বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[দেশ]
অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মাঝে মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে মোদি সরকার প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিল। আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের চাহিদা মতো এই সংস্কার দু’ দশক ধরে বকেয়া পড়েছিল। ১৬ জুন ইউনিয়ন সরকারের ক্যাবিনেট প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ডিফেন্স প্রোডাকশনের অধীনে থাকা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড (ওএফবি) ভেঙে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেট সংস্থা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকারগুলি যে সংস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে নানা দ্বিধা দেখিয়েছে, জনমতের তোয়াক্কা না করে সেটাই মোদি সরকার এক লহমায় করে ফেলল।
ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড (ওএফবি) এত দিন দেশের অর্ডন্যান্স কারখানাগুলি পরিচালনা করতো। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড সারা বিশ্বের মধ্যে সব থেকে বড় সরকার পরিচালিত প্রতিরক্ষা উৎপাদন সংগঠন এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এর স্থান বিশ্বে ৩৫তম। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ডের অধীনে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৪১টি অর্ডন্যান্স কারখানা। ৮১,৫০০ কর্মী এই বোর্ডের অধীনে থাকা অর্ডন্যান্স কারখানাগুলিতে কাজ করেন।
এত দিন সেনাবাহিনী নিজের প্রয়োজনের ৮০ শতাংশ অর্ডন্যান্স কারখানাগুলি থেকে ক্রয় করতো। যদিও ওএফবি-র উৎপাদিত ট্যাঙ্ক, সাজোয়া গাড়ি, কামান, মেশিনগান সব কিছুর দাম বেশি ও নীচু মানের এই প্রচার চলছিল বহু দিন থেকেই। তা ছিল প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণের পক্ষে পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে। ওএফবি ভেঙে সাতটি কর্পোরেট সংস্থায় গড়া অর্ডন্যান্স কারখানাগুলিকে দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার পথে একটি ধাপ।
আগেই মোদি সরকার প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ১০০% বেসরকারি বিনিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কর্পোরেটদের হাতে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রটিকে তুলে দেওয়া আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি ও অস্ত্র লবির স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকার ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা শিল্পে কোর ও ননকোর আইটেম তালিকা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা প্রায় তিনশোটি ননকোর আইটেম সরবরাহের বরাত পেয়েছে। সরকার দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির লাইসেন্স দিতে শুরু করেছে। উত্তরপ্রদেশের আমেথিতে ভারত-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠেছে 'ইন্ডো-রাশিয়া রাইফেলস প্রাইভেট লিমিটেড'। ওই কারখানায় কালাশনিকভ একে ২০৩ ইনসাস রাইফেল তৈরি হবে। বিশাখাপত্তনমে রিল্যায়েন্স ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অস্ত্র তৈরির কারখানা তৈরি করছে। এল অ্যান্ড টি, মালয়েশিয়ার পুঞ্চ অ্যান্ড লয়েডের মতো বিভিন্ন কোম্পানি ছোট অস্ত্র তৈরির বরাত পেয়েছে। ৩৪০টির বেশি সংস্থাকে প্রতিরক্ষা শিল্পের সরঞ্জাম ও অস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দিয়েছে মোদি সরকার। যদি এই প্রক্রিয়া ঠেকানো না যায় অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিগুলির পরিকাঠামো ব্যবহার করে মুনাফা লুঠ করবে বহুজাতিক কর্পোরেটরা। দেশের নিরাপত্তা ও শ্রমিক কর্মচারীদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। যেমন হয়েছে টেলিকম ও অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রায়ত্ত অর্ডন্যান্স কারখানাগুলিকে শুকিয়ে মারার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
২০১৯ সালের আগস্ট মাসে দেশের অর্ডন্যান্স কারখানাগুলির কর্পোরেটায়ন তথা বেসরকারিরণের বিরুদ্ধে একমাসব্যাপী লাগাতার ধর্মঘটের নোটিশ দেয় তিনটি ইউনিয়ন— অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (এআইডিইএফ), ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ওয়ার্কার্স ফেডারেশন এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা মজদুর সঙ্ঘ। প্রায় একশো শতাংশ শ্রমিক কর্মচারী এই ধর্মঘটে সামিল হন। ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশনও ধর্মঘটের সমর্থনে ফ্যাক্টরি স্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। পাঁচদিন ধর্মঘট চলার পর মোদি সরকার সাময়িক ভাবে পিছু হটে।
অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি শ্রীকুমার জানিয়েছেন, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ডকে সাতটি ভাগে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত কারখানাগুলিতে কর্মরত শ্রমশক্তি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যুক্ত অসামরিক ৪ লক্ষ কর্মচারী প্রত্যাখ্যান করছে। এই সিদ্ধান্ত কর্মীদের স্বার্থ ও ভবিষ্যতের পরিপন্থী এবং বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ফেডারেশনগুলির লিখিত চুক্তিকে লঙ্ঘন করেছে।
তিনটি ফেডারেশনের ডাকে সরকারের শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের ৪১টি অর্ডন্যান্স কারখানা গেটেই শ্রমিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভ-প্রতিবাদে ফেঁটে পড়েন। ইছাপুর প্রতিরক্ষা শিল্প বাঁচাও কমিটির উদ্যোগে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরি ও মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরির গেটের সামনেও শ্রমিকদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। তিনটি স্বীকৃত ফেডারেশনের পক্ষ থেকে লিখিত চিঠি দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ও ডিফেন্স প্রোডাকশনের সেক্রেটারিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা হলে অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘটের পথে যাবেন শ্রমিকরা।