বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

ভোট শেষ হলেই এক একটি গ্রাম হয়ে ওঠে অবজ্ঞার বিজ্ঞাপন

ভোট শেষ হলেই এক একটি গ্রাম হয়ে ওঠে অবজ্ঞার বিজ্ঞাপন

সন্দীপন নন্দী

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১ অক্টোবর, ২০২১— কল আছে জল নেই। একটি সরল বাক্য। অথচ এ শব্দমালাতেই লুকোচুরি খেলে কত জটিলতা। সে খোঁজ রাখেন কত জন? যারা অভিযোগ জানাতে পারতো, তাদের সে বোধই নেই। তাই বাধ্য হয়েই এক কিলোমিটার দূরে ধানখেতের সাবমার্শালেই ওদের খালি জলের বোতলগুলো ভরে উঠতো একে একে। কখনো তা না পেয়ে পুকুরের জমা জল খেতেই বাধ্য হতো। বাধ্য শিশু। কথাতে ছিল, কাজেও করে দেখালো এবার। কিন্তু কেউ শোনেনি। কেউ দেখেনি। কারণ ওদের তো ভোটই নেই। তাই অভিযোগগুলো দাবি হয়ে উঠতে পারেনি। এখন তৎপরতা তুঙ্গে। কেননা কদিন পরেই এ প্রাথমিক স্কুলে ভোট হবে। কত মানুষ আসবেন। ভিড় হবে। তাদের তৃষ্ণা মেটাতে তাই ব্লক অফিসে সই করার আগেই আজ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব স্বচক্ষে দেখতে এসেছেন জলের বেহাল দশা। জন্মলগ্ন থেকেই খরাপ্রবণ এক বিস্তীর্ণ গ্রামে, চারশো শিশুর পিপাসা মেটানোর একমাত্র উৎসের দীর্ঘ বিকলাঙ্গ রোগ সেরে উঠল মাত্র কয়েক ঘন্টায়। কারণ এ জলেই স্নান করবেন প্রিজাইডিং অফিসার, ভাত খেয়ে মুখ ধোবেন আধা সামরিক বাহিনীর জোয়ান। ভোট শেষে হাত পরিস্কার করবেন কোনও সচেতন ভোটার। তাই এই চত্বরে ভোটের দিন জল না হলেই নয়। খুব দরকার জলের। সেজন্য এই তলব। শিশুদের জল ছাড়া চলবে? এদ্দিন তো চলেছে। কচিপায়ে হেঁটে হেঁটে ঐ দূরে গিয়েছে জলের সন্ধানে। কিন্তু ভরা চৈত্রে সামান্য একটু জলের জন্য ভোটাররা অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলে তো ঘোর বিপদ। কারণ পোস্টার পড়েছে, একটি ভোটও অমূল্য। সেখানে ভোটারদের তোয়াজ করাটাও যে এক সাংবিধানিক দায়ভার। বিভাজনের দায়ভারও বলা যায়। তাই কোনও উৎসবের আগে আমরা যেমন ঘরের ঝুলমাখা কোন সাফসুতরো করি, লজঝড়ে দেওয়ালে দিই চুনকাম তেমনি অনেক অসম্ভবকে নিমেষে সম্ভব করে দেয় এই গণতান্ত্রিক উৎসবের মরসুম। আজন্ম মোমলন্ঠনে থাকা অন্ধকার গ্রাম, ভোট বয়কটের হুমকিতে পেয়ে যায় বিজলিবাতির পোল। রাস্তা কেটে ধানগাছ উপড়ে গড়ে ওঠে সিমেন্টের রাস্তা। এ যেন এক দেবো আর নেবোর পলিসি। সারা বছরের আন্দোলন, বিক্ষোভে যে সমস্যার সুরাহা মেলে না, সেই সবেরই একটা ফর্দ বানিয়ে দিকে দিকে বহু মানুষ অপেক্ষা করেন। ভোট এলেই সে মাহেন্দ্রক্ষণে চলে ঝোপ বুঝে কোপের নীতি। এও এক বাধ্যবাধকতা। এক যথার্থ সুযোগের সৎব্যবহার। দেওয়ালে পিঠঠেকা মানুষের শেষ হাতিয়ার এই ভোটের মরসুম। চাষি অপেক্ষা করে বর্ষণের।আর বঞ্চিত মানুষ তাকিয়ে থাকে ভোটের ক্যালেন্ডারে।

তবু কিচ্ছু বদলায়না। ভোট পেরোলেই রাজবাস খুলে একটি গ্রাম হয়ে ওঠে অবজ্ঞার বিজ্ঞাপন। বুথগুলো হয়ে যায় দশমীর ভাঙা মন্ডপ। ভোটের অতিথিরা ঘরে ফেরেন। একা পড়ে থাকে মানুষের চিৎকার, দাবিদাওয়া। আসলে "না চাহিলে যারে পাওয়া যায়" এ অসম্ভব। তাই "তারি লাগি যত ফেলেছি অশ্রু জল"। এক প্রতিবন্ধী ছাত্রীর বাবা রোজ কোলে করে ক্লাসরুমে তাকে বসিয়ে যান এই স্কুলে। বছরের ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড তার কাছে তাই আর আলাদা কিছু নয়। ছুটির পরেও কোলে করে বাড়ি নিয়ে যান। কারণ এ স্কুলে কোন র্যাম্প নেইই। নেই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের যাতায়াতের পৃথক করিডর। প্রশ্ন করায়, উত্তর এসেছিল, একটা পা নিয়ে বাড়ির পাশের স্কুলে পড়তে পারছে, এই অনেক। আর কী চাস? ছাত্রীর বাবা আর কথা বাড়াননি। সত্যিই তো এরপর কিছু চাওয়া মানেই অন্যায়। অথচ এই স্কুলেই বুথ বসবে বলে রাতারাতি প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, অন্ধ ভোটারদের জন্য পাথর, বালি, সিমেন্টে তৈরি হল র্যাম্প। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে। গর্ত বেরিয়ে আসা বিপজ্জনক মেঝের সংস্কার হল লহমায়। পাছে কোনও ভোটারের পদস্খলন হয়। ক্লাস ফোরের জানলার পাশে বিষাক্ত পার্থেনিয়ামের ঘনবন উধাও হল যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। বহুদিনের অস্বাস্থ্যকর স্কুলের টয়লেট হয়ে উঠল ঝকঝকে। বাথরুমের হোল্ডারে দশ বছরে এই প্রথম ঝুলে থাকল পাওয়ারফুল একটি বাল্ব। এখানে পোকামাকড়ের বড্ড ভয় তাই। শিশুদের অসুখ আর ভোটারের অসুখে তো বিস্তর ফারাক। তাই এই আয়োজনের তোড়জোড়। আসলে স্কুলটা বুথে বদলে গেলেই দায়িত্ব বেড়ে যায় একশো গুণ। করোনার আবহে ভোটারদের সুখস্বাচ্ছন্দ্য দিতেই হবে। নইলে গণতন্ত্রের মহোৎসবে তিনি উৎসাহী হবেন কি করে? সকাল সকাল ঝুঁকি নিয়ে বাইরে এসে ভোটটা দেবেন কেন? আর প্রশাসন ভোটারদের প্রতি দয়াপরবশ, এ বার্তা পৌঁছনোও ভীষণ জরুরি।

তাই বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা উন্নয়নের জগদ্দল পাথর সরিয়ে দেয় ভোটকাল। মতদানের নাগরিক মেলায় উন্নয়ন চারদিকে নাগোরদোলার মত ঘুরতে থাকে। ফলে অবাক জলপানের ব্যবস্থা থেকে বৈদ্যুতিক আলো। ভেঙে পড়া হেলথ সেন্টারে জেনারেটর জ্বেলে রাতের ছাদ ঢালাই থেকে বড় রাস্তার সাথে যোগাযোগের একফালি ইটসোলিং রাস্তা। সব ম্যাজিকের মতো হয়ে যায়। যেন জাদুকরের লংমার্চ চলতে থাকে এক ভুবনডাঙার মাঠে। প্রগতির সুনামি আসে। তবে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করা মানা। এই ছিল উন্নয়নের শর্ত। সরল গ্রামের মানুষ তাই মেনে নিয়েছিলেন সেদিন।

আসলে গ্রামের লোকজন আজও অল্পতেই খুশি। একটা মার্ক টু টিউবয়েল, একটা সাকুল্যের হেলথ সেন্টার, মাথার ওপর এক টুকরো ছাদ, আর দু’বেলার ভরপেট খাবার। এর বাইরে কিচ্ছুটি চায়নি তারা। বরং তাদেরকে বিভিন্ন দল,এ টা হবে ওটা হবের আলেয়ায় বছরভর ঘুরিয়েছেন। কিন্তু গাঁয়ের মানুষ এসব কোনওদিন চাননি। বরং তারা তাদের নৈমিত্তিক তিমির যাপনকেই একবিংশের উন্নয়ন বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। জাল যার জলা তার, হাল যার জমি তারেই অটুট ছিলেন। অথচ যেটুকু ছিল দেরাজের সম্বলসুখ, সেটুকুও মিথ্যে আশ্বাসে কেড়ে নিলেন নেতারা। তাই একশো বছর আগেও গঞ্জের সনাতন মিদ্যা, বাসব মোহন্ত, স্বপ্না দলুইদের রিকুয়ারমেন্ট যা ছিল। আজও তাই আছে। একপাক গ্রাম ঘুরলেই স্পষ্ট হয় সেকথা। আর মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় উঠে আসে পরাভবের লেখচিত্র, অনটনের বারোমাস্যা। যেখানে পরিশুদ্ধ জল খাবার নেই, রেশন আনতে পেরোতে হয় পাঁচ কিলোমিটার পথ, মরনাপন্ন কাছের মানুষকেও দূরত্বের জন্য সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়া যায় না চিকিৎসকের কাছে।

সেকারণেই ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পরও আঁধার কাটেনি। সেই ভোটের আগে পুরনো পন্থার দর কষাকষিতেই ভরসা রেখেছেন বিজনবাড়ি থেকে বোয়ালদাড় কিংবা চকচন্দন থেকে হলদিডাঙার মানুষজন।

আসছে দিনে স্ট্রংরুমে ইভিএমের নিরাপত্তা মহিলাদের নিরাপত্তার চেয়েও দামি হবে। সূঁচও গলতে দেবেনা কেউ। তাই ভোট যেখানে লকারের স্বর্ণালঙ্কার সেখানে বাকি সব পাখিরবের মতই তো গুরুত্বহীন। মূল্যহীন কানাকড়ি। প্রমাণ মেলে প্রতিদিন। প্রতিরাত। কিন্তু কামদুনি, হাথরস, হায়দ্রাবাদে এ তৎপরতার একসিকিও দেখতে পেলে সেই মুখগুলো হয়তো শান্তি পেত। মরেও মেয়েদের মুখে হাসি ফুটত। আসলে আমরা যা করি, সবই তো নিজেদের জন্য। দেশের জন্য, দশের জন্য কিচ্ছুটি করি না। কিসসু না। শুধু দেশের নাম দিয়ে চালিয়ে যাই আজীবন। কোনও নামি কোম্পানীর নাম, যেভাবে লেখা থাকে জলের বোতলের গায়ে। ঠিক সে ভাবে। যে দেশে জল কিনে খেতে হয়, সেখানে সব ন্যাচারাল। সব।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.