বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

লোককথার ভূত ভবিষ্যৎ

লোককথার ভূত ভবিষ্যৎ

অরূপ সেন

photo

সম্প্রতি হাতে এলো কুমার রাণার বই ‘প্রশ্নের লোককথা’ (আর বি এন্টারপ্রাইজেস, কলকাতা, ২০২২)। বইয়ের গোড়াতেই লেখক তাঁর অনুসন্ধানের গতিপথ চিনিয়ে দিয়েছেন, “গল্প বললে গল্প, সত্যি বললে সত্যি। এক গেরস্ত পৃথিবীর যত প্রশ্ন আছে সেগুলোকে একটা ঘরে আটকে রেখেছিল। প্রশ্ন বড় উৎপেতে জিনিস, এটা কেন, ওটা কেন নয়, ওটা কীভাবে হবে, এটা কীভাবে না-হবে, এইসব সাত-সতেরো হ্যাঙ্গাম। এতে গেরস্তের খুব ঝামিলি।” লেখক পাঠককে মধ্যবিত্ত আত্মতৃপ্ত জগৎ থেকে প্রশ্নতোলার জগতে নিয়ে আসতে চেয়েছেন।
এই বই এক অর্থে স্বাধীন ভারতের স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস। সেই প্রসঙ্গে এসেছে গান্ধী, নেহরু, আম্বেদকার এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনার কথা। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি সবই এসেছে আলোচনার বৃত্তে। আমজনতার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সূত্রে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান লেখক পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
সাধারণ মানুষের কাণ্ডজ্ঞান থেকে যে অনেক কিছু শেখার আছে, এই জীবনদর্শন বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ ঢেনা মান্ডি লেখকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘দিল্লিটা কোনখানে?’ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লেখক পড়েছিল মহা ‘ঝামিলি’তে। “ঢেনা মান্ডির প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কীভাবে বলি কত দূর? মাইল-কিলোমিটারের হিসাব ঢেনার জানা নেই। ওর বেশির ভাগ হিসাব হাঁটাপথে, কদাচ বাসে - যখন দুমকা জেলায় তার গ্রাম থেকে বর্ধমান যায় মজুরি খাটতে। বললাম, হেঁটে গেলে, তা ধরো চল্লিশদিন লাগবে।” লেখক যখন তাকে ম্যাপ খুলে ভারতবর্ষের ভৌগলিক অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন প্রশ্নকর্তা যা বলে ও করে তা শুনে পাঠক চমকে উঠবেন। সে বলে: “আমি তো ভারত দেশের কথা শুধু শুনেছি, দেখেছি তো আমার এই দেশটুকু, আমার গ্রাম, তার চারপাশে আরো কিছু গ্রাম, রামপুরহাট-সিউড়ি-বর্ধমান, ব্যস! লেখাপড়া জানা লোকেদের ক্ষমতাই আলাদা, দ্যাখো এত বড় দেশটাকে এইটুকু একটা নকশার মধ্যে পুরে দিয়েছে!” বলেই সে হাসতে থাকে। এই প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য পাঠককে বড় এক দার্শনিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়: “তার হাসিতে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ছিল না, প্রকৃতই সে লেখাপড়া জানা লোকেদের কৃতিত্বে আশ্চর্য; এবং, এটাও ঠিক, কেউই এটা মনে করবে না যে, মানচিত্র আদতে বৃহৎকে ক্ষুদ্রে পরিণত করে। কিন্তু, প্রশস্ত ব্যাপারকে সংকীর্ণ করে তুলতে যে আমাদের জুড়ি নেই তা তো স্পষ্ট প্রমাণিত।”
বইয়ের ‘আদিবাসী ভারত’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন: “সভ্যতার নির্মাণে এরকম অনেক মৌলিক সম্পদ আদিবাসীদের আছে, যা অন্যদের দিতে তাঁদের কুন্ঠা নেই, অসহযোগ নেই। এমন আর এক উপাদান হল, প্রত্যেকের কথা শোনা, প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া।...পারিবারিক স্তর থেকেই শুরু: বাড়ির ছোট বাচ্চাটাও যদি কিছু বলতে চায়, সেটা শুনতে হবে।...আবার গ্রামের সভায় উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কথা শুনতে হবে। আমি এমন অনেক মিটিংয়ের সাক্ষী থেকেছি, যেখানে লোকের কথা শুনে ঐক্যমতে পৌঁছানোর জন্যই সে মিটিংগুলো তিনরাত চাররাত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সবসময় সব ব্যাপারে চূড়ান্ত ঐক্যমত যদি সম্ভব না-ও হয়, সেই লক্ষ্য অর্জন করার চেষ্টা করাটা জরুরি।”
লেখক স্মরণ করেছেন তাঁর আদিবাসী গ্রাম-ঠাকুরদার কথা: “তিনি আমার গ্রাম ঠাকুরদা, চানা মুর্মু, আমার গড়ম-বা। সব কথাতেই তাঁর কাঁধ দুলিয়ে দুলিয়ে হাসি, কিংবা বিস্ময়, অথবা আশ্বাস। সেই প্রথম তাঁকে আতঙ্কিত হতে দেখলাম। অর্ধ শতাব্দী আগে, ইস্কুলে বা অন্য কোথাও শুনলাম মানুষ চাঁদে পা দিয়েছে। সদ্য জানা তথ্যটা তাঁকে তৎক্ষণাৎ জানানো চাই। কথাটা জানানো মাত্র তাঁর উজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণ মুখটাতে যেন কেউ ছাই ঘষে দিয়ে গেল। কিছুক্ষণের স্তব্ধতা, তারপর প্রায় অস্ফুটে বললেন, ‘সেকি কথা! মানুষ চাঁদের গায়ে পা দিল! সর্বনাশ, আর রক্ষা নেই!’ কুমার লিখছেন: “কল্পনা করার চেষ্টা করি, আজ ছয় দশক পর, যখন অনর্থটা একেবারে ঘাড়ের উপর, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ‘ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’, তখন আমার সেই গড়ম-বা বেঁচে থাকলে কী বলতেন! ...”
এই বই তত্ত্বচর্চার বই নয়। তবে বইটি পাঠ করতে গিয়ে তত্ত্বসন্ধানী পাঠকের মনে পড়বে মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির কথা। গ্রামশি তাঁর লেখাপত্রে সাধারণ মানুষের কান্ডজ্ঞান থেকে রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
আজীবন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী কুমার রাণা পরিণত বয়সে ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্বে গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন পাঠককে। এই বই পাঠ করে পাঠক যে সমৃদ্ধ হবেন।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.