বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

আনিস খানের হত্যা

আনিস খানের হত্যা

পূবালী রাণা

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১ মার্চ, ২০২২— গভীর রাতে আমতার এক গ্রামে একজন পুলিশ ও তিনজন সিভিক ভলেন্টিয়ার নামক আততায়ীদের হাতে ছাত্রনেতা আনিস খান নৃশংসভাবে খুন হন। বাড়ির তিনতলা থেকে প্রতিবাদী তরুণকে নিচে ফেলে দেওয়া হল। পুলিশের পোশাকে একজন রিভলবার ঠেকিয়ে আনিসের বাবাকে আটকে রাখে। তিনজন সিভিক ভলেন্টিয়ারের পোশাকে তিনতলায় উঠে যায়। তারপর সবশেষ।
তদন্ত হওয়া বা না হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই রাত দশটা নাগাদ আনিসের বাড়িতে আসেন এক ঝানু ব্যবসায়ী। সঙ্গে পুলিশ প্রহরা। তিনি আনিসের বাবা সালেমের খানের সঙ্গে দেখা করেন। আনিসের বাবা সালেম খানের বয়ান অনুযায়ী— "একজন এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও দু’জন ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দিদি’ তাঁকে পাঠিয়েছেন। সব কথা শুনে ‘দিদি’ বলেছেন, দোষীদের শাস্তি হবেই। সেই সঙ্গে চাইলে পরিবারের কাউকে চাকরিও দেওয়া হবে। আমি বলেছি, চাকরি দরকার নেই, দোষীদের শাস্তি চাই।"
রাত ১১টা ৪০ নাগাদ আনিসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি তা বলেন নি।" (আবাপ: ২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০২২)
কিন্তু কে এই ব্যবসায়ী? কেন গোপন রাখা হচ্ছে তাঁর পরিচয়? অবশ্য পরে জানা গেছে তার নাম কৌস্তভ রায়। একসময় একটি বাংলা জনপ্রিয় কিছুটা ভিন্ন ধারার নিউজ চ্যানেলের মালিক ছিলেন। এই ব্যাবসায়ী প্রকৃত পক্ষে ক্ষমতার দালাল। না হলে তৃণমূল সুপ্রিমো তাঁর দলের কর্মীদের না পাঠিয়ে একজন ব্যবসায়ীকে পাঠালেন কেন সালেম খানের সঙ্গে দেখা করার জন্য? অস্বাভাবিক নয় কি? আর চাকরির টোপ দিলেই কি সদ্য পুত্রহারা পিতা তা গ্রহণ করবেন বলে মনে হয়!
পুলিশ জানিয়েছে আনিসের বিরুদ্ধে পস্কো মামলা আছে। মানুষকে খুব বোকা মনে হয়? একটা তরতাজা যুবক খুন হয়েছেন, আততায়ীরা পুলিশের পোশাক পরে এসে খুন করছে। আর পুলিশ ঘটনার কথা জানার বেশ কয়েক ঘন্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, যাতে ফরেসন্সিক পরীক্ষার তথ্যপ্রমাণ বিশেষ কিছু না থাকে।
কামদুনি-সারদা-নারদায় মানুষ রিঅ্যাক্ট করেনি বলে এবারেও করবেন না, এরকমটা ভেবে নেয় কী করে শাসক দল তথা সরকার?
প্রশ্ন হচ্ছে কে এই আনিস খান? কেন তাঁকে খুন হতে হল? আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র নেতা প্রথম থেকেই প্রতিবাদে, প্রতিরোধে সরব ছিলেন। শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার দুঃসাহসী প্রতিস্পর্ধা তার মধ্যে প্রবলভাবে ছিল। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন থেকে এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন তিনি। দুর্দম সাহসী এই ছাত্র নেতা শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল— তা কেন্দ্রীয় সরকারই হোক বা রাজ্য সরকার। সবক্ষেত্রেই, ছাত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিলেন আনিস। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তর নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিতর্ক, ক্যাম্পাসের হস্টেলের পরিকাঠামোগত স্বচ্ছতা, স্কলারশিপের টাকা বাড়ানোর দাবিতে আনিস এবং তাঁর সহযোদ্ধারা ক্রমাগত লড়াই আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। আবার সেই আনিসই তার আমতার বাড়িতে ফিরে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে শাসকের চক্ষুশূল হয়েছে। আর সেই তিক্ততা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে আনিস নিজেই নিজের খুন হওয়ার আশঙ্কা করে এবং পরিবারের বিপদের কথা জানিয়ে পুলিশ-প্রশাসনের নানা স্তরে চিঠি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কিন্তু শুধুমাত্র একটা রক্তদান শিবির নিয়ে অশান্তির জন্যই কি হত্যা করা হল তাকে? নাকি দিল্লিতে ক্রমশ বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িয়ে শাসকের রাতের ঘুম কাড়ছিলেন তিনি! 'গ্রেটার'দের পথের কাঁটা দূর করলো 'লেসার'রা?
আসল কথা হল মুসলমান যতক্ষণ শুধুমাত্র সম্প্রদায়গত মুসলমান থাকে ততক্ষণ সে দুধেল গরু এবং ভোট ব্যাঙ্ক। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে কেউ শিক্ষিত হয়ে উঠে এলে, প্রতিবাদের আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলে তার থেকে বিপদজনক আর কেউ নেই। অতএব, তাকে থামাতে কেন্দ্র এবং রাজ্য একইভাবে সচেষ্ট ছিল।
আসলে আরএসএস একাই বসে দাবার ঘুঁটি চালছে।। একদিকে সাদা ঘুঁটি। একদিকে কালো ঘুঁটি। দু’ তরফের চালই দিচ্ছে আরএসএস। খেলায় যে পক্ষই জিতুক না কেন জয় আরএসএস-এরই।
আদতে রাজনৈতিক দলগুলি বেশির ভাগই পুঁজিবন্ধু এবং পুঁজির সঙ্গে পাঙ্গা নেবার ক্ষমতা অথবা ইচ্ছেটাই তাদের নেই। একথা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে পুঁজি তার মুনাফার জন্য যে যজ্ঞের আগুন জ্বালায় তাতে ঘৃতাহুতি দিতে মনপ্রাণ দিয়ে সচেষ্ট থাকে আরএসএস, আইসিস-এর মতো সংগঠন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো।
বর্তমানে ভারতের সর্ববৃহৎ সংগঠনের নাম আরএসএস। তবে বন্ধু আম্বানি-আদানির স্বার্থ দেখার পাশাপাশি তাদের সর্ববৃহৎ অ্যাজেণ্ডা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ধ্বংস করে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ঠিক সেই কারণেই রামমন্দির। ঠিক সেই কারণেই ইসরাত জাহান থেকে আসিফা, আকলাখ থেকে নাজিব, কাফিল খান, উমর খলিদদের নাম উঠে আসে রাষ্ট্রের টার্গেট হিসাবে। একই টেমপ্লেটে কৃষক আন্দোলনকেও "খলিস্তানি" তকমা দেওয়ার চেষ্টা হয় প্রাণপণে।
আনিসের জায়গায় অনুপ হলে এতক্ষণে যে রাজ্য বিজেপির দামালরা দাপাদাপি করে বেড়াতো, বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু ঠিক আসানশোল দাঙ্গায় ইমাম রশিদ যে ষোল বছরের ছেলের লাশের সামনে দাঁড়িয়েও শান্তির কথা বলেছিলেন তা শান্তির ইতিহাসে লেখা থেকে যাবে।
আমতা থেকে আলিয়া কলকাতা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। বাম ছাত্র যুবরা ফুঁসে উঠেছেন। মইদুলের মৃত্যু একসময় দাঁতে দাঁত চেপে কান্নার মতো গিলে নিতে হয়েছিল। কিন্তু আর নয়। চললো রাতভোর আমতা থানা ঘেরাও। স্লোগান উঠলো, "টেবিলের ওই নিচে থেকে/ পুলিশ ভাইকে ডাকছি হেঁকে" কিম্বা, "পুলিশ তুমি উর্দি ছাড়ো/ তৃণমূলের ঝাণ্ডা ধরো"!
এমন বসন্তকাল। শিমুল পলাশের বুকে জেগে থাকবে
আনিসের রক্তের লাল...

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.