বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ মে, ২০২২— বেলা একটা-দেড়টা হবে। বৈশাখী আকাশ যেন আগুন ঝরাচ্ছে। বেলা বাড়তেই রাস্তাঘাট সুনসান। শেষ বাড়ির কাজ শেষ করে বিশাখা মেন গেটের ছিটকানি কোনওরকমে তুলে রাস্তায় নেমে পড়ে। হনহন করে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। ভিজে আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে আকাশের দিকে তাকায় সে। রোদের তাপ দেখে বুঝতে পারে আজও তার বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে রান্না সেরে ছেলেটাকে স্কুল থেকে আনতে যেতে হবে। পা আরো দ্রুত চালায়। সে আর হাঁটে না। ছোটে। বাজারের ভেতর দিয়ে তার বস্তিতে যেতে হয়। কিছুটা দূর যাওয়ার পর বাজারের মধ্যেই সে থমকে দাঁড়ায়। বাজারের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিরা মালপত্র গোছাচ্ছে ধীরে সুস্থে। দু’চার জন ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেওয়ারিশ কুকুরের দল কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে গুমটির ছায়ায়। একজন সবজিওয়ালা অবিক্রিত ভাঙাচোরা সবজিগুলো চটের মধ্যে ভরে ফেলে দিচ্ছে বাজারের এক কোনায়। বিশাখার দৃষ্টি সে দিকে নিবদ্ধ। চটের ভেতর থেকে মাটিতে পড়া পচা কুমড়ো, পাকা ঝিঙে, ভাঙা পটল, শাকপাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফেলে দেওয়া আনাজগুলো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। কুড়িয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে বাড়িতে। পচা অংশটুকু বাদ দিয়ে রান্না করলে বেশ একটা তরকারি হয়ে যাবে। ছেলেমেয়ে দুটোর পাতে একটু সবজি তুলে দিতে পারবে অনেক দিন পর। শীতের পরশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই সবজির দর আগুন হয়ে ওঠেছে। গরম পরার পর থেকেই কোনও সবজিই সে কিনতে পারে নি। আলুই একমাত্র ভরসা। তাও পঁচিশ টাকা কিলো। তাই মাটিতে সবজি পড়ে থাকতে দেখে ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু তার মানসম্মান আছে তো। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেলেও প্রখর আত্মসন্মান বোধ তার। হাজার টানাটানিতেও কারো কাছে হাত সে পাতে না। আর আজ বাজার থেকে সবজি কুড়িয়ে নিয়ে যাবে! তা সে পারবে না। অগত্যা বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
বিশাখা মন্ডল। বয়স তিরিশ-বত্রিশ হবে। দুই সন্তানের মা। গ্রামের বাড়ি রায়দিঘি। কলকাতায় এসেছে বছর সাতেক আগে পাড়ার বিন্দি পিসির হাত ধরে। বাবুদের বাড়িতে গতর খাটিয়ে খায়। সাত আটটা বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। বাসন মাজে, ঘর মোছে, কাপড় কাচে। কোনও কোনও বাড়িতে ধুলো ঝাড়ার কাজ করে। বাড়ির মালকিনের মুখে ডাস্টিং শুনে বিশাখাও ধুলো ঝাড়ার বদলে ডাস্টিং বলে। দু’বেলা হাড় ভাঙা খাটুনির পর মাসের শেষে বিশাখার হাতে আসে নয় হাজারের মতো। করোনার কারণে দুটো বাড়ির কাজ না হারালে দশের বেশি রোজগার হতো তার। ছেলেমেয়ের মুখে তখন সবজি ছাড়া সপ্তাহে দু’একবার পোলট্রির মাংস তুলে দিতে পারতো। এখন মাংস দুরস্ত। দু’বেলা ডাল ভাত আর কালেভদ্রে ডিম জোগাড় করতে হিমসিম খাচ্ছে। ঘর ভাড়াতেই তো চলে যায় আড়াই হাজার টাকা। মুদিখানার জিনিস কিনতে লাগে হাজার দেড়েকের মত। গ্যাসের জন্য যায় হাজার টাকা। যদিও তার একটা গ্যাসে দু’মাস চলে যায়। বিদ্যুতের বিল মেটাতে লাগে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে সাতশো টাকা। মোবাইল ফোনে দু’শো টাকা না ভরালেই নয়। কাজের বাড়ি থেকে ফোন আসে। মাঝেমধ্যে ফোনও করতে হয়। কেবল লাইনের জন্য দিতে হয় আড়াইশো। ছেলেমেয়ের টিউশনি আর খাতা কলমের জন্য হাজারের মতো তো মাসে রাখতেই হয়। বাকি আর কতটুকুই বা থাকে। তাই দিয়ে মাছ মাংস তো কেনা সম্ভব হয় না। সারা মাস ডিম দিয়ে চালিয়ে দিতে হয়। তাও ডিমের দাম যে হারে বেড়েছে, ক’দিন বাদে তাও বাদ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে তাতে মাসে প্রায় দু’হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। অথচ সেই হারে রোজগার কিছুই বাড়েনি। মাইনে বাড়ানোর কথা বললে কাজের বাড়ির বৌদির সাফ কথা, এবছর আর বাড়াতে পারব না। সামনের বছর দেখা যাবে। ফলে সারাদিন গতরের ঘাম ঝড়িয়ে যেটুকু রোজগার করে তা দিয়ে এই চড়া বাজারে দু’বেলা দু’মুঠো ডাল ভাত জোটানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে বিশাখার। আগে মাসের মধ্যে বাচ্চাদের মুখে যেটুকু মাছ, মাংস তুলে দিতে পারতো আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির বাজারে তা আর পারে না।
পরিমল দাস। চিংড়িঘাটা-শিয়ালদহ রুটে আটো চালান। নিজের নয়, ভাড়ার গাড়ি। মালিককে দিতে হয় দিনে চারশো। গ্যাসের খরচ নিজের। এখন লিটার প্রতি গ্যাসের দাম সত্তর টাকা। সারাদিন গাড়ি চলালে সাত-আট লিটার গ্যাস লাগে। দিনে সাত লিটার লাগলে গ্যাসের খরচ চারশো উনপঞ্চাশ টাকা। কাটা গ্যাসের দাম একটু বেশি। লিটার প্রতি বিরাশি টাকা। তবে ভারি গ্যাস হওয়ায় মাইলেজ বেশি পাওয়া যায়। সব কিছু মিটিয়ে পরিদার দিনের শেষে বাড়ি নিয়ে যায় তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকা। সপ্তাহে পাঁচ দিন গাড়ি চালানোর সুযোগ মেল। দু’দিন ছুটি বাধ্যতামূলক। কুড়ি দিন কাজ করে মাসে ঘরে আনতে পারে সর্বসাকুল্যে সাত হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা। গ্যাসের দাম হুহু করে বাড়ছে। গত মাসে এক লাফে দশ টাকা বেড়েছে। অথচ ভাড়া বাড়ানোর কোনও উপায় নেই। সরকার চাইছে না। ভাড়া বাড়ালে যাত্রী পাওয়া মুসকিল হয়ে যাবে। পরিদার পরিবারে পাঁচজন সদস্য। বাড়ি ভাড়া লাগে না। নয়াবাদে খাস জমি কিনে একটা দু’চালা ঘর বানিয়েছে অনেক কষ্টে। তবে স্ত্রীর নার্ভের রোগ আছে। মাসে হাজার খানেক টাকার ওষুধ লাগে। হাজার দেড়েক টাকা চলে যায় মুদির জিনিস কিনতে। বিদ্যুৎ বিল পাঁচ-ছশো। আনাচের যা দাম সারা মাসে হাজার দেড়েকের কম হয় না। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য লাগে হাজার দুয়েক। কেবল-মোবাইল মিলিয়ে আট-নয়শো তো লাগেই। অন্যান্য খরচের জন্য এক হাজার রাখতেই হয়। মাছ, মাংসে প্রায় হাত দিতেই পারে না। আগে সপ্তাহে একবার পোলট্রির মাংস বাড়িতে আসতো। এখন কাটছাট করতে হয়েছে। পনেরো দিনে একবার হয়। মাঝেমধ্যে কাটাপোনা আনতে পারেন। মাসিক খরচ প্রায় দু-আড়াই হাজার টাকা বেড়ে গেছে। জিনিসপত্রের দাম রোজ রোজ বেড়ে চলেছে, সংসার চালানোই দায় হয়ে উঠেছে।
শুধু বিশাখা বা পরিমল নয়, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে এই চড়া বাজারে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা ভয়ঙ্কর কঠিন হয়ে পড়েছে। হিমসিম খেতে হচ্ছে দু'বেলা ডালভাত জোগাড় করতে। মূল্যবৃদ্ধির দাপট কতটা তীব্র তা কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান দেখলে কিছুটা অনুমান করা যায়। মার্চ মাসের হিসাব বলছে দেশে শুধু খুচরো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৯৫ শতাংশ। বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৮.০৬ শতাংশ। আনাজের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.৮৮ শতাংশ। জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৩৪.৫২ শতাংশ। সবচেয়ে চোখ রাঙাচ্ছে অশোধিত তেল— মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৮৩.৫৬ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরো বাজারে। লাফিয়ে লাফিয়ে সূচক বাড়ছে। এমতাবস্থায় খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।