বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
এ বছরের স্বাধীনতা দিবস স্বাধীনতার এক অন্য অর্থ বহন করে আনল। ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার মধ্যরাত কেমন ছিল জানি না, কিন্তু ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট মধ্যরাত ছিল নারী স্বরাজ চিরস্থায়ী করার আহ্বান। সে দিন বাংলা ছাড়িয়ে ভারতের নানা প্রান্তে মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা নামল মধ্যরাতের দখল নিতে। প্রবাসেও ভারতীয়রা শামিল হলেন প্রতিবাদে।
আরজিকরে এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-হত্যা সকলকে জাগিয়ে দিল। মেয়েরা যত বেশি করে নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে, অর্থনৈতিক ভাবে স্বতন্ত্র হচ্ছে, তত যেন তাদের উপর নৃশংসতার বাড়ছে। হাথরসের মেয়েটির জিভ টেনে ছিঁড়ে নেওয়া হয়, কামদুনিতে মেয়েটির যৌনাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। মেয়েরা যত বেশি করে তাদের উপর ঘটে চলা নির্যাতন নিয়ে মুখর হচ্ছে, থানায় অভিযোগ লেখাচ্ছে, তত বাড়ছে ধর্ষণের পর খুন। মরা মানুষ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কী জবানবন্দি দেবে? চিকিৎসক মেয়েটি ৩৬ ঘণ্টা টানা ডিউটি করে যখন সামান্য বিশ্রাম নিতে গিয়েছে সেমিনার কক্ষে, তখন তাকে ধর্ষণ করা হল। প্রচণ্ড মারে চোখ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।
কিন্তু কেবল আরজিকর কান্ডের বিচার চাইতেই কি মেয়েরা সব চৌরাস্তা দখল করল? ‘মেয়ে হয়ে কেউ জন্মায় না, তাকে মেয়ে করে তোলা হয়’ — এই পথ ধরে যারা বড় হয়েছে, তাদের একজনও কি রয়েছে, যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়নি? নিকট আত্মীয়ের কাছে, নিজের বাড়িতে, রাস্তায়, কলেজে বা কর্মক্ষেত্রে, কেউ কি রয়ে গিয়েছে বাকি? ধর্ষণ হলে প্রথমেই যে সব আঙুল ওঠে মেয়েটির পোশাক, চরিত্রের দিকে, সেই সব উদ্যত আঙুলকে প্রশ্ন করেছে এই রাত। নিজের জীবনে ঘটে-যাওয়া যৌন নিপীড়নের বিচার চাইতে মেয়েরা এসেছিল। উপনিবেশের শৃঙ্খলমুক্তি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে; পিতৃতন্ত্রের শৃঙ্খলে মেয়েরা কুঠারাঘাত করল ২০২৪-এ। ভগত সিংহের কথা বারবার স্মরণে আসছিল সেই রাতে — স্বাধীনতা হাসিল করা প্রথম পদক্ষেপ। আমাদের গড়তে হবে নতুন দেশ, যে দেশে সব বর্গের মানুষের থাকবে সমানাধিকার, যেখানে ধর্মের নাম করে সমাজের বিভাজন থাকবে না, যেখানে মানুষের মধ্যে নিপীড়ক আর নিপীড়িতের সম্পর্ক চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
আমরা আসলে ১৬ ডিসেম্বর ২০১২ থেকে পথ হাঁটছি, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে। সেই সময় আমি স্কুলছাত্রী, আমাদের আবাসন থেকেও মিছিল হয়েছিল দিল্লি গণধর্ষণের বিচার চেয়ে। আন্দোলনের চাপে তৈরি হয়েছে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন। কোথাও কর্মক্ষেত্রে আইন মেনে কমিটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারি তন্ত্র অতিক্রম করে হৃদয়ের মধ্যে জন্ম নিয়েছে — স্বপ্ন নয়, শান্তি তো নয়ই, ভালবাসাও নয় — এক বোধ। আমরা যারা স্কুলছাত্রী ছিলাম নির্ভয়ার ধর্ষণের রাতে, তারা আজ কেউ গবেষক, কেউ চাকুরে। মাথার ভিতরে যে কান্না শুনতে পেয়েছি স্কুলবেলায়, সেই কান্না আরজিকরে বীভৎস ঘটনার পরে কেবল গোঙায়, কোনও ধ্বনি শোনা যায় না।
হাজার আঘাত আসছে এখনই। শাসক দল দাগিয়ে দেওয়ায় চেষ্টা করছে বিরোধী বলে। আমরা দেখেছি, দলের ঝাণ্ডা ছেড়ে যখন জল-জঙ্গল-পাহাড়ের প্রশ্নে রাস্তায় নেমে আসেন আদিবাসী মানুষ, তাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি কোন দল? মাথায় বিষ্ঠার বোঝা বইতে বইতে যখন বহুজন হাতে তুলে নেন সংবিধান, তাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি কোন দল? আমাদেরও প্রশ্ন করা হবে তুমি কোন দলে? সাধারণ নাগরিক সব থেকে বড় জমায়েত করে দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন পরিজন, একজন মেয়ের মা, একজন পিতা হয়ে এই দেশের দখল নেওয়া যায়, রাতভোর। আমরা অরাজনৈতিক নই, আমরা অদলীয় এক বিকল্প। আমজনতা।
অশীতিপর বৃদ্ধা রাস্তা হাঁটছেন মোমবাতি হাতে, ন্যুব্জ, দু’হাত ধরে আছে তার পরিবার, তবু তিনি হাঁটছেন মাতঙ্গিনীর মতো; একটি চার বছরের মেয়ে, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলতে বলতে চলেছে। শতফুলের বিবৃতি। কথা চলছে, ছেলেদের জন্ম থেকেই পরিবার কী শেখাবে। ছেলেদের বলা হয়, ‘মেয়েদের মতো কাঁদিস না, ন্যাকামো করিস না’ — এ সব কথা বলা যাবে না। তুমি মায়ের মতো হতে চাইতেই পারো। বলছেন অতি সাধারণ, কিন্তু স্ব-ক্ষমতায় বলীয়ান মানুষেরা। এই রাত দখল যার সূচনা করেছে, তা কেবল সংঘর্ষ নয়, নির্মাণ। নতুন ভারত নির্মাণ। এ ভারতের এক নতুন স্বর।
এই মন্থন এখানে থামিয়ে দিলে চলবে না। মন্থন হলে অমৃত এবং গরল দুইই উঠবে, হয়তো আরও ক্রূর আঘাত আসবে। কিন্তু আধমরাদের ঘা দিয়ে আমরা, আধমরারাই বাঁচিয়ে তুলেছি। আমরা দাবি করেছি, এই ঘটনায় জড়িত সমস্ত কান টানলে মাথাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে, দাবি করেছি রাতের সময় সুরক্ষিত পরিবহণের, দাবি করেছি কর্মস্থলে সুরক্ষিত বিশ্রাম ঘর এবং ক্রেশের। দাবি করেছি স্কুল পাঠক্রমে লিঙ্গ সাম্যের অধ্যায়। এই শুরুর শেষ আমরা দেখেই ছাড়ব।