বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

রসুই থেকে মিছিলে

রসুই থেকে মিছিলে

স্বাতী ভট্টাচার্য

photo

১ নভেম্বর, ২০২২, শ্রমজীবী ভাষা - তেলে সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন। তাতে আধসিদ্ধ গাজর, বেগুন আর ভিন্ডি কষা চলছে। সেদ্ধ অড়হর ডালে সেগুলো ঢেলে, চারটে কারিপাতা দিয়ে ফুটিয়ে নিলেই বেশ দক্ষিণী কায়দার ডাল হয়ে যায়। বোতল থেকে ডালে জল ঢালতে গিয়ে মনের কানে ভেসে এল গীতাদির গলা, “কক্ষনো রান্নায় কাঁচা জল দিতে নেই।”
মিছিলে গিয়ে রান্নার টিপস নিয়ে কেউ ফেরে? ফেরে বইকি, যদি তা হয় মিড ডে মিল রান্নার দিদিদের মিছিল। সেখানেই আলাপ গীতাদির সঙ্গে। মুখে মিষ্টি হাসি। মিছিল-ডেপুটেশনে যেমন রাগী-রাগী মুখ দেখা যায়, একেবারেই তেমন নয়। বারাসতে জেলা শাসকের অফিস ভবনে ঢুকেছেন, কিন্তু লিফটে ওঠা আর নামাই সার। ডিএম-এর অফিস দোতলায়, সেখানে লিফট দাঁড়াতেই দেয়নি সিকিউরিটি। পাঁচতলায় ‘ওসি মিড ডে মিল’-এর ঘরেও ঢুকতে পারেননি। দু’জনের বেশি তিনি নাকি ঘরে ঢুকতে দেবেন না। অন্যরা গিয়েছে ভিতরে, অগত্যা গীতা দাসের ঠাঁই হয়েছে করিডরে।
আমলাদের সংসারে জেলাশাসক যদি বড় কর্তা হন, তবে ‘অফিসার ইন-চার্জ, মিড ডে মিল’ হলেন ন’দি কিংবা ফুলদির সমকক্ষ। কেন চার-পাঁচ হাজার রন্ধনকর্মীর প্রতিনিধির জন্যে উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক পাঁচ মিনিটও সময় দিতে পারবেন না? ঝানু নেতাদের এক একজন যখন গলা তুলে এমন প্রশ্ন করেন, মনে হয় বুঝি ঘরের মধ্যে বাজ পড়ল। করিডর থেকে সুইং ডোর ঠেলে এসি-শীতল ঘরে ঢুকে পড়ে কথাগুলো, চেয়ারের পিঠ থেকে সাদা তোয়ালে হড়কে যেতে চায়। এ মিছিলে তেমন কোনও কণ্ঠ ছিল না।
গীতাদি প্রায় কুড়ি বছর গ্রামের ইস্কুলের ছেলেমেয়েদের রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। পাঁচতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে আর এক প্রতিবাদিনীকে বলছিলেন, “একটু বেশি করে চিনি দিবি, তা হলে ভাল খাবে বাচ্চাগুলো।” “বেশি করে চিনি?” খরখর করে উঠলেন সঙ্গিনী। “হেডমাস্টার যা বার করে দেয়, তাই দিয়ে রাঁধতে হয়। দেড়শো গ্রাম তেলে একশো কুড়িজনের রান্না করি। বাচ্চাগুলো পালাতে চায়, খায় না।” তখনই গীতাদি টিপস দিলেন, রান্নায় গরম জল ঢালতে। তাতে নাকি কম মশলাতেও দারুণ স্বাদ হয়। অপর মিছিলবালা মুখ গোমড়া করে রইলেন। ততক্ষণে শুনে নিয়েছেন, গীতাদির ইস্কুলে গ্যাস এসে গিয়েছে, আর তাঁকে এখনও কাঠে রাঁধতে হয়।
কেন মিছিল, ডেপুটেশন? গীতাদিরা ন্যূনতম বেতনের অনুপাতে পারিশ্রমিক চান, মাতৃত্বের ছুটি চান, কর্মীর মর্যাদা চান। সেপ্টেম্বরের শেষে এক দিন তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন বারাসতের কাছারি ময়দানে। কয়েক পশলা বৃষ্টিতে মাঠের এখানে-ওখানে থকথকে কাদা।তারই মধ্যে শুকনো জমি খুঁজে মেয়েরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে। একজন ভারী টেনশনে — “আমি পঁচিশ টাকা দিয়েছিলাম পতাকার জন্য, পাইনি। পতাকা না নিয়ে মিছিলে গেলে পুলিশ ধরবে না তো?” বলতে বলতেই দেখা গেল, কাদায় পড়ে রয়েছে একটা পতাকার কাপড়টুকু, লাঠিটা নেই। চট করে তুলে নিয়ে তিনি হাঁফ ছাড়ালেন। খানিক পরে আর একজন কুড়িয়ে পেলেন একটা কাপড়হীন লাঠি। মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে বললেন, “পুলিশ কিছু বলতে এলে এটা দেখিয়ে বলব, হুরররররর!” হাসির হুল্লোড় পড়ল।
মিছিল বেরোলে অবশ্য দেখা গেল, রাস্তায় বাড়তি পুলিশ তো দূরের কথা, দুটো সিভিক পুলিশ অবধি নেই। কলকাতায় পঞ্চাশজনের মিছিল বেরোলে পুলিশের যা বন্দোবস্ত দেখা যায়, বারাসতের ব্যস্ততম এলাকায়, যানজটে নাকাল রাস্তায়, চার-পাঁচ হাজার মেয়ের মিছিলের জন্য তার ছিটেফোঁটাও নেই। ঘাড়ের ওপর এসে পড়ছে গাড়ি, ভ্যান, মোটরবাইক। চারপাশ থেকে মেয়েদের প্রতি দাঁত ঘষটানি, বিদ্রুপ-উক্তি। বৃষ্টি আসছে বারবার, মেয়েরা ছুটে গিয়ে উঠছে ফুটপাথে। তবু বাঁচাচ্ছে হাতে ধরে-রাখা কাগজখানি — ন্যূনতম মাইনের আবেদনের প্রিন্ট আউট, ছেড়ে-রাখা জায়গায় আঁকাবাঁকা হরফে নিজের নাম, ইস্কুলের নাম। কথা শুনে বোঝা গেল, নিজের হাতে এই কাগজ দেবেন ডিএম-এর হাতে, এই ওঁদের ধারণা।
দীর্ঘ মিছিলের শেষ দিকটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার, স্লোগান ডুবে যাচ্ছে গাড়ির হর্নে, চাকা থেকে পা বাঁচাতে মেয়েরা ছিটকে যাচ্ছে এ দিক, ও দিক। এক মোটরবাইক আরোহী প্রশ্ন করলেন, “অ্যাই, তোমরা কোন দল?” একজন বললেন, “আমরা কোনও দল নই, দেখছেন না আমাদের পতাকা?” জলে-ন্যাতা নীল পতাকায় ইংরেজি হরফে লেখা, “অ্যাসোসিয়েশন অব মিড ডে মিল অ্যাসিস্টেন্টস,’ আদ্যাক্ষরগুলো জুড়ে ‘আম্মা।’ চমৎকার নাম। মায়ের মতোই এই মেয়েরা রেঁধে খাওয়ান স্কুলপড়ুয়া শিশুদের। তাঁরা সরাসরি নিযুক্ত হন না অবশ্য, রান্নার দায়িত্ব পায় তাঁদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গীতাদিরা পাঁচজন রান্না করেন, মাসে তিন হাজার টাকা আসে দলের অ্যাকাউন্টে, ভাগ করে দাঁড়ায় মাথাপিছু ৬০০ টাকা। রান্না মানে অবশ্য শুধু রান্না নয়, জল তোলা, উনুন ধরানো থেকে শুরু করে পরিবেশন, খাওয়ার পরে এঁটো বাসন তুলে মেঝে নিকিয়ে দেওয়া, এই সবই তাঁদের কাজ। অনেক রন্ধনকর্মী দোকান থেকে ধারে তেল-মশলা নেন। নিজের ঘাড়ে ঋণ নিয়ে সরকারি প্রকল্প চালান এই দরিদ্র মেয়েরা।
মা নিজের সন্তানের জন্য যে ঝুঁকি বহন করেন, যে পরিশ্রম স্বীকার করেন, সরকার তার সবটাই প্রত্যাশা করে এই দরিদ্র মেয়েদের থেকে। এবং পুরুষতন্ত্রের পয়লা নম্বর ধারক-বাহক ভারত সরকার মেয়েদের এই যত্ন, এই পরিশ্রমকে মিনি-মাগনা গণ্য করে। সপ্তাহে পাঁচ দিন, সকাল দশটা থেকে দুপুর তিনটে হাড়ভাঙা খাটুনি সরকারি খাতায় ‘স্বেচ্ছাশ্রম’। একশো দিনের কাজের প্রকল্পে মাটি কেটে অদক্ষ শ্রমিক দৈনিক পান ২১৩ টাকা। আর যাঁরা সামান্য উপকরণে উপাদেয় রান্না করতে দক্ষ, তাঁরা পান দিনে কুড়ি টাকা। বড় জোর পঞ্চাশ, কি সত্তর টাকা। কোন যুক্তিতে এটা ন্যায্য? সরকারের উত্তর — না পোষালে ছেড়ে দাও।
সরকার ভালই জানে, দরিদ্র মেয়েদের টাকা কম, দায়বোধ বেশি। যে টাকায় এক জন পুরুষ আঙুলও নাড়বেন না, মেয়েরা সেই কাজের জন্যই প্রাণপাত করবে। সে দিন মেয়েরা প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটলেও খুদে পড়ুয়াদের পাতে ভাত কম পড়েনি — স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কেউ না কেউ ডিউটি করেছে স্কুলে। এটা শিশুদের প্রতি মমতা, নাকি হেডমাস্টারের কাছে ধমক খাওয়ার ভয়, কে বলতে পারে? মিছিলে দেখা গেল, অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরির হারে বেতন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, এমন সব দাবি-লেখা প্ল্যাকার্ডের পাশাপাশি হাঁটছে ‘বাচ্চাদের খাওয়ার বরাদ্দ বাড়াতে হবে’ প্ল্যাকার্ড।
‘কোন দল?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে-দেওয়া বান্দা কিন্তু পাকা লোক। পাল্টা উত্তর দিলেন, “তোমরা কোনও দল নও? তা হলে ইনক্লাব জ়িন্দাবাদ বলছে যে?” মেয়েদের মুখে আর কথা জোগাল না। সত্যিই, মিছিলে একেবারে শেষে একটা অটো থেকে স্লোগান উঠছে, “ইনক্লাব জ়িন্দাবাদ। মিড ডে মিল কর্মীদের ন্যূনতম বেতনের দাবিতে সংগ্রাম চলছে চলবে।” সেই অটোতে চালক বাদে চারজন আরোহী, চারজনই পুরুষ। শুধুমাত্র মেয়েরা মিছিল করল, কিন্তু মাইক হাতে রাখল কেবল পুরুষরা। কিছু জিনিস কিছুতেই বদলায় না।
— ডিএম অফিস আর কত দূর, জানো মা? হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করলেন এক প্রৌঢ়া।
— এই তো কাছেই। সবাই যাতে আপনাদের মিছিল দেখতে পায়, তাই একটু ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে।
— ও, তা ভাল, ভাল। আমার মাজায় ব্যথা কি না। জল টেনে টেনে আর পারি না।
— জল টানতে হয় কেন?
— আমাদের ইস্কুলের কলে এই বর্ষাকালে জল বড় ঘোলা আসে। ওতে কি রান্না হয়? চার-পাঁচ বাড়ি দূর থেকে জল নিয়ে আসি, ছ’সাত বার যেতে হয়, দু’বালতি করে জল আনতে।
হাবড়ার গড়কোলা গ্রামে ইস্কুলের এই রান্না-দিদিমণির গলায় শুধুই আক্ষেপ, ক্ষোভ নেই। বরং হেসে বললেন, “এখন তো অনেক ভাল। আগে আমগাছতলায় উনুন ছিল, বৃষ্টি হলে উনুনের উপর ছাতা ধরতে হত। তারপর ইস্কুলের উঠোনে রেঁধেছি। এখন তো পাকা রান্নাঘর, গ্যাস।” ২০০৪ সাল থেকে রান্না করছেন তিনি।
ডিএম অফিসের সামনে মস্ত ব্যারিকেড, প্রচুর পুলিশ। ওপারে যাওয়া মানা। কার কাছে তা হলে জমা দেবে এত যত্নে বৃষ্টি-বাঁচানো ডেপুটেশনের কাগজ? চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি শুরু হল। উদ্যোক্তারা মাইক হাতে আশ্বাস দিচ্ছেন (আবারও পুরুষ কণ্ঠ) “আপনাদের সবার কাগজ ডিএম-এর কাছে পৌঁছে যাবে, আমাদের কাছে জমা দিন।” ম্যাটাডোর-চড়া নেতার হাতে কাগজ তুলে দিতে হুড়োহুড়ি পড়ল। ওই কাগজগুলোর নিয়তি কী হবে বলে মেয়েরা মনে করেন, জিজ্ঞাসা করার সাহস হয়নি। যারা মাসে ছ’শো টাকা কি আটশো টাকা পায়, তারা আজ দেড়শো টাকা বাস ভাড়া দিয়ে এসেছে, এই দাবিপত্র সরকারকে দেবে বলে। যে দেশ প্রাথমিকের একজন পড়ুয়ার পুষ্টিকর আহারের মূল্য ধরে দেয় দৈনিক ৫ টাকা ৪৫ পয়সা, আর একজন রন্ধনকর্মীর শ্রমের মূল্য মাসে আটশো কি হাজার টাকা ধার্য করে, সে দেশ এই লিখিত আবেদনের কতটুকু মূল্য দেবে?
এত বড় মিছিল করলেন, কিছু হবে বলে মনে হয়? প্রশ্ন করতে গীতাদি তেমনি নির্মল হেসে বললেন, “যদি মাসে মাসে টাকাটা একটু বাড়ায়। এখন তো দশ মাসের টাকা পাই, যদি বারো মাসের টাকা দেয়। আর, রিটায়ার করার সময়ে হাতে যদি একটু টাকা দেয়।” প্রতিবাদ অত নয়, যতটা প্রার্থনা।
যে সব রাজনৈতিক দল বা নাগরিক সংগঠন এমন নানা শ্রমিক মঞ্চের দাবি সংগঠিত করছেন, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন, তাঁরা চার-পাঁচ হাজার মেয়ের মিছিলকে ‘সাফল্য’ বলেই দাবি করবেন হয়তো। ডিএম অফিসের সামনে ব্যারিকেডে আটকে-যাওয়া মেয়েরা, ফিরতি-পথে ম্যাটাডোরে ঠাসাঠাসি মেয়েরা, কোলে শিশুসন্তান নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল-করা মেয়েরা সফলতা-বিফলতার কী হিসাব কষলেন, কে জানে? আশঙ্কা হয়, প্রশাসনের চোখে তাঁরা হয়তো রাস্তায় নামা ‘দেহ’ হয়েই রইলেন, রাস্তা থেকে উঠে আসা ‘কণ্ঠ’ হতে পারলেন না এ দিনও।দক্ষিণী ডাল হয়ে এসেছে। আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম, কত শিশুর কত দিনের মিড ডে মিলের ডাল-সবজি, তেল-মশলা রয়েছে একটা মধ্যবিত্ত সংসারের প্রেশার কুকার-ভরা ডালে। ফ্ল্যাটবাড়িতে চার-পাঁচজনের সংসারে একটা গ্যাস সিলিন্ডারে এক মাস চলতে চায় না। কী করে সরকারি স্কুলে একটা সিলিন্ডারে সত্তর-একশো ছেলেমেয়ের রান্না হয় সারা মাস? মিছিলে শুনলাম, বড় গামলায় গরম ফ্যান রেখে, তার ওপর সিলিন্ডার রাখলে নাকি আরও একটু গ্যাস পাওয়া যায়। গরিবের সংসার চালানোর এমন সব কৌশল প্রয়োগ করে যারা দেশের সন্তানদের খাওয়ায়, তাদের সন্তানরা কী খায়, তা-ই বা কে জানে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.