বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে নতুন আন্দোলনের পথে হাঁটতে হবে

আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে নতুন আন্দোলনের পথে হাঁটতে হবে

বিনয় চক্রবর্তী

photo

মহাভারতের গল্পে দেখা যায় কুরুক্ষেত্র মহারণের সত্য-অসত্যের দ্বন্দ্ব সমাধানের পর যুদ্ধ বিজয়ী পাণ্ডবরা রাজ্যপাট সামলে নিলে কৃষ্ণ ফিরে যান দ্বারকায়। তারপর একদিন যাদব বংশের কিছু অর্বাচীন এক ঋষির সঙ্গে কৌতুক করতে গিয়ে পুরুষকে গর্ভবতী রমণী সাজিয়ে উত্যক্ত করে তোলে সেই ঋষিকে। ক্রুদ্ধ ঋষির অভিশাপে সেই গর্ভবতী নারী সাজা পুরুষের গর্ভ থেকে নিঃসৃত হয় এক ভয়ংকর মুষল। ভীত অর্বাচীনরা কৃষ্ণের শরণ নিলে কৃষ্ণ বুঝতে পারেন বপন করা হয়ে গেছে যদুবংশ ধ্বংসের বীজ। তবু কৃষ্ণ পরামর্শ দিলেন সেই মুষল চূর্ণ করে নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু ভবিতব্যকে খণ্ডাবে কে? ঋষির অভিশাপ সত্য প্রমাণ করার জন্যই যেন সেই চূর্ণ মুষল থেকেই তৈরি হল উলুখাগড়ার বন আর হাজার হাজার মুষল। গৃহবিবাদে লিপ্ত যদুবংশ সেই মুষল অস্ত্রে নিজেদেরই ধ্বংস করে ফেলল। বিষণ্ণ কৃষ্ণ বিশ্রামের অছিলায় গিয়ে বসলেন গাছতলায়। মুষলের ফলার টুকরোয় তৈরি এক তীরে বিভ্রান্ত এক ব্যাধের নিশানায় বিদ্ধ হয়ে শেষ হয় একটি যুগের।
গল্পটাকে রূপক হিসাবে ধরে নিন। স্বাধীনতার আগে থেকে, স্বাধীনতার পরে তিলতিল করে গড়ে ওঠা আসানসোল, রাণীগঞ্জ-দুর্গাপুর ও সন্নিহিত বাঁকুড়া-বীরভূম জেলার খনি শিল্পাঞ্চল, সেখানখার ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলন, শ্রমচেতনা আর তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃহত্তর এক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সুবাদে যেন হস্তিনাপুর, দ্বারকার মতোই গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল। সেকালের দ্বারকার মত এখানেও একদল অর্বাচীনের অপরিকল্পিত কার্যকলাপ আর কিছু লোকের অসাধু কার্যকলাপ ধ্বংসের দ্বার খুলে দিলে বেনো জলের প্লাবন ভেসে গেল সবকিছু। কেন্দ্রীয় সরকারে বসা ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ নিল। পুঁজির ঘাটতিতে, নবীকরণের পরিকল্পিত অনিচ্ছায় জীবন্মৃত অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হল এই শিল্পাঞ্চলকে। লোহা আর ইস্পাতের গর্ভ থেকেই ফের জন্ম নিল এক আধুনিক মুষলপর্বের।
প্লাবনই অবশ্য শেষ কথা নয়। প্লাবনের ধ্বংসের পর থিতিয়ে পড়া পলিতেই থাকে নতুন বীজের অঙ্কুরোদগমের সম্ভাবনা। স্বাধীনতার আগে ভারতবর্ষের শিল্প খনি অঞ্চলের অন্যতম ছিল আসানসোল, রানীগঞ্জ, কুলটি এলাকা। এই শিল্পাঞ্চলে ব্রিটিশ শাসক আর জমিদার-মহাজনদের অত্যাচারের বিরোধিতার গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল শ্রমিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলন যার পুরোভাগে ছিলেন বামপন্থী শ্রমিক নেতারা। তারপর এল ১৯৪৭। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হল ভারত। পিছনে অবশ্য রয়ে গেল অর্থনৈতিক আর সামাজিক শোষণ, জগদ্দল পাথরের মত রয়ে গেল চরম বৈষম্য। তবু নতুন করে ভারতকে গড়ে তুলতে শিল্প গঠনে প্রয়াসী হতে হল কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে। বিস্তার ঘটল খনি ও শিল্পের। গড়ে উঠল দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল। একটা নতুন জোয়ার এল। সঙ্গে সঙ্গে এল রাজ্যের শিল্প বিরোধী কতগুলো আইন। লাইসেন্সিং প্রথা আর মাসুল সমীকরণ নীতির মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার শিল্পবিকাশের নিয়ন্ত্রণ রেখে দিল নিজেদের হাতে।
শিল্প খনির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার গর্ভ থেকেই উঠে এল শ্রম চেতনা, শ্রমিক আন্দোলনের চেতনা। সরকারের শ্রম আইনগুলির অনেককাংশই ছিল ঔপনিবেশিক শাসকের শ্রম আইনের প্রতিলিপি। এর মধ্যে আছে ওয়ার্কমেন কমপেনসেশন আইন, পেমেন্ট অফ ওয়েজেস আইন, ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপুট আইন, ন্যূনতম বেতন আইন, এমপ্লয়িজ স্টেট ইনস্যুরেন্স অ্যাক্ট, এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড এন্ড (মিসলেনিয়াস) অ্যাক্ট, পেমেন্ট অফ বোনাস অ্যাক্ট, কন্ট্রাক্ট লেবার রেগুলেশন এন্ড এবোলিশন অ্যাক্ট, পেমেন্ট অফ গ্রাচুইটি অ্যাক্ট, ১৯৯৫ সালের এমপ্লয়িজ পেনশন স্কিম সহ বহু আইন। এর সঙ্গে সময়ে সময়ে যুক্ত হয়েছে বামপন্থীদের নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার জন্য অসংখ্য কালাকানুন।
শ্রমিক চেতনার উন্মেষ, সংঘবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রশক্তির অত্যাচার সেদিন নেমে এসেছিল শিল্প-খনি অঞ্চলের শ্রমিক শ্রেণীর উপর। উল্টোদিকে আরো দৃঢ় হচ্ছিল শ্রমিকের ঐক্য। আন্দোলনের জোয়ার এক ঐতিহাসিক স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছিল শিল্প শহরের বুকে। রাণীগঞ্জ থেকে কলকাতা ঐতিহাসিক পদযাত্রা, কুলটি-বার্ণপুরের শ্রমিক ধর্মঘট, চিত্তরঞ্জন সেন-র্যালের শ্রমিক আন্দোলন, দুর্গাপুরের দু-দফার ঐতিহাসিক আগষ্ট আন্দোলন, অসংখ্য শ্রমিকের রক্তাক্ত আত্মত্যাগের শক্তিতে সেদিন কেঁপে উঠেছিল শাসকের ভিত। সেদিন প্রমাদ গনেছিল ভীত শাসকশ্রেণী। তারা আন্দোলনকে দমন করতে শুকিয়ে দিতে শুরু করেছিল উৎসটাকেই। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল নতুন পুঁজির আগমন, কারখানার নবীকরণ, অর্ডারের কৃত্রিম অপ্রতুলতা তৈরি করে সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়েছিল উৎপাদিত পণ্যের বাজার। আর সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের উপর।
বামফ্রন্টের আমলে ভূমি সংস্কারের সাফল্যের উপরে নির্ভর করে বন্ধ কারখানার শ্মশানভূমিতে শিল্পের জোয়ার খানিকটা এল ছোট মাঝারি লোহা ও ইস্পাত কারখানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দুর্গাপুর, রাণীগঞ্জ, আসানসোল, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠলো নতুন কারখানা। স্পঞ্জ আয়রন, টিএমটি বার, ফেরো অ্যালয় কারখানার সঙ্গে গড়ে উঠল পানাগড়-আউসগ্রামের সার কারখানা সহ আরও অনেক ছোট ছোট কারখানা। সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনেও দেখা গেল এক নতুন মোড়। তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকারের কাছে ইনসেনটিভ ও স্বল্পমূল্যে বিদ্যুত সহ আরো অন্যান্য সুবিধা পেয়ে উল্লিখিত স্থানগুলিতে গড়ে উঠল শিল্পগুলি। অবশ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়গুলি অবহেলিত থেকে গেল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দূষণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মানা হল না। তবু স্থানীয় বেকারদের চাকরির প্রশ্ন থাকায় মানুষ নিমরাজি হয়ে দূষণকেও মেনে নিল।
শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি করা হল দুটি শ্রেণী। একটি আট ঘন্টার লেবার আর অপরটি বারো ঘন্টার লেবার। আট ঘন্টার লেবার অধিকাংশই স্থানীয় বেকার যুবক, তারা কোনও না কোনও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। আর আড়কাঠির মাধ্যমে বাইরের রাজ্য থেকে আনা বারো ঘন্টার লেবার। দারিদ্রের কারণে তারা যে কোনও শর্তে কাজ কাজ করতে আসে। তাদের কোনও ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অধিকার নেই। কারখানার ভেতরে বা মালিকের নিজস্ব জায়গায় নিজস্ব লোকের তত্ত্বাবধানে খোঁয়াড়ের মত ব্যারাকে রাখা হল এই সব শ্রমিকদের। অদ্ভুত এটাই যে, ট্রেড ইউনিয়ন ভুক্ত আট ঘন্টার শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে লড়াই করলেও শ্রমিক আন্দোলনের পীঠস্থান এই শিল্পাঞ্চল নীরব, নির্লিপ্ত রইলো বারো ঘন্টার শ্রমিকদের প্রতি। এর সুযোগ নিল ওৎ পেতে থাকা ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা।
শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও উপস্থাপনা করা হল এক অদ্ভুত যুক্তির। যেহেতু বহু প্রচেষ্টায় এই শিল্পাঞ্চলে নতুন শিল্প নিয়ে এসে নতুন করে একটা জোয়ার আনা সম্ভব হয়েছে, সেহেতু শ্রমিকের অধিকার নিয়ে, তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করলেও তা কখনোই সর্বাত্মক করা হবে না, হবে না কোনও জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন। আন্দোলন মূলত হবে আবেদন-নিবেদন ভিত্তিক। এরই সুযোগ নিয়ে কারখানার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ থেকে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ বহাল তবিয়তে চালিয়ে গেল মালিকপক্ষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সময়কালে দুর্গাপুর সিমেন্ট ওয়ার্কসে শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘটের প্রেক্ষিতে তৎকালীন শ্রমমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। তাতে বলা হল আগামীদিনে শ্রমিকরা কারখানার অভ্যন্তরে কোনও বিক্ষোভ করতে পারবেন না। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শহিদ হওয়া আশীষ-জব্বরের দুর্গাপুর, আগষ্ট আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুরের শ্রমিকশ্রেণী এই অপমানজনক শর্ত মেনে নিল বা তাদের মানতে বাধ্য করা হল। আর এখান থেকেই শুরু হয়ে গেল আত্মসমর্পণের ইতিহাস। দুর্বল হতে শুরু করল দুর্গাপুরের শ্রমিক আন্দোলন।
এই পরিস্থিতিতে শ্রম আইন, ন্যূনতম বেতন আইন, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক রেগুলেশন আইন ইত্যাদি আইনগুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মালিকপক্ষ ও রাজ্য-কেন্দ্রীয় সরকারের আধিকারিক ও রাজনৈতিক মুরুব্বিদের যোগসাজসে শ্রমিকদের অধিকার হরণ চলতে থাকল। তার পর গত এক দশকে অধিকার হরণের তীব্রতা বৃদ্ধিতে শ্রমিকদের অস্তিত্ব রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর না করা সত্ত্বেও সেই চুক্তিপত্র বলবৎ করে দেওয়া হয়। চুক্তির ফলে উপকৃত হন সামান্য সংখ্যক শ্রমিক (সর্বোচ্চ মোটামুটি ৩০%)। বাকি ঠিকা শ্রমিক সহ অন্যান্যরা তিমিরেই নিমজ্জিত থাকেন। সেকারণে ‘ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়নস অফ স্মল, মিডিয়াম আয়রন অ্যান্ড স্টীল ইন্ডাস্ট্রিজ, পশ্চিমবঙ্গ’কে এখনও শিল্পমন্ত্রী, চিফ ইন্সপেক্টর অফ ফ্যাক্টরিজ বা জেলাশাসককে বার বার চিঠি লিখে আবেদন জানাতে হয়। মালিকপক্ষ বিভিন্ন ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত, বেতনচুক্তি সহ চুক্তিপত্র নস্যাৎ করে চলে। ইপিএফ অ্যাক্ট, ১৯৫২ এবং ইএসআইসি অ্যাক্ট মালিকপক্ষ মানে না, নিয়োগপত্র, ওয়েজ শ্লিপ বা পে শ্লিপ, পি এফ স্টেটমেন্ট দেয় না বলে অভিযোগ বার বার জানাতে হয়। অভিযোগ জানাতে হয় ১৯৪৮ ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট লঙ্ঘনের। পরিণতিতে মেসার্স বি ডি গোয়েল মেটাল অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ঘুটগোড়িয়া, বড়জোড়া, বাঁকুড়ার ১৪-১৫ জন শ্রমিক গুরুতর আহত হন, ৪ জন মারা যান। শিল্পাঞ্চলে অন্য কারখানাগুলির অবস্থাও প্রায় তাই। সবগুলোই প্রায় জতুগৃহ। মজুরি-দাসত্বের এই ব্যবস্থায় পিষ্ট আজ শ্রমিকেরা। এর থেকে বেরিয়ে আসার দিশা খুঁজে বের করতেই হবে আগামীর শ্রমিক আন্দোলনকে।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.