বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

১৫ অগাস্ট: বাঙালি জাতির ‘নয়া-পরাধীনতা’ দিবস

১৫ অগাস্ট: বাঙালি জাতির ‘নয়া-পরাধীনতা’ দিবস

দীপক পিপলাই

photo

কথামুখ


১৫ অগস্ট। ১৯৪৭ সালের এইদিন থেকে যাদের অনেক কিছু অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক লাভ হয়েছে, তাদের বিচারে “স্বাধীনতা দিবস”। আর যাদের প্রায় সব কিছুই হারাতে হয়েছে, তাদের কাছে ‘নয়া-পরাধীনতা দিবস’।
এই দুই ধরনের মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাদের বিচারও আলাদা। প্রাপ্তির আনন্দ কিম্বা হারানোর যন্ত্রণা, সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী দু’ধরনের মানসিকতা। এঁরা সেইমতোই ১৫ অগস্টকে দেখেন। কেউ আনন্দে উল্লসিত, কেউ যন্ত্রণায় ক্রুদ্ধ। কেউ স্বাধীনতার ‘যুক্তি’ রটনায় আগ্রহী, কেউ নয়া-পরাধীনতার ‘বেদনা’ প্রচারে তৎপর।


এ’বছর (২০২২) সেই দিনটার ৭৫ বছর পূর্তি। পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতবর্ষের বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমি আকাশ-পাতাল ঢুঁড়ে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালনের যুক্তি প্রচারের বিপক্ষে। বরং সর্বস্ব হারানো এক উদ্বাস্তু বাঙালি পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে, আমি ‘নয়া-পরাধীনতা দিবস’ উদযাপনের পক্ষে। সেই উপলক্ষ্যে কয়েকটা কথা বলার জন্যেই এই লেখা।


‘দেশভাগ’: মানে কী?


শতশত বছর ধরেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষ লড়াই করেছেন ব্রিটিশ শোষকদের বিরুদ্ধে। পরবর্তীকালে
যে দুই জাতির মানুষের লড়াই-সংগ্রামের দাপটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়েছিল, তারা হ’লো বাঙালি এবং পাঞ্জাবি। বিভিন্ন ইতিহাস বইয়ে এবং আন্দামান সেলুলার জেলে পাথরে লেখা শতশত বন্দীর তালিকা তার উজ্জ্বল নজির। সেখানে ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামের সৈনিক একের পর এক বাঙালির ফাঁসি এবং অনশনে মৃত্যুর ইতিহাস পরবর্তীকালের অত্যাচারী ‘স্বাধীন’ শাসকদেরও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। তাই ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস থেকে বাঙালির নামও মুছে দেবার তাগিদে, ইতিহাস পাল্টে দেবার গভীর চক্রান্ত এবং সেলুলার জেলের বন্দী তালিকাও বদলে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে।


ভারতবর্ষ এক বহুজাতিক ও বহূভাষিক রাষ্ট্র। তা একটা ‘দেশ’ না, অনেকগুলো দেশ; কার্যত একটা উপ-মহাদেশ। ভারতবর্ষের সংবিধানেও একে বলা হয়েছে “Union of States.” খুবই ঠিক কথা। বাংলা করলে যা দাঁড়ায় “রাষ্ট্রগুলোর ইউনিয়ন।” অনেকগুলো রাষ্ট্র-র সঙ্ঘবদ্ধ অবস্থা, বা রাষ্ট্রসঙ্ঘ। বলা হয়েছে ‘State Governments’ এবং ‘Union Government’। অর্থাৎ, ‘পশ্চিমবঙ্গ’-ও ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্তর্গত অন্যান্য অনেকগুলো রাষ্ট্রের মতো একটা রাষ্ট্র। রবীন্দ্রনাথ একসময়ে বলেছিলেন, “সকলেই এক হইল বলিয়া আইন করিলেই এক হয় না।… পৃথককে বলপূর্বক এক করিলে তাহারা একদিন বলপূর্বক বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, সেই বিচ্ছেদের সময় প্রলয় ঘটে।” (‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ দ্রষ্টব্য।) ‘দেশ’ নিয়ে কথা বলতে গেলে এই বিষয়টা মাথায় রাখতেই হবে।


১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রধানত বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হ’লেও, এই লেখায় শুধু বাংলাভাগ নিয়েই কথা বলা হবে। কারণ বিবিধ বিচারে বাঙালির সর্বনাশ অনেক গভীর, ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ৭৫ বছর পর, বাংলাভাগের বিশ্বাসঘাতকতা আজও এখানে অসহায় বাঙালিকে ‘সীমান্ত’ পেরিয়ে আশ্রয় খোঁজার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যেতে বাধ্য করে! বাঙালির ‘দেশ’- অবিভক্ত বাংলা। সেটা ভাগ হওয়াই বাঙালির কাছে অভিশপ্ত দেশভাগ।


ভারতরাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষ বহু আদিবাসী, বিভিন্ন জাতি, নানা ভাষাভাষী। একে অপরকে চেনেনা, জানেনা, বোঝেনা, দেখেওনি। তাঁদের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শণ, বোধ, আকাঙ্ক্ষা - সবকিছুই আলাদা। শুধু রাজনৈতিক মানচিত্রেই তাঁরা ‘ঐক্যবদ্ধ’, এবং স্বার্থান্বেষী দলীয় ও সরকারি ঘোষণাপত্রেই তাঁরা “এক জাতি, এক প্রাণ, একতা।” বাস্তবে বহু জাতি, বহু প্রাণ, ভিন্নতা।
‘স্বাধীনতা’-র সময়ে ভারতবর্ষে ছিল প্রায় ৫৮৪-টি রাজা-নবাব ইত্যাদিদের শাসনাধীন অঞ্চল। এ’গুলো কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিলনা; কিন্তু ব্রিটিশদের মোড়লি মানতে হ’তো তাদের। উপর থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চাপিয়ে দেওয়া ‘ঐক্য’ জনমানসে কতটুকু দাগ কেটেছে, তা নানা সময়ে ভারতরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনাবলী থেকেই পরিস্কার হয়ে ওঠে!


কাদের স্বার্থে বাংলাভাগ?


বাঙালি যে ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক এক জাতি এবং তাঁদের অভ্যন্তরীণ জাতিগত ঐক্যকে ভাঙতে না পারলে সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে টিঁকিয়ে রাখা যে মুশকিল, এ’কথা ইংরেজ শোষকরা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিল। তাই মুসলমান-হিন্দুতে ভাগাভাগি, বৈরিতা ও হানাহানির ধুরন্ধর পরিকল্পনা তারাই শুরু করে। বাঙালি সমাজের মুসলমান ও হিন্দু দুই অংশেরই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক, ক্ষমতালোভী, কায়েমী স্বার্থের প্রতিনিধি, এবং মেহনতী জনগণের প্রতি দায়হীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব মনেপ্রাণে তা গ্রহণ ও বাস্তবায়িত করে।


পূর্ব ও পশ্চিম, দুই বাংলারই অগণিত মানুষ বাংলাভাগের বিরোধিতা করেছিলেন মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী নির্বিশেষে। তাঁরা কোনোদিনই নিজেদের দেশ-কে ভাগ করার এই সর্বনাশা সিদ্ধান্ত মানেননি। ইংরেজ শাসকদের মর্জিমাফিক এঁকে দেওয়া ‘সীমা’ তাঁরা কখনোই মন থেকে মেনে নেননি।


কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় ১০ মে ১৯৪৭, রজনী পাম দত্ত-র এক বিবৃতি ছাপা হয়। লন্ডনে ৬ মে তিনি এই বিবৃতি দেন:


“ভবিষ্যৎ কোন পথে? ভারত ব্যবচ্ছেদ কি বন্ধ করা সম্ভব? এই শেষ সন্ধিক্ষণেও কি ভারতের ঐক্য রাখা সম্ভব? একমাত্র পথ হইতেছে – যদি ভারতের হিন্দু-মুসলমান, কংগ্রেস-লীগ-কমিউনিস্ট, তথা সকল দেশপ্রেমিক শক্তি যদি এই গণতান্ত্রিক চুক্তিতে একত্রিত হইতে পারে যে, ভারতের ভবিষ্যৎ ভারতীয় জনগণ ঠিক করিবেন।”


একমাস আগে, ১০ এপ্রিল তারিখেও ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকা লিখেছিল-
“আমাদের দাবি
১| স্বাধীন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ বাংলা।
২| বাংলাদেশ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেবে কি না সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বাঙ্গালীর ভোটে তার মীমাংসা চাই।’’
বাংলার যুব সমাজের প্রতি ঢাকার ছাত্র নেতাদের সম্মিলিত আহ্বান ছিল, “বঙ্গভঙ্গ রোধ করুন : ঐক্যবদ্ধ ভারতে স্বাধীন বাংলা গড়ুন। … ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে পূর্ব্ববঙ্গের জনসাধারণের দান কেহই বিস্মৃত হইতে পারেন না। ক্ষুদ্র স্বার্থপ্রণোদিত হইয়া আজ যাহারা পূর্ব্ববঙ্গের কথা ভাবিতেছেন না, তাঁহাদের বিরুদ্ধে বাংলার বিপ্লবী যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের জন্য আহ্বান জানাইতেছি।” (‘স্বাধীনতা’, ১.৬.১৯৪৭)
ময়মনসিংহ, মেদিনীপুর, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, কসবা, চট্টগ্রাম… হাজার হাজার মানুষের মিছিল জনসভা কৃষকসভা প্রচারপত্র, সারা বাংলাকে মুখরিত করে তুলেছিল।
১৯৪৭-এর ২৯ মে, কিশোরগঞ্জে ‘বঙ্গভঙ্গ ও পাকিস্তান বিরোধী’ জনসভায় উপস্থিত ছিলেন দেড় হাজার মানুষ, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান সম্প্রদায়ের। ৩১ মে, ময়মনসিংহের জনসভায় ১০-১২ মাইল দূর থেকেও লাল পতাকা হাতে হাজং আদিবাসীরা মিছিল করে এসে যোগ দিয়েছিলেন। খুলনায় ১ জুন, ‘বঙ্গভঙ্গের চক্রান্তের বিরুদ্ধে’ এক হাজার কৃষকের সভা হয়। ওই একই দিনে বরিশালের গৈলা গ্রামে, সমাজের নিম্নবর্গীয় দশ হাজার মানুষের এক জনসভায় প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল, “বঙ্গভঙ্গ দ্বারা তপশীলী জাতি দ্বিধাবিভক্ত হইবে – উন্নতির পথ রুদ্ধ হইবে।”


বাংলায় কৃষির ফসল এবং শিল্পের উৎপাদন, সবই ছিল সমাজের এইসব নিম্নবর্গীয় মেহনতী মানুষের অশ্রু-ঘাম-রক্তের বিনিময়ে সৃষ্ট। ‘দেশ’ সম্পর্কে এঁদের চেয়ে আন্তরিক ও গভীর উপলব্ধি আর কারোই ছিল না। থাকা সম্ভবও না। কিন্তু সমাজের নিম্নবর্গীয় মেহনতী মানুষের এইসব কথায় কান দেবার কোনও দায় মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন মাতব্বরদের ছিল না। বাংলা ভাগের সর্বনাশা চক্রান্তেই তারা ততক্ষণে মনস্থির ক’রেই ফেলেছিলেন!


মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত এক যৌথ আবেদনে (জুন, ১৯৪৭) বলা হয়েছিল, “আমরা বঙ্গভঙ্গ চাই না। আমাদের দৃঢ়মত এই যে, বঙ্গভঙ্গের ফলে সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদ আরও বৃদ্ধি পাইবে, দাঙ্গা দৈনন্দিন ঘটনায় পর্যবসিত হইবে।”


পরবর্তীকালের ইতিহাস কী শিক্ষা দেয়, তা পাঠকেরই বিচার্য।


মেহনতী জনগণের কাছেই যাঁরা দায়বদ্ধ ছিলেন


‘পূর্ব’ থেকে চোদ্দ পুরুষের জন্মভিটে ছেড়ে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পরিবার চলে এসেছেন ‘পশ্চিম’-এ। আবার ‘পশ্চিম’ থেকেও গ্রাম উজাড় ক’রে অসংখ্য মুসলমান পরিবার চলে গেছেন ‘পূর্ব’ দিকে।


দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চতুরভাবে বারবার লাগানো হয়েছে দাঙ্গা; বহু মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস; পরস্পরের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা স্বভাবিক পার্থক্যগুলোকে বিপুল সংখ্যক মানুষের মনে পরিণত করা হয়েছে ঘৃণায়। এটাই চেয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, মুসলমান ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি, এবং স্বার্থান্বেষী অবাঙালি ব্যবসায়ীর দল।


ভয়, ঘৃণা, সন্দেহ ইত্যাদি নানা কারণে অসংখ্য মানুষ ‘সীমান্ত’-র এপার-ওপার করেছেন। ৭৫ বছর পর, আজও সেই পারাপার বন্ধ হয়নি! অসহনীয় ও অমানবিক উদ্বাস্তু জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটাই এঁদের জীবনে এক নির্মম পরিহাস। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভোরে গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক, কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “কমরেড, আমরা নাকি স্বাধীন পাইছি?” আগের দিনের পরাধীন রাত এবং পরের দিন ‘স্বাধীনতা’-র ভোরে কোনও তফাৎ ছিলনা তাঁর অভিজ্ঞতায়।


পূর্ববঙ্গে মেহনতী জনগণের মধ্যে যেসব কমিউনিস্ট মাটি কামড়ে পড়ে থেকে কৃষক জনতার মুক্তিসংগ্রাম সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, বাস্তবিকই মেহনতী জনগণের সঙ্গে শ্রেণীসংগ্রামের ময়দানে একাত্ম হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই সে সংগ্রামকে পরিত্যাগ করেননি। তাঁরা ছিলেন দেশভাগ-কে অগ্রাহ্য ক’রে মাঠে-ময়দানে শ্রেণীসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া কমিউনিস্ট। আত্মীয়স্বজন দেশত্যাগ করলেও, এঁরা কেউই বাংলার কৃষকসমাজকে পরিত্যাগ করেননি। পরিণতিতে, তাঁদের কেউ কেউ খুন হয়েছেন জামাতের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে; কেউ ‘শুট টু কিল’ অর্ডারের হুলিয়া মাথায় নিয়েও বছরের পর বছর চালিয়ে গেছেন সংগ্রামী কৃষক সংগঠনের কাজ; কেউ ‘স্বাধীনতা’-র অন্যতম দাবিদার কংগ্রেসীদের হাতে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হয়ে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছেন জেলের ভিতর, পূর্বপাকিস্তানে সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবার অভিযোগে।


আবার, নিকট আত্মীয়স্বজন পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলেও, “মরলে নিজের দেশেই মরবো”- এই কথা ব’লে ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে নিজের হাতে মেহগনি গাছ পুঁতেছেন ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান, দেশভাগের প্রতিকী প্রতিবাদ হিসেবে। তাঁর নিজের ‘দেশ’-এই থেকেছেন আজীবন।


‘পার্টিশান’ এবং হিন্দু-মুসলমান পার্থক্যের অজুহাতে দেশভাগ মেনে নিয়ে, এঁরা কেউই সীমান্ত পেরিয়ে নিরুপদ্রব জীবনচর্চার কিম্বা কিছু প্রাপ্তির হাতছানিতে সাড়া দেননি। নিজেদের ‘দেশ’-এই থেকেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, মানুষের সংগ্রাম সংগঠিত করেছেন, নিহত হয়েছেন। কিন্তু জোতদার-জমিদার এবং অবাঙালি শিল্পপতি-বেনিয়াদের স্বার্থে বাংলাভাগ-এর সর্বনাশা রাজনৈতিক চক্রান্তকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন ব্যক্তিগত জীবনে। পার্টির নির্দেশে চলে আসতে বাধ্য হ’লেও, আবার কৃষক সংগ্রামের ধাতৃভূমিতে ফিরে যাবার অপূর্ণ বাসনা বুকে নিয়েও জীবন কাটিয়েছেন অনেকে।


বাংলাভাগের শয়তানি কাদের মস্তিষ্কপ্রসূত?


বাংলাকে তথা বাঙালি জাতিকে ভাগ করার শয়তানি চিন্তা প্রথম আমদানি করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা। বাংলার মাটিতে সংগঠিত বিশাল বিশাল সংগ্রামের ধাক্কায় তখনই তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা। হাজার হাজার মানুষকে ফাঁসি, কামান ও বন্দুকের গুলিতে বারবার হত্যা, অকথ্য অত্যাচার, কোনকিছুতেই গণরোষকে ঠেকানো যাচ্ছিলো না। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে, বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার বাঙালির প্রশাসন-বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে প্রস্তাব করেছিল বাংলাভাগের। বড়লাট লর্ড কার্জন স্বয়ংও এ’ব্যাপারে ফ্রেজারের সঙ্গে সহমত ছিল। ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব স্যার হার্বার্ট হোপ রিজলে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সরকারি প্রতিবেদনে লেখে, “সম্মিলিত বাংলাদেশ একটা গণনীয় শক্তি। এই প্রদেশ ভেঙে দিলে এই শক্তি আর থাকবে না, বিভিন্ন স্বার্থের টানে এটা দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য। … আমাদের উদ্দেশ্য হ’লো বিভেদ জাগিয়ে তোলা এবং আমাদের শাসনবিরোধী একটা সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে ফেলা।” (আধুনিক ভারত, বিপন চন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৮৯, পৃ: ৪০২-৪০৩ দ্রষ্টব্য।) ওই একই মাসে লর্ড কার্জন লিখেছিল, “বঙ্গভাষাভাষী জনসাধারণের ঐক্যে ফাটল ধরানোর নীতি প্রয়োজন, কারণ বঙ্গভাষাভাষীদের এই ঐক্য স্বাধীন-চিন্তার দুর্গ গড়ে তুলবে এবং এর প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকবে। আমাদের এই নতুন পরিকল্পনায় কলকাতার গৌরব আর থাকবে না। কলকাতা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একটা ফলপ্রসূ ঘাঁটি, কলকাতাকে তার গৌরবের স্বর্ণাসন থেকে চ্যুত করতেই হবে … ষড়যন্ত্রকারীগণ এটা ধরতে পেরেছে এবং তাই এরা আমাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে।” (তদেব।)


বাঙালি-বিরোধী এই ঔপনিবেশিক পরিকল্পনার ফল হিসাবেই ১৯০৫-এর ১৬ অক্টোবর দ্বিখন্ডিত হয়েছিল বাংলা।


বাংলাভাগে সহযোগিতা মানেই বাঙালি বিরোধিতা


বাংলা ভাগের সেই সিদ্ধান্তকে সেদিন সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করেছিল বাঙালি জাতি। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ নির্বিশেষে। ‘বাঙালি’ হিসাবে।


বাঙালির সেই প্রতিরোধ আন্দোলনে বেসামাল হয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা। বিশ্বমানবতার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির জন্য গান বেঁধেছিলেন:


“বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল –
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান। …
“বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন –
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।”


তখন যে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী কমিটি (Anti-Partition Committee) গড়ে উঠেছিল, তাতে ছিলেন গুরুদাস ব্যানার্জী, আনন্দমোহন বসু, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাসবিহারী বসু, মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়, আব্দুল রসুল, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, অশ্বিনীকুমার দত্ত, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, ময়মনসিংহের জমিদার আচার্য চৌধুরী, ঢাকার নবাব আত্তিকুল্লাহ, সখারাম গণেশ দেউস্কর, আব্দুল হালিম গজনবী, নীলরতন সরকার, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপীনচন্দ্র পাল প্রমুখ।


হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে যে উত্তাল আন্দোলন তখন গড়ে উঠেছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ সিংহের ঘুম তাতে উড়ে গিয়েছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৫, কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের যে ঐতিহাসিক বিশাল শোভাযাত্রা হয়েছিল, বিভিন্ন সমাবেশে ও শোভাযাত্রায় বাঙালি জাতীয়তার যে চেতনা প্রতিফলিত হচ্ছিল, শাসক শ্রেণীর দুশ্চিন্তাও ততোই বাড়ছিল। এই আন্দোলনের আবহেই অঙ্কুরিত হয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের বীজপত্র। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রমাদ গুনেছিল। ধারাবাহিক আন্দোলনের ধাক্কায়, ছ’বছর পর, ১৯১১ সালে উদ্ধত ব্রিটিশ শাসকরা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। পরাজয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে, দুরভিসন্ধি নিয়েই তারা রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লীতে।


কিন্তু অনেক কংগ্রেস নেতার ধর্মীয় (হিন্দু) সাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে তাদের উপেক্ষার মনোভাব, বাঙালির জাতীয় ঐক্যকে অনিবার্যভাবেই দুর্বল করেছিল। এমনকি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীও, ‘মন্দিরে দাঁড়িয়ে স্বদেশীদের শপথ’ নিতে বলেছিলেন।


“অবশ্য এখানেও ভিন্নমত ছিল। যেমন ছিল বিচক্ষণ রাজনীতিকদের মধ্যে। এঁরা ভবানী পূজা, শিবাজী উৎসব ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন বা মতামত প্রকাশ করেছেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো ধীরস্থির শান্তপ্রকৃতির পণ্ডিত এসব ‘অতীত অনুরাগ ব্যাধি বিশেষ’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন (প্রবাসী ১৯০৬ খ্রি.)। আর রবীন্দ্রনাথ এসব কারণে শেষ পর্যন্ত স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন।


“বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন যেভাবে জাতীয়তাবাদী স্বদেশী আন্দোলনে পরিণত হয় … তেমনি ধর্মীয় সংস্কৃতির সংযোজনে তাতে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বীজও রোপিত হয়েছিল।” (দেশভাগ: ফিরে দেখা, আহমদ রফিক, অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ ২০১৪, পৃ: ২০৫ দ্রষ্টব্য।)


বাংলাভাগেই বাঙালির সর্বনাশ!


১৯০৫ সালে বাংলাভাগের কৌশল ব্যর্থ হলেও, ৪২ বছর পর, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭, সেই দুরভিসন্ধিমূলক সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হয়েছিল শেষপর্যন্ত। ২২ বছর কফিনবন্দী অবস্থায়ও লর্ড কার্জনের মরদেহ হয়তো মুচকি হেসেছিল সেদিন - ব্রিটিশ বিরোধী “জাতিয়তাবাদী”, “ধার্মিক”, “কমিউনিস্ট” ইত্যাদিদের বাংলাভাগ নিয়ে রাজভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখে!


ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গুজরাটি নেতৃত্ব, গান্ধী ও প্যাটেল, বাঙালির সর্বনাশকারী বাংলাভাগে আগ্রহী ছিল, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন পশ্চিমবাংলা ভারতবর্ষের অঙ্গ হবে ব’লে। বাংলায় কংগ্রেস দলের নেতা শরৎচন্দ্র বসু এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম, দু’জনেই মনে করতেন, “ভারত একটি দেশ নয়; একটি উপমহাদেশ। এবং ভারতীয়রা এক জাতি নয়। ভারত যথার্থভাবে তখনই স্বাধীন হবে যখন ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলি ও জাতিসমূহ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।” (‘আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি’; আবুল হাশিম, চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, প্রথম ভারতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ১৯৮৮ || বৈশাখ ১৩৯৫, পৃ: ১১৮ দ্রষ্টব্য।)


শরৎচন্দ্র বসুকে এক চিঠিতে (৮ জুন ১৯৪৭) গান্ধী লেখেন, “তোমার উচিত হবে বাংলার অখণ্ডতার জন্য সংগ্রাম পরিত্যাগ করা এবং বঙ্গভঙ্গের জন্য যে পরিবেশ রচিত হয়েছে তাতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না করা।” শরৎচন্দ্র বসু গান্ধীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার ভাবতে কষ্ট হয়, যে কংগ্রেস একদা ছিল এক মহান জাতীয় প্রতিষ্ঠান, তা দ্রুত কেবলমাত্র হিন্দুদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে।”


সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ যেমন লালায়িত ছিলেন অবিভক্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অঙ্গ হিসাবে পেতে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম ছিলেন অবিভক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার প্রবক্তা। বসু এবং হাশিম যৌথভাবে বারবার দরবার করেছেন গান্ধীর কাছে, চিঠি-টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন বাংলা-ভাগের বিরুদ্ধে। দাবি তুলেছেন অবিভক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার জন্য। সাড়া তো পানই-নি, বরং সরাসরি বিরোধিতাই পেয়েছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল ইত্যাদি সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতাদের কাছ থেকে।


বাংলা ভাগের ব্যাপারে সবচেয়ে দ্বিচারিতাপূর্ণ ও বিস্ময়কর ভূমিকা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির।


হিন্দুমহাসভার মতো ঘোষিত হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী যে বঙ্গভঙ্গের জন্য চেষ্টা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কংগ্রেসের মতো একটি জাতীয় মঞ্চের নেতৃত্ব যেভাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছিল, তাতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের সঙ্গে পাবার জন্য তাদের লোভ ছিল অনিবার্য। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের উপর শোষণ চালানোর স্বার্থে অবাঙালি আদমজী-ইস্পাহানি অ্যান্ড কোং, এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন পশ্চিমবঙ্গের উপর শোষণ চালাবার স্বার্থে বিড়লা-গোয়েঙ্কা-খৈতান ইত্যাদির মতো অবাঙালি বেনিয়াদের বঙ্গভঙ্গের জন্য আগ্রহ, সমর্থন ও তৎপরতাও ছিল তাদের শ্রেণীস্বার্থেই।


কিন্তু ১ জুন ১৯৪৭ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি তার পত্রিকায় (‘স্বাধীনতা’) বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মেহনতী মানুষের প্রতিবাদী আন্দোলনের খবর ধারাবাহিকভাবে প্রচার করেছে। অথচ, সেই জুন মাসেরই ২০ তারিখ আইনসভায় বাংলাভাগের পক্ষে একই সঙ্গে ভোট দিলেন হিন্দুমহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং কমিউনিস্ট নেতা জ্যেতি বসু! শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতে, ‘২০ জুন হিন্দুদের মুক্তির দিন।’ (‘উত্তাল চল্লিশ – অসমাপ্ত বিপ্লব’; অমলেন্দু সেনগুপ্ত, পার্ল পাবলিশার্স, ৯.১১.১৯৮৯, পৃ: ২৩৪ দ্রষ্টব্য।) আবার পরের দিনই ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকা সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখে –


“সারা কলিকাতা শহর আইনসভার দুয়ারে ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই কেন? গত ৪০ বছর ধরিয়া তাঁহারা স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, যাঁহারা হাসিতে হাসিতে ফাঁসীর মঞ্চে উঠিতেছিলেন, কালাপানি পার হইতেছিলেন, কলিকাতার রাজপথে বুলেটের সামনে বুক পাতিয়া জিতেছিলেন, কল-কারখানা ও স্কুল-কলেজ বন্ধ করিয়া লক্ষ লোকের জমায়েত করিতেছিলেন – তাঁহারা আজ কোথায়? তাঁহাদের সেই বিপ্লবী অভ্যুত্থানে আইনসভার প্রাসাদভবন কাঁপিয়া উঠে নাই কেন?”


বিস্ময়কর দ্বিচারিতাপূর্ণ বাঙালি-প্রীতির নমুনা!


ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল পরিকল্পনা; মুসলমান ও হিন্দু, দুই তরফের সাম্প্রদায়িক মাতব্বরদের ব্রিটিশ পদলেহন; এবং ‘কমিউনিস্ট’ শক্তির সমর্থন। এই তিন বাঙালি-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ঐকমত্যই বাংলার সর্বনাশা ভাঙনকে সম্ভব করেছিল।


১৫ আগস্ট: বাঙালির নব-স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখার দিন


মানুষই স্বপ্ন দেখে। স্বাধীনতার। শোষণমুক্তির। মর্যাদার।


বাংলাভাগের দু’মাস আগে, ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭, অবিভক্ত বঙ্গের অন্যতম প্রবক্তা আবুল হাশিম এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন - “ভারতের বর্তমান বৈপ্লবিক চিন্তাধারা তার সূত্রপাতের জন্য বাংলার কাছে ঋণী। …


“শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় এবং ইঙ্গ-মার্কিন বিদেশী পুঁজি বাংলাকে শোষণ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করা হয়েছে। আমাদের ম চেধ্যে ক্রমবর্ধমান সমাজতান্ত্রিক প্রবণতা বিদেশী শোষকদের চিত্তে দখলিচ্যুত হওয়ার ভীতি সৃষ্টি করেছে। তাদের এ বিচক্ষণতা আছে যার দ্বারা তারা স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলায় তাদের অসুবিধার কথা উপলব্ধি করতে পারছে। বিদেশী পুঁজির স্বার্থে বাংলাকে বিভক্ত, পঙ্গু এবং নিষ্প্রভ করার প্রয়োজন রয়েছে যাতে করে শোষণকে প্রতিহত করার কোনো ক্ষমতা বাংলার কোনো অংশেরই অবশিষ্ট না থাকে।


“সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার রূপরেখা থেকে আমার এই ধারণা জন্মেছে যে এর উৎসাহ ও উদ্দীপনা ইঙ্গ-মার্কিন কায়েমী স্বার্থবাদী এবং তাদের ভারতীয় মিত্রেরা জুগিয়েছিল। …


“বাংলার যুবক হিন্দু ও মুসলমানদের উচিত একতা বজায় রেখে নিজেদের দেশকে বৈদেশিক প্রভাবের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে বাংলার বিলুপ্ত মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং ভারতের ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জাতিসমূহের (future comity of nations)-এর কাছে সম্মানের আসন লাভের চেষ্টা করা। …


“কিন্তু বিভক্ত বাংলায় পশ্চিম ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা পশ্চিমবঙ্গ একটি অবহেলিত প্রদেশ, সম্ভবত একটি কলোনীতে পরিণত হবে। বঙ্গভঙ্গের সঙ্গে তাঁরা যতই নিজেদের প্রত্যাশাকে গ্রথিত করুন, এটা আমার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে বাংলার হিন্দুরা বিদেশী পুঁজিবাদের দিনমজুরের পর্যায়ে পরিণত হবেন।” (‘আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি’, পৃ: ১২৩ - ১২৫ দ্রষ্টব্য।)


সন্দেহ নেই, ভঙ্গবঙ্গে ৭৫ বছরের অভিজ্ঞতা উপরের প্রতিটি বক্তব্যকে সঠিক প্রমাণ করছে।


“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” সঙ্গীতের রচয়িতা প্রবীন সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছিলেন, “আবুল হাশিম-শরৎ বোস পরিকল্পনার মতো যে স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক বৃহত্তর বা্ংলা গড়ে উঠত তা হতো দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশ।” (‘দেশভাগ: ফিরে দেখা’, পৃ: ৪১২ দ্রষ্টব্য।)


সেই দূরদৃষ্টি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস, আন্তরিক ইচ্ছা, কোনোকিছুই ছিলনা বঙ্গভঙ্গ-পন্থী সাম্প্রদায়িক ও মেরুদন্ডহীন বাঙালি মোড়লদের!


‘অমৃত মহোৎসব’-এ আলোকিত “স্বাধীনতা”-র পরিণাম পশ্চিমবঙ্গে কী দাঁড়িয়েছে ৭৫ বছরে?
১) বঙ্গভঙ্গের মদতদাতা বিড়লা-গোয়েঙ্কা-খৈতান ইত্যাদিদের সঙ্গে লুঠেরা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে জুটেছে আদানি-আম্বানিদের মতো রাঘব-বোয়াল অবাঙালি শোষক বেনিয়াদের দল।
২) ব্রিটিশ শোষকদের জায়গায় এখন রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শোষক।
৩) দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষকরা আজও নিজেদের জমি পায়নি। আজও তারা শোষিত-বঞ্চিত-লুন্ঠিত।
৪) শ্রমিকশ্রেণী আজও শোষিত-বঞ্চিত-লুন্ঠিত। পাশাপাশি, দিন-আনা-দিন-খাওয়া অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। পশ্চিমবঙ্গ থেকে পেটের দায়ে লক্ষলক্ষ মানুষ পরিযায়ী অসংগঠিত শ্রমিক হিসাবেও হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে, সামান্য টাকা উপার্জনের জন্য বছরের পর বছর কাজ করতে বাধ্য হ’ন।
৫) মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলির চমৎকার সহাবস্থানের ভূমি অবিভক্ত বাংলা এখন প্রধানত পরস্পরবিরোধী দু’ভাগে বিভক্ত: হিন্দু-পশ্চিমবঙ্গ এবং মুসলমান-বাংলাদেশ! দেশ-গাঁয়ে যাওয়া-আসার জন্য সীমান্ত পারাপারের আকাঙ্ক্ষাও আন্তর্জাতিক নিয়মের শিকলে বাঁধা! ‘দুই বাংলা’-ই হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বে দীর্ণ! পশ্চিমবঙ্গ আজও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্লেদ থেকে মুক্ত হ’তে পারলো না!
৬) বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী, বাঙালি রাষ্ট্রপতি, বাঙালি রাজনৈতিক মোড়লদের মাতব্বরী ধারাবাহিকভাবে চলছে। শুধু বাঙালি জাতি ক্রমশই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহ-সংঘাতে জড়িয়ে এক বিপন্ন জাতিতে পরিণত হয়ে চলেছে! শাসকরা তাদের ‘ক্ষমতা’-র গদিপ্রাপ্তি নিয়েই মশগুল! বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের এবং বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথাও তাদের নেই! শুধুই ভাষণের চটকদারি এবং “এক লক্ষ চাকরি”-র মতো ডাহা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির চমক।
৭) পশ্চিমবঙ্গে শাসকদের চুরি, জালিয়াতি, দুর্নীতি এভারেস্টের চূড়াকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে! ‘বাঙালি’ নিয়ে আদিখ্যেতা করা ‘নির্বাচিত’ সরকারের বাঙালি শাসকও গ্রেপ্তার হচ্ছেন জালিয়াতির অভিযোগে।
৮) ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখানো বাঙালি জনগণকে ‘নির্বাচিত’ বাঙালি শাসকই ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে লাঠিপেটা করে, জেলে পাঠায়, গুলি চালিয়ে হত্যা করে।
৯) ৭৫ বছর পরে, বর্তমানে এমন এক ‘বাঙালি’-সরকারের তত্ত্বাবধানে পশ্চিমবঙ্গবাসী আছেন যেখানে শিক্ষিত বাঙালি-পুত্র-কন্যা, শিশুকোলে মা, সকলে দলবদ্ধভাবে ঠান্ডা-ঝড়-বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা ক’রে সাড়ে চারশো দিনেরও বেশি রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের ন্যায্য ও আইনী প্রাপ্যর দাবিতে। লক্ষলক্ষ বাঙালি সন্তানের চোখের জলকে তাচ্ছিল্য ক’রে, শতশত কোটি টাকা সংগঠিত জালিয়াতির অভিযোগে বিদ্ধ ‘নির্বাচিত’ বাঙালি শাসকগোষ্ঠী!
১০) ইস্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু ক’রে, পশ্চিমবঙ্গের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই কার্যত পঙ্গু ক’রে দেওয়া হয়েছে ‘চাকরি বিক্রী’-র ব্যাপক ও গভীর জালিয়াতির মাধ্যমে। “লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ না-দিলে শিক্ষক বা অধ্যাপকের চাকরিও হবে না।” - এটাই সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছে। শতশত যোগ্য যুবক-যুবতী শিক্ষকতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও; কিন্তু শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছে আবেদন পর্যন্ত না-করা এবং পরীক্ষায়ও না-বসা ছেলেমেয়েরা! বিপুল আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হ’য়ে বিভিন্ন সময়ে কারাবাসেও থাকছেন ‘বাঙালি’ শাসকদলের একের পর এক নেতা-মন্ত্রী। বিভিন্ন সরকারের নানা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি-জালিয়াতিতে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা এমন সরকারি প্রশাসন আগে কখনও দেখেনি পশ্চিমবঙ্গ।


‘বাঙালির স্বাধীনতা’- কী নির্মম পরিহাস! কীসের ‘স্বাধীনতা’! কাদের ‘স্বাধীনতা’!


শেষ কথা
নয়া-পরাধীনতার গ্লানি দূর ক’রে ইতিহাসের পুনর্বিবেচনা, বাঙালি জাতির – বিশেষ ক’রে মেহনতী জনগণের – প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, আলাপ-আলোচনা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং যথাযথ বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণের শুভলগ্ন হয়ে উঠুক ১৫ অগস্ট। এটাই সময়ের দাবি। — শ্রমজীবী ভাষা, ১ আগস্ট, ২০২২

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.