বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
এবারের রাজ্য বাজেটে দুটি বিষয়ের বৃদ্ধি দেখে আমরা অনেকে যুগপৎ চমৎকৃত এবং চকিত হয়েছি। লক্ষ্মী ভান্ডারের ভাতা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করা হয়েছে। ওবিসিসহ অন্যান্য মহিলারা ৫০০ টাকার জায়গায় মাসে ১০০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। আর আদিবাসী, তফসিলি জাতির মহিলারা ১০০০ টাকার জায়গায় ১২০০ টাকা ভাতা পাবেন। রাজ্যের গরীব মহিলাদের রোজগারের জন্য এই প্রকল্প বেশ চমকপ্রদ। অনুদান আর অধিকারের কটু তর্কে না গিয়ে এ কথা বলতে কোনও সংশয় নেই যে, লক্ষ্মী ভান্ডারের ভাতা বৃদ্ধিতে রাজ্যের সুযোগ বঞ্চিত মহিলারা উপকৃত হবেন। এই চমৎকারিত্বকে ছাপিয়ে যে সরকারি প্রকল্প হতচকিত করেছে তা হল মদ বিক্রিতে রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত মনোযোগ। আপাতভাবে সংযোগরহিত মনে হলেও এই দুই “সরকারি প্রকল্প” এর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সংযোগ আছে কিনা সে আলোচনা আপাতত মূলতুবি রেখে মদ নিয়ে সরকারের মতামাতির খোঁজটা আগে একটু নেওয়া যাক।
রাজ্য সরকার বিধানসভায় এ বছর মোট ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছে। নিয়ম মোতাবেক সম্ভাব্য ব্যয়ের পাশাপাশি বাজেটে সম্ভাব্য আয়ের উৎসও দেখানো হয়েছে। রাজ্য সরকার সারা বছর সমাজ কল্যাণে যা যা ব্যয় করবে বলে স্থির করেছে, তার একটি বড়ো অংশ মদ বিক্রি করে আয় করবে বলে চিন্তা করেছে। এই চিন্তার জন্য চমৎকৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো চক্ষু চড়ক গাছে ওঠার উপক্রম হয়েছে। গরীব মহিলাদের ভাতা বৃদ্ধিসহ সমাজের কল্যাণের জন্য সরকার যে পথে সরকারি কোষাগারের অর্থ ভর্তি করছেন তাতে সমাজে অন্য সংকট ডেকে আনার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারি এই অনুদান গরীবের সংসারে বাড়তি ঝক্কি ডেকে আনবে না তো। সাম্প্রতিক সমীক্ষা জানাচ্ছে, গরীব এবং খেটে খাওয়া দিনমজুরদের মধ্যে সুরাসক্তি অত্যন্ত বেশি পরিমাণে বেড়ে গেছে। এ কি দুধ বিক্রি করে মদ খাওয়ার পুরোনো প্রবাদের মতো হয়ে গেল না! উলট হোক আর পালট হোক রাজ্যবাসী কিন্তু সোৎসাহে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে বধ্যপরিকর। ধরা যাক, গত বছরের কথা। রাজ্য সরকার মদ বিক্রি করে ১৭ হাজার ৯২১ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিল। অর্থ বর্ষ শেষ হওয়ার দেড় মাস আগেই রাজ্যবাসী অতিশয় অনুপ্রেণিত হয়ে সরকারি প্রকল্পকে সাফল্য মন্ডিত করার জন্য প্রায় ১৮ হাজার ৮৫১ কোটি ৬ লক্ষ টাকার মদ ইতিমধ্যে উদোরিকরণ করে ফেলেছেন। মদ বিক্রি যে রমরমিয়ে চলবে এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। অর্থনীতির উদার বাজারে কারন বারির এহেন রমরমা দেখে রাজ্য সরকার উৎসাহিত হয়ে আগামী বছর মদ বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করার উপায় স্থির করেছে। আসছে বছর উৎসব-উল্লাস-উপলক্ষ্যের আয়োজন এবং আয়তন আড়ে-বহরে বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রাজ্যবাসীকে ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকার মদ খাওয়ানোর কথা বাজেটে সদর্পে ঘোষণা করা হয়েছে। গত বারো বছর রাজ্য সরকারের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ভাড়ে না ভবানী রাজকোষের স্বাস্থ্য ফেরানোর জন্য স্থায়ী ও ঠেকসই কোনও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সরকার যতটা তৎপর, তার থেকে শতগুণ তৎপর মদ বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের পথকে সুগম করা। গত বারো বছরে রাজ্য সরকার মদ বিক্রি করে ৬৭৯ শতাংশ আয় বাড়িয়ে নিয়েছে, অন্য খাতে রোজগার এর ধারে কাছে নেই। অর্থাৎ বিপিনবাবুর কারন সুধা রাজ্যবাসীর ক্ষুধা এবং জ্বালা মেটাতে না পারলেও রাজ্য সরকারের উপার্জনের অন্যতম উপায় হয়ে উঠেছে। রাজকোষের ঘাটতি পূরণের জন্য বিকল্প পথ না খুঁজে মদ বিক্রিকে অন্যতম উপায় হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে সরকারের মনোভাব কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়। সরকারি অনুপ্রেরণায় নেশার এই সামাজিকিকরণ জনমানসে যে বিপর্যয় ডেকে আনছে, তা সরকার বাহাদুরের নজরে আছে তো!
মদ বিক্রির বহর দেখে সহজেই অনুমান করা যায় আমাদের রাজ্যে মদ্যপানের প্রবণতা কত ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের একটি সমীক্ষায় থেকে দেখতে পারছি বছরে প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের মৃত্যু হয় মদ্যপানের কারণে। সমীক্ষা আরো জানাচ্ছে, দেশের ১২.৫ শতাংশ মানুষ সুরাসক্ত। অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি মানুষ সুরা নির্ভর এবং তাদের একটি বড়ো অংশ সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের। মদ্যপায়ীদের চিকিৎসা এবং পুর্নবাসনের জন্য দেশের সরকার বছরে খরচ করে প্রায় ৯৮ বিলিয়ন যা জিডিপির ১.৪৫℅। আর সারা বছর মদ বিক্রি করে সরকার রোজগার করে ২,০৫,৩৬৩ কোটি টাকা।
শারীরিক, আর্থিক এবং মানসিক স্বাস্থের ক্ষতির কথা ছেড়ে দিলেও অতিরিক্ত মদ্যপান যে বিপজ্জনক সামাজিক সংকট ডেকে আনতে পারে এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। মদ্যপ অবস্থায় নারী ও শিশুর উপর অকথ্য অত্যাচার করা থেকে শুরু করে চুরি, ডাকাতি, খুন, জখম, রাহাজানির মত অসামাজিক কাজ যে হামেশা ঘটে তা আমাদের প্রত্যেকেরই অভিজ্ঞতায় আছে। সম্প্রতি সন্দেশখালির মহিলারা যৌন নির্যাতনের যে নিদারুণ কাহিনী নিরুপায় হয়ে জনসমক্ষে বলতে বাধ্য হয়েছেন, তার পেছন নেশার সংযোগ নেই একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। প্রবল প্রতাপশালী নেতাদের মদ, মাংস সহযোগে নিশি যাপনের উপকরণ হিসেবে নারীকে ব্যবহার করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, আর যদি পুলিশের বড়ো মেঝো, সেজো বাবুরা নেতার বশংবদ হয়, তাহলে তো কথা নেই। সরকারি বদান্যতায় আবাদ ও উন্মুক্ত নেশার প্রায় মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে ওঠা এ রাজ্যে যে নারী নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়, তা পরিষ্কার।
এবার প্রথম প্রসঙ্গে ফেরা যাক। লক্ষ্মীর ভান্ডারের সঙ্গে ঢালাও মদ বিক্রির সরাসরি সংযোগের তথ্য প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, গরীব মহিলাদের রোজনামচা শোনার সামান্য অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা জানেন, লক্ষ্মীর ভান্ডারে টাকা ব্যাঙ্কে জমা পড়ার পর বহুক্ষেত্রে মদ্যপ স্বামী কিভাবে তাঁর উপর চড়াও হন। গায়েগতরে খেটেখাওয়া মহিলারা লক্ষ্মীর ভান্ডারের ভাতা পুরোটা সংসার বা নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারেন, নাকি স্বামীর মদ্যপানের রসনাকে তৃপ্ত করতে ওই টাকার কিছুটা অংশ ব্যয় যায় তা জানার জন্য আরো গভীর সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
এই প্রসঙ্গে অন্য একটি অবক্ষয়ের কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। পশ্চিমবঙ্গে স্কুলছুটের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের মধ্যে স্কুলে না আসার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এর একমাত্র কারণ যে কেবল দারিদ্র্য নয় তা স্কুলশিক্ষা সম্পর্কে সামান্য খোঁজখবর রাখা ব্যক্তি মাত্রই জানেন। দারিদ্র্য আগেও ছিল এবং অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া এ রাজ্য আগে ঘটেনি এমনটাও নয়। তবে এক অংশের ছাত্রদের মধ্যে পড়াশোনায় তীব্র অনীহা বা স্কুলছুটের পেছনে অন্য কোনও গভীর কারণ আমাদের খুঁজতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ির চাপ না থাকা সত্ত্বেও এক অংশের ছাত্র স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে, নানান উপায়ে কাঁচা পয়সা রোজগারে অনেক বেশি মনোযোগী। এই রোজগারের একটা অংশ তারা মোবাইল ফোনের পেছনে ব্যয় করছে। অনেকেই আবার বাকি অংশ নেশার পেছনে ব্যয় করতে দ্বিধা করছে না। শহর এবং শহর সংলগ্ন জেলায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা পানশালায় একটু রাতের দিকে খোঁজ নিলে এই সমস্ত স্কুলছুটদের পানপাত্র হাতে দেখতে পাওয়া যায়। নেতা-নেত্রীদের ছত্রছায়ায় এরাই পরবর্তীকালে এলাকা দাপিয়ে বেড়ায় এবং নানান অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। নেশার দ্রব্যের সহজলভ্যতা যুব সমাজকে কোন দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। আর সরকার যেখানে স্বয়ং রাজ্যেবাসীকে নেশাগ্রস্ত হতে প্ররোচিত করছে সেখানে সুস্থ সমাজ আশা করা বাতুলতা মাত্র। রাজকোষের ঘাটতি পূরণের জন্য মদ বিক্রিকে অন্যতম উপায় হিসেবে বেছে নেওয়াটা সরকারের কাছে সহজ পথ হতে পারি, সমাজের কাছে সংকটের।