বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[খেলা]
শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২২— ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের শেষ পর্যায়ের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। সেমিফাইনালে উঠেছে ক্রোয়েশিয়া, মরক্কো, ফ্রান্স, ও আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই বারবার উঠে আসে একটি প্রশ্ন। ভারত কবে বিশ্বকাপ খেলবে?
১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ভারতীয় দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় দল অংশগ্রহণ করেনি। তারপর বহুদিন বাদে আশির দশক থেকে বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খেলা শুরু করে ভারত। কিন্তু আজ অবধি আমরা কোয়ালিফাইং রাউন্ডে জিতে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাইনি। সেনেগাল, ক্যামেরুন, মরক্কোর মত দেশ যদি বিশ্বকাপ খেলতে পারে তাহলে আমরা কেন খেলতে পারছি না।
আর্থিক দিক থেকে ভারতের তুলনায় ক্রোয়েশিয়া বা মরোক্কো অনেক পিছিয়ে আছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ২০২২, অক্টোবরের হিসেব অনুযায়ী, ভারতের জিডিপি ১৪২.৮৭ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ক্রোয়েশিয়া এবং মরোক্কোর জিডিপি যথাক্রমে ৬৯.৩৮ বিলিয়ন এবং ৬৯.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মাত্র।
ক্রোয়েশিয়ার জনসংখ্যা মাত্র ৩৯ লক্ষের মত। মরক্কোর জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির কিছু বেশি। ফ্রান্সের জনসংখ্যা প্রায় সাত কোটি। আর্জেন্টিনার জনসংখ্যা পাঁচ কোটির কাছাকাছি। এদের তুলনায় ভারতের জনসংখ্যা বহুগুণ বেশি। প্রায় ১৪০ কোটির মত। এই ১৪০ কোটির দেশ থেকে বিশ্ব মানের ফুটবলার কেন উঠে আসছে না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ভারতীয় ফুটবলের পীঠস্থান বলা হয় বাংলাকে। বাংলার জনসংখ্যা প্রায় দশ কোটি যা মরক্কো, আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান। সেই বাংলা থেকে ফুটবলার এখন সেভাবে উঠে আসে না।
ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা বরাবরই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দেশ। একাধিক বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া ও মরক্কোর মত দেশও যাদের মোট জনসংখ্যা বাংলার থেকেও কম তারাও আজ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। তারা
এক ঝাঁক বিশ্ব মানের ফুটবলার তুলে আনছে। আর আমরা আজ টিভিতে খেলা দেখছি।
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল বিশ্বে উত্থান ঘটে। ১৯৯৪ সালে ক্রোটদের ফিফা র্যাঙ্কিং ছিল ১২৫, কিন্তু সেখান থেকে অবিশ্বাস্য ভাবে ১৯৯৯-তে তারা তৃতীয় স্থানে উঠে আসে। ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা শুরু করে। প্রথমবারেই বিশ্বকে চমকে দিয়ে তৃতীয় স্থানে শেষ করে তারা। গত বিশ্বকাপে প্রথম বারের মত ফাইনালে উঠেও রানার্স হতে হয় তাদের। এইবছর আবার তারা সেমিফাইনালে উঠে এসেছে। নব্বইয়ের দশকে ক্রোয়েশিয়া সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন বর্তমান ভারতীয় দলের কোচ ঈগর স্টিম্যাচ। সেই দলের তারকা ছিলেন ডাভর সুকের। তিনি প্রথম ক্রোয়েশিয়ান হিসেবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ২০১২ সালে ডাভর সুকের ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হন। তারপর পুনরায় ক্রোয়েশিয়া আবারও দাপট দেখানো শুরু করে। এই সময় বিশ্ব ফুটবলে একাধিক ক্রোয়েশিয়ান তারকার আবির্ভাব ঘটেছিল। মান্ডুকিচ, মড্রিচ, র্যাকিটিচ, পেরসিচ, কোভাকিচ, লভরেনের মত তারকা। যাদের দৌলতে ২০১৮ বিশ্বকাপে রানার্স ও ২০২২ বিশ্বকাপে আবারও সেমিফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়া।

মরক্কোর উত্থান কিন্তু ধূমকেতুর মতো হয়নি। ২০১০ সালে মরক্কোর ফিফা র্যাঙ্কিং ছিল ৯৫, সেই মরক্কো আজ প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল আজকের মরক্কো দল। ১৯৯৮ সালে বিদেশে জন্ম নেওয়া মরোক্কান বংশোদ্ভূত দের জন্য মরক্কো জাতীয় দলের দরজা খুলে দেওয়া হয়। তারপর থেকে ধীরে ধীরে মরক্কো উঠে এসেছে। মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই মরোক্কার ফুটবলারদের পাশাপাশি বিদেশের হয়ে খেলা মরোক্কা বংশোদ্ভূতদের খুঁজে এনে গত ৯ বছর ধরে শক্তিশালী মরক্কো দল গড়ে তুলেছেন। বিশ্বকাপে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মরোক্কা গোলরক্ষক ইয়াসিন বেনো কানাডায় জন্ম। মিডফিল্ডার হাকিমি থেকে শুরু করে হাকিম জিয়াসের মত তারকাদের কে বিদেশ থেকে মরক্কো দলে নিয়ে আসা হয়েছে। এর জন্য মরক্কো ফুটবল সংস্থার স্পেশাল স্কাউট টিম আছে। সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছে উপযুক্ত ফুটবল পরিকাঠামো। শুধু মরক্কো নয় একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে ফ্রান্স। তাদের বিশ্বকাপ দলের ২৬ জন সদস্যের মধ্যে ১৭ জন সদস্যের জন্ম ফ্রান্সের বাইরে। তারপরও ফ্রান্স দুই বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। জিদান থেকে শুরু করে করিম বেনজেমা, পল পোগবার মত তারকাদের নাম এই তালিকায় আছে। এমনকি ২০০৬ ফ্রান্স বিশ্বকাপ দলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিকাশ ধরাসু খেলেছিলেন।
আমাদের দেশে সঠিক পরিকল্পনার অভাব। ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের সদিচ্ছার অভাব। অভাব রয়েছে উপযুক্ত পরিকাঠামোর। মরক্কো বা ক্রোয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছে ও উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তুলেছে। আজ তারা বিশ্ব ফুটবলে দাপট দেখাচ্ছে। ভারতের একটা বড় সমস্যা আইনি জটিলতার কারণে বিদেশে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ভারতের জার্সিতে খেলবার সুযোগ না পাওয়া। নাহলে মাইকেল চোপড়ার মত ফুটবলারদের ভারতের হয়ে দেখা যেতেই পারত। লুসিয়ানো নরসিং কে নেদারল্যান্ডের বদলে ভারতের জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে দেখা যেত। এইরকম অজস্র দক্ষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলার আছে। যাদের দেশের জার্সিতে দেখা গেলে দল শক্তিশালী হবে। সেই সঙ্গে গ্রাসরুট লেভেল থেকে ফুটবলার তুলে আনতে হবে। আমাদের দেশে টিএফএ ব্যাতিত একটিও বিশ্বমানের ফুটবল একাডেমী নেই। নেই সঠিক পরিকাঠামো। দেশের প্রধান লীগ আইএসএলে কোনও অবনমন নেই। লীগে খেলে মাত্র ১১টি দল যেখানে ফ্রান্স বা ক্রোয়েশিয়ান লীগে পনেরো- কুড়িটি করে দল অংশগ্রহণ করে। সে লীগে অবনমন রয়েছে। আমাদের দেশের রেফারিংয়ের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এর জন্য চাই সঠিক প্রশিক্ষণ। সব থেকে বড় কথা উইম কোভারম্যান্স, স্টিভন কনস্টানটাইন থেকে ঈগর স্টিম্যাচের মত বিদেশি কোচেদের লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে এনেও কোনও লাভ হয়নি। তাই আজও ভারতীয় দলকে গোল করার জন্য কেবল সুনীল ছেত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। নেপাল, ভুটানের মত টিমকে হারিয়ে কোনও উন্নতি ভারতের হবে না। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম পঞ্চাশে থাকা দলগুলির বিরুদ্ধে নিয়মিত ম্যাচ খেলতে হবে। তবেই ভারতের পক্ষে বিশ্বকাপ খেলা সম্ভবপর। নচেৎ সারা জীবন আমাদের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কে সমর্থন করে যেতে হবে।