বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

দেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্প: কিছু প্রশ্ন

দেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্প: কিছু প্রশ্ন

প্রদীপ রায়

photo

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মহম্মদ বাজার ব্লকের দেউচা ও পাঁচামি, হরিণশিঙ্গা ও দেওয়ানগঞ্জের ৩৩৮৫ একরের কয়লা ব্লক ছোটনাগপুর মালভূমির বনভূমির অংশ। ভারতের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য যে, এখানে কয়লা আছে ১০০০ ফুট থেকে ৪০০০ ফুট গভীরতায়। প্রায় ১৪০ কোটি ঘনমিটার ব্যাসাল্ট পাথরের স্তরের নীচে। কংক্রিটের শক্তি বাড়ানোর জন্য তাপ নিরোধক ব্যাসাল্ট পাথরের বাণিজ্যিক মূল্য অসীম। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লেখা হয়, খনন করা ১৪.২ কোটি টন ব্যাসাল্টের বাজারমূল্য ৭০০০ কোটি টাকা। টেন্ডারের শর্ত অনুসারে (৭১:২৯ অনুপাতে) সরকারের প্রাপ্য হবে ৫০০০ কোটি টাকা। অবশ্য পরিবেশ আদালতের অনুমান, সঞ্চিত ব্যাসাল্টের মূল্য প্রায় ১৮২০০ কোটি টাকা। যে কোনও খনিজ পদার্থ রাষ্ট্রের সম্পত্তি। বেসরকারি কর্পোরেট মাইনিং কোম্পানি পাবে মাইনিং-এর পারিশ্রমিক। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার আইন বদল করায় খনিজ সম্পদের একটা বড় অংশ সরকারের হাত থেকে কর্পোরেটের হাতে চলে গেছে।
কয়লা খননের দায়িত্বে পশ্চিমবঙ্গ সরকার
২০১১ সালে সংসদে কয়লা মন্ত্রক জানায়, দেউচা-পাঁচামির বিশাল কয়লা ব্লকের উত্তোলনের দায়িত্ব নিতে কোল ইন্ডিয়া ইচ্ছুক নয়। কারণ এই কয়লা উত্তোলন এক ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। বিরাট পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াও ব্যাসাল্টের স্তর সরিয়ে কয়লা উত্তোলনের প্রযুক্তি ও
প্রয়োজনীয় যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। নিলামে ওঠা সাতটি রাজ্যের ৫৪টি কয়লা ব্লকের মধ্যে দেউচা-পাঁচামি কয়লা ব্লক অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোনও রাজ্য সরকার এই কয়লা উত্তোলনের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। ২০১৫ সালের শেষভাগে রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের জন্য বেঙ্গল-বীরভূম কোলফিল্ডস লিমিটেড গঠন করে। ২০১৮ সালে কেন্দ্রের সম্মতিতে রাজ্য সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে এই এবং বাণিজ্য নিগমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২১ সালে নির্বাচন প্রাক্কালে, এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হবে এবং প্রভূত কর্মসংস্থান হবে বলে রাজ্য সরকার ঘোষণা করে। যদিও তখনও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনও আলোচনা করা হয়নি।
প্রকল্প শুরুর প্রাথমিক কাজ
গত বছরের (২০২৪) শেষ দিকে ৩০৩৪ একর জমির উপরে ১২৪ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ন্যূনতম ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা করা সংস্থা এই দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। সংস্থাকেই পরিবেশ ছাড়পত্র এবং বনাধিকার আইন, ২০০৬ অনুসারে ছাড়পত্র নিতে হবে। তাদেরই প্রয়োজনীয় অসরকারি রায়তি জমি কিনতে হবে এবং এলাকায় গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। এরপর খননের পরিকল্পনা অনুমোদিত হলে নির্বাচিত সংস্থাকে খননের অধিকার দেওয়া হবে ২৫ বছরের জন্য।
এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বঙ্গ সম্মেলনের মঞ্চ থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হয়ে
গিয়েছে। অথচ বাস্তবে চান্দা পঞ্চয়েতে মাত্র ১২ একর জমিতে পাথর খাদান তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর জন্য ওই জমির ৯৮০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ স্থানান্তরিত করার কাজ শুরু হয়েছে।
আইন এড়ানোর ধূর্ত প্রচেষ্টা
রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম ১২ একর জমির উপর খননের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র পেয়েছে। কেন মাত্র ১২ একর জমি? দেশের আইন অনুযায়ী সমস্ত খনি প্রকল্প আকার অনুযায়ী A, B1, B2 ক্যাটাগরিতে বিন্যস্ত। ২৫ একরের কম হলে B2, ২৫ থেকে ৫০ একর অবধি BI এবং ৫০ একরের বেশি হলে A ক্যাটাগরি। প্রকল্পের আয়তন বড় হলে কঠোর শর্তের কড়াকড়ি দেশের পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা আইনে আছে। মূল প্রকল্পের আয়তন যেখানে ৩৩৮৫ একর তা অবশ্যই ক্যাটাগরি ‘A’ অন্তর্ভুক্ত। ছাড়পত্র পেতে অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং কঠোর শর্ত পালন করতে হবে যা সময় সাপেক্ষ। প্রকল্প ছোট ক্যাটাগরির হলে পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়া সহজ। পরিবেশ ক্ষতির প্রাক-সমীক্ষা রিপোর্ট প্রয়োজন হয় না এবং গণশুনানিও আবশ্যিক নয়। রাজ্য সরকার প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে পুরো প্রকল্পটিকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করেছে। বনাধিকার আইন ও অন্যান্য আইনে বলা আছে আদিবাসীদের জমি বিক্রয়যোগ্য নয়। বর্তমানরাজ্য সরকারের ঘোষিত অবস্থান হল তারা জোর করে জমি অধিগ্রহণ করবে না। বিগত ২-৩ বছরে নিঃশব্দে আইন বদল করে কৌশলে এমন ব্যবস্থা করা হল যেন দেউচা আদিবাসীরা নিজেরাই খাদানের জন্য জমি দিয়ে দেবেন এবং তা থেকে ব্যাসাল্ট উত্তোলনের দাবিদার হয়ে প্রকল্পের অংশীদার হবেন। আদিবাসীদের যেহেতু খননকার্যের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পুঁজি নেই তাই তারা এলাকার অবৈধ ক্রাশারের সাহায্য নিতে বাধ্য হবে। এমনও খবর আছে যে জমি মাফিয়ারা ব্যাসাল্ট ব্যবসার দখল নিতে রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ঘটিয়ে অনৈতিকভাবে জমি লুঠ করছে।
কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা
এলাকার আদিবাসীদের অন্য উপার্জনের সুযোগ না থাকায় তারা বৈধ- অবৈধ পাথর খাদান ও ক্রাশারগুলোতে কাজ করেন সামান্য মজুরির বিনিময়ে। দীর্ঘদিন ধরে পাথরের গুঁড়ো নিঃশ্বাসের সঙ্গে নিতে নিতে এরা অল্প বয়সেই শ্বাসজনিত রোগ, বিশেষত প্রাণঘাতী সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। গত ছয় মাসে এই অঞ্চলে সিলিকোসিস রোগ নির্ণয় ক্যাম্পে ৩৮ জনের সিলিকোসিস চিহ্নিত হয় এবং এদের মধ্যে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারের সিলিকোসিস পলিসি অনুসারে ক্ষতিপূরণ, পেনশনের ব্যবস্থা থাকলেও তা পাওয়া যায় না। এই বিশাল প্রকল্প চালু হলে যে পরিমাণ দূষণ ঘটাবে এবং সিলিকোসিস আক্রান্তের সংখ্যা যে পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে তা অকল্পনীয়।
উচ্ছেদের কবলে আদিবাসী সম্প্রদায়
এই প্রকল্পে উচ্ছেদ হবেন ২১০০০ জন, যার মধ্যে ৯০৩৪ জন আদিবাসী, ৩৬০১ জন তফসিলিভূক্ত মানুষ। ধ্বংস হবে ৬৩১৪টি বাসস্থান। প্রকল্প এলাকা ৩৩৮৫ একর হলেও খননকার্য খোলামুখ পদ্ধতিতে হওয়ার জন্য বর্জ্য জমা ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রয়োজন ধরলে প্রস্তাবিত খনি এলাকা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে ১১,২০০ একর। এর মধ্যে ৯১০০ একর জমির রায়তি মালিক হলেন আদিবাসী মানুষ।
পরিবেশ দুষণ
১২ একর জমিতে খনন শুরু করতে ৮৯০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ স্থানান্তরিত করতে হয়েছে। পুরো প্রকল্প চালু হলে ধ্বংস হবে ওই এলাকার বনভূমি। বিস্তীর্ণ বনভূমি সাফ হলে এলাকার ভূপ্রকৃতির চরিত্র পাল্টে যাবে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে কৃষিকার্য, নষ্ট হবে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর সহ এলাকার পুকুর, নদীনালার জল দূষিত হবে এবং শুকিয়ে যাবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বায়ুদূষণ। এ সবই খোলামুখ কয়লা খনির অভিজ্ঞতা।
অস্বচ্ছ প্রকল্প ঘিরে কিছু প্রশ্ন
প্রকল্পটি ঘিরে সরকারের তরফে বিভিন্ন সময়ে নানা স্ব-বিরোধী
বক্তব্য উঠে আসছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের তরফে জানানো হয়েছে প্রস্তাবিত ৩৪০০ একর জমির ৯০ শতাংশ জমিতে ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হবে। ফলে উচ্ছেদ, দূষণ অনেক কম হবে। খোলামুখ খনন পদ্ধতি চালু হবে কেবলমাত্র ৩২৬ একর জমিতে। একজন আধিকারিকের বক্তব্য, অত গভীরে খোলামুখ খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অভিজ্ঞতা দেশের কোথাও নেই।
এলাকাটি পুলিশ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভেতরের আদিবাসীদের যাতায়াত যেমন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে তেমনি বাইরে থেকে সামাজিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের এলাকায় ঢোকা বন্ধ। এলাকার রাস্তাগুলোয় বসানো হয়েছে ক্যামেরা, শাসক দলের ক্যাডার বাহিনী মজুত করা হয়েছে জনরোষের নাট্যাভিনয় প্রদর্শনের জন্য।
যেসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি:
১। প্রচলিত আইন এড়িয়ে ঘোষিত খনন যোগ্য এলাকাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা হল কোন অসৎ উদ্দেশ্যে?
২। এই প্রকল্পের বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি কিভাবে সংগৃহীত হবে তা পরিষ্কার নয়।
৩। পরিবেশের উপর ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা এবং বনাধিকার আইনের মানাতা কেন এড়িয়ে যাওয়া হল?
৪। গরিব আদিবাসীদের প্রকল্পে তথাকথিত অংশীদার করার পরিকল্পনার পেছনে কোন অভিসন্ধি?
৫। প্রকল্পের ছাড়পত্র ২০১৫ সালে। তারপর অনেকগুলো বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও ২০২৬-এর নির্বাচন প্রাক্কালে খননকার্য শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনের সময় প্রকল্প শীঘ্রই শুরু হবে এবং এক লক্ষ চাকুরির সংস্থান হবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রকল্পটি নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার হাতিয়ার নয় তো?
৬। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষকে সিলিকাযুক্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা হওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ঘোষণা নেই কেন?
৭। এলাকার অবৈধ ক্রাশার বন্ধ করার কোনও সদর্থক পদক্ষেপের কথাবলা হল না কেন?
৮। ভারত সরকারের ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানীর (কয়লা অন্যতম) ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানো হবে। দেউচা-পাঁচামির প্রকল্পে কয়লা উত্তোলন হবে আগামী ২৫ বছর ধরে। এই স্ববিরোধিতা কেন? q
সূত্র: ৩রা মার্চ ভারত সভা হলে পাথর শিল্প, সিলিকোসিস ও দেউচা-পাঁচামি নিয়ে অনুষ্ঠিত গণ কনভেনশনে গৃহীত প্রস্তাব।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.