বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
আমাদের দেশে নারীনিগ্রহের ঘটনা নতুন নয়। সন্দেশখালির মতো কোনও ঘটনা অভূতপূর্ব বলেও ভাবা যায় না। রামায়ণ-মহাভারতের সময় থেকেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নারীনিগ্রহ চলছেই। মহাকাব্য না ইতিহাস সেই বিতর্কে না গিয়ে রামায়ণ-মহাভারতে বর্ণিত কয়েকটি ঘটনা আমরা আলোচনায় নিয়ে আসব। প্রজানুরঞ্জক রাজা রামচন্দ্র প্রজাদের অনুজ্ঞা পালনের জন্য সীতার অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন। রাবণের দ্বারা বন্দী থাকার পরেও পত্নী সীতার সতীত্ব অক্ষুণ্ন আছে কি না তার পরীক্ষা নিয়েছিলেন, একবার নয়, দুই-দুইবার। স্বামীর দ্বারা সংগঠিত এই অসম্মান সহ্য করতে পারেননি জনকনন্দিনী সীতা। প্রতিবাদের ভাষাও সেদিন হয়ত তাঁর জানা ছিল না। তাই বনবাসান্তে দ্বিতীয় বারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা দিতে গিয়ে লজ্জায় অপমানে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে যেতে তিনি বলেছিলেন, ‘হে ধরণী, দ্বিধা হও’। সীতার পাতাল প্রবেশ বলে যাকে জানি। আবার শুধুমাত্র প্রেম নিবেদন করার কারণে রামানুজ লক্ষ্মণ রাবণের বোন শূর্পনখার নাক-কান কাটার মতো নৃশংসতা করেছিলেন সেকথাও বর্ণিত আছে রামায়ণে।
নারীর শ্লীলতাহানির প্রধানতম এবং ব্যাপকতম ঘটনাটি পাই আমরা আমাদের দ্বিতীয় মহাগ্রন্থ মহাভারতে, ভরা রাজসভায় গুরুজন এবং পঞ্চস্বামীর উপস্থিতিতে দুঃশাসন পঞ্চপাণ্ডবের মানিনী স্ত্রী দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে উদ্যত হয়। এইভাবে রামায়ণ-মহাভারত আমাদের দেশের প্রাচীনতম নারীনিগ্রহের ঘটনাগুলি আমাদের জানিয়ে দেয়। যুগে যুগে কালে কালে নারী নিগৃহীতা, অকারণে অসম্মানিতা। গৃহের অভ্যন্তরে, কর্মক্ষেত্রে, প্রাঙ্গণে, অরণ্যে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বত্রই নারী নিজের কোনও কৃতকর্মের জন্য নয় পুরুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অভিলাষে আত্মসম্মান, মানবিক সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়ে আসছে। “নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা” কবির এই প্রশ্ন তাই উচ্চারিত হতে থাকে দশকের পর দশক ধরে, শতাব্দীর পর শতাব্দীতে।
সন্দেশখালির মেয়েরা প্রতিবাদ করেছে। তাঁদের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়-অবিচার, শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের বিচার চেয়েছে প্রশাসনের কাছে। রাজ্য সরকারের কাছে দাবি
জানিয়েছে নিজেদের এবং ঘরের পুরুষদেরও নিরাপত্তার। সন্দেশখালির বেতাজ বাদশা শেখ শাহজাহান তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের মদতে দখল করে নিয়েছে তাঁদের চাষের জমি, পরিণত করেছে লাভজনক মাছের ভেড়িতে। পুরুষেরা কাজ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আর মহিলারা? রাতের বেলা তাঁদের ডেকে পাঠানো হয়েছে পার্টি অফিসে কাজের জন্য। কি কাজ! সংবাদমাধ্যমে উপস্থিত হয়ে মহিলারা নিজেরাই বিবরণ দিয়েছেন তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার, তাঁদের প্রতি জোর খাটানোর ঘটনার। রাজ্যর মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রীমো, দুর্ভাগ্যক্রমে যিনি একজন মহিলা, বলেছেন ‘ছোট ঘটনা, তিলকে তাল করা হচ্ছে’। রাজ্য মহিলা কমিশন সন্দেশখালির মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছেন এমন কোনও ঘটনার নিদর্শন তাঁরা পাননি। অপরদিকে জাতীয় মহিলা কমিশন ঘটনার সত্যতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন। সন্দেশখালিকে কেন্দ্রে রেখে শুরু হয়ে গেছে রাজ্য বনাম কেন্দ্র রাজনীতি। নারীনিগ্রহের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে নাকি উত্তরপ্রদেশ? সংবাদপত্রে উঠে এসেছে উন্নাও, হাথরাস, গোধরা বা সুটিয়া, কামদুনি, সুজাট বা বিলকিস বানোর নাম। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয় নারীর অবমাননায় ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে কে বা কারা এগিয়ে আছে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেটিই যেন বিবেচনার অন্যতম বিষয়।
রাজনীতির খেলা চলতে থাকুক। আমরা তার মধ্যে আশান্বিত হই এই দেখে যে, মেয়েরা প্রতিবাদ করছে। লাঠি, ঝাঁটা, বেলন, খুন্তি যা সাধারণ নারীর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে তাই নিয়ে শাহজাহান এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গদের প্রতিরোধ করছে। পুলিশ-প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। অকুতোভয়ে মুখ খুলেছে সংবাদমাধ্যমে, বলেছে, “হ্যাঁ, আমি নির্যাতিত হয়েছি”। গত দশ-বার বছরে সারা রাজ্য বা দেশ জুড়ে এমন কত শাহজাহানের সৃষ্টি হয়েছে আমাদের জানা নেই, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ করতে, সম্পূর্ণ নির্মূল করতে, নারীর সম্মান এবং অধিকার রক্ষা করতে গ্রাম-শহরে প্রতিবাদী নারীবাহিনী গড়ে উঠুক। নারীর অধিকারের লড়াই, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সংগ্রামের বীজ পোতা হয়েছে সন্দেশখালিতে — আমাদের শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে যে, রাজনীতির দুর্নীতি এবং আর্থিক প্রলোভনের জটিল আবর্ত যেন তাকে দিকভ্রষ্ট না করে।