বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

গণতন্ত্র এবং রামা কৈবর্ত্য ও হাসিম শেখ

গণতন্ত্র এবং রামা কৈবর্ত্য ও হাসিম শেখ

সৌম্য শাহীন

photo

একমাসব্যাপী রাজসূয় যজ্ঞ সমাপ্ত, গণতন্ত্রের প্রধান উৎসব-শেষে বামপন্থীদের হাতে রইলো পেন্সিল। অন্তত আসন সংখ্যার দিকে তাকালে সেটাই মনে হওয়াই স্বাভাবিক। গত ৭৫ বছরে এই প্রথম বাম প্রতিনিধি ছাড়া আইনসভা গঠিত হলো বাংলায়। শুধু তাই নয়, প্রায় নব্বই শতাংশ ভোট ভাগ হয়ে গেছে দক্ষিণপন্থী এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে। একথা সত্যি যে ফ্যাসিস্ট বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতা দখল করতে না পারায় প্রগতিশীল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কিন্তু একটা বিপজ্জনক রাজনৈতিক বাইনারির জন্ম দিলো এবারের নির্বাচন, একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, কর্পোরেট মিডিয়া— এই তিন স্তম্ভের ওপর ভর করে বাংলা দখলের পরিকল্পনা করেছিল বিজেপি, ছিল তৃণমূলের দাগী দলবদলু একঝাঁক নেতা। প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেলিকপ্টারে চড়ে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন টানা তিনমাস ধরে— এমন একটা সময়ে যখন কোভিড অতিমারিতে গোটা দেশ বিপর্যস্ত। অশ্লীলভাবে কাঁচা টাকা উড়েছে, তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অপচেষ্টা চলেছে। এই পাহাড়প্রমাণ চাপের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষ ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত বিচক্ষণতার হলো গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে বিজেপিকে রুখে দিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারে বামপন্থীরা রাজ্য ও কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আক্রমণের স্ট্র্যাটেজি নিয়েছিলেন। মূলত তৃণমূল বনাম বিজেপি— মিডিয়াসৃষ্ট এই বাইনারি থেকে নির্বাচনী প্রতর্ককে একটা তৃতীয় দিশা দেখানোই ছিল বামেদের উদ্দেশ্য। এটা অনস্বীকার্য যে বামেদের প্রকল্পে বিজেপি বিরোধী সেন্টিমেন্ট যেমন ছিল, প্রতিষ্ঠান বিরোধী সেন্টিমেন্ট তার থেকে কিছু কম ছিলো না। যদিও তাঁদের সেই প্রচার মানুষ গ্রহণ করেননি। বিজেপি ৩৮% ভোট পেয়ে নিজেদের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তৃণমূল পেয়েছে প্রায় ৪৮% ভোট। তাহলে সত্যিই কি ফ্যাসিবাদের অনুপ্রবেশ আটকানো গেলো? চারিদিকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধজয়ের উল্লাস দেখতে দেখতে সত্যিটা গুলিয়ে যাচ্ছে।
বিজেপির কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন যেন ছিল কার্যত লাস্ট ফ্রন্টিয়ার, যার অপর পাড়েই যেন আরএসএস-এর সাধের হিন্দুরাষ্ট্র। স্বভাবতই সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ায় বিজেপি এখন ক্ষেপা মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে, গণতন্ত্রের লজ্জাবস্ত্রটুকু খুলে ফেলতে মরিয়া তারা। নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ছয় বছরের পুরনো নারদা মামলায় সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ববি হাকিম, শোভন চট্টোপাধ্যায় এবং মদন মিত্রকে সিবিআই দিয়ে গ্রেফতার করাটা ভারতবর্ষের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর, এবং সর্বোপরি, সিবিআই-এর মত স্বয়ংশাসিত সংস্থার নিরপেক্ষতার ওপর একটা বিরাট আঘাত। এটি রাজ্যে বিজেপি নেতা-কর্মীদের চাগিয়ে তোলার একটি "অমিত" দাওয়াইও বটে। একইসঙ্গে তৃণমূলের যেসব দলবদলু নেতা আবার পুরনো দলে ফেরার কথা ভাবছেন, ইতিমধ্যেই যাদের দলে ফেরত আসা সম্পর্কে সদর্থক বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বময়ী কর্ত্রী, এটা তাঁদের কাছেও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্যত শীতঘুমে গিয়েছেন, দলের অভ্যন্তরে তাঁর নির্বাচনী কুশলতা সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এদিকে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে গঙ্গাবক্ষে ভেসে যাওয়া শয়ে শয়ে মৃতদেহ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেআব্রু করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিবিআই অস্ত্রে অনেক কটি লক্ষ্যভেদ একসঙ্গে করতে চাইলেন মোদি-শাহ। পারলেন কিনা, তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত।
চারিদিকে এই মৃত্যুমিছিল আর অনন্ত হাহাকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিজেপির এই প্রতিহিংসার রাজনীতি বুঝিয়ে দিলো যে তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রাণের মূল্য কানাকড়িও নয়।
মজার ব্যাপার, একই মামলায় অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী বা শঙ্কুদেব পন্ডাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন বোধ করেনি সিবিআই! রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় যথারীতি সমস্ত সংসদীয় রীতিনীতি বহির্ভূত ভাবে কার্যত আরএসএস-এর এজেন্টের ভূমিকায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই গ্রেফতারির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। বামফ্রন্ট, কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলও এই অতিমারি পরিস্থিতির মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ফ্যাসিস্ট চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মুশকিল হলো, ভারতবর্ষের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের একটি মাত্রই ভোট, এবং আইনের চোখেও সমান অধিকার। দুষ্টু গরুকে ভাঙা বেড়া দেখানোর দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনোই অস্বীকার করতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে বাম-কংগ্রেসের নির্বাচনে জেতা জনপ্রতিনিধিদের কখনো ভয়, কখনো লোভ দেখিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করানো এবং বিরোধীদের দখলে থাকা গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদগুলিকে দখল নেওয়া— এগুলো রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল তাঁর আগের দুটি টার্মে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল্যবোধের প্রতি ন্যূনতম বিশ্বাস থাকলে এই কাজ করা যায় কি? ২০১৮ সালে "বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত" করতে গিয়ে বাম-কংগ্রেস কর্মী সমর্থকদের ওপর তীব্র নির্যাতন নামিয়ে আনে তাঁর দল, একদিকে মস্তান বাহিনী আর অন্যদিকে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল সেই সময়ে, মিথ্যা মামলায় সাধারণ মানুষকে জড়ানো জলভাত হয়ে গেছিল। "রাস্তায় দাঁড়ানো উন্নয়নকে" বাংলার মানুষ যে ভালোভাবে নেননি, তার প্রমাণ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল। কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকার সুযোগে এবং মোদির সুপারম্যান ইমেজকে (যার পুরোটাই পেটোয়া মিডিয়ার গড়ে তোলা) কাজে লাগিয়ে তৃণমূল বিরোধী ভোটকে নিজেদের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হয় বিজেপি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৪.৯১%, বামফ্রন্ট ২৫%, কংগ্রেস ১২.২৫% এবং বিজেপি মাত্র ১০.১৬% ভোট পেয়েছিল। তিনবছরের মধ্যে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে বামেরা ৭ শতাংশ আর কংগ্রেস ৫.৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। তৃণমূলেরও ভোট কমে দাঁড়ায় ৪৩.৬৯%।
দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করার পরে মোদি সরকার তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে আরো ক্রূর ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। তিন তালাকের ক্ষেত্রে ফৌজদারী দণ্ডবিধির প্রয়োগ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ, বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন রায়, বিভিন্ন রাজ্যে লাভ জিহাদ আইন প্রণয়ন, ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির প্রশ্নে বৈচিত্র্যকে ধূলুণ্ঠিত করে মানুষকে উন্মত্ত করে তোলা, মেকি দেশপ্রেমের নামে সমস্ত সমালোচনার কণ্ঠরোধ করা এবং সর্বোপরি সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, নাগরিকত্ব প্রমাণের এক অসম্ভব দায় চাপিয়ে দেওয়া দেশের পূর্ব প্রান্তের চার-পাঁচটি রাজ্যের অধিবাসীদের ওপর, এবং সেখানেও মুসলমানদের মুখোমুখি করা অন্যায্য বৈষম্যের— এই প্রত্যেকটা পদক্ষেপে ফ্যাসিবাদের ধ্রুপদী ছাপ রয়েছে। বিশেষত গত দেড়বছরে কোভিড মহামারির সুযোগ নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রের সমস্ত রীতিনীতি লঙ্ঘন করে যেভাবে একের পর এক জনবিরোধী আইন পাশ করিয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। কৃষক-স্বার্থ বিরোধী তিনটি কৃষি আইন; নয়া শ্রম কোড; ব্যাঙ্ক, বিমা, রেল, কয়লা ইত্যাদি শিল্পের ঢালাও বেসরকারিকরণ; পেট্রল-ডিজেল-রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি; পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও অরণ্যের অধিকার আইনের তরলীকরণ; নয়া শিক্ষানীতি— এর সব কটার উদ্দেশ্যই ছিল ক্রোনি কর্পোরেটদের মুনাফা বাড়ানো। এছাড়াও সামাজিক ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মাৎসন্যায় তৈরি হয়েছে। আখলাখ, পেহলু খাঁ, আফরাজুল, তবরেজ আনসারীর মত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে স্রেফ মুসলমান হওয়ার "অপরাধে" পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। উন্নাও, কাশ্মীর, হাথরাসে জাতীয় পতাকা হাতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির মিছিল আমাদের দেখিয়েছে যে ধর্ষণের মত ভয়ানক সামাজিক ব্যাধিরও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হওয়া সম্ভব।
শাহীনবাগে নাগরিকত্ব আইন বিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রীয় মদতে গণহত্যা চালানো হয় খোদ রাজধানীর বুকে। যারাই এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রতিবাদ করেছেন, তাদের হয় কালবুর্গি, দাভোলকর বা গৌরী লঙ্কেশের মতো খুন হতে হয়েছে, নইলে সুধা ভরদ্বাজ, ভারাভারা রাও, গৌতম নওলাখা, আনন্দ তেলতুম্বে, কাফিল খান বা উমর খালিদের মত দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাবন্দী হতে হয়েছে।
কোণঠাসা হতে হতে ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজ একটা আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বে ভুগছে। প্রতিনিয়ত দেশপ্রেমের প্রমাণ দেওয়ার থেকে তারা আজ নিজেদের আত্মপরিচয়কে সজোরে ঘোষণা করতে চাইছে। আর সাধারণ মুসলমানের এই অসহয়তার সুযোগ নিয়েই রমরমা হচ্ছে ক্রুড আইডেন্টিটি পলিটিক্সের। একদিকে তার ফায়দা তোলা শুরু করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর অন্যদিকে মতুয়া রাজবংশী সহ বিভিন্ন নিপীড়িত সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষের চাষ শুরু করলো সঙ্ঘ পরিবার। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের খারাপ ফলের পর থেকেই রাজ্যে আরএসএস পরিচালিত সংস্থাগুলো ব্যাঙের ছাতার মতো বাড়তে শুরু করে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আরএসএস-এর শাখা-প্রশাখা বাড়তেই থাকে। একইভাবে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে অসরকারি খারিজি মাদ্রাসার সংখ্যা চোখে পড়ার মত বৃদ্ধি পায়, এবং সেগুলি মূলত ব্যবহৃত হয় ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা ছড়ানোর কাজে। ফলে রাজ্য সাম্প্রদায়িক বারুদের স্তূপের ওপরেই বসে ছিল। যার ফল আমরা দেখি ধুলাগড়, বসিরহাট, কালিয়াচক, দত্তপুকুরে। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় প্রশাসনের নাকের ডগায় দাঙ্গা বাধানো হয় প্রতিটি ক্ষেত্রে। সাধারণ খেটে খাওয়া হিন্দু ও মুসলমান মানুষের প্রাণ ও সম্পত্তি নষ্ট হওয়ায় ধর্মের ভিত্তিতে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয় গোটা রাজ্যে। কর্পোরেট মিডিয়া এবং বিজেপির আইটি সেল ধর্মীয় বিদ্বেষ পৌঁছে দেয় বাংলার ঘরে ঘরে। অর্থনৈতিক দুর্দশা, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু চাপা পড়ে যায় মেরুকরণের বাতাবরণে, ফলে রুটিরুজি ও অধিকারের প্রশ্নে বামপন্থীদের তোলা জরুরি প্রশ্নগুলো ভোটের বাজারে মানুষের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছয় না। অন্যদিকে সঙ্কটগ্রস্ত, বিপন্ন জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলির সুরাহা করতে না পারলেও রাজ্য সরকার বিনামূল্যে রেশন, দুয়ারে সরকার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদির মাধ্যমে প্রান্তিক, গরিব এবং শ্রমজীবী মানুষকে কিছু তাৎক্ষণিক সুরাহা পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে শাসকদলের হৃত জনসমর্থন শুধু ফেরতই আসেনি, অনেকটাই বেড়েছে।
কিন্তু নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় ফেরত আসার পরে আমরা কি দেখলাম? এখানে একটু নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গবেষণার সূত্রে গত দু’বছর ভাঙ্গড় এবং পূর্ব ক্যানিংয়ে আমার নিয়মিত যাতায়াত এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে একটা যোগাযোগ রয়েছে। ২ মে নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর পর এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে সংযুক্ত মোর্চার ৫০০র বেশি কর্মী ঘরছাড়া, মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে প্ৰত্যেকের বিরুদ্ধে। মাটি কাটার জেসিবি এস্কাভেটর ভাড়া করে বহু বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, মেয়েরা আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয় স্বজন বা প্রতিবেশিদের বাড়িতে। রাজ্যের শাসকদলের চারজন নেতা আর্থিক দুর্নীতির কারণে গ্রেফতার হওয়ায় যাঁরা গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত বলে প্রতিবাদে সরব, নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁরা মুখ খোলেন নি। কারণ সেই হানাহানিতে মারা যাচ্ছিল, আহত হচ্ছিল, বিনা দোষে জেল খাটছিল যারা, তাদের গায়ের রং কালো, তারা ইংরেজি জানে না, তাদের পদবী মন্ডল, মোল্লা, বাগদি, ওঁরাও, হাড়ি বা শেখ। এরা মিটিংয়ে ভিড় বাড়ানো সাধারণ মানুষ, পতাকা বওয়া, পোস্টার বা বোমা মারা, ভোটের দিন বুথ জ্যাম করা- এটাই তাদের একমাত্র উপযোগিতা রাজনৈতিক দলের কাছে। দু’ সপ্তাহ ধরে বিরোধী দলগুলোর সাধারণ কর্মীদের ওপর তীব্র অত্যাচার যখন নেমে এসেছিল, পুলিশ-প্রশাসনের সাহায্যে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাদের ঘরছাড়া করা হচ্ছিল যখন, তখনও গণতন্ত্র এভাবেই ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু সেটা আমাদের এভাবে নাড়া দেয়নি। কারণ শ্রেণীচরিত্রগতভাবে ওরা "অপর", আর সুব্রতবাবুরা ভদ্রবিত্তশ্রেণীর আপনজন। তাই আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিমারিকে ছাপিয়ে গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে হাহাকার। যেটা আমরা ভুলে যাচ্ছি, তা হলো গণতন্ত্রের অনুশীলন তৃণমূলস্তর থেকে না করা হলে ফ্যাসিবাদের দমকা হাওয়ায় তাসের ঘরের মত ওপরের কাঠামোটাও ভেঙে পড়তে বাধ্য।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.