বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার উপর অভিভাবক-ছাত্রদের অনাস্থা

স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার উপর অভিভাবক-ছাত্রদের অনাস্থা

সীমান্ত গুহঠাকুরতা

photo

শ্রমজীবী ভাষা, ১৬ মে, ২০২২— গ্রাম-পতনের শব্দের মত প্রতিষ্ঠান ভাঙনের শব্দ পাই আজকাল, শ্রেণীকক্ষে পা রাখলেই। আশঙ্কায় শিরদাঁড়া বেয়ে হিম স্রোত নেমে যায় মাঝে মাঝে।
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইদানীং এক সার্বিক অনাস্থা গড়ে উঠতে দেখছি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মানসিকতায়। এমনিতে অনুপস্থিতি-জনিত একটা সমস্যা আমাদের সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলগুলোতে বরাবরই ছিল। সচরাচর নিম্ন-মধ্যবিত্ত অথবা দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাই এসব স্কুলে পড়তে আসে কিনা, পড়াশুনার পাশাপাশি এই সমস্ত ছাত্রছাত্রীর কিছু অন্যতর দায়বদ্ধতা থাকেই। ছেলেরা অনেকেই এদিক-ওদিক কিছু কাজেকর্ম জুটিয়ে নেয়, নিজের হাতখরচ বা সংসারের আর্থিক সমস্যার কিছু সুরাহা করার জন্য। মেয়েরা গৃহস্থালীর কাজে হাত লাগায়। মনে পড়ে একবার স্কুলে দেরিতে আসার কারণ জানতে চাওয়ায় একটি ছাত্র মাথা নীচু করে চুলে আটকে থাকা খড়ের কুচিগুলো দেখিয়েছিল। তখন ধানকাটার মরসুম, ধানের বোঝা মাঠ থেকে মাথায় করে গোলায় পৌঁছে দেবার কাজ করছিল সে। পরিবারের কিশোর ছেলেটি এই কাজটুকু করে দিলে একজন দিনমজুরের খরচ বাঁচে। আবার ক্লাস সেভেনের এমন ছাত্রীকেও পেয়েছি, যার বাবা-মা দুজনেই কর্মসূত্রে তামিলনাড়ুতে থিতু। বাড়িতে শয্যাশায়ী বৃদ্ধা ঠাকুরমা আর ক্লাস ফোরের পড়ুয়া ভাইয়ের জন্য রান্নাবান্না করে তবে সে স্কুলে আসে। এসব সামলে-সুমলে ওরা যতদূর সম্ভব পড়াশুনা চালিয়ে যায়। ফলে ওদের নিয়মিত স্কুলে আসা সম্ভব হয় না, গড়ে সপ্তাহে দু-তিনদিন এদের কামাই লেগেই থাকে। তারপর নিতান্ত অসম্ভব হলে হাল ছেড়ে গিয়ে পুরোদস্তুর কাজেকর্মে লেগে যায়। মেয়েদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে যায়।
একজন সামান্য শিক্ষক হিসেবে সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থাটিকে বদলে ফেলার সামর্থ্য তো আর আমাদের নেই, তাই অনেক কিছুকে নীরবে মেনে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। তবু প্রতি বছর প্রত্যেকটা শ্রেণীতেই আমরা এমন একদল ছাত্রছাত্রীকে পেয়ে যাই, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যারা নিয়মিত স্কুলে আসতে সচেষ্ট, তথাকথিত মেধাবী না হলেও তারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি তাদের আনুগত্য অটুট থাকে এবং মেধার অভাবটুকু তারা পরিশ্রম দিয়ে পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করে।
এই যে ওপরে দু’ রকমের শিক্ষার্থীদের কথা বলা হল, এদের কারোর কথাবার্তাতেই কিন্তু এতদিন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে প্রতি অনাস্থা চোখে পড়েনি। তাদের অভিভাবকদের আচরণেও নয়। কিন্তু ইদানীং দেখতে পাচ্ছি, পরিস্থিতি বদলে গেছে। অতিমারি-জনিত দীর্ঘ ছুটি স্কুলছুটের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। দু’ বছর পর স্কুল খুলল যখন, দেখা গেল সমস্ত শ্রেণীতেই নিয়মিত অনুপস্থিত বেশ ভাল সংখ্যক পড়ুয়া। সকলের বাড়ি যাওয়া নিতান্তই অসম্ভব, তাই শুধুমাত্র মাধ্যমিকের ফর্ম ফিল-আপের সময় যারা অনুপস্থিত রইল, তালিকা হাতে তাদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া হল। দেখা গেল, ছেলেদের বেশিরভাগই পরিযায়ী শ্রমিকের তালিকায় নাম লিখিয়ে ইতিমধ্যেই পরবাসী, মেয়েদের অধিকাংশেরই বিয়ে হয়ে গেছে। নিজেদের বাড়িতে রয়েছে যারা, তাদের সকলেরই স্কুলে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট অনীহা। তীব্র আপত্তি অভিভাবকদেরও। বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ানো মাস্টারমশাইয়ের উদ্দেশ্যে তারা অনেকেই রূঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘কী হবে স্কুলে পাঠিয়ে, আবার তো করোনা বাড়বে, আর সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। এভাবে পড়াশুনা হয় নাকি?’ মাস্টারমশাইদের কাছে এর কোনও জুতসই জবাব ছিল না। মাথা নীচু করে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা।
দুশ্চিন্তা বাড়ল, যখন দেখা গেল স্কুলের প্রতি এই ভরসা-হীনতা সঞ্চারিত হয়েছে সেই মেধাবী এবং নিয়মিত স্কুলে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও। কোভিড-উত্তর পর্বে দেখছি, ওদেরও অনুপস্থিতি বাড়ছে। কারণ জিজ্ঞাসা করায় ওরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, ‘দুপুরে প্রাইভেট পড়া থাকে স্যর।’ আগে প্রাইভেট টিউটররা পড়াতেন সকালে বা সন্ধ্যায়, স্কুলের সময়টা বাঁচিয়ে। কোভিডের দীর্ঘ ছুটি সেই সময়সূচিকেও ঘেঁটে দিয়েছে। ছেলেমেয়েরাও তাই স্কুল এবং প্রাইভেট টিউশনের মধ্যে দ্বিতীয়টিকে বেছে নিচ্ছে। উপায়ান্তর না দেখে অভিভাবক-সভায় প্রসঙ্গটি তোলা হয়েছিল। পঠনপাঠনের প্রশ্নে বিদ্যালয়ই যে মুখ্য এবং প্রাইভেট টিউশনের ভূমিকা নিতান্তই সহায়কের – উপস্থিত অভিভাবকদের সেকথা বোঝানোর চেষ্টা হতেই প্রতিবাদ উঠে এল অভিভাবকদের মধ্যে থেকে, ‘বছরে ক’দিন স্কুল হয়, যে স্কুলের সময় বাদ দিয়ে প্রাইভেট মাস্টারমশাইকে পড়াতে বলব?’
রাজস্থানের কোটা শহরটি আইআইটি, জয়েন্ট এন্ট্রাস ইত্যাদি পরীক্ষার কোচিং-এর জন্য বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী সেখানে পড়তে আসে। প্রচুর টাকার বিনিময়ে নামী-দামী কোচিং সেন্টারে তারা টিউশন নেয়, কিন্তু তাদের সকলকেই স্থানীয় কোনও স্কুলে অ্যাডমিশন নিয়ে রাখতে হয়। সেই স্কুলে তারা হয়তো ন’ মাসে ছ’ মাসে এক-আধদিন গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসে। স্কুল-কর্তৃপক্ষও সবই জানে, সবই বোঝে। তাই সেখানেও তাদের কেউ কিছু বলে না। আমাদের রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর ভূমিকাও কি তবে আস্তে আস্তে সেই রকমই হয়ে যাচ্ছে?
এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীর সঙ্গে। তিনিও গভীর আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘একটা ব্যবস্থা বা একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনেক সময় এবং বহু মানুষের কায়িক এবং মানসিক শ্রম লাগে। শিক্ষা-ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য-পরিসেবা, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা – এগুলো কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই বহু শতাব্দীর মনীষীর কাজ। কিন্তু এগুলোকে ভেঙে দিতে বেশি সময় বা লোকবল কোনওটাই লাগে না। এমনকী কোনও ব্যক্তিবিশেষের একক প্রচেষ্টাতেও অনেক সময় এরকম এক-একটা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বসে পড়েছে – ইতিহাসে এমন একাধিক নজির আছে’।
ইতিহাসের তেমনই একটা সন্ধিক্ষণে সম্ভবত আমরাও দাঁড়িয়ে আছি। যাবতীয় রাষ্ট্রীয় সিস্টেমকে একেবারে ভিতর থেকে অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। পরিষেবা-গ্রহণকারীর মনে ব্যবস্থাটির প্রতি অনাস্থা তৈরিটাই তার প্রথম ধাপ। ঠিক যেভাবে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচার চালিয়ে একসময় মানুষের মনে এই ধারণাকে বদ্ধমূল করে দেওয়া হয়েছিল যে সরকারি হাসপাতালে ভাল চিকিৎসা পাওয়া যায় না কিংবা সরকারি টেলি-ব্যবস্থাতেও ভাল পরিসেবা মেলে না, অবিকল সেই পদ্ধতিতেই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাসকে টলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই লেখাটি যখন লিখছি, পয়তাল্লিশ দিনের প্রলম্বিত গ্রীষ্মের ছুটির দশদিন অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে কয়েকদিন ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়াও অনেকটায় সহনীয় হয়ে গেছে। কিন্তু ছুটি প্রত্যাহারের কোনও রকম সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। এরপরও আমরা আমাদের অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের কাছে কীভাবে আস্থা ও বিশ্বাস দাবি করতে পারি? উত্তর আছে কি আমাদের শিক্ষা-নিয়ামকদের কাছে?

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.