বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

যাদবপুর কাণ্ড এবং পশ্চিমবাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা

যাদবপুর কাণ্ড এবং পশ্চিমবাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা

কমল দাশ

photo

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিবাদের ধরন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। দাবি জানানোর নাম করে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তাকে লাগামহীন বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কিছুই বলতে নারাজ সুশীল সমাজের একাংশ। কেউ কেউ আবার বলছেন, অতিবাম রাজনীতির ছত্রছায়ায় একদল উচ্ছৃঙ্খল, নেশাগ্রস্থ ছাত্র গাড়ির উপর ঝাপিয়ে পড়ে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে প্রাণে মারার চেষ্টা করেছিল। তাই মন্ত্রীমশাই প্রাণ রক্ষার তাগিদে ছাত্রের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছেন। যদিও মন্ত্রী মহোদয় পুরো ঘটনাকে সাজানো বলে পাল্টা প্রচারও করছেন। সরকার এবং বিরোধী পক্ষের হট্টগোলে ছাত্রদের প্রতিবাদের ন্যায্যতা এবং ক্ষোভের যৌক্তিকতা আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সাত বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন চেয়ে ছাত্ররা লাগতার বিক্ষোভ চালিয়ে গেছে। অনশনও করেছে। তা সত্ত্বেও এক অজানা কারণে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী সমিতিতে — কোর্ট, কর্ম সমিতি, ফ্যাকাল্টি কাউন্সিলে প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ থেকে ছাত্ররা দীর্ঘদিন বঞ্চিত হচ্ছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার কোনও উপযুক্ত কারণও জানানো হয়নি। সরকারের তরফে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করার কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং ছাত্র সংসদ তুলে দিয়ে ছাত্র কাউন্সিল নামক একটি সরকার নির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সরকারের বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। শুধু ছাত্র সংসদ নির্বাচন নয়, স্বশাসিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বদল এনে সরকার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বশাসনে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে। প্রশাসনিক কাজকর্মে সরকারের কর্তৃত্বের বহর দিন দিন বাড়ছে। প্রচলিত প্রথা ভেঙে রাজ্য সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন নিয়োগ করছে। কর্মসমিতির মিটিং ডাকার জন্য কোনওদিনই সরকারের অনুমোদনের কোনও প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে সরকারের সম্মতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসমিতির মিটিং ডাকতে পারে না। সরকারি বা বেসরকারি যে কোনও সংস্থার সঙ্গে গবেষণা বিষয়ক কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করতে গেলেও সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বছর পার হয়ে গেলও এই অনুমোদন অনেক সময় পাওয়া যায় না। কোনও কোনও সময় প্রস্তাবিত বিষয়টি তামাদি হয়ে যায়। প্রতিটি বিভাগে প্রায় অর্ধেক শিক্ষক পদ শূন্য। সরকার আর আচার্যের অস্বাস্থ্যকর খেঁউড়ে রাজ্যের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো যাদবপুরও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী উপাচার্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনও নিবন্ধক, অর্থ সচিব। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও বিধি (স্ট্যাটিউড) নেই। অপ্রাপ্তির তালিকা এখানেই শেষ নয়। যাদবপুর কোনও কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ফলে তার নির্দিষ্ট কোনও অর্থের যোগানদার নেই। শিক্ষকদের বেতন আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যৎসামান্য অর্থ রাজ্য সরকার বরাদ্দ করে। তাও আবার গত কয়েক বছর ধরে সেই বরাদ্দ ধীরে ধীরে কমতে কমতে তালানিতে এসে ঠেকেছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা সংকুচিত করে সরকারি কর্তৃত্ব কায়েম করা, অন্যদিকে আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে ভাতে মারার চেষ্টা চলছে। শুধু যাদবপুর নয়, রাজ্যের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অগণতান্ত্রিক অচলাবস্থা বিদ্যমান। খাতায় কলমে ছাত্র সংসদ নেই, অথচ অধিকাংশ কলেজে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দৌরাত্ম কারও অজানা নয়। ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে কলেজের প্রশাসনিক কাজে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের ছোট বড় নেতাকর্মীর দাপাদাপি প্রায়শ প্রকাশ্যে চলে আসে। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে দুর্নীতির সিন্ডিকেট বিভিন্ন অছিলায় তোলা তুলছে। প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির সভাপতির পদে শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক রহিত শাসক দলের দাপুটে নেতাদের বসিয়ে দিয়ে সরকার কলেজগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। তাদের অঙ্গুলি হেলনকে অমান্য করার সাহস দেখাতে গেলে অধ্যপক অধ্যপিকাদের জগের আঘাতে আহতও হতে হয়। শুনতে হয় অশ্রাব্য গালিগালাজ। প্রতিটি কলেজের প্রতিটি বিভাগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক পদ শূণ্য। কোনও কোনও কলেজের কোনও কোনও বিভাগে একজন করে পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক সব দায়িত্ব কোনওরকমে সামাল দিচ্ছেন। অর্থের অভাবে গবেষণাগারসহ পরিকাঠানোর বেহাল দশা রাজ্যের উচ্চ শিক্ষার করুণ পরিস্থিতি তুলে ধরে। শিক্ষা খাতে ক্রমাগত বরাদ্দ কমানো এবং চরম ঔদাসীন্য সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সমাজে একটা তীব্র অনীহা তৈরি হয়েছে। সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নামকরা কলেজের স্নাতক স্তরের বিভিন্ন বিভাগের অধিকাংশ আসন শূণ্য পড়ে থাকছে। রাজ্যের মেধাবী ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষার জন্য অন্য রাজ্যে বা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। এই দুর্দিনেও যাদবপুরের মতো আঙুলে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের উৎকর্ষ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অথচ সরকার তাদের মুক্ত বিচরণের পথে শুধু বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইছে না, তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। তাই ছাত্রদের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার চেয়ে আন্দোলনের পাল্টা হিসেবে সরকার ক্যাম্পাসে পুলিশ ফাঁড়ি বসাতে চাইছে।
উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের স্কুল শিক্ষাও ধ্বংসের মুখে। শিক্ষক নিয়োগে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, তা ভারত ও পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কোনওদিন ঘটেছে বলে জানা নেই। বেকার যুবকের স্বপ্ন চুরি করে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি করা হয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে অযোগ্য প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র দিয়ে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে শিক্ষা দপ্তর। হাইকোর্টের নির্দেশে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি চলে যাওয়ার উপক্রম হলে, তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য বিধানসভায় ক্যাবিনেটের মিটিং ডেকে বাড়তি পদ সৃষ্টি করার মধ্যে দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির উপর সরকারি সীলমোহর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান, বিশ্বাসযোগ্যতা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা না ভেবে দুর্নীতিগ্রস্থদের চাকরি বাঁচানোর চেষ্টা করে সরকার গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে। ধ্বংসের বীজ শুধু নিয়োগ দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যালয় শিক্ষাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যে গণতান্ত্রিক কাঠামো এ রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বহাল ছিল, তা সুকৌশলে নষ্ট করা হয়েছে। পরিচালন সমিতির গঠনতন্ত্রে আমূল পরিবর্তন এনে বিদ্যালয় পরিচালনায় দলীয় রাজনীতির আধিপত্য কায়েম করা হয়েছে। এখন পরিচালন সমিতি গঠন করতে গেলে স্থানীয় বিধায়কের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচনের মাধ্যমে আর বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতি গঠিত হয় না। যেহেতু শাসক দলের বিধায়ক বা স্থানীয় নেতার বদান্যতার উপর পরিচালন সমিতির গঠন নির্ভরশীল সেহেতু স্কুলের পরিমন্ডলে গণতন্ত্র চর্চার আর কোনও অবকাশ থাকছে না। অন্যদিকে, কোষাগারের করুণ দশা দেখিয়ে সরকার বিদ্যালয়ের অর্থ কম্পোজিট ফান্ডের টাকা দীর্ঘদিন আটকে রাখছে। বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে কর্তৃপক্ষকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। সহৃদয় শিক্ষকদের অনুদানের টাকায় বা স্কুলের সম্পদ বিক্রি করে চক, ডাস্টার ইত্যাদি কিনে কোনওভাবে স্কুল চালাতে হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষক পদ শূণ্য। ২০১১ সালে শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত ছিল ৩৫: ১। বর্তমানে ৭০:১। রাজ্যের ৬১৪ টি মাদ্রাসা মিলিয়ে মোট ১০ হাজার শিক্ষক পদ শূণ্য। গ্রামের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শাখায় কোনও শিক্ষক নেই। বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা কলা বা বাণিজ্য বিভাগে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষাকর্মী নেই। প্রাথমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল মিলিয়ে বর্তমানে মোট ৩,৯৮,১৫০ পদ শূণ্য। শূন্য পদে নিয়োগ না করে সিভিক শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন একাধিক কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত রেখে বিদ্যাচর্চার পরিসরকে সংকুচিত করা হচ্ছে। সরকারি বিদ্যালয়কে পঠনপাঠনের অনুপযুক্ত করে সরকার পরোক্ষভাবে বেসরকারি শিক্ষাকে উৎসাহ দিচ্ছে। সম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরা আর সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে না। গরীর ঘরের ছেলেমেয়েরা বাধ্য হয়ে সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়। শিক্ষার অঙ্গনে শিক্ষার্থীকে আটকে রাখার জন্য পোষাক, ব্যাগ, বই ইত্যাদি বিনা মূল্যে বিতরণ করেও স্কুল ছুট আটকানো যাচ্ছে না। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে স্কুট ছুটের হার ১৮.৩৮ শতাংশ। চলতি শিক্ষা বর্ষে প্রায় তিন লক্ষ ছাত্র একাদশ শ্রেণীতে নাম নথিভূক্ত করলেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়ে শিক্ষার পরিধির বাইরে চলে গেছে। পারিবারিক দারিদ্র্যের চাপে এদের মধ্যে অনেকে স্কুল ছেড়ে কাজ নিতে বাধ্য হয়েছে, একথা সত্য। আবার বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাও সত্য। কিন্তু এর বাইরে বহু ছাত্র পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে নেশায় আসক্ত হচ্ছে, অসামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন। স্কুল ছুট ছাত্রদের একটা বড় অংশ সমাজের মূল স্রোত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না তো! অন্যদিকে কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু করেও বাল্যবিবাহ আটকানো যাচ্ছে না কেন, সে বিষয়েও সরকারের আরো গভীরভাবে ভাবনা চিন্তা করা উচিত।
অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মতো শিক্ষা মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের ২৬ নম্বর ধারায় সর্বজনীন শিক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি জানানো হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে প্রতিটি মানুষের শিক্ষা গ্রহণের অধিকার আছে। ঘোষণাপত্রে আরো বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা বিনা খরচে এবং বাধ্যতামূলক করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের সংবিধানের ২১এ ধারায় ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে বিনামূল্যে ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কেন্দ্র অথবা রাজ্য কোনও সরকারই শিক্ষার প্রতি যত্নশীল নয়। দারিদ্র্যের কারণে অসংখ্য শিশু শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা আসছে তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে শিশুশ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। এই উদ্বেগজনক ছবি পাল্টানোর জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বরং দুর্বৃত্তায়ন এবং আধিপত্য বিস্তার করে শিক্ষা ক্ষেত্রকে ধ্বংস করার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.