বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

আমরা যদি এই আকালে-ও স্বপ্ন দেখি

আমরা যদি এই আকালে-ও স্বপ্ন দেখি

শরণ্য বৈদ্য

photo

গিয়েছিলাম রাজ্যের প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় কোনওরকম সরকারি সাহায্যের বাইরে গড়ে ওঠা একটা শিশুদের স্কুল দেখতে। মহাত্মা গান্ধী শিক্ষাকে বৃষ্টির জল ও সূর্যের আলোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ভারতের সংবিধান-ও সার্বজনীন শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সপ্তম সংশোধনী আইনে (১৯৫৬) ৩৫০বি ধারা যুক্ত করে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ভারতের আত্মা জেগে আছে যে গ্রামীণ ভারতবর্ষে, সেখানে আদিবাসী ও অন্যান্য ভাষাগত সংখ্যালঘু পরিবারের সন্তানেরা আজ-ও প্রায়শ-ই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় বা শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগসুবিধার কিছু-ই পায় না। তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের ২০১০-১১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর মধ্যে আদিবাসী পড়ুয়াদের প্রায় ৭১% স্কুলছুট, দেশের মোট আদিবাসী জনসংখ্যার (মাত্র ৮.৬%) নিরিখে। এক দশকে আদিবাসী শিক্ষার অবস্থা বিশেষ পাল্টায়নি। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের হিসেবে ২০১৭-১৮ সালে আদিবাসী জনসংখ্যার মাত্র ২.৪৭% কম্পিউটার সহ অন্যান্য বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহার করে। এই বৈষম্য আরো চওড়া করেছে অতিমারি, যার ফলে এক বড় সংখ্যক নিম্নবিত্ত পরিবারে আকস্মিকভাবে ছেদ পড়েছে শিশুশিক্ষায়। জাতীয় শিক্ষানীতিতে (২০২০) ৩০-এর কম পড়ুয়া রয়েছে এমন সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে কারণ আর্থিকভাবে এই স্কুল চালানোর ব্যয়ভার বহন করা বড্ড জটিল। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, এ রাজ্যে সরকারি ও সরকার পোষিত মিলিয়ে মোট ৮২০৭ স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৩০-এরও কম। জাতীয় শিক্ষানীতি (২০২০) বাস্তবায়িত হলে এইসব স্কুলের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে ভেবে অস্বস্তি হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেছিলাম ছাঁচনপুর।
বাঁকুড়া থেকে ঝাঁটিপাহাড়ির দিকে একঘন্টার রাস্তা ছাঁচনপুর। ছাতনা ব্লকের অধীনে এই গ্রাম পুরোপুরি উপজাতি, মূলত সাঁওতাল, অধ্যুষিত। এই গ্রামে-ই শুরু দুই বন্ধুর স্বপ্নের উড়ান যারা আজীবন একে অন্যের কাছে দায়বদ্ধ থেকেছে, নিজেদের সীমিত সামর্থ্যে চারপাশের জন্য ভালো কিছু করতে চেয়েছে। এই গল্প রেবা আর লক্ষ্মী মূর্মূর। ২০০৭-’০৮ সালে ২২ জন পড়ুয়াকে নিয়ে দুজনে মিলে তৈরি করেন একটা স্কুল, আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের যথাযথ শিক্ষা ও তার সঙ্গে নাচ, গান, খেলাধুলো সহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়ার জন্য। লক্ষ্মী মূর্মূর আকস্মিক মৃত্যুর পর ২-৩ বছর রেবা কিছু করেননি। তারপর আবার স্কুলের পুনরুজ্জীবন ঘটে। লক্ষ্মী মূর্মূর স্মরণে স্কুলের নামকরণ করেন রেবা - লক্ষ্মী মূর্মূ স্মৃতি শিশু বিদ্যালয়।
“আমি ছোটবেলা থেকে-ই খুব লড়াই করে বড় হয়েছি। সেভাবে বেশিদূর পড়াশুনো করে উঠতে পারিনি। ফলে শিক্ষার অভাবে আর পাঁচজনের মতো আমি-ও প্রতারিত হতাম নিজের অজান্তে-ই। তাই আস্তে আস্তে শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরে মনে মনে লেখাপড়া করার আগ্রহ জাগে। শেষমেশ ১৯৯১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দি-ই।” তাঁর জীবন ও তাঁর এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে তাঁর চিন্তাভাবনা সম্পর্কে বলছিলেন ৫২ বছর বয়সী রেবা মূর্মূ। “কিন্তু এত সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও আদিবাসী বাচ্চাদের পড়ানো তো খুব-ই সাহসের কাজ।” আমাকে অবাক হতে দেখে রেবা হাসলেন, “সীমিত কোথায়? আমার মনে হয়েছিল, আমি নিজে যতটুকু পড়াশোনা করেছি, সেটুকু দিয়ে-ই আমার এলাকার বাচ্চাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করব। আস্তে আস্তে এই পড়ানোর কাজটা আমার নেশা হয়ে যায়।”
লক্ষ্মী মূর্মূ আদতে ছিলেন শুশুনিয়া পাহাড়ের ধারে এক গ্রামের বাসিন্দা। এক অপ্রীতিকর ঘটনায় সামাজিকভাবে চূড়ান্ত অপদস্থ হয়ে তিনি গ্রাম ছাড়েন। সেইসময়ে রেবা আর লক্ষ্মী কাজ করতেন এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায়। রেবা লক্ষ্মীকে তাঁর গ্রামে নিয়ে আসেন। কিন্তু রেবার বাড়িতে-ও নানা বাধার সম্মুখীন হন তাঁরা। এর কারণ হয়তো ওই অল্পবয়সে-ই তাঁরা ছিলেন সাহসী, স্বাধীনচেতা আর গরীব বাচ্চাদের জন্য নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর। লক্ষ্মী ছিলেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। বাচ্চাদের স্বাস্থ্য আর লেখাপড়ার ব্যাপারে তাঁর কর্তব্যবোধ ছিল সহজাত। পারিবারিক গোলমালের মধ্যেই রেবা-লক্ষ্মী তাঁদের নিজেদের একটা আস্তানা তৈরির চিন্তা করছিলেন। একসময় ছাঁচনপুর গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে দ্বারকেশ্বর নদের ধারে আড়াই বিঘা জমি কিনে তাঁরা শুরু করলেন তাঁদের স্বপ্নের যাত্রা।
প্রথমে তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেইসব পরিবারের দ্বারস্থ হলেন যাদের ছেলেমেয়েরা প্রকৃত আদর-যত্ন-ভালোবাসা ছাড়া-ই বড় হচ্ছে, যাদের অভিভাবকদের সময়-ই হয় না, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর প্রতি খোঁজখবর নেওয়ার। এ কাজে সাড়া-ও মিলল ভালো। কিন্তু এ আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হল না। ২০১১ সালে লক্ষ্মী মূর্মূর ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসার জন্য নিতান্ত বাধ্য হয়ে রেবা তাঁকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। স্কুলের দায়িত্ব নেওয়ার কেউ রইল না। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল স্কুল, পড়ুয়ারা-ও যে যার বাড়ি ফিরে গেল। একবছরে অনেক চেষ্টা ব্যর্থ করে লক্ষ্মী মূর্মূ মারা গেলেন বাঁকুড়া হাসপাতালে। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে রেবা ফিরে এলেন গ্রামে। সেসময় তাঁর একবার মনে হয়েছিল আর নয়। নতুন করে আবার স্কুল চালু করবেন না। কিন্তু শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহে ও উদ্যোগে লক্ষ্মী মূর্মূর মৃত্যুর পর আবার নতুন করে আশা ও উদ্দীপনা জাগিয়ে শুরু হয় স্কুল। ২০১৫ সালে প্রারম্ভিক থেকে চতুর্থ শ্রেণী মিলিয়ে মোট ৬০ জন পড়ুয়া ভর্তি হয়েছিল। ২০১৯ সালে কোভিড অতিমারির প্রাক্কালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩।
এই মুহূর্তে স্কুলে ৫৫ জন ছাত্র আর চারজন শিক্ষক রয়েছেন; দুজন পুরুষ – গৌরচন্দ্র বর্মণ ও লখিন্দর টুডু – আর দুজন মহিলা – মালা টুডু ও পানমণি মূর্মূ। দুজন সহায়িকা রান্নাবান্না ও বাচ্চাদের দেখাশুনোর কাজ করেন। স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আছে ভাষাশিক্ষা ও প্রাথমিক স্তরের অঙ্ক। এছাড়া পড়ুয়াদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কাজে-ও (বিশেষ করে ছবি আঁকায়) যথেষ্ট উৎসাহ দেন রেবা মূর্মূ। স্কুলে পোঁছতেই চোখে পড়ল প্রায় সর্বত্র মাটির দেওয়ালে আদিবাসীদের নিজস্ব চিত্রকলা, তাদের স্বতন্ত্র শিল্পবোধের দ্যোতক।
সকাল আটটা থেকে এগারোটা অবধি স্কুল। বেলা এগারোটা বাজতে-ই স্কুল শেষের ঘন্টা বাজল। হইহই করতে করতে পড়ুয়ারা ক্লাসঘর ছেড়ে যে যার থালা বাজাতে বাজাতে একটা বড় দালানে জমায়েত হল। এবার খাওয়ার পালা। ব্যাপারটা অনেকটা সরকারি মিড ডে মিলের মতো। কোনওরকম সরকারি বা সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল না হওয়া সত্ত্বেও। লক্ষ্য করে দেখা গেল, দারিদ্র ও অপুষ্টির সঙ্গে লড়াই করা পড়ুয়াদের খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। রেবা জানালেন, বাচ্চাদের অধিকাংশ-ই স্কুলে আসে কিছু না খেয়ে, ফলে দ্বিতীয় পিরিয়েড থেকেই খিদে পেয়ে যায়। এমনকি এদের কেউ কেউ এতই গরিব যে স্কুলে আসে শুধুমাত্র পেট ভরানোর তাগিদে। আমরা যেদিন গেলাম সেদিনের খাওয়ার আয়োজনে ছিল মুড়ি আর শসা। জল ঢেলে নরম করে মহানন্দে মুড়ি খেলো বাচ্চারা সবাই।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে ছিলাম। সেটা দেখিয়ে রেবা বললেন যে তাঁরা কষ্ট করে গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের পড়ুয়াদের স্কুলে আসতে কোনও সমস্যা না হয়। স্কুল শেষ হয়ে গেলে গাড়ি করে-ই তাদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। তাঁর মতে, পড়ুয়াদের যাতায়াতের ঠিকঠাক বন্দোবস্ত করা তাঁর দায়িত্ব যাতে পড়ুয়ারা প্রত্যেকদিন নিয়ম করে স্কুলে আসতে পারে। মনে পড়ে গেল শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯) প্রসঙ্গে ভারতে বিশ্বব্যাঙ্কের শিক্ষা-বিশেষজ্ঞ স্যাম কার্লসনের মন্তব্য, “শিক্ষার অধিকার আইন প্রথমবার গোটা পৃথিবীজুড়ে সরকারের উপর পড়ুয়াদের ভর্তি করানো ও পড়ুয়াদের নিয়মিত স্কুলে আসা নিশ্চিত করার মতো বিষয় তুলে ধরে। অভিভাবকদের-ও বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে বাধ্য করে।” জানা হয়নি, শিক্ষার অধিকার আইন সম্পর্কে রেবা কিছু জানেন কিনা। কিন্তু এইটুকু বোঝা গেল, বাচ্চাদের প্রতি তাঁর সহজাত ও স্বতঃস্ফুর্ত দায়িত্ববোধ শিক্ষার অধিকার আইনের উদ্দেশ্যগুলিকে-ই যেন নিজের উদ্যোগে শামিল করে নিচ্ছে। শুধু শিক্ষা নয়, বাচ্চাদের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে কোনও সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণ করা-ও রেবার বহুদিনের ইচ্ছে। সেই পরিকল্পনা থেকে-ই বনবিভাগের জমির উপর পাট্টা নিয়ে পড়ুয়েদের সঙ্গে শুরু করেছেন সমবেত চাষ-আবাদ। “এই স্কুল চালাতে আমার দিনে খরচ প্রায় ১০০০ [অর্থাৎ মাসে ৩০,০০০] টাকা। ফলে খরচ বাঁচাতে শুধুমাত্র চালটা-ই আমরা বাজার থেকে কিনি। বাকি সমস্ত ফলমূল শাকসব্জি এখানে-ই চাষ করে স্কুলের বাচ্চারা আর শিক্ষকেরা। আমরা এমনকি সর্ষের চাষ-ও করি যাতে তেলের অভাব মেটানো যায়।” কাছেই দ্বারকেশ্বরের ধারে পাম্প বসিয়ে নদীর জল তোলা হয়, রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজের জন্য। “আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের প্রায়-ই বলি, ‘যাও, নদীর ধারে চলে যাও। সেখানে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকো। তারপর ফিরে এসে কী দেখেছ, তোমার অনুভূতি, নিজের ভাষায় লেখো’।” রেবা বললেন। এইভাবে নিজের অজান্তে-ই ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার অধিকার আইনের আরো একটি উদ্দেশ্য পূরণ করছে; প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষার একটা নাড়ির টান তৈরি করা।

photo

এই স্কুলে এই মুহূর্তে ৫৫ জন পড়ুয়ার মধ্যে ১২ জন হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। দুটো ডরমেটারিতে এরা থাকে। আরো ৬ জন পড়ুয়া এখানে থেকে পড়াশুনো করে, যারা এই স্কুলের ছাত্র নয়, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি হওয়ায় যাতায়াতের সুবিধার্থে এখানে থেকে কাছেপিঠে স্কুল-কলেজে পড়ে। সব মিলিয়ে মোট হস্টেলবাসীর সংখ্যা ১৮। প্রারম্ভিকের একজন পড়ুয়া-ই হস্টেলে থাকে, সে রেবার কাছে রাতে ঘুমোয়। মায়ের স্নেহ তাঁকে দেন রেবা-ই। হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে স্কুলের সেইসব ছেলেমেয়েরা, যাদের বাবা-মা কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন, অথবা যাদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাতায়াত করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। কোভিডের সময় এখানে আবাসিক শিক্ষার ধারণাটি এক বিশেষ মাত্রা পায়। ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কোভিডের ফলে পড়ুয়াসংখ্যা ১০৩ থেকে কমে দাঁড়ায় ১৩-এ। পড়ুয়াদের অভিভাবকদের কাজকর্ম অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া এর একটা বড় কারণ। ২০২১ সালে নতুন করে কাউকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। তার পরের বছর থেকে আবার ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়। আরো জানা গেল, কোভিডের মধ্যে যখন বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে কর্পোরেট ক্ষেত্র, বেসরকারি স্কুল সর্বত্র বেতন কমানো বা কর্মী ছাঁটাই চলছে, সেই সময় সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও রেবা কিন্তু শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করেননি। ফলে শিক্ষকরা দ্বিগুণ উৎসাহে যাবতীয় কোভিড বিধি মেনে ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্মতি নিয়ে কাছেপিঠে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি পড়াতে যেতেন; সেইসব ছাত্র, যারা কোভিডের ফলে রোজকার স্কুলজীবনের স্বাভাবিক ছন্দে হঠাৎ হোঁচট খেয়েছে। মনে হয় রেবার চিন্তায় ফুটে ওঠা তাঁর গ্রাম, সেই গ্রামের মানুষ, সবাইকে এই শিক্ষা-উদ্যোগে শামিল করার এই দায়বদ্ধতা ছাঁচনপুর ও সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে সম্মিলিত শিক্ষার ধারণাটি ক্রমে প্রসারিত করবে।
স্কুল চালানো ছাড়া-ও রেবা মূর্মূ নিকটবর্তী ঝাঁটিপাহাড়ি আদিবাসী সমবায় সংস্থায় চাকরি করেন। মাসে যা আয় করেন তার পুরোটা-ই স্কুলের উন্নতিতে ব্যয় করেন। সত্যি বলতে কি, গোটা স্কুলটা-ই চলছে তাঁর আয় ও কিছু শুভানুধ্যায়ীর অর্থসাহায্যে। তাঁরা যে যেমন পারেন সাহায্য করেন স্কুলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এই তাগিদে। যার কাছ থেকে যেটুকু সাহায্য পাওয়া যায়, রেবার কাছে স্কুল চালার সেটা-ই অনেক। এছাড়া-ও স্কুলের পড়ুয়াদের কাছ থেকে মাসিক ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে অনেক পড়ুয়া-ই নিয়মিত বেতন দিতে পারে না। স্কুল ছুটি হলে তিনি অফিস যান। এভাবে-ই তিনি অফিস ও স্কুল – এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলেছেন।
স্কুলের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে যথেষ্ট আশাবাদী রেবা। স্কুলের অর্থসাহায্য যৎসামান্য হলে-ও সেটুকু টাকা-ও যথাযথ পরিকল্পনামাফিক খরচ করে চলেছেন তিনি। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস জাগিয়ে তুলতে স্কুলে একটি লাইব্রেরি তৈরি করেছেন। লাইব্রেরি সম্প্রসারণ নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়িত হতে পারছে না। স্কুলটা আগাগোড়া আবাসিক স্কুল হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা-ও করছেন রেবা। “যারা বাইরে থেকে আসা-যাওয়া করে তাদের বাড়িতে পড়াশোনায় সাহায্য করার কেউ নেই। তাই এখানে প্রস্তুতি ছাড়া-ই চলে আসে। এখানে থেকে লেখাপড়া করলে ওরা অন্তত একটা পড়াশোনার পরিবেশের মধ্যে থাকবে।” তাঁর বক্তব্য।
স্কুলের পরিকাঠামো কীভাবে আরো উন্নত করা যায়, সে ব্যাপারে রেবা জানালেন এ গ্রামে প্রতিবছর হাতেগোনা কিছু পর্যটক আসেন। তাই তিনি একটি ‘হোমস্টে’ তৈরির পরিকল্পনা করছেন দুটি ঘর নিয়ে। এখান থেকে তিনি যদি কিছু আয় করেন তার পুরোটাই ব্যয় করা হবে স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নে। ছেলেমেয়েদের কম্পিউটারে দক্ষ করে তুলতে তিনি একটা কম্পিউটার-ও কিনেছেন। কিন্তু এখন-ও ঠিকঠাক চালিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর আশা, খুব শিগগির-ই এই কম্পিউটার তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর ব্যবস্থা করে উঠতে পারবেন। “আমি সবসময় আমার ছাত্রছাত্রীদের বলি, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা-ই একমাত্র বড় কথা নয়, বড় কথা সবকিছু শিখে রাখা। কারণ কখন কোনটা দরকার পড়ে কেউ বলতে পারে না। তাই সবকিছু-ই শিখে রাখো যাতে জীবনের চলার পথে কখনও কোনও বাধার সম্মুখীন হলে তা অনায়াসে-ই পেরিয়ে যেতে পারো” বললেন তিনি।
ভারতে এই মুহূর্তে ক্রমশ বেড়ে চলা সামাজিক বিভাজন আঘাত করেছে শিক্ষাক্ষেত্রকে-ও। ব্যক্তি-মালিকানাধীন ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার দাপটে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা দিনে দিনে মলিন থেকে মলিনতর হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারে দেশের ভিতর তৈরি হচ্ছে আর একটা ‘দেশ’ যেখানে Digital Divide প্রান্তিক সমাজের শিশুদের শিক্ষার স্বাভাবিক অধিকারের পথ দিনে দিনে কঠিন করে দিচ্ছে। এর-ই মাঝে শিক্ষা নিয়ে রেবা মূর্মূর এক অন্যরকম পরীক্ষানিরীক্ষা মনকে স্পর্শ করে গেল। রাষ্ট্রব্যবস্থার অভিমুখ যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ নাগরিকের মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রগুলি থেকে ক্রমশঃ সরে যাচ্ছে, সেইসময় আশা করতে ভালো লাগে, দেশের আনাচেকানাচে হয়তো রেবা মূর্মূর মতো এরকম আরো কিছু উদ্যোগী মানুষ নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের উপর ভরসা রেখে অনেক শিশুকে সুস্থ, সক্ষম জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.