বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
সাধারণভাবে অর্থনীতির বিষয়বস্তু হল মানব সমাজের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু সামগ্রীর উৎপাদন ও বন্টন সম্পর্কিত নিয়মাবলী অনুধাবন করা। উৎপাদন বলতে বোঝায় শ্রমের সচেতন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার্য করে তোলা। প্রাকৃতিক সম্পদ হল পৃথিবীর উপরিভাগের সম্পদ ও ভূগর্ভস্থ সম্পদের সমাহার, যাকে এক কথায় পরিবেশ বলা হয়। এইভাবে বিচার করলে উৎপাদন হল পরিবেশের রূপান্তর, তথা পরিবেশে-বিঘ্নতা। কাজেই এটা অনুধাবন করা দরকার পরিবেশের বিঘ্নতার সঙ্গে উৎপাদন তথা অর্থনৈতিক অগ্রগতির আন্তঃসম্পর্ক কি ধরনের? একই সঙ্গে অনুধাবন করা দরকার এই আন্তঃসম্পর্ক যদি নেতিবাচক হয় তাহলে তার ব্যাখ্যা কী এবং এর প্রতিকারের জন্য অর্থনীতিবিদেরা কী বলছেন অনুধাবন করা। এই নিবন্ধের প্রথম অংশে এই তিনটি বিষয়ে আলোচনা করা হবে। দ্বিতীয় অংশে এই তাত্ত্বিক বিষয়টা নদীয়া জেলার একটি হাজামজা নদীর পুনরুজ্জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুধাবন করা হবে।
পরিবেশের ওপর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে আলোচনার একটা রূপরেখা ১৯৫০ সালে সাইমন কুজনেটস দিয়েছেন। কুজনেটস দেখেছেন, শুরুতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশের গুণমান হ্রাস পায়। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পরিবেশের গুণগত মান আবার বৃদ্ধি পায়। ফলে সম্পর্কটি একটা উল্টানো ইউ আকৃতির বক্ররেখা হয়। এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়, অর্থনীতি যখন উন্নয়নশীল হয় তখন মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে পরিবেশের অবক্ষয় বেড়ে যায়। এর মূল কারণ হল শিল্পায়ন, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং সম্পদের ব্যবহারের ফলে দূষণ বৃদ্ধি পায় এবং তা পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। কুজনেটস এই বক্তব্য সম্পর্কে অবশ্য থমাস পিকেটি দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, বেশিরভাগ দেশেই সময়ের সঙ্গে পরিবেশের গুণগত মান ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। তাঁরা দেখিয়েছেন এই বক্ররেখা ইউরোপীয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্বল্প সময়ের জন্য প্রযোজ্য।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশের গুণগত মান হ্রাস পাওয়ার বিষয়টা বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসীয় অর্থনীতিবিদেরা বিষয়টাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেছেন। বিপরীতে নয়া উদারবাদী অর্থনীতিবিদেরা ব্যক্তিসত্তার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ জন বেল্লামি ফস্টারের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন পরিবেশগত অবক্ষয়ের মূল কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি (বৈভব) বেশি সম্পদ ব্যবহারের দিকে চালিত করে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন পরিবেশের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে, ফস্টার দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তথা অযাচিত বৈভব দূষণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অযাচিত বৈভব জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়।
নয়া-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ গ্যারেট হার্ডিন ভিন্নভাবে পরিবেশের অবক্ষয়ের দিকটা বিবৃত করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে সাধারণ সম্পদ যথা বন, জল যখন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, তখন ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে সেই সম্পদের অধিকাংশ ব্যবহৃত হয়, যা শেষ পর্যন্ত সবার পক্ষে ক্ষতিকারক হয়। হার্ডিন এই ধারণাটি মূলত একটা সাধারণ চারণভূমি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন যেখানে প্রতিটি মেষপালক তার ভেড়া চড়াতে নিয়ে যায়, ফলে চারণভূমি ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। হার্ডিনের এই তত্ব ‘ট্র্যাজেডি অফ দা কমন্স’ নামে পরিচিত। ১৯৬৮ তে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর অতিরিক্ত জনসংখ্যা যা পরে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশের অবক্ষয়ের প্রতিকার কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্য বিদ্যমান। এখানে দু’জনের কথা উল্লেখ করা হবে। প্রথমজন হলেন রোনাল্ড কোয়েস আর দ্বিতীয় জন এলিনর অষ্ট্রম। এই দু’জন যথাক্রমে ১৯৯১ সালে এবং ২০০৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান। রোনাল্ড কোয়েস একটা উদাহরণের সাহায্যে তার বক্তব্য উপস্থাপিত করেন। ধরা যাক, একটি শিল্প কারখানা একটি নদীর পাশে অবস্থিত এবং কারখানার দূষণ নদীর জলের গুণমানকে প্রভাবিত করছে। কোয়েসের তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি কারখানার মালিক এবং নদী ব্যবহারকারীদের মধ্যে সম্পত্তির অধিকার স্পষ্ট থাকে তবে তারা আলোচনা করে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে। অর্থাৎ কারখানার দূষণ কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে অথবা নদী ব্যবহারকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। পরিবেশগত অর্থনীতি ও তার নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বে কোয়েস উপপাদ্যের একটি কেন্দ্রীয় স্থান আছে। কিন্তু বাস্তব সমাধানের জন্য এগুলির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক আছে।
বাস্তব বিশ্বের বাহ্যিক সমাধানের জন্য এলিনর অস্ট্রম দেখিয়েছেন, যদি স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু নিয়মকানুন তৈরি করা যায়, যেখানে তারা নিজেদের সম্পদ ব্যবহার করার সময় একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে, তবে তারা সম্পদকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। অস্ট্রমের গবেষণা থেকে দেখা যায়, অনেক স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেদের সম্পদকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং কমন্সের ট্র্যাজেডিকে এড়াতে পারে। অস্ট্রমের এই মতকে সমর্থন করে অরুণ আগরওয়াল বলেছেন, সাধারণ মানুষকে তাদের সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছুক থাকতে হবে এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
২০০১ সালে আগরওয়াল ও তার সহযোগীরা পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ৮৪টি বনভূমি পর্যবেক্ষণ করে উপরোক্ত উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন। কমন্সের ট্র্যাজেডি এড়ানোর জন্য অস্ট্রমের বক্তব্যের যথার্থতা অনুধাবনের জন্য বর্তমান নিবন্ধে নদীয়া জেলার পশ্চিম প্রান্তে চাকদহের বুড়ি গঙ্গা নদীকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বুড়ি গঙ্গা আসলে মূল গঙ্গার একটি ধারা। চাকদহের সান্যালচর থেকে শুরু করে রানিনগর, মশানের মাঠ, নবাঙ্কুর হয়ে মুকুন্দনগর ঘাটের কাছে গিয়ে ফের গঙ্গায় পড়েছে। মূলত উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এই ধারা। বলা হয় ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই নদীতে স্রোত ছিল। তারপর স্রোত তার গতি হারায় এবং ১৯৯০ এ এসে সমগ্র নদী শৈবালদাম-এ পূর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ এ হল ‘ট্র্যাজেডি অফ কমন্স।’

এভাবেই মূক হয়ে পড়েছিল মৃত নদী। এরপর এল ২০০০ এর বন্যা। আর ২০০৫ সালের চাকদহ শহরের পানীয় জলে পাওয়া গেল আর্সেনিক। বন্যায় চাকদহ পৌর এলাকার ২০ নং ও ১১ নং ওয়ার্ড টানা ১৪ দিন জলের তলায় ছিল। তখনই জল নিকাশের জন্য বুড়িগঙ্গা সংস্কারের কথা ভাবতে শুরু করেন অনেকে। একইসঙ্গে পানীয় জলে আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির জন্য ভূগর্ভস্থ জলস্তর নিচে নেমে যাওয়া তথা বুড়িগঙ্গার স্রোত হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, সেদিকেও নজরে পড়ে বিশেষজ্ঞদের। এরপরই নদী বাঁচানোর জন্য সরকারি স্তরে আবেদন নিবেদন করা হয়। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচিয়ে তোলার কাজে স্বার্থ আছে এমন সকলকে নিয়ে ২০১৬ সালে রানাঘাটে একটা সভা করা হয়। এই সভায় চারটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। ক) স্থানীয় মৎস্যজীবী ও কৃষকদের জীবিকা সুনিশ্চিত করতে হবে, খ) বর্ষায় জলনিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে, গ) শহরের ভূগর্ভস্থ জলস্তর বজায় রাখতে হবে এবং ঘ) নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে হবে। এই দাবিগুলো নিয়ে ২০১৭-১৮ সালে মিটিং মিছিল হয়। ২০১৯ সালে ১০০০ জনের স্বাক্ষর সংগৃহীত করে একটি দাবি সনদ সরকারকে জমা দেওয়া হয়। ২০২১ সালে প্রায় ১০টি আরটিআই করা হয়। এই ধরনের লাগাতার প্রচেষ্টার ফলে ২০২৩ সালের ৩০ মে সরকারিভাবে প্রথম ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু করা হয়। এই ওয়ার্ক অর্ডার এর ফলে সান্যালচর থেকে মশানের মাঠ পর্যন্ত ৩৪০০ মিটার নদীগর্ভ খননের কাজ শুরু হয়। এই খননকার্য শেষ হবার ফলে এতদিনের অবরুদ্ধ নদীতে নতুন করে জলপ্রবাহ শুরু হয়। ২০২৪ সালের ১০ জুন দ্বিতীয় দফা খননের প্রায় ৫৪০০ মিটার ওয়ার্ক অর্ডারের সুবাদে নদীর ৯০ শতাংশ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং নদীর পশ্চিম পারের এলাকাগুলো উজ্জীবিত হয়েছে।
বুড়ি গঙ্গা নদীকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলাটা চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা এবং দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের নিরলস প্রচেষ্টার ইতিবাচক উদাহরণ। স্থানীয় মানুষদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে রাজ্য সরকার। এভাবে বেঁচে উঠেছে এক মরা নদী। বাস্তব বিশ্বের বাহ্যিক সমাধানের ক্ষেত্রে বুড়ি গঙ্গার পুনরুজ্জীবন হল এক আদর্শ উদাহরণ। এখানে পরিবেশ আন্দোলন ও রুটি রুজির আন্দোলন একীভূত হয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে নদীর খনন কার্যে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অস্ট্রমের তত্ত্বতে এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে।