দরে আয়কর বিভাগের তল্লাশি হল। ঠিক দু’ বছর পরে ২০২০ সালে আদানি প্রথমে ওই বন্দরের ৫০ শতাংশ অংশিদারিত্ব নেয় এবং পরে একশো শতাংশ অধিকার করে নেয়।
একইভাবে ২ জুলাই অম্বুজা সিমেন্টে তল্লাশি চালায় সিবিআই আর ১০ ডিসেম্বর, ২০২২ আদানি গ্রুপ দখল নেয় এই কোম্পানির।
ওই একই তারিখে সিবিআই জিভিকে (গুণপতি বেঙ্কট কষ্ণা) এর বিরুদ্ধে এফআইআর করে এবং ১৮ জুলাই অভিযান চালায়। এরপর ৩১ আগষ্ট জিভিকে আদানির হাতে মুম্বাই বিমানবন্দর তুলে দেয়।
কার্ল মার্কস শিল্প পুঁজির গোড়া পত্তন প্রসঙ্গে বলেছেন, পুঁজির মাথা থেকে পা সর্বত্র লুঠের নোংরা ও রক্তের দাগ।... যথেষ্ট মুনাফা হলে ওরা সাহসী হয়। দশ শতাংশ হলে গোটা দুনিয়া ছোটে, কুড়ি শতাংশ মুনাফায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে, পঞ্চাশ শতাংশে তার স্পর্ধা মাত্রা ছাড়ায়, একশো শতাংশ হলে আইনকে মাড়িয়ে যেতে প্রস্তুত হয়। তিনশো শতাংশ হলে ফাঁসির ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না। মার্কসের কথা মিলে যাচ্ছে।
মোদি এখনও আদানি নিয়ে চুপ তার কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না। এর পরে বিজেপির নির্বাচনী তহবিল কী করে হাজার হাজার কোটি টাকায় ফুলে ওঠে, কে ইলেকশন বন্ড এর মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা দেয়, সেটা বুঝতে অন্ধভক্তদেরও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
আদানিদের দ্বারা, আদানিদের হয়ে এবং আদানিদের জন্যে যে শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে— তারই জোরে আদানিরা শুধুমাত্র দেশে নয় গত চার বছর ধরে বিদেশে থাকা নিজের আত্মীয়, ভাই, শালাবাবুর ভুয়ো কোম্পানি, যাকে বলে শেল কোম্পানি দিয়ে, নিজেদের শেয়ার নিজেরাই কেনা বেচা করে, তাদের শেয়ারের দাম রকেট গতিতে উত্থান ঘটিয়েছে। আর সেই সূত্র ধরে শেয়ারের মোট সম্পদ বা মার্কেট ক্যাপিটাল মিথ্যে মিথ্যে বাড়িয়ে আর তাই দেখিয়ে দেশে ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্ক, জীবন বীমা কর্পোরেশন, পাঞ্জাব ন্যাশান্যাল ব্যাঙ্কের মতো সরকারি ব্যাঙ্ক, আর্থিক সংস্থা বা বিভিন্ন বিদেশি অর্থ লগ্নি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন আদানি। একের পর এক ধনীকে টপকে এমনকি বিল গেটসকে পিছনে ফেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি হয়েছিলেন। মাত্র এক মাসে আজ তিনি অর্ধেক সম্পদ হারিয়ে ৩১তম স্থানে! আর মুখ বাঁচাতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নিজেদের পছন্দের মতো লোকেদের দিয়ে তদন্ত করতে চাওয়া হয়েছিল। বন্ধ খামে সেই পছন্দের লোকেদের নাম জমা দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। যদিও সুপ্রিম কোর্ট সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মিথ্যে আর প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় “তাসের ঘরের” মত ভেঙে পড়েছে আদানিদের সাম্রাজ্য। পৃথিবীর অন্যতম ধনকুবের আমেরিকার ফান্ড ম্যানেজার জর্জ সোরস ৯২ বছর বয়সে ঠিক এই কথাই বলেছেন। মোদির সাহায্য নিয়ে আদানি কি ভারতের গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে তাই নিয়ে জার্মানিতে এক আর্থিক সম্মেলনে প্রশ্ন তুলেছেন জর্জ। তাঁর দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা আদানির কোম্পানিতে লগ্নি করেছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতরা প্রশ্ন তুললেও মোদি কেন এখনও নীরব, তাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জর্জ সোরস। মোদি এবং আদানি যে একে অপরের পরিপূরক সেই সার সত্যিটা আজ গোটা বিশ্ব বুঝতে পারছে। খুলে গিয়েছে মোদির মুখোশ। আর ইলেকশন বন্ড এর মাধ্যমে বিজেপির ফান্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা চাঁদা পড়ার রহস্য। মরীয়া চেষ্টায় বিবিসি এর অফিসে তিন দিন ধরে আয়কর হানার পরে কার্যত কিছুই মেলেনি।
শুধুই কি শাসক বিজেপি বা আরএসএস এদের উচ্ছিষ্ট ভোগী?
এই বিপুল ঋণ আদানি গ্রুপ তো কেবল নিজের জন্য নেয়নি। বরং নির্বাচনী বন্ড কিনে পার্টি ফান্ডে জমা করেছে আর বিনিময়ে সহজে টেন্ডার হাতিয়েছে। এজন্য আপনাকে বিজেপি শাসিত রাজ্যে যেতে হবে না। এই রাজ্যের শিল্প মেলায় আদানিদের গদগদ আপ্যায়ন এবং নবান্নে গৌতম আদানির সঙ্গে গোপন বৈঠক! আদানি গ্রুপ বিনিয়োগ করবে হলদিয়া, তাজপুরে। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা বিদ্যুৎ পরিবহণের খুঁটি বসিয়ে ছিল আদানি গোষ্ঠী। মা-মাটি-মানুষের নামে চলা রাজ্য সরকারের পুলিশের অতি সক্রিয়তার সাহায্যে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংশ করে অনেক আম, লিচু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের এখনও কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। হাজার হাজার আদিবাসী মানুষকে উচ্ছেদ করে দেউচা পাঁচামী খোলামুখ খনি লুটের রুট ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। তাজপুরে ১১২৬ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য রাজ্য সরকার আদানি দিয়েছে মাত্র ১ টাকা লিজে। এমনকি দিতে হয়নি স্ট্যাম্প ডিউটিও, রেজিস্ট্রেশন চার্জও। তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের জন্যেই বন্দরে মাল ওঠা নামার চালু ঊর্ধ্বসীমার নিয়ম কানুন। চুক্তিতে সরকারি নজরদারির আগের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। না, কর্মসংস্থানের কোনও গ্যারেন্টির শর্তও নেই।
উল্লেখ্য, কমিশন রাজনৈতিক দলগুলির বার্ষিক আয়ের যে হিসেব প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের বার্ষিক আয় ৫৪৫.৭৪ কোটি টাকা যার অন্যতম সূত্র নির্বাচনী বন্ড।
জনগণের চেতনায় এই প্রতারণার পর্দা ফাঁস করা জরুরি। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়া আদানিদের জালিয়াতি নিয়ে বলা শুরু করেছে। বিজনেস পত্রিকা ফর্বস, বিজনেস স্ট্যান্ডর্ড, ইকনমিক টাইমস লিখতে বাধ্য হচ্ছে।
আদানির ধাক্কা মানে মোদি অমিত শাহের দলীয় তহবিলে অবৈধ হাজার হাজার কোটি টাকা আসা বন্ধ হওয়া। যে টাকায় শুধু ভোট লড়া নয়, বিধায়ক কিনে একের পর এক নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া যায়। সংবিধানের সর্বনাশ করা এবং রাজনৈতিক ভাবে ইডি, আয়কর, সিবিআই লাগিয়ে বিরোধীদের ভয় দেখিয়ে ভোটের আগেই ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।
আদানিদের মতো ক্রোনিদের ধাক্কা মানে দেশের প্রাকৃতিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ— যেমন সমুদ্র বন্দর, বিমান বন্দর, খনি, জল, ব্যাঙ্ক-বীমা কোম্পানি, তেল কোম্পানি, জাতীয় সড়ক, খাদ্য পণ্য মজুতের গুদাম, বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সব কিছু বেচে দেওয়ার দেশদ্রোহী প্রক্রিয়ার আপাতত শ্লথ হওয়া।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.