বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ মে, ২০২২ - বছর আড়াইয়ের ছেলেটিকে আমাদের বাড়িতে রেখে তার গৃহপরিচারিকা মা কমলা নাইয়া কাজের বাড়ি যেত। সেই সুযোগে আমরা খেলা করে নিতাম প্রাণভরে — ছুটোছুটি করে ধরাধরি, ব্যাটবল, কুশন ছোঁড়া যুদ্ধ। বেশ কয়েক মাস এমন আনন্দময় রুটিন ছিল আমাদের। এখন শিশুর পরিবার কাজ বদলেছে, বাসাও বদলে উঠে গিয়েছে খানিক দূরে। বেশ ক’দিন এ বাড়িতে কচি গলার কলরব আর শোনা যায় না। ওমা, সে দিন বিকেলে ফের দরজায় টুকটুক করে দু’বার আওয়াজ। কে রে, কই রে? খুদে অতিথি তার অভ্যেস মতো লুকিয়েছে লিফট আর দেওয়ালের মাঝের খাঁজে। লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিয়েছে ঘরে ঢোকার আগেই। কমলা বলল, অনেকগুলো বাড়ির কাজ সে ছেড়ে দিয়েছে, যাতে সকালটা ছেলেকে দেখতে পারে। বাবা কাজ সেরে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে, তার জিম্মায় ছেলেকে রেখে তবে মা কাজে বেরোয়। আজ বাবা ফেরেনি, তাই খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন।
কিন্তু খোকাকে দেখার জন্য এতগুলো কাজ ছেড়ে দিতে হল? চলছে কী করে? চুপ করে থাকে কমলা নাইয়া। মনে পড়ে গেল, ক’দিন আগে নারী দিবস উপলক্ষে শ্রমজীবী মেয়েদের একটি আলোচনা সভায় টিটাগড়ের কাগজকুড়ানি মেয়েরা আক্ষেপ করছিল, “কাজ করব কী, আমরা ঘর থেকে বেরোই আর বাচ্চাদের চলন-বলন বদলে যায়।” এই দিন আনি-দিন খাই মায়েরাও ছেলেমেয়ের মুখ চেয়ে বাড়িতে বসে করার মতো কাজ বেছে নেয়, অনেক কম মজুরি সত্ত্বেও। কেমন কাজ? একজন বললেন, তিনি টায়ার কেটে তা থেকে সুতো বার করেন। এক কেজি সুতো বিক্রি হয় পাঁচ টাকায়। কতক্ষণ লাগে এক কেজি সুতো বার করতে? একটা গোটা দিন লেগে যায়। এমন অবিশ্বাস্য কম মজুরিতে বহু ধরনের কাজ করে মেয়েরা — বিড়ি বাঁধা, কাপড়ে চুমকি-জরি বসানো, এমব্রয়ডারি করা কিংবা বোতাম, চেন বসানো। পুরুষরা এর উল্টো — যথেষ্ট মজুরি না পেলে বরং তারা বসে থাকবে, কিন্তু কাজ করবে না। নিজের কাজের আরও বেশি দাম পেতে দিল্লি, কেরল, আন্দামান, এমনকি বিদেশেও যাত্রা করছে পুরুষরা। আর মেয়েরা সন্তানের মুখ চেয়ে আরও, আরও কম মজুরিতে আরও বেশি সময়, বেশি পরিশ্রমের কাজ বেছে নিচ্ছে। মেয়েদের শ্রমের বাজার বাড়ির চৌহদ্দিতে বন্দি, তাই তার মজুরি, আর সরকারের বেঁধে-দেওয়া ন্যূনতম মজুরি পাশাপাশি দেখলেও লজ্জা লাগে। এত কম টাকায় কাজ করাই বা কেন?
সেই জন্যই কাজ ছাড়ছে মেয়েরা। ভারতে মেয়েদের কাজের বাজার থেকে সরে যাওয়ার ঝোঁক গত দু’দশকে আরও স্পষ্ট হয়েছে। লকডাউনে মেয়েদের কাজের হার তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে — কর্মক্ষম বয়সের দশ শতাংশ মেয়েও রোজগারে বেরোচ্ছে না। বহু মেয়েকে কাজ থেকে মেয়েদেরই ছাঁটাই করা হয়েছে। কিন্তু সেই মেয়েদের একটা বড় অংশ আর কাজ খুঁজছে না, কারণ, ইস্কুল না থাকায় ছেলেমেয়েরা বাড়িতে, তাদের দেখাশোনা করবে কে? কেবল খেটে-খাওয়া মেয়েরা নয়, তুলনায় বিত্তশালী পরিবারের পেশাদার মেয়েরাও সন্তানের দেখাশোনা, পারিবারিক কাজের জন্য নিজের পেশা থেকে সরে আসছে। ‘লিঙ্কডইন’ নামে পেশাদারদের একটি সমাজ মাধ্যম সম্প্রতি ভারতে দু’হাজারেরও বেশি মহিলার উপর একটি সমীক্ষা করেছে। সত্তর শতাংশ মেয়ে বলেছেন, পরিবারের জন্য সময়, আর কাজের জন্য সময়, এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালান্স না থাকায় তাঁরা কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, কিংবা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
আর বাইরে কাজ না করলে পেট চলবে না? কী হচ্ছে সেই মায়েদের, আর তার শিশুদের? মাঝেমাঝে ভয়াবহ ঘটনার কথা শোনা যায়। যেমন খবর মিলল পয়লা এপ্রিল — মালদহের দুই পরিযায়ী শ্রমিক পরিবার হায়দ্রাবাদে গিয়েছিল কাজের খোঁজে। ঘরের মতো কর্মক্ষেত্রেও তারা ছিল পড়শি, তাই একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী তাঁদের চার বছরের ছেলেকে অন্য পরিবারের পুরুষটির কাছে রেখে কাজে যেতেন। সেই লোকটি শিশুকে অকথ্য নির্যাতনই শুধু করেনি, তার ভিডিও করেও ছড়িয়েছে। সেই ভিডিও নজরে না এলে শিশুটির বাবা-মা সে কথা জানতেই পারতেন না। ছেলেটিকে এতই ভয় দেখিয়ে রেখেছিল ওই দুর্বৃত্ত, যে সে তার বাবা-মাকে কখনও কিছু জানায়নি। কল্পনা করতেও হৃৎকম্প হয়, প্রতিদিন বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে ওই নির্যাতনকারীর কাছে যাওয়ার পথে শিশুটির মনের কী অবস্থা হত। কতখানি ত্রাস, কতটা অসহায়তা থেকে সে মার খাওয়ার জন্য যেত রোজ। তত্ত্বাবধানকারী আত্মীয়-পড়শি নিরুপায় শিশুকে এমন কত ভাবে নিগ্রহ করে, কত অবহেলা করে, তার কতটুকু সামনে আসে? এই কি শ্রমজীবী মায়ের সন্তানের প্রাপ্য?
দরিদ্রের সন্তানের পড়াশোনা হয় না, সে অপুষ্ট, রুগ্ন হয়ে বড় হয়, তা পয়সার অভাবের জন্য অতটা নয়, যতটা শ্রমজীবী মায়ের সময়ের অভাবের জন্য। শিশুসন্তানকে নাওয়ানো-খাওয়ানো, পড়ানো-শেখানো চিরকাল ‘মেয়েদের কাজ’ বলে গণ্য হয়। আমেরিকা, ইউরোপের পরিবারগুলিতে পুরুষরা ঘরের কাজ, শিশুর দৈনন্দিন দেখভালের যেটুকু দায়িত্ব বহন করে (মেয়েদের সমান করে না), দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে তার অতি সামান্যই করে। ভারতে মেয়েরা (বেতনহীন) গৃহকাজে দিনে পাঁচ ঘন্টারও বেশি ব্যয় করে, পুরুষরা ব্যয় করে এক ঘণ্টারও কম — এই ব্যবধান বিশ্বে সর্বোচ্চের স্তরে। এমনকি পরিশ্রমী, উদ্যোগী, রোজগারে উৎসাহী মেয়েরাও ভেবে পাচ্ছে না, কী করে বাইরের কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সন্তানকে নিরাপত্তা, যত্ন, পরিচর্যা দেবে। সন্তানের সুরক্ষা মানে মা-দিদিমার গৃহবন্দি দশা। যেখানে তারা বাইরে কাজে যাচ্ছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা ধুলোয় খেলে বেড়াচ্ছে, ইস্কুলের জন্য বেরোলেও শেষ অবধি পৌঁছচ্ছে কিনা, কেউ জানতে পারছে না।
অথচ, এই ভারতেরই বেশ কিছু জায়গায় কমলা নাইয়ার মতো খেটে-খাওয়া মায়েরা নির্দ্বিধায় কাজে যেতে পারে। তাদের সন্তানের দেখাশোনা করে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত ক্রেশ। তামিলনাডুর ভেলোর জেলায় এমন তেইশটি ক্রেশ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, প্রধানত দু’বছরের কম শিশুদের জন্য। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা দিয়ে নয়, ক্রেশের জন্য বাড়তি কর্মী রাখা হয়েছিল। যদিও মাসে মাত্র তিন হাজার টাকা মাইনে হওয়ায় ক্রেশ কর্মীদের ধরে রাখা সহজ হয়নি। আবার, কর্ণাটক-সহ বেশ কিছু রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিও চলে ভোর সাড়ে ন’টা-দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত। তাই সেগুলি ক্রেশ-এর ভূমিকা অনেকটাই পালন করে।
কিন্তু ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যেই ছবিটা অন্য রকম। ১৯৭৫ সালে শুরু হয় যে আইসিডিএস প্রকল্প, তার পরিকাঠামো আজও অতি দুর্বল। জেলাস্তরের আধিকারিক (সিডিপিও) থেকে শুরু করে গ্রামের কেন্দ্রের রন্ধনকর্মী (অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা), প্রতিটি স্তরে কর্মীর বহু পদ শূন্য। বহু অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের নিজস্ব বাড়ি নেই, নিজস্ব টয়লেট নেই। যে ভাড়াবাড়িতে চলছে, তা অনেক সময়েই বেড়া বা পাঁচিলে সুরক্ষিত নয়, তাই মায়েরা সাহস করে শিশুদের পাঠাতে পারেন না। কর্মীর অভাবে অধিকাংশ জায়গায় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে খিচুড়ি বিতরণ, যার জন্য এগুলি ‘খিচুড়ি ইস্কুল’ বলে পরিচিত। পুষ্টি জোগানোর কাজও তেমন ভাল হচ্ছে না — চোদ্দ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চালিয়েও শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার কমেনি, দশজনে প্রায় চারজনের বৃদ্ধি কমে গিয়েছে পুষ্টির অভাবে।
সম্প্রতি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির দিকে নতুন করে দৃষ্টি পড়ে, যখন শিক্ষার অধিকারের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে নিয়ে আসে জাতীয় শিক্ষা নীতি (২০২০)। প্রস্তাব আসে, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিকে তিন বছর বয়স অবধি শিশুদের জন্য রাখা হোক, তার উপরের শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট করা হোক স্কুলের অন্তর্গত প্রি-স্কুল বিভাগ। কিন্তু সে প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায় প্রধানত খরচের ভয়ে — তিন বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ক্লাসরুম আর শিক্ষক জোগাতেই সরকারকে বাড়তি বরাদ্দ করতে হবে অন্তত তিরিশ হাজার কোটি টাকা। তা ছাড়া, অভিজ্ঞতায় এ-ও দেখা গিয়েছে যে স্কুলগুলি তাদের কিন্ডারগার্ডেন বা নার্সারি বিভাগকে এক রকম ‘এলেবেলে’ করে রাখে, সেখানে ‘আর্লি চাইন্ডহুড এডুকেশন’-এর ধারণাগুলির অতি সামান্যই প্রয়োগ করা হয় কাজে। অতএব ভরসা সেই খুঁড়িয়ে-চলা অঙ্গনওয়াড়ি।
অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি যদি সত্যিই স্বনির্ভর, শক্তিশালী, মানবসম্পদে সমৃদ্ধ হয়, তবে তা শিশুপুষ্টি, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অক্ষর-পরিচয়, সংখ্যা-পরিচয় যেমন নিশ্চিত করত, তেমনই শ্রমজীবী পরিবারের মেয়েদের যথাযথ রোজগারের সুযোগও করে দিতে পারত। সেই সঙ্গে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ক্রেশ-এর সুবিধে তৈরি করা কি এতই কঠিন? কেন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এ বাবদ কিছু টাকা ব্যয় করবে না? সম্প্রতি ওই দফতর বয়স্কদের শুশ্রূষার জন্য ‘সেবাসখী’ প্রকল্প ঘোষণা করেছে। ক্রেশ তো সেই কাজের খুবই কাছাকাছি। তেমনই, একশো দিনের কাজের প্রকল্পেই বা কেন ক্রেশ-এর ব্যবস্থা হবে না? চারাগাছ পোঁতা, তাতে জল দেওয়ার কাজের চাইতে কি ফুলের মতো শিশুদের দেখভাল কম গুরুত্বপূর্ণ? নাকি, শিশুদের বড় করাটা ‘অ্যাসেট ক্রিয়েশন’ বলে গণ্য করা যায় না? এখন পশ্চিমবঙ্গের এক একটি পঞ্চায়েত বছরে পাঁচ কোটি টাকাও খরচ করে। শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের কি তার মধ্যে কোনও ভাগ নেই?
এ কাজগুলো করার চেষ্টাও হচ্ছে না, বরং শিশুপুষ্টি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, এ সব খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ার বদলে কমছে। শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করার শাস্তি আরও লঘু করা হচ্ছে আইন সংশোধন করে। মেয়েদের হাতে নানা অনুদান তুলে দিচ্ছে সরকার, অথচ শ্রমজীবী মায়ের চাহিদাকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা করার চেষ্টাও করছে না। যেন মেয়েদের কর্মনিযুক্তির হার কমে আসা উন্নয়নের পথে কোনও বাধা নয়। যেন শ্রমজীবী মেয়েদের মজুরির হারে পতন দেশের সংকট নয়।
আন্তর্জাতিক আর্থিক তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, ভারতের মেয়েরা পুরুষদের সমান হারে কাজ করলে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ত সাতাশ শতাংশ, জিডিপি বৃদ্ধির হার হত নয় শতাংশ। তবু কেন শিশুর যথাযথ পরিচর্যার ব্যবস্থা করে মেয়েদের কাজে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়াটা একটা জরুরি কর্তব্য বলে মনে করে না সরকার? এ ভাবেই আধিপত্যের বাসনা-চালিত রাজনীতি অন্যকে দাবিয়ে রাখতে গিয়ে নিজেকেও খাটো করে। কর্মরত মায়েদের পাশে পরিবারও নেই, রাষ্ট্রও নেই, তাই উন্নয়ন খুঁজে পাওয়া যায় কেবল নির্বাচনী প্রচারে।