বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

চটকলে নারী শ্রমিক ইতিবৃত্ত

চটকলে নারী শ্রমিক ইতিবৃত্ত

অশোক ঘোষ

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ নভেম্বর, ২০২১— চটকলের কাজ, কাজের বিধি ব্যবস্থা, আধুনিকীকরণ, বেতন কাঠামো ইত্যাদি বিষয় বহু আলোচনা সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে হয়ে থাকে৷ সরকারও মাঝেমধ্যে নড়ে চড়ে বসেন৷ কখনও কাঙিক্ষত ফল পাওয়া যায়, কখনও বা অবস্থা আগের মতো চলতে থাকে৷ কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে অর্থাৎ যে মাত্রায় হওয়া উচিত ছিল, কার্যত তা হয়নি, সেই ক্ষেত্রটি হল চটকলের নারী শ্রমিক ও চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়া মহিলাদের জীবন ও জীবিকার পরিসর৷ জীবনের সর্বেক্ষেত্রে যে বঞ্চনার মুখোমুখি তাঁদের হতে হয়, সেই ক্ষেত্রগুলি বিশেষ আলোচিত নয়৷
হুগলি জেলার তেলেনিপাড়ায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া জুট মিলের একজন শ্রমিক ভিখারি পাসোয়ানের পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হয়৷ সময়টা ছিল অক্টোবর, ১৯৯৩ সাল৷ সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটির ব্যাপক প্রচার হয়৷ ভিখারি পাসোয়ানের বাবা লক্ষ্মীচাঁদ পুলিশের শাস্তির দাবিতে মামলা করেন৷ কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলায় ভিখারির স্ত্রী লালতি পাসোয়ানের সাক্ষ্য থেকে এমন বহু বিষয় উঠে আসে, যা চটকলের সঙ্গে নারী সমাজের জীবনের বেদনাদায়ক ইতিবৃত্ত৷
মামলা চলাকালীন লালতি পাসোয়ানের সাক্ষ্য হয়ে যাওয়ার পর ভদ্রেশ্বর থানার অফিসার-ইন-চার্জ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে জানান, ভিখারি পাসোয়ানের স্ত্রী পরিচিতিতে লালতি’র সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ লালতি ভিখারি পাসোয়ানের বিবাহিত স্ত্রী নন৷ কোনও একসময় নৈহাটি জুট মিলের শ্রমিক জগু পাসোয়ানের সঙ্গে লালতির বিবাহ হয়েছিল৷ পরে লালতি জগু পাসোয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে গঙ্গা পার হয়ে তেলেনিপাড়ার ভিক্টোরিয়া জুটমিলের শ্রমিক ভিখারি পাসোয়ানের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন৷ আদালত বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়৷ কিন্তু লালতি ও তাঁর সন্তানদের বেঁচে থাকার জন্য শুধুমাত্র গ্রাসাচ্ছাদনের বিষয়টিও আদালতে গুরুত্ব পায়নি৷ এই সময় দেখা যায় রাজ্য সরকারের আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও চটকল কর্তৃপেক্ষর মধ্যে অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে৷ আর এই মামলা চলাকালীন লালতি পাসোয়ানকে একজন মহিলা হিসেবেই বিচার করা হয়েছে৷ শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টিতে কখনও লালতির সমস্যাকে দেখা হয়নি৷ লালতি পাসোয়ানের চটকলের শ্রমিক ছিল না ঠিক, কিন্তু ভিখারির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনে লালতি হয়ে উঠল কেন্দ্রীয় চরিত্র৷ পুলিশ প্রশাসন ও কারখানা কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত আক্রমণের লক্ষ্য হল লালতি৷
লালতি কোর্টে যে বয়ান দিয়েছিলেন, তার থেকে চটকলের শ্রমিকদের জীবনযাপন, সামাজিক নিরাপত্তা, দু’বেলা গ্রাসাচ্ছাদনের সমস্যা পুরুষ ও নারীর লিঙ্গভিত্তিক সমস্যা বিশ্লেষণ করা যায়৷ এই বয়ান থেকে চটকল শ্রমিকদের শ্রেণীগত অবস্থানের চিত্র উঠে আসে৷ ভিখারির মৃত্যুর পরে লালতি ও তাঁর সন্তানদের (যারা ভিখারি পাসোয়ানেরই সন্তান) খেয়ে পরে বেঁচে থাকার প্রশ্নটিকে প্রশাসনের কোনও মহলেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি৷ পুলিশ প্রমাণ করতেই ব্যস্ত ছিল যে, লালতি একজন সাধারণ মহিলা আর এই রকম ঘটনাই চটকলে দেখা যায়, ভিখারি পাসোয়ানের স্ত্রী হিসেবে লালতি কোনও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য নয়৷ লালতি পাসোয়ানের বক্তব্যরে মাধ্যমে উঠে আসা সমস্যাগুলি ছিল কার্যত শ্রেণী সমস্যা৷ কোনও একজন মহিলার বা শুধুমাত্র মহিলাদের সমস্যা নয়৷ চটকলে নারী ও পুরুষ একই সঙ্গে কাজ করলেও, উভয়েই শ্রমিক শ্রেমির অন্তর্গত৷ অর্থাৎ নারী শ্রমিকদের সমস্যাও শ্রেণীগত সমস্যা, সেভাবে দেখা হয়নি৷ কার্যত চটকলের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সমূহ পর্যন্ত সেই দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত নয়৷ পুরুষ শ্রমিকরা সর্বদাই যেভাবে শ্রমিকশ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত হয়, নারীদের ক্ষেত্রে সেভাবে দেখা হয়নি৷ লালাস পাসোয়ানের ঘটনা প্রায় কুড়ি বছর আগের হলেও অবস্থার কোনও হেরফের হয়নি৷
চটশিল্পে এখন নারী শ্রমিকের সংখ্যা খুবই কম৷ বাংলাদেশে ১৮৫৫ সালের পর থেকে দ্রুত গড়ে উঠতে থাকে চটকল৷ ১৮৯০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত পঞ্চাশ বছরে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়৷ গ্রামবাংলার সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির ভেঙে পড়া ক্ষয়িষ্ণু পরিমণ্ডলে বিভিন্ন কারণে জীবন ধারণ বিপন্ন হয়ে পড়ায় বহু মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চটকলে কাজ করতে চলে আসে৷ এঁদের মধ্যে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও দরিদ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের পুরুষ ছিল সংখ্যাধিক্য৷ কিন্তু হতোদরিদ্র হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের মহিলারাও বেঁচে থাকার অন্য কোনও উপায় না পেয়ে তাঁরাও চটকলে কাজ করতে শুরু করেন৷ কাজের সূত্রে এঁরা অনেকেই চটকলের চারপাশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন৷
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গ্রামবাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়ে৷ কৃষিনির্ভর সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণগুলিও অমিল হতে থাকে৷ কার্যত গরিব বা মরা গরিব বলতে যাঁদের বোঝানো হয়, তাঁদের জীবন ও জীবিকা সর্বাধিক বিপন্ন হয়ে পড়ে৷ শুধু ক্ষুণ্ণিবৃত্তির প্রয়োজনেই জন্মস্থানের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হয় দলে দলে মানুষ৷ কলকাতাকে কেন্দ্র করে চব্বিশ পরগনার বিড়লাপুর থেকে একদিকে হালিশহর আর গঙ্গার অপর পারে হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়াতে নতুন নতুন চটকলের স্থাপনা হতে থাকে৷ এই নতুন গড়ে ওঠা চটকলে শ্রমিকের প্রয়োজন পূরণ করতে পরিযায়ীর দল শ্রমের বাজারে ভিড় করতে শুরু করে৷ পুরুষ শ্রমিক সংখ্যাধিক্য হলেও শ্রমের বাজারে নাম লেখানো নারী শ্রমিকের সংখ্যাও বেড়ে চলে৷ এই শ্রমশক্তির মধ্যে অবহেলিত, বঞ্চিত, নিম্নবর্ণের বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত দরিদ্র মহিলারাই বেশি সংখ্যায় কাজে যোগ দিতেন৷ উচ্চবর্ণের হিন্দু মহিলারা সাধারণভাবে চটকলের কাজে আসতেন না৷
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চটকল ও বস্ত্রকলে নারীরা যত বেশি সংখ্যায় মজুরি শ্রমিকে পরিণত হল, তাদের কেন্দ্র করে সামাজিক উদ্বেগ বাড়তে থাকল৷ সন্তান-সন্তিত পালন থেকে সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকাও আলোচ্য হয়ে উঠল৷ উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারী মুক্তির বিষয়টি সো্চ্চার হওয়ার ফলে সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নরনারী সম্পর্কের পুননির্মাণ শুরু হয়৷ বিধবা বিবাহ চালু হওয়ার কারণে মহিলাদের শারীরিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার সামাজিক বিধিব্যবস্থাগুলি অকার্যকর হওয়া শুরু হয়৷ এই সময় গড়ে ওঠা নতুন নতুন চটকলগুলিতে শ্রমশক্তির প্রয়োজনে মালিকপক্ষ পুরুষ ও নারী উভয় শ্রমিকের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল৷ তবে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল কম৷ কিন্তু কোনও সময়ই নারী শ্রমিকদের শ্রেণীগত অবস্থান গুরুত্ব পায়নি৷
ধীরে ধীরে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে চটকলের কাজে যোগ দিতে আসা নারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে চলে৷ কলকাতা শহরে বসবাসকারী দরিদ্র মহিলারাও চটকল ও কাপড়ের কলে কাজে যোগ দেয়৷ ১৮৯৭ সালে চটকলে পুরুষ শ্রমিক ছিল ৭২,৪৪০ জন, নারী শ্রমিক ছিল ১৭,৯০৫ জন, শিশু শ্রমিক ছিল ১২,১০৪ জন৷ এই বছর নারী শ্রমিকের শতাংশের হার ছিল ১৭.৪ শতাংশ৷ ১৯০১ সালে নারী শ্রমিক ছিল ১৩,৪৮৯ জন, শতাংশের হারে ২০.৯ শতাংশ৷ ১৯১১ সালে পুরুষ শ্রমিক ছিল ১,৬১,২৩৯ জন, নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৫,২৬৩ জন, শতাংশের হারে ১৭.৯ শতাংশ৷
১৯২২ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকদের সংখ্যা ১৬ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশে নেমে আসে৷ ১৯১২ সালে বাংলাদে্শে চটকলের সংখ্যা ছিল ৬১টি৷ প্রতিবছরই নতুন নতুন চটকল গড়ে ওঠে৷ পাশাপাশি, নারী ও শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা কমতে থাকে৷ ১৯৩৯ সালে ১০১টি চটকল ছিল বাংলায়৷ পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ছিল ২,৪৩,৪৯০, নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৭,৬৮৮, শতাংশের হারে ১৩.৪ শতাংশ৷ দেশভাগের পরে চটকলে পুরুষ ও নারী শ্রমিকের অনুপাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে৷ ১৯৫০ সালে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭,৫৩১, শতাংশের হারে ১২.৪ শতাংশ৷ কিন্তু নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে লিঙ্গগত বিভাজন চটকলের শ্রেণী আন্দোলনকেই দুর্বল করেছে৷ এই ধরনের বিভাজন, কার্যত মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের অশুভ আঁতাতের মোকাবিলা করতে পারে না৷ তাছাড়া পুরুষ ও নারী শ্রমজীবী মানুষের আন্তঃসম্পর্ক পুঁজিবাদী ধারণা থেকেও গড়ে ওঠে৷
মজুরি শ্রমের বাজারে নারীদের পক্ষে কখনওই সহজ হয়নি৷ বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের পারিবারিক দায়িত্ব কর্তব্য থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আর্থিক বিবাহিত নারীদের পারিবারিক দায়িত্ব কর্তব্য থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আর্থিক দৈন্যরে কারণে সবকিছু ছেড়ে কাজের বাজারে প্রবেশ সেদিনও কঠিন ছিল৷ একবার শ্রমের বাজারে ঢুকে পড়লে সারাজীবনই কাজ করে যেতে হয়৷ আর এই কাজগুলি হয় নিম্নমানের ও অস্থায়ী৷ নারী শ্রমিকদের শ্রেণী হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে গোঁড়া (অর্থোডক্স) দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করত৷ একমাত্র উন্নত পুঁজিবাদী দেশে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মানসিকতা ছিল না৷
বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, হতোদরিদ্র মহিলাদের তুলনায় অন্যান্য রাজ্যরে বিশেষ করে বিহার, যুক্তপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেই মহিলারা বেশি সংখ্যায় শ্রমের বাজারে যোগ দেয়৷ এদের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের মহিলারা ছিলেন সংখ্যাধিক্য৷ এঁরা তখনই বাধ্য হয়েছিলেন শ্রমের বাজারে যোগ দিতে যখন এদের বেঁচে থাকার সমস্ত উপাদানই শেষ হয়ে যায়৷ কিন্তু পুরুষ শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে চটকলে যোগ দিতে শুরু করার ফলে ক্রমশ নারী শ্রমিকদের সংখ্যা ঢাকা পড়ে যায়৷ ১৮৮০ সালের পরবর্তী সময়ে দলে দলে পরিযায়ীরা শ্রমের বাজারে উপচে পড়ে৷ নারী শ্রমিকদের শ্রমের বাজারে প্রবেশ মসৃণ হয়নি, কারণ সর্বদাই তাঁদের সাংসারিক দায়িত্বের বিষয়টি কাজে প্রবেশের শর্ত হয়ে উঠত৷ তাঁদের সাংসারিক দায়িত্বের বিষয়টি কাজে প্রবেশের শর্ত হয়ে উঠত৷ এদের রোজগারের টাকা থেকে সংসারের খুব আর্থিক সাহায্য হতো না৷ কারণ, এঁরা ছিলেন অতি সস্তা শ্রমিক৷ পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের মধ্যে মজুরির ফারাক ছিল৷ নারী শ্রমিকদের সর্বেক্ষত্রেই কম মজুরি দেওয়া হতো৷
চটকলে কর্মরত মহিলা শ্রমিকদের জীবনে যৌন সম্পর্ক আর মাতৃত্বের সমস্যা কাজের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে ওঠে৷ দরিদ্র মেয়েদেরই যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হতো৷ চটকলে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার দায়িত্ব থাকত সর্দারদের ওপর৷ একজন সর্দারের সঙ্গে একাধিক মহিলার সম্পর্ক থাকত৷ চটকলে কাজ পাওয়া নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্দারদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা জরুরি ছিল, বৈধ বা অবৈধ সেই বিচার হতো না৷ ১৯২০ সালের পরে সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে৷ এই সময় কলকাতার মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক মহলে উদ্বেগ দেখা দেয়৷ অবাধ যৌন সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ, অপরাধ প্রবণতা, বেশ্যাবৃত্তির বিস্তার ঘটতে থাকে শিল্প এলাকাগুলিতে মিল কর্তৃপক্ষের কাছে এই ঘটনাগুলি প্রশাসনিক, উৎপাদন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকে৷ সরকার পক্ষ পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে৷
১৯৩০ সাল নাগাদ কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ দিকের ২৫ মাইলের মধ্যে গড়ে ওঠে ১০০টি চটকল৷ চটকল কর্তৃপক্ষ উৎপাদনের প্রয়োজনেই পুরুষ শ্রমশক্তির ওপরেই বেশি নির্ভর করতে যাবে৷ চটকলের ধারে কাছে বসবাসকারী পুরুষদেরই কাজে নিয়োগের গুরুত্ব দেওয়া হল৷ নারীদের ক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা ও মাতৃত্বের সমস্যাই তাঁদের কলেকারখানায় কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে৷ তাছাড়া নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেতন বষৈম্য, নারী শ্রমিকদের বেতন অতন্ত কম ছিল৷
১৯৩৪-৩৫ সালে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার কারণে বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়৷ প্রথমেই ব্যাপক সংখ্যায় ছাঁটাই করা হয় নারী শ্রমিকদের৷ শহরের শ্রমের বাজারে পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল কম৷ কোনও কারখানাতেই নারী শ্রমিকদের ভারী মেশিনে কাজ করানো হতো না৷ নিম্নস্তরের কাজে এরা নিযুক্ত হতো৷ সেই কাজ থেকে এদের সরিয়ে দেওয়া ছিল সহজ৷ আধুনিক শিল্পে নারী শ্রমিকদের কোনও গুরুত্বূপূর্ণ ভূমিকা ছিল না৷ শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণী ইতিহাস নারী শ্রমিকদের ভূমিকা যথাযথভাবে লেখা হয়নি৷ আসলে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী উন্নত পুঁজিবাদী দেশের শিল্প শ্রমিকদের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল৷ ঔপনিবেশিক বাংলায় কোনও শিল্পই নারী শ্রমিকদের শ্রেণী হিসেবে দেখা হয়নি৷ তাছাড়া চটশিল্পে মহিলাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরও একটি অন্যতম কারণ বিহার ও যুক্তপ্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের সংখ্যাধিক্য৷ এই শ্রমিকরা মহিলাদের সরিয়ে দিয়ে তাদের কাজের জায়গাগুলি দখল করল৷ নারী শ্রমিকরা যেহেতু অদক্ষ কাজে নিযুক্ত ছিল, সেহেতু তাদের সরিয়ে দেওয়া ছিল সহজ৷ দক্ষ শ্রমিকদের বেতন বেশি হওয়ার ফলে তাঁরা চটকল এলাকাতেই পরিবার সহ বসবাস শুরু করে৷ এদের পরিবারে মেয়েরা আর চটকলে কাজ করত না৷ এভাবেই চটকলে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে যেতে থাকে৷ তথ্যানুসারে ১৯২৩-২৪ সালে কারখানায় যে মহিলারাই কাজ করত তাদের অধিকাংশ হয় বিধবা অথবা এক মহিলা, যাদের ভরণপোষণের কেউ ছিল না৷ এবং অনেক সময় পুরুষদের সঙ্গেই কাজে যোগ দিতে আসত, কিন্তু সেই পুরুষরা এদের স্বামী ছিল না৷ কোনও চটকল কর্তৃপক্ষ মনে করত মহিলাদের নিয়োগ সমস্যাবহুল৷ চটকল মালিকদের সংগঠন “ইজমা-আইজেএমএ’ আশঙ্কা প্রকাশ করল, মহিলা ও শিশু শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের আইন মানার বাধ্যবাধকতায়৷ অবশ্য কোনও কোনও চটকল কর্তৃপক্ষ মনে করত পুরুষ শ্রমিকরা ধর্মঘট করলেও নারী শ্রমিকরা ধর্মঘটে সামিল হয় না৷ এদের নারী শ্রমিক নিয়োগে বিশেষ আপত্তি ছিল না৷
যে মহিলারা বেঁচে থাকার জন্য চটকলে কাজ করতে বাধ্য হতো, তাদের অনেকেরই চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠত৷ এক চটকলের কাজ ছেড়ে তারা দু’জনেই অন্য চটকলের কাজে যোগ দিত৷
স্বাধীনতার পর থেকে ব্যাপকভাবে কমে গেল নারী শ্রমিকদের সংখ্যা৷ এখন চটকলে হয়তো খুব বেশি হলে ২ বা ৩ শতাংশ নারী শ্রমিক আছেন৷ বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রক্রিয়াতে নারী সমাজের অংশগ্রহণ আশানুরূপ কখনও ছিল না৷ আর নারী শ্রমিকদের শ্রমিক শ্রেণীর দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গী থেকে গণ্য করাও হয়নি৷

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.