বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[দেশ]

[দেশ]

গিগ কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে

গিগ কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে

কুশল দেবনাথ

photo

পিঠে বড় একটা ব্যাগ। বাইকে করে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে। রাস্তার লোককে পাশ কাটাতে গিয়ে ছোটখাট ধাক্কাও হয়তো দিয়ে ফেলে। কিন্তু ঠিক সময়ে না পৌঁছলে ডবল বিপদ। ডেলিভারিতে দেরি হয়েছে বলে ক্রেতা জিনিস নিতে প্রত্যাখ্যান করলে পুরো লোকসান। আবার, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনও কেড়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, এমন শর্তেই কাজ করে এ যুগের শ্রমিক — গিগ কর্মী বা প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কাররা। অল্প বয়সের তরুণ-তরুণীরা এই কাজে যুক্ত। পুঁজিবাদের সাম্প্রতিক বিবর্তনে এই নতুন ধরনের শ্রমিক জন্ম নিয়েছে। ‘শ্রমিক’ শ্রেণীটি সমাজে আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়েছিল কম পয়সায় মজুর খাটানোর প্রবণতা। শ্রমিকদের সংগঠিত হতে না দেওয়া, যখন তখন ছাঁটাই করা। এগুলি আজও এই ক্ষেত্রে একই ভাবে আছে। যেন কোনও অদৃশ্য চাবুক পিঠে পড়েই চলছে। গিগ শ্রমিকরা সেই ধারাকে বহন করে চলেছেন।
তবে গিগ শ্রমিকদের উদয়াস্ত পরিশ্রম, হয়তো শহরের রাস্তায় দৃশ্যমান বলেই, অনেক মানুষের সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায় করেছে। এমন কি গল্প, কবিতা, নানা প্রবন্ধও লেখা হয় এঁদের নিয়ে। গিগ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার কথাও অনেকে বলছেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে — এই যে এতগুলি শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছে, তারা কি নিজেদের ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করার অনুমতি পায়? পায় না। কেন, সেটাই এই আলোচনার মূল বিষয়।
আমাদের প্রশ্নটি সহজ। এক দল শ্রমিক এক সঙ্গে কাজ করেন, মজুরিও পান। তাঁরা যদি নিজেদের ইউনিয়ন গড়তে চান, পারবেন না কেন? অনেক গিগ শ্রমিককে এক সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন না দিলেও, এলাকা বা জ়োন-এর ভিত্তিতে তাঁদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া যায়। কিন্তু নানান অজুহাতে ভারত সরকার রেজিস্ট্রেশন দিতে অস্বীকার করছে। এখনও চারটি শ্রম কোড পালন শুরু হয়নি। পুরোনো শ্রম আইনে কোথাও গিগ শ্রমিকদের কথা লেখা নেই। কিন্তু সম্প্রতি কিছু কিছু আইন হয়েছে। যেমন রাজস্থান সরকার ২০২৩ সালে একটি আইন করে, তাতে বলা হয়েছে, গিগ কর্মে যিনি নিযুক্ত তিনিই গিগ কর্মী, তাঁর নিযুক্তি যত সময়ের জন্যই হোক। ‘গিগ কাজ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটা একটা চুক্তিভিত্তিক কাজ, বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে যে কাজে নিযুক্তদের একটি নির্দিষ্ট হারে মজুরি দেওয়া হয়। এই কাজ যে ‘পিস রেট’-এর কাজ, অর্থাৎ প্রতিটি নির্দিষ্ট ট্রিপ বা ডেলিভারির ভিত্তিতে টাকা মেলে, তা-ও বলা হয়েছে আইনে।
এই যদি আইন হয়, তা হলে তার ভিত্তিতে গিগ কর্মীরা তো শ্রমিক! কিন্তু শ্রম কোডে তাঁদের জন্য বলা হয়েছে শুধুমাত্র কিছু কল্যাণ প্রকল্পের কথা। সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত কোড-এ (২০২০) বলা হয়েছে, “গিগ কর্মী হল এমন ব্যক্তি যিনি কাজ করেন, বা কাজের একটা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেন এবং তা থেকে রোজগার করেন, যা গতানুগতিক নিয়োগকারী-নিযুক্ত সম্পর্কের মধ্যে পড়ে না।”
‘ট্র্যাডিশনাল রিলেশন্স’-এর বাইরে শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, এর কোনও ব্যাখ্যা কিন্তু দেওয়া নেই। বোঝা যাচ্ছে না যে, গতানুগতিক নিয়োগ সম্পর্কের বাইরে হওয়ায় এই শ্রমিকদের অবস্থান কি শ্রমিক ইউনিয়নেরও বাইরে? বিষয়টা অস্বচ্ছ হয়ে আছে। কিন্তু একটা কথা লক্ষ্যণীয়, কোনও রাজ্যের সরকার গিগ শ্রমিকদের ‘পার্টনার’ হিসেবে অভিহিত করেনি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এ বিষয়ে বক্তব্য কী? কলকাতা ও বিধান নগরের বেশ কিছু গিগ শ্রমিক ‘প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার ডেলিভারি রাইডার’নামের তলায় সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে রাজ্যের শ্রম দফতরে আবেদন করেন ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য। পশ্চিমবঙ্গ শ্রম দফতর নানান অজুহাতে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে শুরু করে। বারবার শ্রম দফতরে ডেকে পাঠানো হয় কিন্তু রেজিস্ট্রেশন আটকে রাখা হয়। অনেকবার দেখা করা, চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় দেড় বছর কাটার পর ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে কলকাতা হাই কোর্টে বিচারপতি শম্পা চট্টোপাধ্যায়ের বেঞ্চে রিট পিটিশন করা হয়। সব পক্ষের কথা শুনে বিচারপতি ৬০ দিনের মধ্যে শ্রম দফতরকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলে। অন্তত শ্রম দফতরের বক্তব্যটা জানার অবস্থা তৈরি হল হাই কোর্টের রায়ের পরে। এরপর শ্রম দফতর থেকে ট্রেড ইউনিয়ন রেজিষ্ট্রার ওই গিগ কর্মীদের সংগঠনকে ডেকে পাঠায়। আরও কিছু কাগজ পত্র দেখতে চায়। অবশেষে জানায়, যে ব্যক্তিরা ইউনিয়ন তৈরি করতে চান তাঁরা যে হেতু ওই ব্যবসায় পার্টনার, তাই তাঁদের ‘ওয়ার্কার’(কর্মী, শ্রমিক) বলে ধরে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই এই আবেদন বাতিল হল।
প্রশ্ন হল, ঠিক কী অর্থে এঁরা ‘পার্টনার’? এই কোটি কোটি গিগ ওয়ার্কার, তাঁরা সবাই তাঁদের সংস্থার মালিকানার সঙ্গে যুক্ত — পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রম দফতরের এই অভিমত থেকে প্রশ্ন উঠে আসে, এই কর্মীরা কি নিজেরাই কাজ ধরেন? উত্তর — না।
এরা কি কাজ থেকে ছাঁটাই হন? উত্তর - হ্যাঁ।
এরা কি কোনও লভ্যাংশ পান? উত্তর - না।
এঁদের কে কাজ দেয়? উত্তর - নির্দিষ্ট কোম্পানি, বা তাদের ফ্রাঞ্চাইজ়ি। যে টার্গেট দেওয়া হয় সেটা পূরণ না হলে বেতন কাটা যায়, কাজ চলে যায়, আইডি ব্লক করে দেওয়া হয়।
তাহলে শ্রম দফতর কীসের ভিত্তিতে এঁদের শ্রমিকের মর্যাদা না দিয়ে ‘পার্টনার’বলে দাবি করছে? আসলে বিভিন্ন বড় বড় খাবার ডেলিভারি কোম্পানির চাপ আছে, যাতে গিগ শ্রমিকরা ইউনিয়নের আইনী স্বীকৃতি না পায়। যত দূর জেনেছি, শ্রম আধিকারিকরা রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন, কিন্তু এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তা আটকে দেন। বড় কোম্পানির চাপেই এই রাজ্যে হস্তক্ষেপ, এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অথচ, গিগ, প্লাটফর্ম ওয়ার্কার্সদের প্রাথমিক সমস্যা হল সংগঠিত হওয়ার সমস্যা, ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার সমস্যা। শ্রমিক স্বীকৃতি আদায়ের সমস্যা।
রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বিধাননগর-কলকাতা অঞ্চলের যে শ্রমিকদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হল না তাঁরা ফের হাই কোর্টে যাবেন। আইনি লড়াইয়ে তাঁরা জিততেও পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই নতুন ধরনের আধুনিক শ্রমিকরা যদি সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার রাস্তায় না হাঁটেন, তা হলে তাঁদের মূল সমস্যার সমাধান হবে না। সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে তাদের অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার ও বিভিন্ন দাবি আদায় করতে হবে।
সভ্যতার ইতিহাসে পুঁজিবাদের হামলা প্রতিহত করে শ্রমিকরা একটি স্বতন্ত্র শ্রেণীর পর্যায়ে পৌঁছেছেন। কারখানা, শিল্প ভিত্তিক ইউনিয়ন গড়েছে শ্রমিক শ্রেণী। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে বহু সংগ্রাম, আত্মত্যাগের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণী অনেক অধিকার অর্জন করেছিল। যে মে দিবসের কথা আমরা বলি তার পিছনের লড়াই এর কথাও আমরা বারবার বলি। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে সংগঠিত হয়ে লড়াই করতে গেলে অনেক মূল্য দিতে হবে। আর এই ‘মূল্য’দিয়েই শ্রমিক শ্রেণী বরাবর এগিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে কোম্পানি, এজেন্ট, সরকার কখনওই আইনি অধিকার দিতে চাইবে না। অধিকার নস্যাৎ করার চেষ্টা তো তারা প্রায় সব ক্ষেত্রেই করে। গিগ শ্রমিকরা শ্রমিক, তাদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া, ইউনিয়ন করার অধিকার আছে। এই দাবিতে গিগ ওয়ার্কাররা পথে নামুন, আমরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.